সকাল ১০:০৬ ; রবিবার ;  ২১ এপ্রিল, ২০১৯  

একটি মৃত্যু ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরা

প্রকাশিত:

লিপটন কুমার দেব দাস।।

রায়হান আমার সামনে মারা যায়। মারা যাওয়ার সে দৃশ্য আজ কয়েকদিন প্রতি মুহূর্তে ভেসে ওঠে চোখের সামনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি ক্লাশে গিয়ে সকলের সামনে যখন রায়হানের কথা বলে সহযোগিতা চেয়েছি সকলের চোখেমুখেও কষ্টের নীল আভা ফুটে উঠতে দেখেছি। এমন একজন শিক্ষার্থীকে পাইনি যে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রায়হানের জন্য অর্থ সংগৃহীত বাক্সে টাকা দেয়নি। সকলের কাছ থেকে অসামান্য সাড়া পেয়েছি। বাক্সে পেয়েছি ৫০০ টাকার নোট সহ ১০০ টাকার অনেক নোট। আমি গর্বিত। আমি সত্যিই গর্বিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর বিশাল মানসিকতার পরিচয় পেয়ে। গর্বিত আমিও চবির ছাত্র হতে পেরে।

কথাগুলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র রফছান আল মাসুম খানের। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের নিচে পড়ে মারা যাওয়া রায়হানের পরিবারকে সাহায্যের হাত বাড়ানো যুবকদের মধ্যে অন্যতম তিনি।

রায়হান। ৯ বছরের একটি শিশু। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয় শাটল ট্রেনে সংবাদপত্র বিক্রি করে সে। গত ২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সেই পরিচিত ট্রেনটিই দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে তাকে। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে পড়ে থাকে তার নিথর দেহ।

রায়হানের এই মৃত্যুর দিনটিই ছিল রফছানের জন্মদিন। এইদিন বন্ধুদের সাথে তিনি শহরে যাচ্ছিলেন জন্মদিন পালন করতে। চোখের সামনে এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তিনি। রায়হানের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে গেছেন।

এই কাজে তিনি পাশে পেয়েছেন একঝাঁক নিবেদিত তরুণ প্রাণ। মো. সরওয়ার হুসাইন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, ইমতিয়াজ আহমেদ, মুজাহিদুল ইসলাম, তানজিনা ইয়াসমিন টুম্পা, রিনুয়ারা বুলবুল মনি, মাচিংওয়ে মারমা প্রমা, রিদওয়ান হাসনাত শরীফ, তাহমিনা আক্তার মিনা, রোখসানা আক্তারসহ আরও অনেককে সাথে নিয়ে শুরু করেন অর্থ সংগ্রহের কাজ।

প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাড়া পান তারা। সবার সহায়তায় রায়হানের পরিবারের জন্য কেনা হয় একটা বাটারফ্লাই সেলাই মেশিন এবং হাতে তুলে দেয়ার জন্য বেঁচে থাকে ৫ হাজার টাকা।

রায়হানের পরিবার বায়জীদ থানার সামনের বস্তিতে থাকে। সেখানে ছুটে যায় এই তরুণ দল। ছোট্ট বস্তির ঘরে এখন থাকেন নিহত রায়হানের ফুটপাতে তরকারী বিক্রেতা বাবা, গার্মেন্টস কর্মী মা আর ৫ বছরের ছোট বোন। রায়হানের পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয় সংগৃহীত অর্থ আর বাটার ফ্লাই সেলাই মেশিন।

কয়েকজন তরুণের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হয়তো রায়হানের পিতামাতার, বোনের সন্তান কিংবা ভাই হারানোর ব্যথা লাঘব করতে পারবে না। কিন্তু সব হারানোর মাঝে কিছুটা সম্বল তো তারা খুঁজে পাবেই।

এমনটাই বলছিলেন রফছান, তাদের কতটুকু সহযোগিতা করতে পেরেছি জানি না। তবে আমাদের সবাইকে দেখে রায়হানের পিচ্চি বোনের মুখে বেশ হাসি ফুটেছিল। আসার সময়ে বারবার বলছিল, 'বাইয়া আবার আইয়েন।' রায়হানের মায়ের নাড়ীছেঁড়া সন্তান হারানোর বেদনা বিধুর পাথর মুখের দিকে তাকাতে সাহস হয়নি। রাইহানের বাবার চোখে দেখেছি একটানা পানি ঝরছে, কি জানি তার চোখের অশ্রুর কোন একটি ফোঁটায় আমাদের জন্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের জন্য দোয়া ছিল কিনা?

এমবিআর

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।