রাত ১০:০২ ; মঙ্গলবার ;  ১৮ জুন, ২০১৯  

পথশিশুদের সাথে বিজয় দিবস উদযাপন

৪০ পথশিশুকে শীতবস্ত্র প্রদান

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সাবিদিন ইব্রাহিম।।

বিজয় দিবসকে সামনে রেখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী এক অন্যরকম বিজয় দিবস উদযাপন করে। তারা একদল পথশিশুর সাথে বিজয় দিবস উদযাপন করে। এই ভয়াবহ শীতে তাদেরকে সেরা উপহার দিল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা। প্রায় ৪০ জন পথশিশুকে শীতের কাপড় প্রদান করে। প্রত্যেক সেটে একটি টুপি, একটি সোয়েটার বা জ্যাকেট ও একটি কম্বল ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের একদল শিক্ষার্থীর উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান ‘প্রয়াস’ এই মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের দ্বিতীয় তলায় ১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় শীতবস্ত্র প্রদান অনুষ্ঠান শুরু। প্রথমেই পথশিশুদের হালকা নাস্তা দেয়া হয়। নাস্তাপর্ব শেষ হওয়ার পর আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ আসন গ্রহণ করেন। বিজয় দিবস, শীতবস্ত্র বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘প্রয়াস’ এর উপদেষ্টা এবং জবি ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক দ্বীন ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন প্রয়াস এর সভাপতি মাহমুদুল হাসান অপু।

‘প্রয়াস’কে পরিচিত করা ও প্রয়াসের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা রাখেন প্রয়াসের সহ-সভাপতি মানিক সাহা ও আল আমিন শুভ। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন প্রয়াসের সাংগঠনিক সম্পাদক অভিনি অলিভিয়া।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জবি ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক দ্বীন ইসলাম তার শিক্ষার্থীদেরকে এমন সুন্দর অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য সাধুবাদ জানান এবং সবসময় এরকম উদ্যোগের পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করেন।তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষ হয়ে গেলেও প্রয়াসের কর্মীগণ পথশিশুদের সাথে সম্পর্ক ছেদ করবে না, পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এদের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখবে।

প্রধান অতিথির বক্তৃতার পর শুরু হয় শীত বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচি। শিশুরা সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে অতিথি ও প্রয়াসের বন্ধুদের কাছ থেকে শীতের পোশাক সংগ্রহ করে।

প্রত্যেক পথশিশুই তাদের শীতের কাপড় পায়। শীতের কাপড় নিয়ে হইচই করতে করতেই শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে নৃত্য ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন প্রয়াসের বন্ধুরা। পথশিশুরাও গান, কবিতা আবৃত্তি ও একক অভিনয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটিকে রাঙিয়ে তুলে। তারা একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায়ও অংশগ্রহণ করে।

পথশিশুদের বিপদসংকুল জীবনকে সত্যিকারের মানবিক জীবনে রূপ দিতে নিরলসভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে 'প্রয়াস"। প্রয়াসের 'পথশিশুর পাঠশালা" এখন শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সদরঘাট এলাকার পথশিশুদের মাঝে। সপ্তাহের পাঁচদিনই শিশুদের পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি নৈতিকতা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। তাদের সচেতন করা হচ্ছে মাদকের কুফল সম্পর্কেও। এছাড়াও স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতি ক্লাসের পরেই বাচ্চাদের খাবারও দেয়া হয়।

উল্লেখ্য, গত ঈদুল আজহা উপলক্ষেও প্রয়াস ৩১জন পথশিশুকে ঈদের নতুন জামা-কাপড় দেয়া হয় যা ইতিপূর্বে বাংলা ট্রিবিউনের তারুণ্য পাতায় প্রকাশিতও হয়। কিছুদিন আগে প্রয়াসের এক বন্ধু কেক কেটে আর রঙিন বেলুন উড়িয়ে পথশিশুদের সাথে তার জন্মদিন উদযাপন করে।

প্রয়াসের সভাপতি মো. মাহমুদুল হাসান অপু বলেন, ‘মানবিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে পথশিশুদের জন্যে ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা থেকেই প্রয়াসের পথচলা। ভবিষ্যতে আমাদের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি পথশিশুকে সত্যিকারের একটি সুন্দর জীবন উপহার দিতে চাই, যে জীবন তাদেরকে সমাজে ভালোভাবে বাঁচতে শেখাবে। সেই চেষ্টায় আমাদের সাথে আছে গোটা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।’

পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে প্রয়াসের বন্ধুরা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন পথশিশুদের জীবনের গল্প। এ ব্যাপারে প্রয়াসের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হক মোল্লা বলেন, ‘আমরা যারা ক্লাস নিতে যাই, তারা চেষ্টা করি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ওদের জীবনের গল্পগুলো জেনে নিতে। ওদের কারো গল্পের রাজা হচ্ছেন বাবা যিনি আর বেঁচে নেই; কারো গল্পের রাণী তার মা, তিনিও বেঁচে নেই। কারো কারো তো দুনিয়াতে কেউই নাই। এত দুঃখ কষ্টের মাঝেও ওদের খুনসুটি থেমে থাকে না। অনেক না পাওয়ার মাঝেও তারা বেঁচে থাকার মাঝেই জীবনের আনন্দ খুঁজে নেয়।

ছোটখাটো দুর্ঘটনা, হাত পা কেটে ফেলা বা খোসপাঁচড়াতে আক্রান্ত হওয়া পথশিশুদের জন্য নিয়মিত ঘটনা। পথশিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার জন্য প্রয়াসের বন্ধুরা সম্প্রতি একটি ফার্স্ট এইড বক্স বানায়। প্রয়াসের সহ-সভাপতি মানিক সাহা বললে, ‘পথশিশুদের দাবি সপ্তাহে সাতদিন ক্লাসের। কিন্তু অর্থের অপ্রতুলতা আর সময়ের অভাবে আপাতত সপ্তাহে সাতদিন ক্লাস নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে প্রয়াসের ক্লাস সপ্তাহের সাতদিনই নেয়া হবে এবং প্রয়াসকে ঢাকার সমস্ত পাড়া মহল্লায় ছড়িয়ে দেয়া হবে। সেই লক্ষে আমাদের একদল কর্মী কাজ করেও যাচ্ছে।’

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নে ৩০ লাখ মানুষ ১৯৭১ সালে অকাতরে তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল। তাঁদের সেই স্বপ্ন এখনো পূরণ না হলেও স্বপ্ন পূরণের দিকেই হাঁটছে বাংলাদেশ। আর সেই স্বপ্নের বাংলাদেশকে বাস্তবায়িত করতে সারা বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছে প্রয়াস কর্মীদের মতো অসংখ্য তরুণ। আর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নেরই একটি ধাপ হচ্ছে পথশিশুদের শিক্ষা, অন্ন, বস্ত্র প্রদান।

এমবিআর

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।