দুপুর ০৩:০৪ ; শুক্রবার ;  ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯  

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিরাপদ নয় নারী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জাকিয়া অাহমেদ॥

গোপালগঞ্জ শহরের বীণাপানি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুই শিক্ষক শিক্ষক সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস ও জীববিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক আজাহারুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার ঘোলখার পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আজিজ ওরফে মাজুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ছাত্রীর মা নাজমা বেগম ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় মামলা করেছেন।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় কমলকুড়ি বিদ্যা নিকেতনের প্রধান শিক্ষক সরোয়ার হোসেন তালুকদারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছেন একই স্কুলের এক শিক্ষিকা। মোবাইল ফোনে দেওয়া ওই কুপ্রস্তাবের রেকর্ডসহ লিখিত অভিযোগ জেলা প্রশাসক বরাবর জমা দিয়ে বিচার দাবি করেছেন তিনি।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার পৌরসভা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে সোমবার তাকে সাতদিনের বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে শাহীনাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকাকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সমানভাবে সহিংসতার শিকার নারী। ১৯৯৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাঁধনের শ্লীলতাহানী অাজও লজ্জায় ফেলে। খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের দায়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্র ও শিক্ষকেরা অান্দোলন করছে।

কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত যৌন নিপীড়ন বন্ধে কোনও নীতিমালা গ্রহণ করা হয়নি। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইকোর্টের অালোকে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও কমিটি গঠনের মাধ্যমে যৌন নিপীড়ন রোধে কার্যকরী ভূমিকা রেখে চলেছে।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মাদ্রাসাগুলোতে ছাত্রী এমনকি ছাত্ররাও শিক্ষকের নিপীড়নের শিকার হয়।

শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি ও প্রকাশনা জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এসএম রফিকুল আলমকে চাকরিচ্যুত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২০০১ সালে রফিকুল আলমের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগের ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে।

“বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যৌন নির্যাতনকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করা হয়েছে। তারপরও ঢাকা ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে” বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরী।

তিনি অারও বলেন, “শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও হাইকোর্টের নির্দেশনা বা যৌন নির্যাতনের বিষয়ে সচেতন নন। গ্রামীণ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরও খারাপ। তাই গ্রামীণ এলাকায় নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সবার মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।”

গত ১৫ সেপ্টেম্বর যৌন হয়রানির অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের বিক্ষোভের মুখে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর অাগেও একই বিভাগের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর অামজাদ অালী জানান, শিক্ষার্থীরা যে অডিওটি উপাচার্যের কাছে জমা দিয়েছেন তা পরীক্ষা করে ড. সাইফুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাওয়া গেছে। যা একজন শিক্ষকের জন্য লজ্জাজনক এবং নৈতিকতাবিরোধী। সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের বৈঠক রয়েছে। সেখানে এ বিষয়ে বিশদ অালোচনা হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে ড. সাইফুলের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ২০০৭ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের হাতে ছাত্রী নিপীড়নের ১৭টি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বাধ্যতামূলক ছুটি কিংবা সাময়িক বহিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। কোনও কোনও শিক্ষককে আবার প্রশাসন পদোন্নতি দিয়ে বা চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে পুরস্কৃত করেছে। আর এদিকে দিন দিন বাড়ছে শিক্ষকদের হাতে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনা।

২০০৯ সালে হাইকোর্ট দেশব্যাপী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন নিপীড়ন বিরোধী কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিন্ডিকেট সদস্য মাহবুবে আলমকে আহ্বায়ক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

সর্বশেষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য নাসরীন অাহমাদকে প্রধান করে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন রোধে অভিযোগ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নীলিমা আকতার, মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক মিসেস আফরীন চৌধুরী, অধ্যাপক মাহফুজা খানম এবং আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান।

হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার যে কোনও ছাত্র-ছাত্রী এই কমিটির আহ্বায়কের কাছে অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হলেও কমিটির সদস্য নীলিমা অাকতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কমিটির কাজ এখনও 'ওয়েল ডিফাইন্ড' না। তাই ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটে তাহলে অামাদের ভূমিকা পরিষ্কার হবে। তখন অামরা বুঝতে পারবো অামাদের করণীয় কী হবে। অামরা কি প্রত্যক্ষভাবে কাজ করবো নাকি তাদের কাউন্সিলিং করবো কিবা তাদের কোনও ভাবে সাহায্য করবো।

নতুন কমিটির কাছে কোনও অভিযোগ এসেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনও কোন অভিযোগ অাসেনি। “অার অামরা এখনও পরিষ্কার না যে, অভিযোগ কি সরাসরি অামাদের কাছে অাসবে নাকি ভিসি স্যারের কাছে যাবে।”

জানা যায়, কেবল ২০১১ সালেই এ ধরনের আটটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

দেশে যৌন নিপীড়ন ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও শিক্ষকের ক্ষেত্রে সে আইনের কোনও প্রয়োগ নেই বলে অভিযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের।

যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রোটেকটিং হিউম্যান রাইটস কর্মসূচির প্রকল্প সমন্বয়ক রেহানা সুলতানাও। রেহানা সুলতানা বলেন, যৌন নির্যাতনের প্রতিকার ও প্রতিরোধে ২০০৯ সালে হাইকোর্ট গাইডলাইন বা নির্দেশমালা দেন। আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ নির্দেশনাই আইন হিসেবে কাজ করবে। তবে এই নীতিমালা মানা হচ্ছে না। নজরদারিরও ব্যবস্থা নেই।

সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের জন্য এ নীতিমালা প্রযোজ্য। নীতিমালা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট অভিযোগ কমিটি গঠন করার কথা। তবে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই এ ধরনের কমিটি গঠন করা হয়নি। আবার কমিটি গঠন করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর নয়। এ ছাড়া জনস্বার্থ মামলায় প্রতিপক্ষদের রায় প্রয়োগের কার্যকারিতা–সম্পর্কিত প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা দেওয়ার আদেশ থাকলেও তা প্রতিপক্ষরা মানছে না।


 

/জেএ/এফএ

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।