রাত ১১:০৮ ; শনিবার ;  ২০ এপ্রিল, ২০১৯  

ক্যানসার চিকিৎসা: জিনথেরাপি নিয়ে চট্টগ্রামের ছেলে

প্রকাশিত:

লিপটন কুমার দেব দাস।।

হুমায়ূন আহমেদ বিদেশ থেকে যখন কেমো থেরাপি নিয়ে ফিরে আসেন, তখন তার শরীর বিধ্বস্ত। চোখের নিচে কালো রেখা স্পষ্ট। এটা কি চিন্তার কারণে নাকি চিকিৎসার ফলে হয়েছে তা নিয়ে কত শত কথা। আসল কথা হল কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির মতো প্রচলিত চিকিৎসায় মানুষের দেহের সুস্থ কোষও নষ্ট হয়। ফলে চুল পড়ে যাওয়াসহ নানান উপসর্গ দেখা যায় রোগীর শরীরে। যেমনটি দেখা গিয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের বেলায়।

ক্যানসার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি কিংবা রেডিওথেরাপি কোনওটিই শতভাগ সফল এবং নির্দিষ্ট চিকিৎসা নয়। ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য নতুন কোনও থেরাপির কথা কি চিন্তা করা যায় তাহলে?

হ্যাঁ। ক্যানসারের নতুন থেরাপি নিয়েই গবেষণা করবেন আমাদের মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান। কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির বিকল্প হতে পারে জিনথেরাপি।

চট্টগ্রামের হালিশহরের বৌবাজার এলাকায় বেড়ে ওঠা এই ছেলেটি ২৪-২৫ বছর বয়সের এই তরুণটি মাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ণ ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০১৩ সালের জুন মাসে তিনি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

চট্টগ্রামের নির্মল বাতাসে বড় হওয়া ওয়াহিদ পড়েছেন চট্টগ্রামের মুসলিম উচ্চবিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম কলেজে। ছোট বেলা থেকেই মেধাবী এই ছাত্রই এখন সুনামের বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছেন শহরের গণ্ডি পেড়িয়ে সারাদেশে। দেশ থেকে দেশান্তরে।

নিজের পরিচয় ছাপিয়ে যে জিনিস তাঁকে সাফল্যের হাতছানি দিয়ে ডাকছে তা হল, সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। জাপান সরকারের পূর্ণ শিক্ষাবৃত্তির আওতায় চার বছরের জন্য পিএইচডি করতে যাচ্ছেন তিনি। ‘ক্যাসপার ক্যাসনাইন সিস্টেম’ নামের একধরনের ব্যাকটেরিয়ার রোগ-প্রতিরোধী ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করবেন তিনি।

ক্যানসার চিকিৎসায় তার এই গবেষণা নতুন মাত্রা যোগ করবে বলেই মনে করেন তিনি। ব্যাকটেরিয়া যে পদ্ধতিতে অতি দ্রুত নিজের জিন পরিবর্তন করে নিজের জীবন রক্ষা করে, সেই একই প্রক্রিয়াতে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব কিনা তাই নিয়েই হবে গবেষণা।

তবে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে তাকে অক্লান্ত পরিশ্রমও করতে হয়েছে। নিজের প্রতিভার পরিচয় দিতে হয়েছে কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে। স্নাতকোত্তরে তার থিসিসের বিষয় ছিল আর্সেনিকোসিস। এই থিসিস তাকে এনে দিয়েছে প্রথম সম্মান। এই গবেষণার জন্য তিনি পেয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফেলোশিপ।

চবি’র প্রাণরসায়ণ ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে রয়েছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গবেষণাগার। গবেষণাগারটির নাম সেন্টার ফর রিসার্চ এক্সিলেন্স। এখানেই তিনি গবেষণা সহযোগী হিসাবে কাজ শুরু করেন।

চঞ্চলমনা ওয়াহিদুজ্জামান সবসময় নতুন কিছু করতে চাইতেন। তাই তিনি শুরু করেন মলিকুলার প্রোফাইলিং। এই কাজে যখন তিনি দক্ষতা অর্জন করলেন তখন তিনি স্তন, মূত্রাশয় ও মলদ্বারের ক্যানসারের মলিকুলার প্রোফাইলিং শুরু করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ড. জিল্লুর রহমানের সহযোগী হিসেবে তিনি তার কাজ এগিয়ে নিয়ে যান।

স্বপ্ন আকাশ ছুঁতে থাকে। বাড়তে থাকে নতুন থেকে নতুনতর জানার আকাঙ্ক্ষা। শুরু হয় ক্যান্সারের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা। আর তারই ধারাবাহিকতায় ডাক পেয়েছেন জাপান থেকে। এই মাসেই পাড়ি জমাবেন জাপান। সূর্যোদয়ের দেশ থেকে নতুন সূর্য হয়ে দেশের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলার অপেক্ষায় এখন দেশ। আগামী দিনের সেই সূর্যটা কি হতে পারবেন মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান?

এমবিআর

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।