রাত ০১:৫৮ ; শুক্রবার ;  ২১ জুন, ২০১৯  

পৃথিবীর কোথাও নেই তা

প্রকাশিত:

লিপটন কুমার দেব দাস ।।

আকারে একটা প্রাইভেট ভার্সিটির সমান কিংবা তার চেয়ে বড়ই হবে। পাহাড় ঘেরা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। এরই ভেতর রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় পুঁথির সংগ্রহশালা। বলছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের ‘দুষ্প্রাপ্য ও পাণ্ডুলিপি’ শাখার কথা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের দুষ্প্রাপ্য ও পাণ্ডুলিপি শাখায় এমন কিছু পাণ্ডুলিপি রয়েছে যা পৃথিবীর অন্য কোনও লাইব্রেরিতে নেই। একথা স্বয়ং  নিম্নবর্ণের ইতিহাস নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বইয়ের লেখক ও প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্রের। পরাগল খার ‘মহাভারত’ থেকে শুরু করে এখানে রয়েছে আবুল ফজলের আকবরনামা পর্যন্ত।

মুখরিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে শান্ত আর নিস্তব্ধ স্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটি। সুবিশাল গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় যেন মনে হয় নতুন কোন পৃথিবীতে প্রবেশ করছি।

গ্রন্থাগার আঙ্গিনায় পা রাখলেই বইয়ের গন্ধ নাকে লাগে। কেমন এক মাদকতা ছড়িয়ে আছে এই গন্ধে। এইজন্যই বুঝি যারা বই ভালোবাসে, লোকে তাদের বইপাগল বলে ডাকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের দুষ্প্রাপ্য ও পাণ্ডুলিপি শাখায় এমন কিছু পাণ্ডুলিপি রয়েছে যা পৃথিবীর অন্য কোনও লাইব্রেরিতে নেই। একথা স্বয়ং  নিম্নবর্ণের ইতিহাস নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বইয়ের লেখক ও প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্রের

পুঁথি সংগ্রাহক আবদুস সাত্তার চৌধুরীর সংগৃহ করা  পুঁথি পুস্তক ও পাণ্ডুলিপি দিয়ে সর্বপ্রথম গ্রন্থাগারে দুষ্প্রাপ্য ও পাণ্ডুলিপি শাখা খোলা হয় হয়েছিল। আর এর পেছনে সার্বিক সহযোগিতা করেন ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম এবং সৈয়দ আলী আহসান।

বর্তমানে দেশ বিদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দুর্লভ উপাদান লুকিয়ে আছে এই সংগ্রহশালায়। দেশ বিদেশ থেকে অসংখ্য গবেষক এখানে আসেন তাদের গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করতে।

দুর্লভ সব সংগ্রহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের এই শাখাটির পরিচিতি এখন বিশ্বব্যাপী। দুর্লভ, ঐতিহাসিক এবং শত বছরের ভুঁজ পাতা হাতের তৈরি তুলট কাগজে, তালপাতা, কাঠের ও বাঁশখণ্ডের উপর বাংলা সংস্কৃতি, পালি, আরবি, ফারসি ও উর্দুভাষায় লেখা দুর্লভ বই এই শাখাকে করে তুলেছে সমৃদ্ধ।

এই শাখাতে যে শুধু প্রাচীন পুঁথির সংগ্রহ তা নয়, এখানে রয়েছে পুরানো পাণ্ডুলিপি, দলিল দস্তাবেজ, দুর্লভ গ্রন্থাবলি, সাময়িকী, পত্রপত্রিকা এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত নানা প্রকাশনা। যা গবেষকেরা গবেষণাকর্মের উপাত্ত হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

আঞ্চলিক এবং জাতীয় পর্যায়ের ইতিহাস যেন এই শাখাতে মুখ লুকিয়ে রয়েছে। এখানে বিভিন্ন থিসিস এবং ১৯৬৮ সাল থেকে প্রকাশিত আঞ্চলিক ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকা বাঁধাই করে সংরক্ষণ করা হয়। ফলে ইচ্ছা হলেই যে কেউ গবেষণার কাজে এই সময়কার তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন।

১৮৭২ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত প্রায় চার হাজার পুরানো সাময়িকী রয়েছে শাখাটিতে। এই সাময়িকীগুলো আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের দেয়া। যা এই শাখাকে ভিন্নমাত্রা প্রদান করেছে।

দুষ্প্রাপ্য ও পাণ্ডুলিপি শাখার অন্যতম সংগ্রহ হল, মহাকবি আলাওলের সবগুলো কাব্যের পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি, সফর আলীর ‘গোলে হরমুজ খাঁন’, রাজা রামমোহন রায়ের ‘গৌড়িয় ব্যাকরণ’, আবদুল নবীর ‘বিজয় হামজা’, জিন্নাত আরার মনি উল বেদায়াত, হামিদুল্লাহখাঁর ‘ধর্ম বিবাদ’, ড. মোমেন চৌধুরীর ‘চট্টগ্রাম গীতিকা, দৌলত উজির ‘ লাইলি মজনু’, দুর্লভ কোরান, হাদিস, ফেকাহ শাস্ত্র, সংস্কৃত ভাষায় কলহনের লেখা রাজতরঙ্গিনী, সৈয়দ গাজীর  ‘হর-গৌড়ির পুঁথি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে যাত্রা শুরু গ্রন্থাগারটির। প্রায় ৪ লক্ষ দুষ্প্রাপ্য বই, বৈচিত্র্যময় দেশি-বিদেশি বই জার্নাল ও রেফারেন্স বই রয়েছে গ্রন্থাগারটিতে।

মেজোনাইন ফ্লোর বিশিষ্ট ৫৬,৭০০ বর্গফুট পরিমিত গ্রন্থাগার ভবনটিতে কলা, বিজ্ঞান, সমাজ, বাণিজ্য, আইন অনুষদের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা পাঠকক্ষ। এটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার বলেও মনে করা হয়।

এমবিআর

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।