রাত ১০:০৪ ; শনিবার ;  ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯  

অফিস ও যানবাহনে অনিরাপদ নারী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জাকিয়া অাহমেদ॥

বাংলাদেশে জনসমাগমস্থলে নারীদের ওপর বেশি যৌন হয়রানি হয়ে থাকে বলে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একইসঙ্গে শহরে গ্রামের তুলনায় এ প্রবণতা বেশি বলেও এতে বলা হয়।

অ্যাকশন এইডের প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, হয়রানি বা নির্যাতন সহ্যের সীমা অতিক্রম না করা পর্যন্ত নারীরা সাধারণত বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন না। নির্যাতনের প্রতিবাদ ৫০ ভাগ নারী না করলেও ৫৪ শতাংশ নারী তাদের পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করেন। আর ৪১ শতাংশ নারী তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার প্রতিবাদ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হয়রানি কিংবা নির্যাতিত হলেও অধিকাংশ নারী লোকলজ্জা বা আরও হয়রানির ভয়ে এ নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাওয়া থেকে বিরত থাকেন।

যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পর কোনো সংস্থা বা পুলিশকে কিছু জানাননি বলে জানিয়েছে ৮৪ শতাংশ নারী। নির্যাতিত নারীরা ঘটনার প্রতিকার চাইতে গেলে পুলিশ উদাসীনতা দেখানোয় নির্যাতিতরা পুলিশের সহায়তা নিতে চান না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। কারণ ৬৫ শতাংশ নারী মনে করেন, পুলিশ উল্টো অভিযোগকারীকে দোষারোপ করে। আর ৫৭ শতাংশ বলেছেন, পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। অপরদিকে ৫৩ শতাংশ নারী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশন এইড এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দেশের সাতটি শহরে এ জরিপ চালিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে সংস্থাটি।

নারীর প্রতি সহিংসতামুক্ত শহর গড়তে গত ২৮ অক্টোবর ‘নিরাপদ নগরী নির্ভয়ে নারী’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপরিবহনসহ জনসমাগম স্থানগুলোয় নারীরা সবচেয়ে বেশি যৌন হয়রানির শিকার হন। ৮৪ শতাংশ নারী অনাকাঙ্ক্ষিত কটূক্তি ও অশোভন আচরণের মুখে পড়েছেন। ৫০ শতাংশ নারী রাস্তাঘাটে কুপ্রস্তাব পেয়েছেন এবং ৫৭ শতাংশ নারী অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হয়েছেন।

অনূর্ধ্ব ২০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে শতকরা ৭৬ ভাগ এবং ত্রিশোর্ধ্ব নারীদের মধ্যে শতকরা ৪৪ ভাগ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে এতে বলা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরের সাড়ে ৪৭ ভাগ নারী গণপরিবহন, রাস্তা কিংবা উন্মুক্ত জনবহুল এলাকায় চলাফেরা করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ৮৮ ভাগ নারী পথচারী পুরুষযাত্রী ও ক্রেতার মাধ্যমে হয়রানির শিকার হন।

শহরের ৯৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানিকে সহিংসতা মনে করেন। যৌন সহিংসতা এড়াতে ৬৪ ভাগ নারী রাতে ঘরের বাইরে যান না। ৬০ ভাগ নারী নিরাপত্তাহীনতার কারণে রাতে ঘরের বাইরে দলগতভাবে যেতে চান।

প্রতিবেদন প্রকাশের দিন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, পুলিশের কাছেও নারীরা নিরাপদ না। নারীদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ঢাকাসহ সব শহরে রাতের টহলে পুরুষের সঙ্গে নারী পুলিশের টহলের ব্যবস্থা করতে হবে। নারীর প্রতি সহনশীল অাচরণ করতে পুলিশ সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকা উচিত বলেও তিনি বলেন।

নারী নির্যাতন কোনওভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং এর জন্য অাইনের কোনও ঘাটতি থাকলে অাইনকে হালনাগাদ করার কথাও বলেন তিনি।

অপরদিকে, ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ নারী পোশাক শিল্প শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (অাইএলও) এক জরিপে প্রকাশ হয়েছে।

এ বিষয়ে কর্মক্ষেত্রে নারীদের পেশাগত স্বাস্থ্য বা হয়রানির বিষয়ে নজর দিলেও যৌন হয়রানির বিষয়টি এখনও অনেক ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোশাক কারখানা মালিক। অার এসব বিষয়ে পোশাক শিল্প মালিকদের সচেতন হওয়া অত্যন্ত দরকার বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, নারী সহকর্মীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।

পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর অ্যাডভোকেসি অফিসার অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শ্রম অাইনের ৩৩২ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হয়েছে, “কোনও প্রতিষ্ঠানের কোনও কাজে কোনও মহিলা নিযুক্ত থাকিলে, তিনি যে পদমর্যাদারই হোন না কেন, তার প্রতি উক্ত প্রতিষ্ঠানের অন্য কেহ এমন কোন অাচরণ করিতে পারিবেন না যাহা অশ্লীল কিংবা অভদ্রজনোচিত বলিয়া গণ্য হইতে পারে, কিংবা যাহা উক্ত মহিলার শালীনতা ও সম্ভ্রমের পরিপন্থী।”

নজরুল ইসলাম অারও বলেন, অাইএলও'র জরিপটি নিয়ে অামাদের অারও দেখতে হবে। তবে এ ধরনের কোনও ঘটনা যদি এক শতাংশ'ও ঘটে থাকে তাহলে সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকপক্ষের যৌথ উদ্যোগে এবং সমন্বয়ে এর অধিকতর তদন্ত করা উচিত বলে অামি মনে করি।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা অাক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অাইএল'র প্রতিবেদন শ্রম সচিব অাপত্তি জানাতে পারেন কিন্তু ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে অামি দ্বিমত করছি না। অামাদের পোশাক কারখানাগুলো 'জেন্ডার বেসড ভায়েলেন্স' হচ্ছে। কিন্তু সাধারণত মেয়েরা বলতে শেখে না, বলে না, মুখ খোলে না। কারণ যদিও দোষটি পুরুষের কিন্তু তা যাবে মেয়েটির কাঁধেই।

অামাদের মেয়েদের শেখানোই হয় এগুলো লজ্জার বিষয়, এগুলো চেপে রাখতে হবে।

কল্পনা অাক্তার অারও বলেন, “অামরা এগুলো শুনতে চাই না, বলতে চাই না। কিন্তু অামি দাবি নিয়ে বলছি, ইট ইজ একজিস্ট।”

বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ নারী সাংবাদিক কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সেফটি ইন্সটিটিউট (অাইএনএসঅাই) ও দ্য ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স ফাউণ্ডেশনের এক জরিপে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

সংস্থা দুটির মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্মক্ষেত্রের পুরুষ বস, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সহকর্মী কর্তৃক এই হয়রানির শিকার হয় নারী সাংবাদিকেরা। হয়রানির শিকার অর্ধেক নারী সাংবাদিকই শারীরিকভাবে হয়রানির শিকার হন। যদিও বেশিরভাগই এ ব্যাপারে মুখ বুঁজে থাকে।

অাইএনএসঅাই প্রধান হাননান স্টেরাম বলেন, 'যখন অামরা মিডিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলি, সব সময়ই অামরা যুদ্ধক্ষেত্র, জনঅসন্তোষ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অামলে দেই। কিন্তু কদাচিৎ অামরা মিডিয়া অফিসগুলোর অভ্যন্তরীণ বৈরি পরিবেশ সর্ম্পকে ভাবি।

মাঠপর্যায়ে জরিপ করে অামরা নারী সাংবাদিকদের নিজে‌‌‌দের কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকির বিষয়গুলো জানতে পেরেছি। তারা তাদের সহকর্মীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হন। নারী সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের হয়রানি কিংবা সহিংসতার কোনও সুবিচার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় না, অপরাধীকে দেওয়া হয় না কোনও শাস্তি।

গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৮৭৫ জন নারী সাংবাদিকের ওপর জরিপটি চালানো হয়। প্রায় একশ'রও বেশি নারী সাংবাদিক জানান, তাদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন, অনেককে অস্ত্র দিয়ে ভয় পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে ২৭৯ জন নারী সাংবাদিক বলেছেন, তারা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হন। ১৬০ জনের বেশি বলেছেন, তাদের ব্যক্তিগত ই-মেইল বিভিন্ন সময়ে হ্যাক হয়েছে।

কর্মক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অামি অামার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রতিটি গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদককে বলেছি প্রত্যেকের অফিসে একটি গোপন অভিযোগ বাক্স রাখার জন্য। যেন কোনও নারী কর্মী কোনও হয়রানির শিকার হলে তিনি সেই গোপন বাক্সে তার অভিযোগটি দিতে পারেন।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ৭ অাগস্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানি রোধে নির্দেশনা চেয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী রিট দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১৪ মে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেন এবং তা কার্যকর করতে রায় দেন।

হাইকোর্ট যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীতিমালা তৈরি করে আইন হিসেবে বিবেচনার জন্য নির্দেশ দিলেও তা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিতই রয়েছে দাবি করে আইনজীবী অ্যাভোকেট ফৌজিয়া করিম বলেন, আমরা শুনেছি দুয়েকটি বেসরকারি বিশ্বদ্যিালয়ে যৌন হয়রানি রোধের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিজেএমইএ, বিকেএমইএসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোথাও কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।


 

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।