রাত ০৯:০২ ; রবিবার ;  ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯  

যবনের তীর্থদর্শন। মুহম্মদ মুহসিন। শেষপর্ব

প্রকাশিত:

(পূর্ব প্রকাশের পর)

মাজার পূজা, মাজারের বেদয়াত, মাজারের শিরকিয়াত, ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে ঘিরে বেদয়াত ও শিরকের প্রচলন এড়াতে ওহাবীরা এই বিধ্বংসী কর্মকা- করেছিল। এটা না করলে কী হতে পারতো একথা খুব জোরে উচ্চারণ অপ্রয়োজনীয়। এই ধ্বংসলীলা চালানোর আগে কী ঘটছিল তা অনেকখানি বোঝা যায় আজমির শরীফের মাঈনউদ্দিন চিশতীর মাজারে গেলে কিংবা দিল্লীতে নিজামুদ্দীন আউলিয়ার মাজারে গেলে কিংবা আমাদের নিকটবর্তী চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডার শরীফের মাজারসমূহ পরিদর্শনে গেলে। আজমিরে এবং নিজামুদ্দীনে স্রেফ পূজাঅর্চনা হচ্ছে এবং সে পূজায় পরিচ্ছন্নতা ও প্রশান্তির সামান্য পরশও নেই যা প্রতিমা পূজায় হিন্দুদের মাঝে আছে। মাইজভাণ্ডারে তো এক মাজারে বিশাল হুক্কা স্থাপন করা আছে যার নল দেয়া আছে গেলাফের নিচে কবরের ভিতরে। বলা হচ্ছে পির বাবা কবর থেকে হুক্কা খাচ্ছেন। এমন দৃশ্য থেকে সাহাবীদের ও ইসলামের মহান সাধকগণের মাজারকে মুক্ত করতেই ওহাবীরা ধ্বংসলীলা চালিয়েছে তা বলা যায়। কিন্তু ধ্বংসের মধ্য দিয়ে অর্জিত এ সাফল্য চোখের জল আটকাতে পারছে না। এ তো মাথাব্যথা সারাতে গিয়ে পুরো মাথাটাই কেটে ফেলা হলো। এই ধ্বংসলীলার মধ্যদিয়ে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে মহান ও মহীয়ান স্মারক স্থাপনাসমূহ ও স্থানসমূহ ধূলার সাথে মিশে গেল। আজ মহম্মদ (সঃ) এর জন্ম যে বাড়িটিতে সেই বাড়িটির চিহ্ন নেই, হযরত আবুবকরের বাড়িটির চিহ্ন নেই, হযরত ওমরের বাড়িটির চিহ্ন নেই, খাদিজা (রা:) এর মাজারটির চিহ্ন নেই, মহানবীর শিশুপুত্র ইব্রাহীমের কবরটির চিহ্ন নেই, জেদ্দায় অবস্থিত সেমিটিক সকল ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী পৃথিবীর প্রথম মানবী হাওয়া (আঃ) এর কবরটিরও কোনো চিহ্ন নেই। এমন হাজারো ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপনা আজ গোটা আরব জুড়ে পথ পাথর আর পাহাড় হয়ে বসে আছে। গোটা সৌদি আরব আজ ইতিহাসের সকল মনুমেন্ট বিবর্জিত এক ধূধূ বালুকাভূমি।

তবে ওহাবী ধর্ম নির্দেশনার এই বাড়াবাড়ি আজ একটু হলেও শিথিল হচ্ছে। ধর্ম বিষয়ে ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের বংশধরদের  সর্বোচ্চ পদসমূহ একটু একটু সরে যাচ্ছে। ১৯৮৬ সালে বাদশাহ ফাহাদ নিজেকে কাবা ও মসজিদে নববীর অধিকর্তা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বাদশাহ আব্দুল্লাহ ঘোষণা করেছেন মহিলারা পরবর্তী স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে পারবে। এগুলো ওহাবী আকীদার শরীয়াহ থেকে বিচ্যুতি। এই বিচ্যুতি যদি আগাতে থাকে এবং একসময় ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত উত্তরাধিকারী রাষ্ট্রের উলেমাপ্রধান হিসেবে যদি ঘোষণা দেন যে, বেদয়াত-শিরকিয়াত হতে-না-দেয়া সাপেক্ষে কবরের ওপর স্মৃতিফলক ও গম্বুজ জাতীয় স্থাপনা থাকতে পারবে, সেদিন ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের এই তিনশ বছরের বংশধরদের সকলে একত্রে মিলিয়াও কি ফিরিয়ে আনতে পারবে মহম্মদের শিশুপুত্র ইব্রাহীমের কবরের চিহ্নটুকু কিংবা তার মাতা আমিনার কবরের চিহ্নটুকু?

জান্নাতুল বাকীর তরুছায়া-শ্যামলতাহীন বিরাণভূমির ওপর একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে অনুভব করছিলাম দীর্ঘ ইতিহাসের দৃশ্যমান পাথরগুচ্ছ চেতনার নাড়িভুড়ি পেঁচিয়ে আমার ভেতরে ওলটপালট খাচ্ছে। চেতনা জুড়ে সে পাথরগুলোর নড়াচড়া পরবর্তী ক’দিনে বলতে গেছে আর বন্ধই হয়নি। বন্ধ না হওয়ার এক কারণ মদিনায় আর যে কয়দিন ছিলাম অনেকটা ঘুরেই কাটিয়েছি, আর যেখানেই গিয়েছি ইতিহাসের অনেক ঘটনার স্মারক স্থাপনা ও মনুমেন্টের ধ্বংস কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের দীনতা দেখে দুঃখ আর কষ্টই পেয়েছি। ওহুদের ময়দানে গিয়ে কষ্ট পেয়েছি। সালমান ফারসির পরিখা দেখতে গিয়ে কষ্ট পেয়েছি। হযরত আলী (রা.), হযরত আবুবকর (রা.) প্রমুখের নামে প্রতিষ্ঠিত বিরান মসজিদ দেখে কষ্ট পেয়েছি। এমন কষ্টই পেয়েছি প্রায় সর্বত্র।
তবে মদিনায় এই ইতিহাস হত্যার যন্ত্রণা ভুলে থাকার বিশেষ একটি দিন ছিল যেদিন ‘ওয়াদি জিন’ গেলাম। ওয়াদি জিনের গল্প দেশে থেকেও শুনেছিলাম। সেখানে ইঞ্জিন বন্ধ করে গিয়ার নিউট্রাল করে রাখার পর গাড়ি আপনা আপনি চলতে শুরু করে এবং সেই চলা কখনো সমান রাস্তায় আবার কখনো বা নিচু থেকে উঁচুর দিকে। চলতে চলতে গাড়ির গতিবেগ উঠে যায় ঘণ্টায় ১২০ কি.মি. পর্যন্ত। মাওলানা জাকারিয়া ভাই চেষ্টা করছিলেন এই অদ্ভূত ঘটনাটি আমাদেরকে চাক্ষুষ করিয়ে আনবেন। কিন্তু ‘জেয়ারাহ’ ‘জেয়ারাহ’ বলে চিৎকার করা ট্যাক্সি ড্রাইভারগুলো যখনই শোনে ওয়াদি জিন যাওয়ার কথা তখনই চোখরাঙিয়ে তাকায় আর ঝাঁঝওয়ালা আরবিতে বলে- ওখানে যাওয়া যাবে না। কিন্তু জাকারিয়া ভাই নাছোড়বান্দা, এক ভোলাইয়া বাঙালি ড্রাইভারকে একদিন রাজি করিয়ে ফেললেন।

রওয়ানা হলাম ওয়াদি জিন। সকলেরই অনেক উত্তেজনা। পথে খেজুর বাগানের দৃশ্যগুলো মনোমুগ্ধকর ছিল। ড্রাইভার খুব গুরত্ব দিয়ে একটি বাড়ি  দেখালেন। বাড়িটি হুদুদে হারামের সীমানার বাইরে কিন্তু একেবারে সীমানা ঘেষে। ড্রাইভার জানালেন এটি বাদশাহর প্রমোদ বাড়ির একটি। এটি হুদুদে হারামের বাইরে কারণ মক্কা ও মদিনা শহরের যতোটুকু হুদুদে হারামের অন্তর্ভুক্ত ততোটুকুর মধ্যে বিধর্মীদের প্রবেশ নিষেধ। যেহেতু আমেরিকান খৃস্টানরা বাদশাহর সবচেয়ে কাছের বন্ধু সেহেতু তাদেরকে মক্কা মদিনা দেখানোর প্রয়োজনে বাদশাহ বাড়িটা এখানে করেছেন। এখানে মুসলমান খৃস্টান যুবক যুবতীদের মিলন মেলা বসে। এই বলতে বলতে ড্রাইভার হঠাৎ জোশে পৌঁছে গেলেন যেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন কানা দাজ্জাল এখানেই নামবে। এখান থেকেই কানা দাজ্জালের যাত্রা শুরু হবে। এটাই হবে কানা দাজ্জালের বাড়ি। বাদশাহ কানা দাজ্জালের অতি আপনজন হিসেবে তার জন্য  বাড়িটি আগেভাগেই বানিয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশের এক ভোলাইয়া ড্রাইভার। সে কি কোনোদিন দেখেছে সৌদি বাদশাহর মদিনার হুদুদে হারামের বাইরের বালাখানায় কী হয়? তারপক্ষে কি কোনোদিন সম্ভব হবে সে জিনিস দেখা? শুধু অনুমান আর গুজব থেকে বাদশাহর প্রতি তার এই পরিমাণ রাগ, এই পরিমাণ ক্ষোভ। এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কী? জানি না, তবে অনুমান হয় পৃথিবীর বেশির ভাগ মুসলমানই মনে করে মক্কা-মদিনা আরবের লোকেদেরও নিজের সম্পত্তি নয়, আরবের বাদশাহরও নয়। মক্কা-মদিনায় পৃথিবীর সমস্ত মুসলমানের সমান অধিকার। সেই মক্কা-মদিনার অধিকর্তা, খাদেমুল হারামাইন, যদি কেউ হনই তাকে হতে হবে ইসলামী আমল ও আখলাকে পুন্যবান ও পবিত্র এক মানুষ। তা যদি না হয়, মক্কা মদিনাকে পবিত্র জ্ঞানকরা যে কোনো মানুষই তখন ঐ ভোলাইয়া ড্রাইভারের মতো নিরাপদ দূরত্ব থেকে অনৈসলামিক আচারের যে কোনো খাদেমুল হারামাইনেরই এমন চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করবে- এমনটাই স্বাভাবিক। আমরা ভোলাইয়া ড্রাইভারের এই স্বাভাবিক গজগজানি শুনতে শুনতেই পৌঁছে গেলাম অস্বাভাবিক সেই জায়গায় যেখানে গাড়ি আপনাআপনি চলে।

জায়গাটি মদিনা থেকে ৫০ কিলোমিটারের মতো উত্তরপশ্চিমে। জায়গাটির মূল নাম ‘ওয়াদি আল বায়দা’ অর্থাৎ বায়দা পাহাড়ের উপত্যকা। কিন্তু লোকমুখে প্রচলিত নাম ‘ওয়াদি জিন’। অতি সম্প্রতি একটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে জায়গাটির সীমারেখা টানা হয়েছে। এই বেড়ার ভেতর এলাকায় সম্ভবত বারো-চৌদ্দ কিলোমিটার পথ এই অলৌকিক কাণ্ডের জায়গা। যাওয়ার পথে গাড়ির ইঞ্জিন চালিয়েই ড্রাইভার রাস্তার শেষ মাথা পর্যন্ত গেলেন। পথে দেখলাম কিছু লোক পানিভর্তি বোতল রাস্তায় রেখে দেখছে বোতল নিজ থেকে দৌড়ায় কিনা। দেখলাম বোতল গড়াচ্ছে নিচু থেকে উঁচুর দিকে। যদিও সেখানে আমরা নামলাম না। গাড়ি গিয়ে থামলো রাস্তার একদম শেষ মাথায়। রাস্তা ওখানেই শেষ। এরপরে পাহাড়। রাস্তার শেষ মাথায় একটি গোল চক্কর ঘুরে গাড়িটি রিটার্নের জন্য রেডি হলো। এবার ড্রাইভার ইঞ্জিন বন্ধ করলেন, গিয়ার নিউট্রাল করলেন, পা-ও সিটের ওপর তুললেন। শুধু স্টিয়ারিং-এ হাত রাখলেন। গাড়ি আস্তে আস্তে চলতে শুরু করলো। খুব আস্তে, কিন্তু যত আগাচ্ছে গাড়ির গতি ততো বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে গাড়ির গতি গড়ালো ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। আমরা সবাই তখন এত বিস্মিত যে আমাদের কথাবার্তা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। ভয় পাচ্ছি গতি ২০০ কিংবা ৩০০ কিলোমিটারে গিয়ে ঠেকে কিনা। ড্রাইভার স্টিয়ারিং এর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে কিনা। কিন্তু গতি ১২০ কি.মি. ওঠার পর দেখলাম আস্তে আস্তে কমছে। কমতে কমতে গতি ২০/২৪ কিলোমিটারে যখন আসলো ততক্ষণে আমরা এই অলৌকিক কাণ্ডের এরিয়ার প্রায় শেষ মাথায় এসে গিয়েছি। তারকাটার নতুন তৈরি বেড়া দেখা যাচ্ছে। তখন ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট তুললেন। আমরা তখন বিস্ময়ে অভিভুত। দেশে ফিরে বিষয়টি নিয়ে প্রসঙ্গক্রমে একদিন মৃত্তিকা বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. হারুনর রশীদ খানের সাথে কথা হয়েছিল। বিষয়টি তার কাছে ভূগর্ভস্থ কোনো চুম্বক ক্ষেত্রের ফল বলেই মনো হলো। কিন্তু তার কাছে পানি ভর্তি বোতলের আপনাআপনি গড়ানোর বিষয়টি ব্যাখ্যার অযোগ্যই রয়ে গেলো।

অবশ্য আমাদের ড্রাইভারের কাছে তথা হাজার হাজার এমন ড্রাইভার ও হজ্জ মুয়াল্লিমদের কাছে এর ব্যাখ্যা একেবারেই পানির মতো সহজ। এটা তো ওয়াদি জিন, মানে জিনের উপত্যকা। জিনই এই গাড়ি ঠেলে তাদের এরিয়া থেকে এই শক্তিতে গাড়িটি বের করে দিচ্ছে। www.aulia-e-hind.com/dargah/Int/jinn-wadi-e-jinn.htm-ওয়েবসাইটে ওয়াদি জিনের পাহাড়ের এমন ছবি ও ভিডিও দেয়া আছে যেখানে দেখা যাচ্ছে পাথররূপে জিন কীভাবে সেজদায় পড়ে আছে। এই ওয়েবসাইটে পাহাড়ের ওপরে জিনের ঘরবাড়ি পর্যন্ত দেখানো আছে। বর্ণনা দেয়া আছে- এখানে রাতে থামলে শোনা যায় অদৃশ্য উৎস থেকে আওয়াজ হচ্ছে, অর্থাৎ জিনরা বলছে- ‘তোমরা এখান থেকে চলে যাও, তোমরা এখানকার নও’। এর চেয়েও আশ্চর্যজনক যে, সৌদিআরবের ইংরেজি পত্রিকা arab news ৩ আগস্ট ২০১৪ তারিখে এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট করেছে। সেখানেও একই রকম কথাই বলা হয়েছে। তবে সাথে সে রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ঘটনাটি হয়তো পাহাড়ের অন্তস্থ কোনো চুম্বক শিলার আকর্ষণে ঘটছে।

অবশ্য এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্ট করেছেন মালয়েশিয়ান ইঞ্জিনিয়ার মাজলান। তিনি সরফরাজ খানের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, এটি চৌম্বকীয় আকর্ষণ নয় বরং একধরনের দৃষ্টি বিভ্রম যা পৃথিবীর অনেক পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে। এই দৃষ্টি বিভ্রমে উচুঁকে নিচু এবং নিচুকে উচুঁ বলে মনে হয়। তিনি প্রথমেই খারিজ করেছেন চৌম্বকীয় আকর্ষণের বিষয়টি। তার অকাট্য যুক্তি হলো বিষয়টি চৌম্বকীয় হলে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস যেমন মোবাইল ফোন, গাড়ির ইলেক্ট্রনিক গিয়ার ইত্যাদিতে তার প্রভাব পড়তো। তার মতে গাড়ি কিংবা পানির বোতল এ জায়গায় মূলত নিচে নামে- ওপরে ওঠে না। ওয়াদি জিনে নিচের দিকে যে এই ঢাল রয়েছে তা সরফরাজ খান অনেক চিত্র সহকারে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝিয়েছেন তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট http: //aghasarfrazkhan.weebly.com/wadi-e-baida.html-এ।  তিনি দেখিয়েছেন যে, ওয়াদি জিনের পাহাড়ের কোল থেকে কাঁটাতারের বেড়া বা আল-খুলাইল ড্যাম পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার পথে ১২৯৬ ফুটের একটি ঢাল রয়েছে। তার বক্তব্যমতে পাহাড়ের কোল যেখান থেকে আমাদের গাড়িটি বিনা স্টার্টে চলতে শুরু করেছিল সেখানটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩১২১ ফুট উঁচু এবং যেখানটায় এসে গাড়ির স্বয়ংক্রিয় চলা বন্ধ হয়েছে সেখানটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮২৫ ফুট উঁচু। ফলত গাড়িটি ওপর থেকে ১২৯৬ ফুট নিচে নেমে এসেছে। আর এ কারণেই সে আপনা আপনি চলেছে। আমরা কেন বুঝতে পারি না যে আমরা উপর থেকে নিচে নামছি? এ প্রশ্নের উত্তরে সরফরাজ খান এবং মাজলান দুজনই বলেন যে, ১৪ কিলোমটিার পথ বেয়ে মাত্র ১২৯৬ ফুট নিচে নামলে বোঝা যায় না যে আমরা নিচে নামছি। বরং মাঝে মাঝে বোঝা যায় উপরে উঠছি। এমন উপর-নিচ বুঝতে না পারার দৃষ্টিবিভ্রমের পাহাড়ি এলাকা পৃথিবীতে অনেক আছে। এরকম পাহাড় বা পাহাড়ি এলাকাকে ম্যাগনেটিক হিল বলে এবং গ্রাভিটি হিলও বলে। ম্যাগনেটিক বললেও মূলত এখানে ম্যাগনেটের বিষয় নেই, পুরো বিষয়টিই গ্রাভিটি সংক্রান্ত। এমন গ্রাভিটি হিলের একটি দীর্ঘ তালিকা উইকিপিডিয়ায় আছে। তার মধ্যে কয়েকটি নাম যেমন: অস্ট্রেলিয়ার নিউসাউথওয়েলসের বাওয়েন মাউন্টেন, ব্রাজিলের বেলো অরিজোনতে, কানাডার ওশাওয়া, চীনের গানসু, দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু আইল্যা- ইত্যাদি। এই বিজ্ঞানমনস্করা যাই বলুক ওয়াদি জিন গিয়ে এই বিজ্ঞান মনে রাখা কঠিন  হবে বলে আমার বিশ্বাস। বিজ্ঞান যা-ই বলুক, যে-ই ওয়াদি জিন যাবে সে-ই একটা অলৌকিক শক্তির প্রতি বিশ্বাসকে তার মধ্যে গাঢ় হতে দেখবে।

এই গাঢ় বিশ্বাস নিয়েই ফিরলাম মদিনায়। ইচ্ছা এই গাঢ় বিশ্ববাস নিয়েই যাতে ফিরতে পারি দেশে। দেখতে দেখতে দেশে ফেরার সময় হয়ে এসেছে। ৬ এপ্রিল রাত পৌনে তিনটা বা চারটায় আমাদের ফ্লাইট মদিনা এয়ারপোর্ট থেকে। ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় ভাবছিলাম মক্কা মদিনায় এই ক’দিনের সফর থেকে কী নিয়ে যাচ্ছি। দেখলাম ভিতর থেকে এই কটি জিনিস প্রতিধ্বনিত হচ্ছে : ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপনাসমূহের ধ্বংস থেকে উঠে আসা একটি দীর্ঘশ্বাস; কাবা শরীফ বা বাইতুল্লাহর হুসনে জালালিয়াত; মসজিদে নববীর হুসনে জামালিয়াত; ওয়াদি জিনের কুদরতি হিকমত থেকে জন্ম নেয়া একটু ভিন্নতর বিশ্বাসের গাঢ়ত্ব; এবং কাবার মাতাফের ঘুর্ণ্যমান জনতার অবিরাম হৃদয়োৎসারিত তৌহিদি ধ্বনি ও দুই পবিত্র মসজিদের বহিচত্বরে সার্বক্ষিক চলমান এক আধামারেফতি-মিশ্রিত ধ্বনি প্রতিধ্বনির অনিঃশেষিত রেশ।

শেষের বিষয়টি পাঠকের কাছে হয়তো কিছুটা রহস্যময় মনে হচ্ছে। একটু খোলাসা করা যাক। কাবার মাতাফে তাওয়াফরত জনতার উচ্চারণসমূহ শুনলে মনে হয় না যে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দোয়া বা আয়াত পড়ছে। দোয়া, আয়াত, তসবিহ যে যা পড়ছে তার মিলিতরূপে হোক কিংবা এ সবের বাইরে ভক্তের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত অনির্দিষ্ট শব্দের কিংবা ভাষা-ঊর্ধ কোনো উচ্চারণ থেকে হোক কলরকে জাগিয়ে তোলার একটি অসংজ্ঞেয় আওয়াজ সেখানে সার্বক্ষণিকভাবে শ্রুতিময়। শব্দ বা আওয়াজরূপে তা ‘লাহু’ বা ‘লাহা’ ধ্বনির এক সুমসুম চলমান রূপ। ইহা কাবার অভ্যন্তরে মাতাফ জুড়ে। কাবা ও মসজিদে নববী উভয়ের বহিরাঙ্গনে রয়েছে এমন আরেকটি আওয়াজ।

কাবা শরীফের বহিঃচত্বরে এবং মসজিদে নববীর বহিঃচত্বরে সবসময়ই দেখা যায় কিছু লোক হাতে কিছু কিতাবপত্র নিয়ে সার্বক্ষণিক চিৎকার করে যাচ্ছেন ‘বাকা’ ‘বাকা’ ‘বাকা’। হাতে কোরানশরীফ আর মুখে এই ‘বাকা’ আওয়াজের মানে বুঝতে আমার সময় লেগেছে। আমি যা ‘বাকা’ ‘বাকা’ হিসেবে শুনছি সেটি মূলত আরবি ‘ওয়াকফ’ শব্দের বিকৃত ও অতিদ্রুততায় উচ্চারিত রূপ। হাতে কোরানশরীফ নিয়ে এই লোকেরা ‘ওয়াকফ’ ‘ওয়াকফ’ বলে চিৎকার করছেন যাতে মুসল্লিরা তার কাছ থেকে ‘কোরান’ বা এজাতীয় ইসলামী গ্রন্থ কিনে মসজিদে ওয়াকফ করে। বুঝতে পারার পর আমার এক বন্ধুর বাবার নামে আমিও এদের কাছ থেকে একটি কোরানশরীফ কিনে কাবা শরীফে ওয়কফ করলাম। বুঝতে পারার পর ‘ওয়াকফ’ কিভাবে ‘বাকা’ হয়ে যায় তার নিরীক্ষা করতে মনে মনে আমিও ‘ওয়াকফ’ ‘ওয়াকফ’ করতে লাগলাম। দৈনিক পাঁচবার মসজিদে যাই। ফজর বাদ দিয়ে চারবার আসা যাওয়ার পথে এই আওয়াজ শুনি। আর অবচেতনে নিজেও নিরীক্ষা করি। করতে করতে একসময় দেখলাম মনের অজান্তে আমি নিজেই মাঝে মনে মনে ‘বাকা’‘বাকা’ করে যাচ্ছি আর ভিতরে শুনতে পাচ্ছি মাতাফের চতুষ্পার্শে চলমান চিরন্তন উচ্চারিত ভক্তিময় শব্দাবলীর আওয়াজের সাথে এই ‘বাকা’ ‘বাকা’ ধ্বনির এক অরাসায়নিক সংশ্লেষ। মনের উচ্চারণ, বাইরের শ্রবণ ইত্যাদি মিশে মিশে আমি একসময় অনুভব করতে লাগলাম ‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’র মারাবার গুহায় মিস এ্যাডেলা কোয়েস্টেড এর শোনা ‘বুম’ আওয়াজের মতো আমিও এক অসংজ্ঞেয় আওয়াজ শুনছি। আমার সে আওয়াজ ‘বুম’ নয়। আমার সে আওয়াজ মাতাফের ‘সুম-সুম’ আর মাতাফের বাইরের ‘বাকা-বাকা’ ধ্বনির এক আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক মিশ্রণ। ‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’র এই ‘বুম’-এর অর্থ যেমন অসংজ্ঞেয় অধরা অস্পষ্ট থেকে এক গভীর অর্থের হাতছানি দেয়, মাসজিদুল হারামের ‘সুম-সুম’ রূপ ফানাফিল্লাহর আওয়াজ ও এর বহিরাঙ্গনের ‘বাকা-বাকা’রূপ বাকাবিল্লাহর আওয়াজ একইভাবে এক আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক মিশ্রণে এখনো আমার কানে বেজে বেজে আমার হঠাৎ সাময়িক নিঃসঙ্গতায় একটি অসংজ্ঞেয় অধরা অলৌকিক অর্থের হাতছানি দেয়। আমি সে অর্থ বুঝি না, তাবে আজো কবিতার মতোই সেই আওয়াজ, সেই অর্থ আমি অনুভব করি। আস্বাদন করি।

আগে প্রকাশিত পর্বগুলোর লিংক-

যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-১১
যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-১০

যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৯
যবনের তীর্থদর্শন । মুহম্মদ মুহসিন । পর্ব-৮
যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৭
যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৬
যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৫
যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৪
যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৩
যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-২
যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-১
 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।