সকাল ১১:১৪ ; সোমবার ;  ১৭ জুন, ২০১৯  

একটি স্ট্যাটাস বাঁচায় লক্ষ প্রাণ

ফেসবুকে তারুণ্য

প্রকাশিত:

তাসমিয়া আফরোজ তৃষা।।

মুরব্বিদের কাছ থেকে এ প্রজন্মের তরুণদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ এরা কাজের কাজ কিছুই করে না, সারাদিন ফেসবুকে বসে আকামে সময় নষ্ট করে। কথাটা কিঞ্চিত সত্য হলেও পুরোটা নয়। দেশে দেশে গণ-আন্দোলন থেকে শুরু করে অসহায় ব্যক্তি-মানুষের নানা সমস্যার সহযোগিতায় ফেসবুকে তরুণরা নানা রকম স্ট্যাটাস দিয়ে থাকে। এরকম একটি স্ট্যাটাসের নমুনা হচ্ছে—

একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্ত প্রয়োজন। প্লীজ হেল্প।
কপি পেস্ট শেয়ার করুন। প্লীজ হেল্প।

ফেসবুক খুললেই প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায় এরকম রক্তের আবেদন। কারো মায়ের অপারেশন, কারো আবার বাবার এক্সিডেন্ট হয়েছে, কোনও সদ্য মায়ের রক্তের দরকার, কোনও শিশুর কঠিন রোগের অপারেশন, কারো বা আবার প্রিয় বন্ধু লিউকমিয়ায় ভুগছে। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যে দেশে প্রতিদিনই অপঘাতে মানুষ মারা যায়। কত যে আহত হয় তার হয়তো হিসেবও রাখে না কেউ। কত রক্তের যে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় তারও হিসেব কেউ রাখে না। এই বেহিসেবিদের ভিড়ে বেশ হিসেব করেই কিছু স্বেচ্ছাসেবী দল অথবা একজন স্বেচ্ছাসেবী রক্ত দিয়ে সাহায্য করছে, নিজের রক্তের বিনিময়ে বাঁচাচ্ছে অনেকগুলো প্রাণ।

জাহিদ হুসাইন খান নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বললেন, এ পর্যন্ত ১৬ জনকে রক্ত দিয়েছি। তাদের মধ্যে ৫ জনই শিশু। নাম কামানো বা ভালোলাগা থেকে যে রক্ত দিই এরকম কিছু না। রক্ত দিই দায়বদ্ধতা থেকে। সমাজের প্রতি আমাদের প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা আছে। আমি রক্ত দিয়ে সেটা পালন করি এবং ভবিষ্যতে করে যাব।

প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন এর পাভেল বাবু বললেন , বিভিন্ন এলাকায় আমরা ক্যাম্পেইন করি। যার ফলে আমরা অনেক ডোনারের গ্রুপ জানতে পারি। এদের সাথে আমরা সবসময় যোগাযোগ রাখি। অনলাইন অথবা অফলাইন দু দিকেই যোগাযোগ রাখি। তবে ফেসবুক এক্ষেত্রে বেশ সাহায্য করে। একজন স্ট্যাটাস দিলে কপি পেস্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। যেমন ফেসবুকে সাবরিনা সিরাজী তিতির আপুর কথা বলতে পারি। আপুর ফ্যান ফলোয়ার অনেক। আমরা আপডেট জানালে আপু পোস্ট করেন। সহজেই সবার কাছে পৌঁছে যায়।

দিনে অগণিত অনুরোধ আসে। আমরা চেষ্টা করি দেশের যে প্রান্তেই হোক না কেন ব্লাড ম্যানেজ করে দেয়ার। যত রাতই হোক না কেন প্রয়োজন হলে আমাদের কাজ আমরা করি। যদি কোনও মেয়ে রক্ত দিতে চায় তবে তাদেরকে আমরা নিয়ে যাই আবার নিয়ে আসি। সবার ডাটা আমাদের কাছে থাকে। রক্তের প্রয়োজনে ফোন আসলেই আমরা কাজে নেমে পড়ি। অনলাইন-অফলাইন যা কিছুর প্রয়োজন হয়।

শুধু প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন নয়, রক্তের প্রয়োজনে ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ আছে। কল ফর ব্লাড, ডোনেট ব্লাড সেভ লাইফ ,মানবিক সহ হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান আছে যারা ফেসবুকে রক্তের প্রয়োজনে পোস্ট করে রক্ত সংগ্রহ করছে আর প্রতিদিন জীবন বাঁচাচ্ছে।

মানবিক-এর কর্মী জয়িতা হোসাইন বললেন, রক্ত দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। আজ আমি কাজ করছি ,কাল আমাকে দেখে হয়তো অন্যজন হাত বাড়াবে। এটাই জগত সংসারের নিয়ম। এটাই সামাজিক বন্ধন। আমাকে কেউ বলে দেয়নি মানুষের জন্য কাজ কর। নিজের তাড়না থেকেই কিন্তু কাজ করছি। সবাই তাই করে। ফেসবুক থেকে সুবিধাটা হচ্ছে আমরা একবারে অনেক কে জানাতে পারছি। মাকড়সার জালের মতো জরুরি খবর ছড়িয়ে পরে খুব অল্প সময়েই।

ফেসবুকের অপকারিতা হয়তো অনেক আছে— পাঠ্যবই বাদ দিয়ে ছেলেমেয়েরা মুখবইয়ে (ফেসবুক) মুখ ডুবিয়েছে, সময় নষ্ট করছে কিন্তু এর মাঝেও যে ভালো আছে তা প্রমাণ করে দেয় এই স্বেচ্ছাসেবী দলগুলো। দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ প্রবাদ সঙ্গী করে এগিয়ে যাচ্ছে দলগুলো। টাকার প্রয়োজনে নয় শুধু দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করে যাচ্ছে তারা। একটি ফোন, একটি স্ট্যাটাস, একটি কপি বা একটি শেয়ার এর মাধ্যমে বাঁচিয়ে তুলছে লক্ষ্য প্রাণ । অকাজের এই ফেসবুককেও তরুণেরা করে তুলেছে জীবন বাঁচানোর কারিগর।

সব কিছুর মধ্যেই ভাল খারাপ থাকে। ভালোটাকে ছেকে বের করাটাই মানুষের কাজ। তাই মানুষ করে। করবে নাই বা কেন? মানুষ তো মানুষেরই জন্য।

এমবিআর

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।