রাত ০১:২৭ ; শুক্রবার ;  ২১ জুন, ২০১৯  

এক টুকরো স্বাধীনতা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

লিপটন কুমার দেব দাস।।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পা ফেলতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আপনাকে স্বাগত জানাবে। স্মৃতিস্তম্ভ ‘স্মরণ’ আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেবে ১৯৭১ সালের এক খণ্ড মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব গাঁথা। যুদ্ধে শহীদ ১৫ মুক্তিযোদ্ধা আপনাকে বরণ করে নেবে আত্মত্যাগ আর বীরত্বের সম্ভাষণে।

১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পরের দিন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হল সংগ্রাম পরিষদ । তৎকালীন চবি উপাচার্য ড. আজিজুর রহমান (এ.আর.) মল্লিকের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের শ্রেণীকক্ষে (বর্তমানে চবি স্কুল) একটি সভায় আত্মপ্রকাশ হল সংগ্রাম পরিষদের। শিক্ষক, ছাত্র-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত এ সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. ফজলী হোসেন।

এরপরের ইতিহাস বীরত্বের, গৌরবের, আত্মত্যাগের। মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন শিক্ষক, ১১ জন ছাত্র এবং ৩ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী শহীদ হলেন। পরবর্তীতে যুদ্ধে বীরত্বের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের কর্মচারী মোহাম্মদ হোসেন ‘বীর প্রতীক’খেতাবে ভূষিত হন।

‘আমাদের আত্মত্যাগ তোমাদের জন্য’ এই বার্তার সামনে দাঁড়িয়ে তরুণটি কী সেই ত্যাগের ইতিহাসপড়ছে?

মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ১৫ বীর সেনানীরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের চেইনম্যান বীর প্রতীক মোহাম্মদ হোসেন, চাকসু’র জিএস আবদুর রব, সমাজতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ, ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ফরহাদ উদ-দৌলা, অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র নাজিম উদ্দিন খান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রভাস কুমার বড়ুয়া, আলাওল হলের প্রহরী ছৈয়দ আহমদ, দর্শন বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক অবনী মোহন দত্ত, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল মনসুর, বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হোসেন, মোস্তফা কামাল ও মনিরুল ইসলাম খোকা, বাণিজ্য অনুষদের শিক্ষার্থী খন্দকার এহসানুল হক আনসারি, অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র আবদুল মান্নান এবং ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আশুতোষ চক্রবর্তী।

যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সংগ্রাম পরিষদ আলাওল হলকে ঘাঁটি করে শক্ত প্রতিরোধ তৈরি করে। এ প্রতিরোধ চলে ২৬ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা জাফর ইমামের নেৃতেৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন। পরে ২৫ ডিসেম্বর তাঁরা পাক হানাদারদের হাত থেকে ক্যাম্পাস মুক্ত করেন।

দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, তরুণ একটি স্বাধীন প্রজন্মের জন্য যাদের এই আত্মত্যাগ তারা অমর হয়ে রয়ে গেছেন আমাদেরই স্মৃতির মাঝে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে তৈরি করা হয়েছে তিনটি স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভ ‘স্মরণ’, ‘বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং ‘স্বাধীনতা ভাস্কর্য’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সামনেই রয়েছে স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্যটি। খ্যাতিমান শিল্পী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক মুর্তজা বশীরের একক প্রচেষ্টায় এ ভাস্কর্য নির্মিত হয়। ভাস্কর্যটি প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পথে নির্মাণের কথা থাকলেও স্বাধীনতাবিরোধীদের হুমকির মুখে শেষ পর্যন্ত কলা অনুষদের সামনে স্থাপন করা হয়। ভাস্কর্যটিতে চারটি আবাবিল পাখির প্রতীকী নির্মাণে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাঙালি জাতির ছয় দফা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্রমধারা। পাখির ডানায় ২১টি পাথরের টুকরায় লিপিবদ্ধ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। আর ভাস্কর্যের মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে জাতীয় ফুল শাপলার ওপর।

বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভটি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে স্থাপন করা হয়েছে। চবি শহীদ মিনারের বিপরীত পাশে এই স্তম্ভটি। স্তম্ভটির অবস্থান বুদ্ধিজীবী চত্বর নামে পরিচিত। প্রথিতযশা শিল্পী রশিদ চৌধুরী এর নকশা প্রণয়ন করেন। ১৯৮৫ সালে স্থাপিত এ স্মৃতিস্তম্ভটি এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীল কর্মের সূতিকাগার হিসাবে ভাবা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পথেই প্রথম চোখে পড়ে যে স্তম্ভটি তার নাম ‘স্মরণ’। স্মৃতিস্তম্ভটির স্থপতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ সাইফুল কবীর। ভূমি থেকে স্মরণের মূল বেদি পর্যন্ত চারটি ধাপ। প্রতিটি ধাপ বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। প্রথম ধাপ বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, দ্বিতীয় ধাপ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, তৃতীয় ধাপ সত্তরের নির্বাচন ও চতুর্থ ধাপে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। বেদির ওপরে রয়েছে দুটি স্তম্ভ। সামনের প্রশস্ত স্তম্ভটির উচ্চতা ৯ ফুট যা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সময়কে বোঝায়। স্তম্ভের এই অংশটি কালো রংয়ের গ্রানাইড পাথরে আবৃত। উপরের অংশে লাল রংয়ের গ্রানাইড পাথর, যা পাহাড়বেষ্টিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রতীকী রূপ। স্তম্ভের পেছনের দ্বিতীয় অংশটি পুরোপুরি কালো গ্রানাইড পাথরের তৈরি। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতীক। পুরো স্তম্ভটির উচ্চতা ১৬ ফুট। এই উচ্চতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের কথা।

মুক্তিযুদ্ধের একখণ্ড ইতিহাস বুকে নিয়ে যখন কাঁটা পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার পালা, তখন চোখ পড়বে ‘স্মরণ’ স্মৃতিস্তম্ভের চকচকে কালো গ্রানাইড পাথরে। যেখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন, ‘আমাদের আত্মত্যাগ তোমাদের জন্য’।

আলোকচিত্র: অনির্বাণ রায়

এমবিআর

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।