বিকাল ০৫:৪৪ ; বুধবার ;  ১৬ অক্টোবর, ২০১৯  

ঠাণ্ডা চায়ে গরম অাওয়াজ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

২০১০ সালে শ্যুটিং শুরু হলেও নানান জটিলতার কারণে ‘এক কাপ চা’ চলচ্চিত্রটির কাজ শেষ করতে হয়েছে ২০১৪ সালে। এর মাধ্যমেই চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে চিত্রনায়ক ফেরদৌসের হাতেখড়ি। সেজন্যই বোধ হয় এ ছবিকে ঘিরে সিনেমা জগতে এক ধরনের আগ্রহ এবং প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কতটুকু প্রত্যাশা মেটাতে পেরেছে নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামূল পরিচালিত ‘এক কাপ চা’? রিভিউ লিখেছেন- মাহমুদুল হক মনি

‘হঠাৎ বৃষ্টি’ খ্যাত পরিচালক বাসু চ্যাটার্জীর গল্পে তৈরি হয়েছে রোমান্টিক কমেডি ধাঁচের ‘এক কাপ চা’। সরলরৈখিক প্রেমের এ গল্পের মূল চরিত্র শফিক ও দীপা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সহপাঠী দীপাকে (মৌসুমি) শফিকের (ফেরদৌস) ভালো লাগে। কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনি। ঘটনাক্রমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শফিক ইংরেজির লেকচারার আর দীপা লাইব্রেরিয়ান হিসেবে যোগদান করে। ভালো লাগার মানুষকে সহকর্মী হিসেবে পেয়ে শফিক নতুন উদ্যমে তার ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে চায়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দীপাকে তার মনের কথা বলতে পারে না। প্রতিদিন দীপার টেবিলে একটি লাল গোলাপ রেখে শুধু স্বপ্নই দেখে শফিক। তাতেও কাজ হয় না। পরে একদিন সাহস করে শফিক দীপাকে তার ভালো লাগার কথা বলে একসঙ্গে এক কাপ চায়ের প্রস্তাব দেয়। পরদিন দীপার বাসায় এক কাপ চা পান করতে গেলে শফিক নানা বিড়ম্বনায় পড়ে। এখানেই গল্পের মূল উপজীব্য বিষয়। দীপা যে ভদ্রলোকের বাসায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকে, তার ছেলে দূরারোগ্য ব্যধিতে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়। যার জন্য প্রয়োজন বিশেষ একটি দুষ্প্রাপ্য ইঞ্জেকশানের যা শুধু ডাক্তার আফজালের বাসায় রয়েছে। শফিক ওই ঔষধ আনতে গেলে শফিকের সাথে এক এক করে ঘটতে থাকে নানা ঘটনা দূর্ঘটনা। সেখানেই শফিকের সাথে দেখা হয় বার ড্যান্সার ও যৌনকর্মী দিলরুবার (ঋতুপর্ণা) সাথে। শেষ পর্যন্ত সকল ধকল শেষে শফিক কীভাবে দীপার সাথে এক কাপ চা খায়, তাই দর্শককে সিনেমার শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে।

চিত্রনায়ক ফেরদৌসকে দর্শক মূলত চিনেন ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ ছবি থেকে। বাসু চ্যাটার্জী গল্পে ‘এক কাপ চা’ ছবিটি প্রযোজনা ও এতে অভিনয় করে ফেরদৌস তার ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র সফলতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চেয়েছেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে ফেরদৌস এ ছবিকে রোমান্টিক নির্মল হাসির ছবি হিসেবে দাবি করেছেন। কিন্তু বাস্তবে পর্দায় দর্শক একটি দ্বিধান্বিত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র দেখছে যেখানে রোমান্স, কমেডি, মারামারি, সাসপেন্স এর খিচুড়ি রয়েছে।

‘এক কাপ চা’ ছবির সাফল্যের দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমেই আসবে এর আকর্ষণীয় নাম, পোস্টার আর প্রচারণা। এক কাপ চায়ের কথা শুনলেই মনের মধ্য এক ধরণের ভালো লাগা ভর করে, সেটা কাজে দিয়েছে। পোস্টারে সেই ভালো লাগাটা সুন্দরভাবে ফুটেও উঠেছে। নামের সঙ্গে পোস্টার দেখলে ছবিটি দেখতে ইচ্ছে করে। এক কাপ চায়ের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে ইচ্ছে হয়। এ সিনেমা প্রথম দিকে অনেক দর্শক টেনেছে এ জন্যই। দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি ছবির দর্শককে নির্মল বিনোদন দেয়, তা হলো মৌসুমী আর ফেরদৌসের অভিনয়। মৌসুমীর অসাধারণ অভিনয়, নির্ভেজাল রোমান্স আর সাবলীল নৃত্য ও উপস্থাপনা দর্শক মনকে ছুঁয়ে গেছে। পর্দায় সিনেমার মূল আকর্ষণ ছিলেন এই অভিজ্ঞ নারী অভিনেতা। অনেক দিন পর পর্দায় হাজির হলেও তার আবেদন দর্শকের কাছে একটুও কমেনি। কিছু কিছু দৃশ্যে অতি অভিনয় বাদ দিলে ফেরদৌস বরাবরের মতোই রোমান্টিক। কিন্তু, পরিচালক তার চরিত্র ঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। লেকচারার শফিককে দেখে দর্শকের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন জাগে। তিনি এমন মোটা মাথা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কীভাবে হলেন? তার বাবা-মা, বন্ধু বান্ধব কেউ নেই? মারপিট করলেও এত দেরিতে কেন? এছাড়া ঋতুপর্ণার অভিনয় ছিল চলনসই। আইটেম গানে তার অংশগ্রহণে দর্শক ভিন্ন কিছু আশা করলেও নিম্নমানের চিত্রায়ণ এবং বলিউডের নাচের নকল মুদ্রা দর্শককে হতাশ করেছে। তবে এ ছবিতে তার উপস্থিতি বাড়তি আকর্ষণ তা বলার বাকি রাখে না।

এর পর যে বিষয়টি খুব সহজে চোখে পড়ে, তা হলো ছোট ছোট চরিত্রে অনেক খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় অভিনয় কুশলীদের উপস্থিতি। এ ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে এসেছেন প্রয়াত হুমায়ুন ফরীদি এবং অমল বোস। এছাড়াও নায়করাজ রাজ্জাক, ওমর সানি, হার্টথ্রব শাকিব খান, শহীদুল ইসলাম সাচ্চু, মীর সাব্বির, হালের এজাজুল, কাবিলা ও হুমায়রা হিমুসহ আরও অনেকে ছিলেন। সিনেমার শুরুতেই প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদেরর লেখা ‘লীলুয়া বাতাস’ গানের সাথে নায়ক আলমগীর ও তার কন্যা আঁখি আলমগীর এবং নীরব-নিপুণ জুটির উপস্থিতিও ছিল। কিন্তু, প্রায় ত্রিশ জন তারকাকে পর্দায় এনে আসলে কী প্রমাণ করতে চেয়েছেন প্রযোজক-পরিচালক তা দর্শক বুঝে উঠতে পারেন না। তবে কিছু কিছু জায়গায় চিত্রনাট্যে ভাটা পড়লেও দর্শক আগ্রহ ধরে রাখতে সফল হয়েছেন এ সকল তারকা।

ছবিটির প্রাণ ছিল গান আর রোমান্স। ফেরদৌস মৌসুমীর ভালো রোমান্টিক দৃশ্যের সঙ্গে ‘এক কাপ চা’ ‘স্বপ্ন দেখি আমি’ আর 'লীলুয়া বাতাস' গানগুলো দর্শকের জন্য উপভোগ্য। আইটেম গান ‘বাপরে বাপ’ ব্যতীত সবগুলো গানের দৃশ্যায়নই আকর্ষণীয়। ছবির ঝকঝকে প্রিন্টের সঙ্গে মার্জিত কথা আর সুর দর্শককে আনন্দ দেয়। টেকনিক্যাল দিকের সাফল্যের কথা বলতে গেলে, লাইটিং, সেট ডিজাইন ও শিল্প নির্দেশনায় পরিশ্রম ও যত্নের ছাপ পাওয়া যায়। আর, সার্বিকভাবে দৃশ্য পরিচালনা সুন্দর হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অভিনয় এবং ড্যান্স বারের দৃশ্যগুলো বিশ্বাসযোগ্য। অন্য বাণিজ্যিক ধারার সিনেমার মতো যেমন তেমন করে চালিয়ে দেয়া হয়নি। সার্বিকভাবে, নকল ও অশ্লীলতা বর্জিত ‘এক কাপ চা’ পরিবারের সবাইকে নিয়ে উপভোগ করার মতো ফ্রেশ। এবং তার জন্য প্রযোজক, পরিচালক ও কলাকুশলীদের পরিশ্রম সার্থক।

কিন্তু, তারপরেও এক কাপ চা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কেননা, এর সাফল্যের দিকে থেকে ব্যর্থতার দিকটাই ভারী। প্রথমেই যে দুর্বলতাটি চোখে পড়ে, তা হচ্ছে গল্প। দৃশ্যায়ন ও বর্ণনায় চমক থাকলেও মোটা দাগে গল্প খুবই সাধারণ, কোনও নতুনত্ব নেই। নির্মল হাসির উদ্রেক করার প্রেচেষ্টা বেশির ভাগ সময়ই ব্যর্থ। রোমান্টিক কমেডি সিনেমার যে ধরণের ডায়ালগের প্রয়োজন ছিল তা একেবারেই অনুপস্থিত। অতি ভদ্র ও পরোপকারী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সালমানের পতিতালয় দর্শন সিনেমার মূল স্পিরিটের সঙ্গে যায় না। অসুস্থ শিশু পিটারের কী হলো তা জানা যায় না। অনেক চরিত্রের পরিনতিও নেই। সব মিলে গল্প পরিণত নয়। মাঝে মাঝে মনে হয় এত ছোট গল্পের জন্য দুই ঘণ্টা ছাব্বিশ মিনিট বাণিজ্যিক চিন্তা বৈ আর কিছু নয়।

সিনেমাটোগ্রাফি চলনসই হলেও গানের দৃশ্য ছাড়া আর কোনও দৃশ্যে লং শট নেই। লং শটের অভাবে সিনেমাকে অনেক সময় টিভি নাটক মনে হয়। এছাড়া মৌসুমীর অনেকগুলো ক্লোজ শটে ফোকাস নেই। লাইব্রেরির ভেতরে কিছু দৃশ্য ব্যতীত ক্যামেরা অপারেশন খুবই সাধারণ মানের। কিছু দৃশ্যে লো লাইটিং চোখে পড়েছে।

অভিনয়ের কথা বলতে গেলে, ফেসবুক (কাবিলা) ও তার দুই সাঙ্গ পাঙ্গের অভিনয় দর্শককে বিরক্ত করে। এত সব তারকার উপস্থিতি থাকলেও মীর সাব্বির ও শাকিব খান ছাড়া আর সবার অভিনয়ই গড়পড়তা। দর্শক এদের কাছে কিছুই পাননি। বিশেষ করে ওমর সানি ও সাচ্চুকে কেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুটি ডায়ালগ দিয়ে পর্দায় আনতে হলো- তা বোধগম্য নয়। কারও চরিত্রে নিয়েই কাজ করা হয়নি, শুধু তাদেরকে উপস্থিত করা হয়েছে। আর প্রয়াত অমল বোস আর হুমায়ুন ফরীদিকে দেখে প্রায় সবাই বুঝতে পারেন যে এ সিনেমাটি অনেক দিন আগের শ্যুট করা। সব মিলে, এত সব তারকাদের সাথে এক কাপ চা ভাগ শেয়ার করা সম্ভব হয় না।

সম্পাদনাও ভালো হয়নি। হঠাৎ করে দৃশ্যের কর্তন, হঠাৎ অনেকের উপস্থিতি এমনটা অনেকবার ঘটেছে। ডায়লগ শেষ না হতেই দৃশ্য পরিবর্তন সম্ভবত বিশেষ জটিলতা এড়ানোর জন্য করা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু, ডিজিটাল প্রযুক্তির এই ছবির এডিটিং আরও কার্যকরী করার সুযোগ ছিল।

‘এক কাপ চা’ নামটি শুনে দর্শক যে বাড়তি প্রত্যাশা নিয়ে হলে গিয়েছিলেন তা পূরণ হয়নি। এ সিনেমা মুক্তির আগে থেকেই নানান সংবাদ ও ক্রিকেট মাঠে ফেরদৌসের কমেন্ট্রি প্রচারণা দর্শককে উদ্বুদ্ধ করেছে চায়ের আমন্ত্রণে, কিন্তু সেই চা যে ঠাণ্ডা হবে তা দর্শক আশা করেনি। এত কিছুর পরও সুস্থ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ধারার ‘এক কাপ চা’ একটি গুণগত যোগ। হারিয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে পুনরায় প্রেক্ষাগৃহে আনতে এ ছবির ভূমিকা সবার মনে থাকবে।

হুমায়ুন আহমেদের লেখা গান দিয়ে শুরু এবং হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় দিয়ে শেষ। এটা শুনলেই মনে হয় ছুটে যাই এক কাপ চায়ের আড্ডায়। কিন্তু যাওয়ার পর সব মিলে ‘এক কাপ চা’ রোমান্টিক নির্মল হাসি আড্ডার আবহ সৃষ্টি করতে পারলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে আড্ডা পুরোটা জমেনি।

 

/এমজে/


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।