রাত ১১:৪৭ ; বুধবার ;  ২৬ জুন, ২০১৯  

হাইটেক প্রকৃতি!

প্রকাশিত:

নূসরাত জাহান॥

প্রযুক্তি মানেই কাঠখোট্টা সেমিকন্ডাক্টার কিংবা শুকনো খটখটে মাইক্রোচিপ নয়। প্রকৃতির সবুজ কোমল পেলবতার মাঝেও লুকিয়ে আছে হাজারো লজিক গেইট, সেন্সর এবং যোগাযোগ কাঠামো। চোখ কান খোলা রাখলেই পরিষ্কার বুঝতে পারবেন, প্রকৃতির চেয়ে বড় বিজ্ঞানী আর কেউ নেই।

ভিমরুলের আছে সোলার প্যানেল

বিজ্ঞানীদের কাছে অরিয়েন্টাল হর্নেট তথা প্রাচ্যের ভিমরুল এখনও এক রহস্য। অন্য প্রজাতিগুলোর মতো নয় এটি। সূর্য যতই তাপ ছড়াতে থাকে, ততই যেন চনমনে হয়ে ওঠে এই ভিমরুল। অথচ অন্য প্রাণীরা প্রাকৃতিকভাবেই সূর্যের প্রখরতায় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য নিজেদের গুটিয়ে রাখে। আর তাই এই ভিমরুলটিকে নিয়ে গবেষণায় মাতে তেলআবিব ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। তারাই জানালেন, এই ভিমরুলের পিঠে থাকা বাদামি রেখা আলো ধরার ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। পরবর্তীতে ওই আলো প্রতিসরিত হয়ে বিশেষ একটি পিগমেন্টের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করে বিদ্যুৎ! ওই বিদ্যুৎ দিয়ে ভিমরুলটি আবার তার শরীরের ভেতরকার প্রাকৃতিক পাম্পও চালায়, শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে। অর্থাৎ শুধু সোলার প্যানেলই নয়, একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও আছে এ পতঙ্গের শরীরে।


বুনো বোলতার রাডার

পরাশ্রয়ী প্রজাতির বুনো বোলতার আছে রাডার ব্যবস্থা। এরা ডিম পাড়ে গাছের গায়ে বেড়ে ওঠা এক ধরনের শুঁয়োপোকার শূককীটের শরীরে। আর ভেতরে ওই শূককীট আছে কি-না তা জানতে বোলতা গাছের বাকলে ঘন ঘন পদাঘাত করতে থাকে। এতে একটি বিশেষ তরঙ্গ তৈরি হয়, যা শূককীটের গায়ে লেগে আবার ফিরে আসে বোলতার পায়ে। ওই পা এতটাই স্পর্শকাতর যে কোনও শূককীট যদি নড়াচড়া নাও করে, তবু তার উপস্থিতি ধরা পড়ে যায়। রাডারের মতো সঙ্কেতের তারতম্য বুঝে বোলতা জেনে যায় শূককীটের অবস্থান। তারপর পাকড়াও করে ওটাকে।


ফাঙ্গাসের আছে অ্যান্টিভাইরাস

বিশেষ ধরনের কিছু উদ্ভিদ আছে, যারা শেকড়ের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে। মাইকোরাইঝাল তেমনই একটি ফাঙ্গাস। ছত্রাকটি নিজেদের মধ্যে শেকড়ের মাধ্যমে আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক বজায় রাখে। মাটি থেকে বেশি বেশি পুষ্টি সংগ্রহই এর প্রধান কারণ। তবে আরও একটা কাজ আছে এই নেটওয়‌‌‌ার্কের। যখনই নেটওয়ার্কে থাকা একটি ফাঙ্গাস কোনও রোগে আক্রান্ত হয়, তখনই আক্রান্ত ফাঙ্গাসটি একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক উপকরণ ছড়িয়ে দেয়। সিগনালটি চলে যায় নেটওয়ার্কের অন্যসব ফাঙ্গাসের ভেতরও। বাকিরা ততক্ষণে তৈরি হয়ে যায় নতুন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে।

চাষী পিঁপড়ার ইন্টারনেট প্রটোকোল

আগে ধারণা নেওয়া যাক ইন্টারনেট ট্রাফিক কিভাবে কাজ করে। ইন্টারনেট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকে টিসিপি (ট্রান্সমিশন কন্ট্রোল প্রটোকোল)। ইন্টারনেট ট্রাফিকে তথ্য যেন গাদাগাদি করে না থাকে, সেটা ব্যবস্থাপনা করে এটি। ব্যবহারকারীর প্রান্ত থেকে কোনও একটি 'অনুরোধ' আসার পর টিসিপি বিশ্লেষণ করে দেখে ওটার গতি কত। গতি বেশি হলে টিসিপি তখন ওই সঙ্কেতের বিপরীতে বেশি করে ব্যান্ডউইথ দেয়। তথ্য প্রদানের গতিও বাড়ে। আর ওই 'অ্যাকনোলেজমেন্ট' সঙ্কেত যদি শ্লথগতির হয়, তবে টিসিপিও তার তথ্য প্রদানের গতি কমিয়ে দেয়।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন হারভেস্টার শ্রেণির পিঁপড়ারা ঠিক এই কায়দায় কাজ করে। পিঁপড়ার কলোনি পরীক্ষা করে দেখে পিঁপড়াদের খাবার সংগ্রহের গতিটা কেমন। যদি দেখা যায় পিঁপড়ারা দ্রুত খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে পারছে, তখন আরও বেশি করে পিঁপড়াকে বাইরে পাঠানো হয়। আর যদি পিঁপড়ার খাবার সংগ্রহের গতি কম হয়, তবে কম পিঁপড়াকে বাইরে পাঠানো হয়।


গুবরে পোকার ইনফ্রারেড

১৯২৫ সালের আগস্ট মাসের কথা। ক্যালিফোর্নিয়ার কোয়ালিংগার একটি তেল গুদামে আগুন লাগে। সব পুড়ে ছাই। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে দেখা যায় সেখানে অসংখ্য কালো গুবরে পোকা (চারকোল বিটলস)। অথচ ওরা ওখানকার বাসিন্দা ছিল না। ওরা থাকতো ঘটনাস্থল থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরের সিয়েরা নেভাদার পাহাড়ের পাদদেশে। পরে গবেষণায় বেরিয়ে এলো কালো ওই গুবরেপোকার ভেতর আছে প্রাকৃতিক ইনফ্রারেড সেন্সর। পোকাগুলোর খোলসে আছে অসংখ্য ক্ষুদ্রাকৃতির পানিভর্তি গর্ত। যার প্রতিটির ব্যাস ০.০২ মিলিমিটার। বাতাসে অতিবেগুনি রশ্মির উপস্থিতিতে ওই পানির গোলকগুলো ফুলে ওঠে এবং গুবরে পোকার পিঠে এক ধরনের চাপ তৈরি করে। আর সেই চাপ বুঝে বুঝে গুবরে পোকাটা চলে যায় তাপের কাছে।


ব্যাকটেরিয়ার ফেসবুক

কোনও একটি জীবের শরীরে যখন দল বেঁধে এম জ্যানথাস প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া চরে বেড়ায়, তখন ওরা নিজেদের সঙ্গে এক ধরনের নেটওয়ার্ক বজায় রাখে। আর এই যোগাযে‌‌‌াগের জন্য তারা এক ধরনের চেইন-ঝিল্লি ব্যবহার করে। ঠিক যেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম! অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্যেও এ ব্যাকটেরিয়ার একটা 'পলিসি' আছে। সেটা হলো, একটি এম জ্যানথাস ব্যাকটেরিয়ার দল কখনই অন্য প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার নেটওয়ার্ককে নিজের দলে ভিড়তে দেবে না। নিজের মতো আরেকটি এম জ্যানথাস নেটওয়ার্ককেই তারা প্রবেশাধিকার দেবে। অর্থাৎ এদের একখানা দশাসই প্রাইভেসি সেটিংও আছে!


 

/এইচএএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।