রাত ০২:১৫ ; মঙ্গলবার ;  ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯  

প্যাত্রিক মোদিয়ানোর নোবেল ভাষণ

প্রতিটা নতুন বই-ই লেখকের মন থেকে আগের বইয়ের স্মৃতি মুছে দেয়

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি ঔপন্যাসিক প্যাত্রিক মোদিয়ানো। গত রোববার, ৭ ডিসেম্বর, তিনি সুইডিশ একাডেমির স্টকহোমে নোবেল ভাষণ দেন। যথারীতি তার মাতৃভাষায়। জেমস হার্ডিকার-এর করা ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষণটি অনুবাদ করেছেন ফাহমিদা দ্যুতি]

 

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করায় আপনাদের কাছ থেকে যে সম্মান পেয়েছি তাতে আমি মুগ্ধ। আপনাদের মাঝে আমি উপস্থিত হতে পেরেছি; তাতে খুব খুশি হয়েছি। আমি সোজাসুজি এদুটো অভিব্যক্তির কথাই বলতে চাই আপনাদের সামনে। 
এত বড় দর্শক সমাবেশে এটাই আমার প্রথম বক্তব্য দেয়ার অভিজ্ঞতা। ঠিক মতো বলতে পারব কি-না সে ব্যাপারে আমি কিছুটা শঙ্কিত। খুব সহজেই কল্পনা করা যায়, কোনো লেখকের জন্য সহজ স্বাভাবিক কাজ এটা। কিন্তু কোনো লেখকের- নিদেনপক্ষে কোনো ঔপন্যাসিকের সঙ্গে বক্তব্য প্রদানের সম্পর্ক কখনও কখনও অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। স্কুলের পড়াশোনার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, লিখিত আর মৌখিক পাঠের মধ্যে তফাৎ রয়েছে। কোনো ঔপন্যাসিকের মুখে বলার পারদর্শিতার চেয়ে লেখার প্রতিভা বেশি থাকে। তিনি চুপ থাকতেই অভ্যস্ত থাকেন। কোনো আবহকে আত্মস্থ করতে চাইলে তাকে ভীড়ের মধ্যে মিশে যেতে হয়। সরাসরি আগ বাড়িয়ে না এসেও তিনি চারপাশের মানুষদের কথোপকথন শুনে থাকেন; আর যদি তিনি আলাপের মধ্যে ঢুকে পড়েন তাহলে সেটা করে থাকেন তার চারপাশের নারী পুরুষদের আলাপ সম্পর্কে নিজের অবগতিকে আরো পরিষ্কার করার লক্ষে কোনো বিচক্ষণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার অভিপ্রায় নিয়ে। তার বক্তেব্যর মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকতে পারে; কারণ লেখার মধ্যে তিনি অহরহই শব্দ কাটাকুটি করে বাতিল করেন। একথা সত্য, বেশ কয়েকবার কাটাকুটি  করে পুনরায় লেখার পরে তার শৈলী ঝকঝকে পরিচ্ছন্নতা পায়। কিন্তু দর্শক-শ্রোতাদের সামনে কথা বলার সময়ে মুখে কথা আটকে গেলে তার বক্তব্য ঠিকঠাক করে নেয়ার মতো সুযোগ থাকে না। 
ছেলেবেলায় আমি যে প্রজন্মের মধ্যে বড় হয়েছি সে প্রজন্মে অল্পবয়সীরা বড়দের চোখের সামনে ঘোরাফেরা করলেও দুচারটে ব্যতিক্রম ছাড়া এবং শুধু অনুমতি জিজ্ঞেস করার পরে ছাড়া তাদের মুখের কথা বড়রা খুব একটা শুনতে পেতেন না। তবে তাদের কথা কেউ শোনেননি এবং তাদেরকে লক্ষ না করেই অন্যরা কথা বলেছেন। সে কারণেই আমাদের কেউ কেউ কথা বলার সময় সমস্যার সম্মুখিন হয়ে থাকি, মাঝে মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই, কিংবা আমাদের কথা মাঝখানে অন্য কেউ থামিয়ে দিতে পারেন মনে করে খুব দ্রুত কথা বলে যাই। সম্ভবত সে কারণেই ছেলেবেলা শেষ হওয়ার পথে অন্য অনেকের মতো আমার মধ্যেও লেখালেখির ঝোঁক চেপে বসে। সে বয়সে মনের মধ্যে আশা জাগে, বড়রা আমাদের লিখিত কথাগুলো শুনবেন। এভাবে আমাদের কথা থামিয়ে না দিয়ে বরং শুনতে বাধ্য হবেন তারা এবং ভালো করে বুঝতে পারবেন আমাদের বুকের ভেতর কী কথা লুকিয়ে আছে।  
আমাকে পুরস্কার প্রদানের ঘোষণাটিকে অবাস্তব মনে হয়েছিল আমার। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়েছিল কী কারণে আপনারা আমাকে বেছে নিলেন। নিজের বই সম্পর্কে কোনো ঔপন্যাসিক কতখানি অজ্ঞ থাকতে পারেন, তিনি কী লিখেছেন সে সম্পর্কে ঔপন্যাসিকের চেয়ে তার পাঠকরা কতটা বেশি ওয়াকিবহাল থাকতে পারেন- সে সব ব্যাপারে সেদিন যা বুঝেতে পারলাম তার চেয়ে বেশি মনে হয় আগে কখনও বুঝিনি। ঔপন্যাসিক যখন পাণ্ডুলিপি থেকে বাক্যগঠনের ভুলত্রুটি, অধিকমাত্রায় পুনরাবৃত্তির দোষ কিংবা কখনও কখনও দুচারটে লঘু অর্থের অনুচ্ছেদ দূর করার কাজ করেন শুধু তখনই তার নিজের উপন্যাসের পাঠকের ভূমিকা নিতে পারেন তিনি। নিজের উপন্যাস সম্পর্কে তার ধারণা আংশিক এবং অস্পষ্ট হয়ে থাকে। ভারার ওপরে চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের নিচের পাশে ফ্রেসকো আঁকার সময়ে শিল্পীর যেমন ধারণা থাকে তার কর্ম সম্পর্কে ঔপন্যাসিকের ধারণাও সেরকম। খুব কাছ থেকে কাজ করেন বলে শিল্পী কাজের সময় গোটা চিত্রের সামগ্রিক রূপ ধরতে পারেন না। 
লেখালেখি একটা অদ্ভূত এবং নিঃসঙ্গ কর্ম। উপন্যাসের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা লেখার সময় হতোদ্যম ভাব চলে আসে। প্রতিদিনই  মনে হতে পারে, ভুল পথে বুঝি চলে এলাম। এরকম অনুভূতির পেছনে ফিরে গিয়ে ভিন্ন কোনো পথে এগুনোর তাড়না তৈরি করে থাকে। এরকম তাড়নার কাছে হার না মেনে বরং সামনে এগিয়ে যাওয়াই উচিত। শীতের রাতে বরফাচ্ছন্ন রাস্তায় শূন্য মাত্রার দৃশ্যমানতা নিয়ে গাড়ি চালানোর সঙ্গে লেখালেখির কাজের খানিকটা মিল রয়েছে। বিপরীত পথে ফিরে যাওয়ার মতো বিকল্প থাকে না; সামনে যেতেই হবে। যেতে যেতে নিজেকে বোঝাতে হবে কুয়াশা উঠে গেলে এবং সামনে রাস্তার অবস্থা ভালো পাওয়ার পর সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।  
কোনো বই লিখে শেষ করার মুহূর্তে মনে হতে পারে বইটা যেন সান্নিধ্য থেকে দূরে চলে যাচ্ছে এবং শেষ হওয়ার আগেই বইটা যেন স্বাধীনতার নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে। গ্রীষ্মের ছুটি হওয়ার আগের দিনের ক্লাসে বাচ্চারা যেরকম আচরণ করে থাকে বইয়ের আচরণও যেন সেরকম হয়ে যায়। বাচ্চাদের মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায়; তাদের আচরণে উদ্দামতা চলে আসে এবং শিক্ষকের কথায় আর তারা মনোযোগ দেয় না। আমি আরো একটু এগিয়ে বলতে চাই, লেখক যখন শেষ অনুচ্ছেদগুলো লেখেন তখন লেখকের হাত থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার চেষ্টায় বইটা যেন খানিকটা বৈরিতা দেখিয়ে থাকে। শেষ কথাটা লেখার সুযোগ যেন দিতেই চায় না, তার আগেই বইটা লেখককে ছেড়ে চলে যায়। লেখা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বইটার আর লেখককে দরকার হয় না। ততক্ষণে লেখককে ভুলেও গিয়ে থাকে। এরপর থেকে বইটা পাঠকদের মধ্যে নিজের গুণাগুণ খুঁজে বের করতে থাকবে। এরকম ঘটার সময় শূন্যতার একটা অনুভূতি পেয়ে বসে লেখককে। নিজেকে পরিত্যাক্ত মনে হতে থাকে। এক ধরণের হতাশাও চলে আসে। কারণ লেখার সময়ে লেখক এবং বইয়ের মধ্যে যে একটা বন্ধন তৈরি হয়ে থাকে সেটা খুব দ্রুতই ছিন্ন হয়ে যায়। আগের বইয়ের প্রেক্ষিতে লেখকের মনের ভেতর যে অতৃপ্তি থেকে যায়, অসমাপ্তির যে অনুভূতি থেকে যায় তাতেই তাড়িত হয়ে লেখক পরবর্তী বইয়ের কাজ শুরু করে দেন যাতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু সেই ভারসাম্য আর কখনও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। এভাবে বছরের পর বছর গড়িয়ে যায় আর লেখকের হাতে তৈরি হতে থাকে একটার পর একটা বই। তখন পাঠকেরা তার লেখার সমষ্টি নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু তখনও লেখকের মনে হতে থাকে, এত দিন ধরে তিনি লেখালেখি করেছেন মানে না ভেবে সামনের দিকে হঠকারী গতিতে দ্রুত এগিয়েছেন। 
সুতরাং অবশ্যই বলা যায়, নিজের বই সম্পর্কে লেখক যা জানেন তার চেয়ে বেশি জানেন পাঠক। উপন্যাস এবং পাঠকের যে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া ঘটে সেটার মিল পাওয়া যেতে পারে ডিজিটাল যুগের আগে ফটোগ্রাফ ডেভেলপ করার পদ্ধতির সঙ্গে। অন্ধকার রুমে প্রিন্ট করার সময় ফটোগ্রাম একটু একটু করে দৃশ্যমান হতো। পাঠক যখন কোনো উপন্যাস পড়ে এগিয়ে যান তখনও ওই একই রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া ঘটে। তবে লেখক এবং পাঠকের মাঝের এই সামঞ্জস্যের অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য পাঠককে অতি দ্রুত এগিয়ে যেতে না দেয়াটা জরুরী; গায়কদের সম্পর্কে আমরা বলে থাকি তারা কখনও কখনও গলাকে বেশি মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়ে থাকেন। বরং পাঠককে আনুক্রমিকভাবে প্রলুব্ধ করে এগিয়ে নিতে হবে এবং বইয়ের জন্য পরিসর রাখতে হবে যাতে বইটি পাঠককে একটু একটু করে ভেতরে প্রবেশ করতে দিতে পারে। যে কৌশলে আকুপাংচার করা হয়ে থাকে সেভাবে; সঠিক জায়গায় সুচ এমনভাবে ফোটাতে হয় যাতে নার্ভাস সিস্টেমে প্রবাহ ঘটানো যেতে পারে। 
আমার বিশ্বাস ঔপন্যাসিক এবং পাঠকের মধ্যে যে আন্তরিক এবং পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে তার মিল এবং সমকক্ষ অবস্থা পাওয়া যেতে পারে সংগীতের ভুবনে। আমি সব সময়ই মনে করেছি লেখালেখির নৈকট্য রয়েছে সংগীতের সঙ্গে। পার্থক্যের কথা বলতে গেলে বলা যায়, উপন্যাস সংগীতের মতো অতটা খাদহীন নয়। সংগীতজ্ঞদের প্রতি সব সময় আমার ঈর্ষাই হয়েছে; কেননা আমার দৃষ্টিতে তাঁরা যে শিল্পের সাধনা কনেন সেটা উপন্যাসের চেয়ে উচ্চমার্গীয়। ঔপন্যাসিকদের তুলনায় সংগীতজ্ঞদের কাছাকাছি আছেন কবিরা। ছেলেবেলায় লেখালেখি শুরু করেছিলাম কবিতা দিয়ে। আর নিশ্চিতভাবে সে কারণেই- অনেক দিন আগে একটা মন্তব্য পড়েছিলাম- সেটা এখনও মনের মধ্যে ধ্বনিত হয়: গদ্যের লেখক তৈরি হয়ে থাকেন দুর্বল কবি থেকে। সংগীতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ঔপন্যাসিকের কাজ হলো সব মানুষকে, দৃশ্যাবলীকে প্রলুব্ধ করা; গানের স্বরলিপিতে যে রাস্তাকে তিনি দেখতে পেরেছিলেন সেটাকেও প্রলুব্ধ করা তার কাজ। কেননা সেখানকার সুরের ভগ্নাংশ তার এক বই থেকে আরেক বইয়ে বহমান থাকে। কিন্তু সেটাকে তার কাছে অসম্পূর্ণ মনে হয়ে থাকে। কাজেই ঔপন্যাসিক তখন অনুতাপে ভুগবেন যেহেতু তিনি খাঁটি সংগীতজ্ঞ হতে পারেননি এবং চোপিনের নকচারনিস-এর মতো কিছু সৃজন করতে পারেননি।  
নিজের সামগ্রিক কাজ সম্পর্কে ঔপন্যাসিকের সচেতনতার অভাব এবং নিজের কাজের প্রতি সমালোচনামূলক দূরত্বের অভাব ঘটে থাকে একটা বিশেষ পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে। সে অবস্থাটা আমার নিজের মধ্যেও লক্ষ করেছি এবং আরো অনেকের মধ্যে দেখতে পেয়েছি: প্রতিটা নতুন বই-ই লেখকের মন থেকে আগের বইয়ের স্মৃতি মুছে দেয়। মনে হয় আমি সেটার কথা ভুলে গেছি। আমার মনে হতো আমি একটার পর একটা বই লিখেছি সেগুলোর মধ্যে কোনো রকম যোগসূত্র ছাড়াই। একের পর এক বিস্মৃতি আক্রমণ করেছে আর আমি সেগুলো লিখে গেছি। তবে আধোঘুমে তৈরি করা তাপিশ্রীর নকশার মতো কখনও কখনও একই রকম মুখ, একই রকম নাম, একই রকম জায়গা, একই রকম শব্দসমষ্টি একের পর এক বইতে এসে যায়। এরকমটি ঘটে থাকে অধোঘুমে কিংবা দিবাস্বপ্নের মধ্যে। ঔপন্যাসিক কখনও কখনও নিদ্রাচর হয়ে থাকেন। তার লেখনীর মধ্যে তিনি এতটাই ডুবন্ত থাকেন। কাজেই ভয় থাকে কখন তিনি রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ির নিচে চাপা পড়েন। তবে যে সব নিদ্রাচর ছাদের ওপর হাঁটেন কিন্তু পড়ে যান না তাদের চরম যথার্থতার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। 
আমাকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের ঘোষণার মধ্যে ব্যবহৃত শব্দসমষ্টিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত আছে: ‘তিনি অধিকৃতদের জীবন-জগতকে উন্মোচন করেছেন।’ ১৯৪৫ সালে যাদের জন্ম হয়েছে তাদের সবার মতোই আমিও যুদ্ধের সন্তান। আরো পরিষ্কার করে বললে, আমার জন্ম হয়েছিল প্যারিসে। আমার জন্মের জন্য অধিকৃত প্যারিসের কাছে আমি ঋণী। যারা সে সময়ের প্যারিসে বাস করতেন তারা প্যারিসকে খুব দ্রুত ভুলে যেতে চাইতেন। কিংবা বড়জোর দৈনন্দিন জীবনের চিত্র মনে রাখতে চাইতেন। যুদ্ধের সময়ের পূর্বে তাদের জীবন যাপন যেমন স্বাভাবিক ছিল তেমনই ছিল যুদ্ধের সময়েও- এমন একটা মরীচিকাময় চিত্র তারা দেখাতে চাইতেন। সে সময়ের প্যারিসের বাস মানে একটা দুঃস্বপ্ন ছিল বলা যায়। সে সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে যারা বেঁচে এসেছেন তাদের মনে বিরাজ করেছে গভীর অনুতাপ। পরবর্তীতে তাদের সন্তানরা যখন যুদ্ধের সময়ের কথা এবং সে সময়ের প্যারিসের কথা জিজ্ঞেস করেছে তখন তারা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। অথবা তারা নীরব থেকেছেন যেন স্মৃতি থেকে ওই সময়ের অন্ধকার বছরগুলো মুছে ফেলতে চান এবং আমাদের কাছ থেকে কিছুটা লুকিয়ে রাখতে চান। কিন্তু আমাদের পিতামাতাদের নীরবতার সম্মুখিন হয়ে আমরা নিজেদের মতো করে সে সময়ের চিত্র তৈরি করে নিয়েছি যেন আমরা নিজেরা সে সময়ের সাক্ষী।
সে সময়ের প্যারিস বড় অদ্ভূত এক জায়গা ছিল। ওপরে ওপরে দেখা যেত জীবন আগের মতোই আছে। নাট্যশালা, সিনেমা, গানের হল, রেস্তোরা- সব চালু ছিল। রেডিওতে গান বাজত। নাট্যশালা আর সিনেমায় আগতরা যুদ্ধের আগের চেয়ে বরং বেশি নিরাপদ ছিল। এসব জায়গার লোকেরা একে অন্যের গা ঘেসে বসে যেন বেশি নিশ্চয়তা খুঁজে পেত। কিন্তু বিচিত্র বর্ণনাও পাওয়া যায় যেগুলোতে ইঙ্গিত রয়েছে, প্যারিস মোটেও আর আগের মতো ছিল না। সে সময়ের গাড়ির অনুপস্থিতি প্যারিসকে নীরব নগরে পরিণত করেছিল। সে নীরবতার মধ্যে গাছের পাতার মর্মর শব্দ, ঘোড়ার খুরের শব্দ, লোকজনের ভীড়ের পায়ের আওয়াজ, তাদের কণ্ঠের গুনগুন শব্দ খুব স্পষ্টভাবে শোনা যেত। শীতের সময়ে পাঁচটার দিকেই নিস্প্রদীপ জারি হয়ে যেত; সে সময়ে জানালা দিয়ে সামান্য আলো বের হওয়াও নিষিদ্ধ ছিল। রাস্তার নীরবতা এবং আলোহীনতার কারণে প্যারিস যেন নিজের কাছ থেকে নিজেই অনুপস্থিত হয়ে গিয়েছিল। নাৎসী দখলদাররা প্যারিসকে বলত ‘দৃষ্টিহীন নগরী’। বড়রা ছোটরা সবাই এক মুহূর্তের ব্যবধানে দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতে পারত। এমন কি বন্ধুদের মধ্যে একজন আরেকজনের কাছ থেকে পরিষ্কার কোনো কথা পেত না; মানুষজনের কথাবার্তার মধ্যে খোলাখুলি ভাবটাই ছিল না। কারণ সবার মধ্যে আতঙ্কের অনুভূতি কাজ করত- বাতাসে ভেসে বেড়াত বিপদের আশঙ্কা। 
দুঃস্বপ্নের সেই প্যারিসে যে কোনো ব্যক্তি যখন তখন অভিযুক্ত হয়ে যেতে পারত, কিংবা মেট্রো স্টেশনের বহির্গমনে গ্রেফতার হয়ে যেতে পারত। শান্তির সময়ে যাদের পথ কোনো দিন এক হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না তাদেরও মাঝে মধ্যে একে অন্যের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। কারফিউয়ের আধো অন্ধকারের মধ্যেই ক্ষণভঙ্গুর প্রেম-ভালোবাসা তৈরি হয়ে যেতে পারত যদিও ভবিষ্যতে আর কখনও দেখা হওয়ার সম্ভাবনাই থাকত না। সেই সব ক্ষণস্থায়ী এবং জীর্ণ সাক্ষাৎকারের ফলেও পরবর্তীতে মানব সন্তান পয়দা হয়েছে। সেই কারণেই অধিকৃত প্যারিসকে আমার কাছে সব সময় এক ধরণের আদিম অন্ধকার বলে মনে হয়েছে। এরকম প্যারিস ছাড়া হয়তো আমার জন্মই হতো না। সেই প্যারিস আমাকে সব সময় বিরতিহীন তাড়া করে ফিরেছে এবং আমার উপন্যাসগুলো প্রায়ই সেই প্যারিসের অবগুণ্ঠিত আলো-স্নাত হয়েছে। 
 
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও এবং এমন কি লোকে যাকে ‘গজদন্তমিনার’ বলে থাকে সেরকম কোনো স্থানে নিজেকে আড়াল করে রাখলেও কোনো লেখক যে তাঁর জন্ম-তারিখ এবং জন্ম-সময় দ্বারা অমোচনীয়ভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন তার প্রমাণ এখানেই। তিনি যদি কাবতা লিখে থাকেন তবে সেগুলো তাঁর সময়ের প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে। তাঁর কবিতা কখনওই অন্যভাবে লেখা হতে পারে না। 
এ সত্যটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য মহান আইরিশ কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটসের বেলায়। তাঁর কবিতা “দ্য ওয়াইল্ড সোয়ানস অ্যাট কুলি” আমার কাছে সব সময়ই মর্মস্পর্শী মনে হয়েছে। ইয়েটস একটা পার্কের মধ্যে কয়েকটা রাজহাঁসকে জলের ওপরে ভেসে বেড়াতে দেখছেন: 

প্রথমবার যখন গুণেছিলাম তারপর
উনিশতম শরৎ এসেছে আমার;
ভালো করে গুণে শেষ করার আগেই দেখলাম
সবগুলোই হঠাৎ পানি থেকে উঠে পড়ল
আর বিশাল এক ভগ্নবৃত্তের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে ছড়িয়ে পড়ল 
নিজেদের পত্পত্ আওয়াজের পাখার ওপরে।

কিন্তু এখন হাঁসগুলো শান্ত জলের ওপরে হালকাচালে ভেসে যাচ্ছে
কী রহস্যময়, কী সুন্দর!
কোন সে শরের ভেতর ওরা জড়ো হবে,
কোন হ্রদের ধারে কিংবা কোন সে জলাশয়ের পাশে 
মানবের দৃষ্টিকে আনন্দ দেবে যখন আমি কোনো এক দিন জেগে উঠে
দেখব ওরা উড়ে গেছে?  

উনবিংশ শতাব্দীর কবিতায় প্রায়ই রাজহাঁসের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। বোদলেয়ারের কবিতায় আছে, মালার্মের কবিতায়ও আছে। তবে ইয়েটসের এই কবিতাটি উনবিংশ শতাব্দীতে লেখা যেত না। এই কবিতাটির মধ্যে একটি বিশেষ ছন্দ আছে, একটি বিশেষ ভিন্নতা আছে এবং এই দুটো গুণ কবিতাটিকে বিংশ শতাব্দীতে স্থাপন করেছে এমন কি যে বছরে কবিতাটি লেখা হয়েছিল ঠিক সে বছরে। 
বিংশ শতাব্দীর কোনো লেখকের মাঝে মাঝেই মনে হতে পারে তিনি তাঁর সময়ের কারাগারে বন্দি হয়ে আছেন। আর বালজাক, ডিকেন্স, তলস্তয় এবং দস্তয়েভ্স্কির মতো উনবিংশ শতাব্দীর মহান ঔপন্যাসিকদের লেখা পড়লে তার ওপরে এক ধরনের স্মৃতিকাতরতা এসে যেতে পারে। তখনকার দিনে সময় এখনকার চেয়ে ধীর গতিতে চলত এবং ওই ধীর গতি ঔপন্যসিকদের কাজের সঙ্গে মানানসই ছিল। কারণ তাতে তিনি তাঁর শক্তি এবং মনোযোগকে সুবিন্যস্তরূপে পরিচালনা করতে পারতেন। সময় এখন তখনকার চেয়ে গতি বাড়িয়েছে এবং অনিয়মিতভাবে সামনের দিকে এগোয়; এগিয়ে যাওয়ার সময় অতীতের বিশাল সব সাহিত্যিক ইমারত তথা ক্যাথিড্রালের মতো স্থাপত্যের সঙ্গে আজকের দিনের ভাঙাচোরা ও অসংলগ্ন সাহিত্যকর্মের পার্থক্য দেখিয়ে যায়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলা যায় আমার প্রজন্ম হলো ক্রান্তিকালের প্রজন্ম। পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, ইমেইল এবং টুইটের সঙ্গে যাদের জন্ম তারা এই জগৎকে তাদের সাহিত্যে কীভাবে প্রকাশ করবে সেটা দেখার প্রবল কৌতুহল আমার মনে। বলা হয়ে থাকে এই জগতে নাকি সবাই সবার সঙ্গে স্থায়ীভাবে সম্পর্কযুক্ত; আমাদের মধ্যে কিছুদিন আগেও যে আন্তরিকতা এবং গোপনীয়তা বিশেষ মানসিক এলাকা হিসেবে বজায় ছিল সেগুলোকে এই জগতের সামাজিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে ফেলছে। সেই গোপনীয়তা ব্যক্তি মানুষকে গভীরতা দান করত এবং কোনো উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু হতে পারত। তবে সাহিত্যের ভবিষ্যত সম্পর্কে আমি আশাবাদী থাকতে চাই। আমি বিশ্বাস করতে চাই ভবিষ্যতের লেখকেরা সাহিত্যের ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করে চলবেন হোমারের পর থেকে প্রতি প্রজন্মের পক্ষেই যেমনটি করা হয়েছে।  
আর তাছাড়া অন্য শিল্পীদের মতো একজন লেখক তাঁর যুগের সঙ্গে খুব আষ্টেপৃষ্টে বাধা থাকেন; নিজের সময়কে কিছুতেই এড়াতে পারেন না; তার নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে তার নিজের সময়ের পরিচয়বাহী বাতাসই ঢোকে এবং বের হয়; তবু তিনি তার কর্মের মধ্যে সময়োত্তীর্ণ কোনো কিছুর প্রকাশ ঘাটিয়েও থাকেন। রেসিন এবং শেক্সপিয়ারের রচনার মধ্যে কোনো চরিত্রকে তাঁদের সময়কার পোশাক পরানো হোক কিংবা পরিচালক তাদেরকে জিন্স এবং চামড়ার জ্যাকেট পরাতেই চান না কেন তাতে কিছু যায় আসে না। সেগুলো আসলে তেমন কোনো তাৎপর্য বহন করে না। তলস্তয় পড়ার সময় আনা কারেনিনাকে দেড়শো বছর পরেও আমাদের এতটাই কাছের মনে হয়, আমরা ভুলেই যাই তার পরনে ১৮৭০ সালের পোশাক রয়েছে। এডগার অ্যালান পো, মেলভিল কিংবা স্টেন্ধালের মতো লেখকও আছেন; তাঁদের মৃত্যুর দুশো বছর পরও পাঠক তাঁদের লেখা খুব ভালো করেই বুঝতে পারেন, এমন কি তাঁদের সমসাময়িককালের পাঠকদের চেয়েও ভালো করে বুঝতে পারেন। 

শেষ পর্যন্ত লেখক তার সময়ের চেয়ে কতখানি দূরে অবস্থান করতে পারেন? জীবনকে বর্ণনা করার জন্য জীবনের একেবারে প্রান্তে অবস্থান করেন। কারণ লেখক নিজের সময়ের মধ্যে ডুবে থাকলে যে চিত্রকল্প ধরতে পারবেন সেটা হয়ে যাবে ভিন্ন উপাদানে মিশ্রিত। কিন্তু তিনি সামান্য দূরত্ব বজায় রাখলে যে সকল চরিত্র এবং মানুষ বাস্তব জীবনে তাকে লেখার কাজে উৎসাহ দিয়ে থাকে তাদেরকে তুলে ধরার কাজে তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় না। ফ্লবেয়ার বলেছেন, ম্যাডাম বোভারি মানে আমিই। রাশিয়ার এক স্টেশনে এক রাতে এক মহিলাকে ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছিলেন তলস্তয়। তাৎক্ষণিকভাবে তলস্তয় নিজেকেই দেখতে পেয়েছিলেন মহিলার মধ্যে। ওই মহিলার মধ্যে নিজেকে দেখতে পাওয়ার মাত্রা এতদূর এগিয়েছিল যে, তলস্তয় তাঁর বর্ণনার আকাশ আর ভূচিত্রকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। ওই ভাবের মধ্যে তিনি পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিলেন, এমন কি আনা করেনিনার চোখ পিটপিট করার মতো তুচ্ছ কাজের মধ্যেও। এই পরিবর্তিত অবস্থাট হলো আত্মরতির বিপরীত। কারণ এই অবস্থার মধ্যে আত্মবিস্মৃতি এবং সর্বোচ্চ মনোযোগের যুগপৎ মিশ্রণের ইঙ্গিত থাকে যাতে অতি ক্ষুদ্র বস্তুর বর্ণনাও লেখকের দৃষ্টিকে এড়িয়ে যেতে না পারে। এতে খানিকটা নৈঃসঙ্গেরও ইঙ্গিত থাকে। এই প্রক্রিয়াকে নিজের ভেতর গুটিয়ে যাওয়া বলা যাবে না। বরং বাইরের জগৎ দেখার সময় এ প্রক্রিয়ায় মনোযোগের মাত্রা একটু বেশি পাওয়ার এবং বেশি মাত্রায় স্বচ্ছতা পাওয়ার সুযোগ থাকে। তখনই বাইরের জগৎকে উপন্যাসের মধ্যে স্থান দেয়া যেতে পারে। 
আমার সব সময় মনে হয়েছে কবিরা এবং ঔপন্যাসিকেরা দৈনন্দিন জীবনের আপাত বিমূঢ় মানুষদের ব্যক্তিত্বে এবং আপাত তুচ্ছ বিষয়ে রহস্য আরোপ করতে পারেন। কারণ ওই ব্যক্তি এবং বিষয়গুলোকে তারা অব্যাহত মনোযোগের সঙ্গে বারবার লক্ষ করে থাকেন, প্রায় মোহগ্রস্তের মতো করে। তাদের দৃষ্টির নিচে প্রাত্যহিক জীবন রহস্যাবৃত অবস্থায় ধরা দেয়, অনেকটা অন্ধকারে দেখা উজ্জ্বল শিখার মতো। এ চেহারাটা প্রথম দর্শনে হয়তো চোখে পড়ে না, বরং গহন গভীরে হয়তো লুকিয়ে থাকে। কবি, ঔপন্যাসিক এবং চিত্রকরের ভূমিকা হলো প্রত্যেক ব্যক্তির গভীরে এরকম রহস্য ও অন্ধকারের মধ্যে বিরাজিত উজ্জ্বল শিখা বের করে আনা। আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় আমেদিও মোদিগ্লিয়ানির কথা মনে আসছে। তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো চিত্রকর্মগুলোর জন্য মডেল হিসেবে বেছে নিয়েছেন অপরিচিত লোক, বাচ্চা ছেলেমেয়ে, রাস্তার মেয়ে, কাজের মেয়ে, কৃষক, শিক্ষানবীশ- এরকম মানুষদের। তিনি তাদের চিত্র তৈরি করেছেন তুলির তীব্র আঁচড়ে যেগুলো দেখে মহান টুসকান ঐতিহ্যের বত্তিসেল্লি এবং কোয়াত্রোসেতোর সিয়েনিজ চিত্রকরদের কথা মনে পড়ে যায়। আমেদিও মোদিগ্লিয়ানি সাধারণ মানুষদেরকে পরিমার্জনা এবং আভিজাত্য দান করেছেন কিংবা বলা যায় তাদের সাধারণ চেহারার ভেতরে লুকিয়ে থাকা পরিমার্জনা এবং আভিজাত্য আবিষ্কার করে বের করেছেন। ঔপন্যাসিকের কর্মও ওই একই দিকে যাত্রা করবে। তার কল্পনা বাস্তবতাকে বিকৃত না করে বরং বাস্তবতার একেবারে তলা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। অবলোহিত এবং অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে উপরিতলের নিচে কী লুকিয়ে আছে বের করে আনবে এবং এভাবেই বাস্তবতাকে প্রকাশিত হতে সাহায্য করবে তার কল্পনা। আমি প্রায় বিশ্বাসই করতাম, ঔপন্যাসিক হলেন এক ধরণের অলোকদ্রষ্টা কিংবা এমন কি স্বাপ্নিক। তিনি একটা ভূকম্পলিখ- সামন্যতম নড়াচড়াও ধরে ফেলার জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকেন। 
আমার পছন্দের লেখকের জীবনী পড়ার আগে সব সময়ই আমি দুবার চিন্তা করে নিই। জীবনীকাররা অনেক সময় ছোটখাটো বর্ণনা যোগ করে থাকেন, যেমন অনির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, বিভ্রান্তিকর এবং হতাশাজনক স্বভাব-বৈশিষ্ট্য। সেগুলোকে তুলনা করা যেতে পারে রেডিওতে গান প্রচারের সময়ে শোনা রেডিওর যান্ত্রিক আওয়াজের সঙ্গে; অনেক সময় সে আওয়াজের কারণে গায়কের কিংবা গায়িকার কণ্ঠ এবং বাদ্যযন্ত্রের সুর শুনতে অসুবিধা হয়। আসলে কোনো লেখকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য আমরা পেতে পারি শুধু তার লেখা পড়ার মাধ্যমে। লেখার মাধ্যমেই তাকে ভালো করে দেখা যায় এবং ওই সব বাতাবরণ ছাড়াই তিনি নিচু স্বরে আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। 
তবু কোনো লেখকের জীবনী পড়ার সময়ে মাঝে মধ্যে তার ছেলেবেলার কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনার দেখা পেয়ে যেতে পারেন। সে রকম কোনো ঘটনার মধ্যেই হয়তো তার সমস্ত সৃষ্টিকর্মের বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে এবং সে ঘটনা সম্পর্কে লেখকের নিজেরও সচেতন পর্যায়ের পরিষ্কার বোধ নাও থাকতে পারে যদিও সে ঘটনার ছায়া বিভিন্ন রূপে তার বইগুলোর মধ্যে আনাগোনা করেছে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে আলফ্রেড হিচককের কথা। যদিও তিনি লেখক নন তবু তাঁর চলচ্চিত্রের মধ্যে উপন্যাসের গাঁথুনি এবং শক্তি দেখতে পাওয়া যায়। ছেলের বয়স যখন পাঁচ বছর হিচককের বাবা তার পুলিশ অফিসার বন্ধুর কাছে একটা চিঠি নিয়ে যেতে বলেছিলেন। চিঠি নিয়ে থানায় পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অফিসার তাকে থানার পর্দাঘেরা একটা অংশে আটকে দিলেন। সেখানে সব ধরনের অভিযুক্তদের রাতের জন্য আটকে রেখে দেয়া হতো। তাকে সেখানে ঘণ্টাখানেক থাকতে হয়েছিল। ছেড়ে দেয়ার সময় অফিসার তাকে বুঝিয়ে দিলেন ‘জীবনে খারাপ কাজ করলে তার ফলাফল কী হতে পারে।’ এরপর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। বাচ্চাদের বড় করার সত্যিকার অদ্ভূত ধারণাঅলা এই পুলিশ অফিসার নেপথ্য হিসেবে আছেন আলফ্রেড হিচককের সব চলচ্চিত্রের অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগের আবহের পেছনে।  

আমার ব্যক্তিগত গল্প বলে আপনাদের বিরক্তি ঘটাব না। তবে আমার অবশ্যই মনে হয় আমার ছেলেবেলার কতিপয় ঘটনা পরবর্তীতে আমার বইয়ের বীজ বপন করে দিয়েছিল। ছেলেবেলায় আমার অবস্থান প্রায়ই বাবা-মার থেকে দূরে ছিল, যাদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না এমন কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের কাছে, বেশ কয়েকটা জায়গায় এবং বাড়িতে থাকতে হয়েছিল আমাকে। সে রকম বয়সে কোনো কিছুই বিস্ময়কর বলে মনে হয় না। বিচিত্র পরিবেশ পরিস্থিতিও বেশ স্বাভাবিক মনে হয়। অনেক পরে আমার ছেলেবেলার ঘটনাবলীকে বিভ্রান্তিকরও মনে হয়েছে। আমার বাবা-মা আমাকে যে সব মানুষের কাছে রেখে যেতেন তাদের সম্পর্কে এবং যে সব জায়গায় আমাকে থাকতে হয়েছে সে সব জায়গা সম্পর্কে আরো তথ্য জানার চেষ্টা করেছি আমি। স্বভাবতই ওই সব জায়গা অনেক বদলে গেছে। তবে ওই সব মানুষদের অনেককেই আর চিনতে পারিনি। অতীতের জায়গা এবং বাড়িগুলোরও দৈশিক যথার্থতাসহ চেনা চেহারা খুঁজে পাইনি। কোনো ফলাফল না পেলেও বিভ্রান্তি দূর করার তাড়না এবং রহস্য খুলে দেখার তাগিদ আমাকে লেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। যেন লেখালেখি এবং কল্পনা শেষমেষ ওই সব বিচ্ছিন্ন বেপরোয়া বিষয়াদিকে এক সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করার কাজে আমাকে সাহায্য করতে পারবে। 
আমাদের কথার মধ্যে যেহেতু রহস্যের প্রসঙ্গ এসে গেছে, কথার সঙ্গে কথার প্রাসঙ্গিকতায় উনবিংশ শতাব্দীর একটা উপন্যাসের নাম মনে পড়ে গেল: লে মিস্টিরেস দে প্যারিস। ঘটনাক্রমে যেহেতু প্যারিস আমার জন্ম-নগরী, এই নগরী আমার ছেলেবেলার একেবারে প্রথম ধারণার সঙ্গে গেঁথে আছে। আর সে সব ধারণা যেহেতু খুব প্রবল ছিল, সেই সময় থেকেই আমি এযাবৎ প্যারিস নগরীর রহস্য উদঘাটন করে চলেছি। মনে আছে, আমার বয়স তখন নয় কি দশ বছর; কী কারণে যেন আমি একা হাঁটতে হাঁটেতে আমাদের এলাকার অনেক দূরের এক অচেনা জায়গার দিকে চলে গিয়েছিলাম।  আমার মনের ভেতর হারিয়ে যাওয়ার ভয়ও ছিল। জায়গাটা সিন নদীর ডানপাশের তীরের কাছে। তখন ছিল দিনের বেলা। কাজেই ভরসা ছিল মনে। আমি কৈশোরের শুরুতে মনের ভেতরকার ভয় দূর করার চেষ্টা করতাম এবং রাতের বেলা মেট্রোতে করে অনেক দূরে চলে যেতাম। এভাবেই নগরী সম্পর্কে জানা যায় এবং সে সময় আমার পছন্দের বেশ কয়েকজন ঔপন্যাসিকের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার চেষ্টাও করছিলাম। উনবিংশ শতাব্দী থেকেই প্যারিস, লন্ডন, সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং স্টকহোমের মতো নগরী তাদের উপন্যাসের পটভূমি এবং অন্যতম বিষয়বস্তু হয়েছে। 
‘দ্য ম্যান অব দ্য ক্রাউড’ গল্পে এডগার অ্যালান পো প্রথমে মানব-তরঙ্গকে তুলে আনেক। ক্যাফের জানালা দিয়ে দেখা ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের অশেষ স্রোতকে তিনি দেখেছেন। ভীড়ের মধ্যে থেকে আলাদা চেহারার এক বৃদ্ধকে বেছে নিয়ে তিনি তার পিছু নেন। রাতভর লোকটার পিছে পিছে লন্ডন নগরীর বিভিন্ন জায়গায় ঘোরেন যাতে লোকটির সম্পর্কে আরো বেশি কিছু জানতে পারেন। কিন্তু অপিরিচিত লোকটি আসলে ‘ভীড়ের মধ্যেকার একজন’, তাকে অনুসরণ করে লাভ নেই। কারণ সে সব সময় বেনামীই রয়ে যাবে এবং তার সম্পর্কে কিছু জানা আর কখনওই সম্ভব হবে না। তার নিজস্ব বা ব্যক্তিগত কোনো অস্তিত্ব নেই; সে শুধুই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে কিংবা ধাক্কাধাক্কি করতে করতে নিজেরদের মধ্যে হারিয়ে যায় যারা সে সব হেঁটে যাওয়া পথচারীদের সমষ্টির একটা অংশ। 
কবি টমাস ডি কুইন্সির ছেলেবেলায় ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার কথাও মনে পড়ছে। সেই ঘটনাটি আজীবন মনে রাখার মতো ছিল তাঁর কাছে। লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটে হাঁটার সময় একটি মেয়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়, বড় বড় নগরীতে যেমনটি হয়ে থাকে। মেয়েটির সান্নিধ্যে তিনি বেশ কয়েক দিন কাটালেন। তারপর কয়েক দিনের জন্য লন্ডনের বাইরে যাওয়ার দরকার হলো তাঁর। তাঁদের দুজনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় মেয়েটি প্রতি সন্ধ্যায়, একই সময়ে গ্রেট টিচফিল্ড স্ট্রিটে অপেক্ষা করবে। কিন্তু তাঁদের দুজনের আর কখনও দেখা হয়নি। ডি কুইন্সি বলেছেন, যদি সে বেঁচেই থেকে থাকে তাহলে আমরা একে অন্যকে একই সময়ে লন্ডনের বিশাল গোলকধাঁধার মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য অবশ্যই খুঁজেছি; হয়তো একজন আরেক জনের থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে থেকেছি। লন্ডন নগরীর ভীড়ের বাধার চেয়ে প্রশস্ত বাধা আর হয় না; কেননা সে বাধা দুজনের মাঝে মহাকালের বিচ্ছিন্নতা রচনা করতে পারে। 
বছরের পর বছর পার হয়ে যাওয়ার পরে নিজস্ব প্রতিবেশ এবং নগরের প্রতিটি রাস্তা একেকটা স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। যারা ওই নগরে জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের মনে পড়ে যেতে পারে কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ, অনুশোচনার কোনো ঘটনা, সুখের কোনো মুহূর্ত ইত্যাদি। এমনও হতে পারে, একই রাস্তা পর পর অনেকগুলো স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আবার এমনও হয়, কোনো নগরীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট কারো সারা জীবন জুড়েও বিরাজ করতে পারে। পর পর বিভিন্ন স্তরে সে সব বৈশিষ্ট্যের কথা মনে পড়ে যেতে পারে যেন প্রাচীন পাণ্ডুলিপিতে একটার ওপরে আরেকটা লেখা দেখে পড়া যাচ্ছে স্পষ্টভাবে। 
সে কারণেই আমার লেখালেখির শুরুর দিকে সাহায্য পাওয়ার জন্য আমি প্যারিসের পুরনো টেলিফোন নির্দেশিকা খুঁজে বেড়াতাম, বিশেষ করে যেগুলোতে রাস্তার নাম এবং ভবনের নাম লেখা আছে সেগুলো। সেগুলোর পৃষ্ঠা উল্টানোর সময় আমার অনুভূতি হতো, আমি যেন আটলান্টিসের মতো ডুবে যাওয়া কোনো নগরীর এক্সরের দিকে তাকিয়ে আছি আর নিঃশ্বাসে ভরে নিচ্ছি প্রাচীন সময়ের গন্ধ। অনেক বছর পেরিয়ে যাওয়ার কারণে হাজার হাজার অচেনা মানুষদের ফেলে যাওয়া চিহ্ন বলতে ছিল শুধু তাদের নাম, ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর। এমনও হয়েছে, কোনো কোনো নাম এক বছর পাওয়া গেল, কিন্তু পরের বছরের নির্দেশিকা থেকে হারিয়ে গেছে। পুরনো টেলিফোন নির্দেশিকার মধ্যে তাদের নাম ঠিকানা খুঁজে বেড়ানোর কাজটা কিছুটা হতবুদ্ধিকরও: এই ফোন নম্বরগুলোতে কল করলে আর সাড়া পাওয়া যাবে না। পরবর্তীতে ওসিপ মেন্ডেলস্টামের কবিতার কয়েকটি স্তবক আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে: 

অশ্রুর কাছে চেনা আমার নগরে ফিরে এসেছিলাম.
ফিরে এসেছিলাম আমার ধমনী আর ছেলেবেলার টনসিলের কাছে,

পিটার্সবার্গ...
তুমি যখন আমার টেলিফোন নম্বর জীবন্ত রাখছ।

পিটার্সবার্গ, আমার ঠিকানা এখনও হাতে আছে
মৃতদের কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়ার জন্য আমি ব্যবহার করব ঠিকানা।  

সুতরাং আমার মনে হয়, আমার প্রথম বইগুলো লেখার আকাঙ্খা এসেছিল আমি যখন প্যারিসের ওই টেলিফোন নির্দেশিকাগুলোর দিকে তাকিয়েছিলাম। শত শত হাজার হাজার নামের ভেতর থেকে কোনো অপরিচিত ব্যক্তির নাম, ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর পেন্সিল দিয়ে আন্ডারলাইন করা ছাড়া আমার আর কিছু করার মতো ছিল না। আন্ডারলাইন করার সময় কল্পনা করে দেখতাম ওই ব্যক্তির জীবন কেমন ছিল। 
বড় নগরে ইচ্ছে করলে নিজেকে হারিয়ে ফেলা যায় কিংবা লোকচক্ষুর আড়ালে চয়ে যাওয়া যায়। নিজের পরিচয় গোপন করে নতুন জীবনও যাপন করা যায়। বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিবেশে ঈর্ষার হদিস পাওয়ার জন্য শুধু একটি বা দুটি ঠিকানা দিনে শুরু করে দীর্ঘ তদন্ত করে দেখা যেতে পারে। অনুসন্ধান রেকর্ডে যে সংক্ষিপ্ত চিরকুট পাওয়া যায় সে রকম চিরকুটের প্রতি আমার সব সময়ই মোহ ছিল বা আছে। যেমন: সর্বশেষ জানা ঠিকানা। অন্তর্ধান, পরিচয়, সময়ের প্রবাহ- এসবের বিষয়বস্তু নগরগুলোর প্রাকৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। সে কারণেই উনবিংশ শতাব্দী থেকে ঔপন্যাসিকদের বিচরণের এলাকা হলো নগর। একেকটি নগরের সঙ্গে জুড়ে আছে তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজনের নাম: বালজাক এবং প্যারিস, ডিকেন্স এবং লন্ডন, দস্তয়েভস্কি এবং সেন্ট পিটার্সবার্গ, নাগাই কাফু এবং টোকিও, জালমার সোডেরবার্গ এবং স্টকহোম। 

আমাদের প্রজন্ম এই সকল ঔপন্যাসিকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। বোদলেয়ারের ভাষায় বলতে গেলে ‘পুরনো রাজধানী শহরের পাকানো ভাঁজ বা মোড়’-এর রহস্য খুলে দেখতে চেয়েছে আমার প্রজন্ম। অবশ্য পঞ্চাশ বছর আগে, অন্য কথায়, আমার প্রজন্মের কিশোররা যখন নিজেদের নগরের রহস্য উন্মোচন করে বিপুল রোমাঞ্চের অভিজ্ঞতা লাভ করছিল তখন নগরগুলো বদলে যাচ্ছিল। আমেরিকায় এবং লোকে যে এলাকাকে তৃতীয় বিশ্ব বলে সে সব জায়গায় সেই নগরীগুলোর বেশ কয়েকটি ম্যাগাসিটিতে পরিণত হয়েছে। অস্বস্তিকর রকমের নানাদিক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে সে সব নগরী। সেখানকার বাসিন্দারা অবহেলিত প্রতিবেশ পর্যন্ত বিভক্ত হয়ে গেছে; তারা সামাজিক যুদ্ধাবস্থার আবহের মধ্যে বাস করছে। বস্তিগুলো সংখ্যায় বাড়ছে এবং বিস্তৃতিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিংশ শতাব্দী পর্যন্তও ঔপন্যাসিকেরা নগরীগুলো সম্পর্কে কম বেশি রোমান্টিক দৃষ্টি পোষণ করতেন। তাঁদের দৃষ্টি ডিকেন্স কিংবা বোদলেয়ারের দৃষ্টি থেকে খুব বেশি ভিন্ন ছিল না। এ কারণেই ভবিষ্যতের ঔপন্যাসিকেরা কথাসাহিত্যে এইসব শহুরে মনোযোগকে কীভাবে তুলে আনেন দেখার খুব ইচ্ছে জাগে আমার। 

আমার বইগুলো সম্পর্কে আপনাদের মন্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট সদয় দৃষ্টি দেখা গেছে; আপনারা উল্লেখ করেছেন, স্মৃতির শিল্পের সঙ্গে তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ের অধরা মানব নিয়তি তুলে এনেছেন।’ কিন্তু এই সৌজন্য শুধু আমার জন্য সীমাবদ্ধ নয়। যে বিচিত্র ধরণের স্মৃতি অতীতের ছোট ছোট টুকরো ঘটনাকে এবং পৃথিবীতে পরিচয়হীন অচেনা মানুষদের ফেলে যাওয়া চিহ্নগুলোকে জড়ো করে সেই বিচিত্র স্মৃতি সম্পর্কেও এই সৌজন্য। আর এই স্মৃতিও আমার জন্মের বছর ১৯৪৫ সালের সঙ্গে অটুট বাধনে আবদ্ধ। ১৯৪৫ সালে জন্মলাভ করা, নগরীগুলোর ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে জনবসতি বিলীন হয়ে যাওয়া- এই তিন কারণ আমার সময়ের অন্যান্যদের মতো আমাকেও স্মৃতি আর বিস্মৃতির বিষয়বস্তুর প্রতি সংবেদনশীল করেছে।             
দুর্ভাগ্যজনক হলেও, আমার মনে হয় মার্সেল প্রুস্তের মতো শক্তি আর স্বচ্ছতা নিয়ে অতীতের স্মৃতিচারণ করা সম্ভব নয়। উনবিংশ শতাব্দীর যে সমাজের বর্ণনা তিনি দিয়েছেন সে সমাজ তখনও সুস্থিত ছিল। প্রুস্তের স্মৃতি অতীতকে নিয়ে আসে জীবন্ত ছবির মতো তার সমস্ত বৈশিষ্ট্যসহ। আজ আমার মনে হয়, স্মৃতি নিজের সম্পর্কেই অনেকটা কম নিশ্চিত; কেননা স্মৃতি সব সময় স্মৃতি-বিলোপ আর বিস্মৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে যায়। বিস্মৃতির যে স্তর সবকিছুকে বাধার আড়ালে রাখে সেটার অর্থ হলো আমরা অতীতের শুধু টুকরো অংশ, সংযোগহীন চিহ্ন, পলায়নপর ও অধরা মানব নিয়তিকে তুলে আনতে পারি শুধু। 
তবু বিস্মৃতির এই বিশাল ফাঁকা পৃষ্ঠার মুখোমুখি হয়ে গেলে ঔপন্যাসিকদেরই কতিপয় বিবর্ণ হয়ে যাওয়া শব্দকে আবার সমুদ্রের উপরিভাগে ভাসে থাকা হিমশৈলের মতো দৃশ্যমান করে তোলার আহূতি থাকা উচিত। 

 

প্যাত্রিক মোদিয়ানো সম্পর্কে জানতে পড়ুন-

প্যাত্রিক মোদিয়ানো সংখ্যা

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।