সন্ধ্যা ০৭:০৩ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ জুলাই, ২০১৯  

যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-১১

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

পূর্ব প্রকাশের পর

সে সবের একটি প্রসঙ্গ জান্নাতুল বাকী। জান্নাতুল বাকী হলো সাহাবীদের কবরস্থান এবং একইসাথে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বুজুর্গব্যক্তিদের কবরস্থান। সারা দুনিয়ার মুসলমানদের বুকের মধ্যে অপরিসীম ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মাখা এই কবরস্থানের এক মহিমান্বিত রূপ অঙ্কিত ও কল্পিত। আমার বুকেও তেমনই একটা রূপের কল্পনা এই কবরস্থান নিয়ে অঙ্কিত ছিল। আরো যেহেতু এর নামের সাথে রয়েছে সহগ শব্দ রয়েছে ‘জান্নাত’, সেহেতু কল্পনায় ছিল এর দৃশ্যটি হবে প্রশান্তিময়, সৌন্দর্যময়, পুষ্পময়, তরুছায়াময় এক অনাবিল শ্যামল নিকতন। কিন্তু মসজিদে নববীর পূর্বপাশে একটি সুন্দর সুউচ্চ সিঁড়ি বেয়ে উঠে এই জান্নাতের দিকে যখন তাকালাম তখন চোখদুটো বুজে ও খুলে বার বার চোখ দুটো সক্রিয় নাকি নিষ্ক্রিয় তা পরীক্ষা করেও যেন নিশ্চত হতে পারছিলাম না যে, আমি চোখের সামনে যা দেখছি তার নাম জান্নাতুল বাকী। আমারা জানি এখানে সাহবীদের কবর রয়েছ, অনেক তাবেয়ীনের কবর রয়েছে, অনেক তাবে-তাবেয়ীনের কবর রয়েছে, অনেক আয়েম্মায়ে মুজতাহিদীনের কবর রয়েছে; অথচ একটি কবরেরও নাম নেই, একটি কবরেরও নিশানা নেই, একটি কবরেও ঠিকানা নেই। এমনকি এটি যে একটি কবর সেইটুকু বোঝার সামান্য চিহ্নটুকুও নেই। নেই একটু ছায়া, নেই দুটো ফুলের সুবাস, নেই একটু তৃণময় শ্যামল ভূমি। শুধু ধূধূ মরুভূমির মতো খা খা প্রান্তর। দেখে থামানো যাছিল না অন্তর্গত প্রশ্ন- ‘কেন এমন হলো’? 
এ প্রশ্ন অবশ্য জাকারিয়া ভাইকে করতে হয়নি, কারণ এই দৃশ্য দেখার আগেই বিভিন্ন পাঠে এর মোটামুটি এক ইতিহাসের সাথে পরিচয় ছিল। সে ইতিহাস ওহাবী আন্দোলনের ইতিহাস। আর এই ওহাবী নামটা মাথায় আসলে আরো মনে পড়ে বিশেষ করে আমাদের চট্টগ্রামের সুন্নী-ওহাবী তকমায় চলমান ঘৃণ্য ও হাস্যকর ধর্ম বিভেদবিষয়ক কর্মকা-গুলো। ১৯৮৩ সালে প্রথম চট্রগ্রাম গিয়েছিলাম হাটহাজারীস্থ মেখল মাদ্রাসায় পড়তে। এটি বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত মুফতি ফয়জুল্লাহ্র মাদ্রাসা। এখানে জুনিয়র সেকশনে পড়ার পর প্রায় সব ছাত্রই হাটহাজারী মাদ্রাসায় যায় সিনিয়র সেকশনে পড়তে। মেখলের এই মাদ্রাসার নাম মাদ্রাসায়ে হাসিউস্সুন্নহ মেখাল এবং হাটহাজারী মাদ্রাসার নাম দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী। এই মাদ্রাসায়ে হামিউস্সুন্নাহ মেখলে এসে কিংবা বলা যায় চট্টগ্রাম এসে প্রথম জানলাম মুসলমানদের মধ্যে দুইটা গ্রুপ বা ফেরকাহ আছে। একটার নাম ওহাবী আরেকটার নাম সুন্নী। ওহাবী কারা? চট্টগ্রামে এসে যা দেখলাম ও শুনলাম তাতে বোঝা গেল ওহাবী হলো যারা গোল ও লম্বা পাঞ্জাবী পরে, ইয়া নবী সালামাইকা দিয়া মিলাদ পড়ে না এবং মাজারে গিয়া কান্নাকাটি করে না। অপরদিকে সুন্নী কারা? চট্টগ্রামের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বোঝা গেল সুন্নী হলো যারা নিচের দিকে দুপাশ ফাড়া খাটো খাটো পাঞ্জাবী পড়ে, সালামুন ইয়া কিংবা সালাতুন ইয়া রাসুলাল্লাহ দিয়া যথেষ্ট জোশের সাথে মিলাদ পড়ে এবং পীরের মাজারকে প্রায় কাবা শরীফের মত সম্মান করে। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম পড়তে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি না ছিলাম ওহাবী, না ছিলাম সুন্নী। এবার যেহেতু মেখল মাদ্রাসায় পড়ি এবং যেহেতু আমি লম্বা ও গোল পাঞ্জাবী পরি, সেহেতু আমি চাই বা না চাই চট্টগ্রামের অধিকাংশ মানুষের দৃষ্টিতে আমি ওহাবী।
কিন্তু আমরা যারা মেখল মাদ্রাসায় বা কওমী মাদ্রাসায় পড়তাম তারা মনে করতাম আমরাই সুন্নী, ওরা সুন্নী নয় যারা আমাদেরকে ওহাবী বলে। তাই বলে উল্টো করে আমরা ওদেরকে ওহাবীও বলতাম না। আমরা ওদেরকে বলতাম বেদয়াতী। আমরা নিজেদেরকে সুন্নী বলতাম বা ভাবতাম কারণ আমরা জানতাম আমরা সুন্নতের ওপর চলি এবং সুন্নতের পথে থাকতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা যা বলতাম তার সাথে আমাদের জানার ও ভাবনার কোনো ফাঁক ছিল না। আমরা জানতাম আমরা সুন্নত পালন করছি। সুতরাং আমরা সুন্নী; আর মাজারকেন্দ্রিক ওরা বেদয়াতের ওপর চলছে বলে ওরা বেদয়াতী। কিন্তু ওরা আমাদেরকে তাচ্ছিল্ল্য করে কেন ওহবী বলতো তা আমি বুঝতাম না। ওহাবী শব্দের মূলে যে একটা নাম আছে ‘ওহাব’, সেই ওহাবটা কে- তা আমরা জানতাম না। আমাদের কোন্ কোন্ কাজ সেই ওহাবের মত তার কিছুই আমি আমার মাদ্রাসায় পড়াকালীন দুই বছরে জানতে পারিনি। না জানতে পারার সহজ কারণ হলো মাদ্রাসায় সুন্নত কী - সে বিষয়ে কেতাব আছে, বেদয়াত কী- সে বিষয়ে কেতাব আছে, কিন্তু ‘ওহাবী কী’- সে বিষয়ে কোনো কেতাব নেই।
এই ওহাব সম্পর্কে আমি যখন খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম তখন আমি বেদয়াতী, ওহাবী ইত্যাদি সব এরিয়া থেকে বেরিয়ে অনেক দূরে সরে এসেছি। ফলত আমি কী ঘাটছি তা নিয়ে যখন আর কারোর মাথাব্যথা নেই সেই সময়ে ঘাটতে গিয়ে দেখলাম এই ওহাব মিয়া তো এক মস্ত আদমি। তার পুরো নাম মুহাম্মদ ইবন্ আবদুল ওয়াহহাব। জন্ম তৎকালীন আরবের নজদ মুলুকে ১৭০৩ সালে এবং মৃত্যু ১৭৯২ সালে। লেখাপড়া প্রথমে মদিনায়, পরে বসরায় এবং তারওপরে বাগদাদে। প্রচুর অধ্যয়ন শেষে তার সময়ের চতুস্পার্শ্বের মুসলমানদের ইসলামী কর্মকাণ্ডে জমে ওঠা ক্লেদ ও আবর্জনা দেখে দেখে তার ভিতরে দানা বাঁধতে থাকা ইসলামী আচরণ ও কর্মকাণ্ডের এক মহাসংস্কারের আয়োজন। তিনি দেখেন তার সমাজে সাহাবীদের কবর নিয়ে রীতিমত পূজা-অর্চনা  চলছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ইসলামিক ঘটনার সাক্ষী বড় বড় বৃক্ষগুলোকে মানুষ দেবতার মতো অর্চনা করছে। আনুশাসনিক নিয়মকানুনের অনেক ব্যত্যয় ঘটিয়ে মানুষ অন্যরকম এক নামাজ-রোজা করছে। মহানবীর জন্মদিন নিয়ে জশনে জুলুস আয়োজিত হচ্ছে যা মৌলিক ইসলামিক আচরণধারার বেশরকম ব্যত্যয়। এসব দেখে তিনি মূলধারার সুন্নাহ মাফিক ইসলামিক আচরণধারা প্রবর্তনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা আটতে থাকেন।
এই পরিকল্পনায় তিনি ইসলামী আইন ও বিধির তথা ফিক্হের তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে প্রথমত গ্রহণ করেন নবম শতকের ইসলামী আইনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত আহমদ ইব্ন হাম্বলকে (৭৮০খৃ: - ৮৫৫ খৃ:)। পরবর্তীতে তাত্ত্বিক মহলে আহম্মদ ইবনে হাম্বলের শুদ্ধিবাদী ভাবনার দুনিয়াব্যাপী এক পাণ্ডিত্যময় প্রকাশ ঘটেছিল তকীউদ্দীন আহমাদ ইবনে তাইমিয়ার (২২ জানু ১২৬৩ - ২০  সেপ্টেম্বর ১৩২৮) মাধ্যমে, যাকে আমরা সাধারণভাবে ইবনে তাইমিয়া নামেই চিনি। তকীউদ্দীন আহমাদ ইবনে তাইমিয়া ছিলেন সেই ব্যক্তিত্ব যিনি চেঙ্গিস খান তথা হালাকু খানের বংশধর বিশাল মধ্যপ্রাচ্যের সম্রাট ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী মামুদ ঘাজান খান কর্তৃক সিরিয়া ও মিশর আক্রান্ত হলে সোজা মাহামুদ ঘাজান খানের দরবারে গিয়ে তাকে বলেছিলেন - ‘আপনি দাবি করেন আপনি মুসলমান - আমরা দেখিও যে আপনার সাথে ইমাম, মুয়াজ্জিন আর ইসলামী পন্ডিতদের এক বিশাল বহরও আছে। অথচ আপনি আমাদের ওপর আক্রমণ করেছেন। আপনার পূর্বপুরুষ হালাকু খান মুসলমান ছিলেন না। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। তিনি আমাদের ওপর আক্রমণ করেননি। আর আপনি মুসলমান হয়েও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেন।’ 
এই যার সাহস তার কি আর বেদয়াত আর বেশরিয়তির বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় হবে? মোটেই না। তাইতো তিনি নির্ভয়ে করে চললেন অনেক দার্শনিক তর্ক- দিয়ে চললেন অনেক শরীয়াহ্ভিত্তিক নির্দেশনা। বেদয়াতীদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত এই ইমাম সকল মাজারকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে শিরকিয়াত ঘোষণা করে ব্যাপক প্রচারণা চালালেন। একপর্যায়ে বলে ফেললেন- ‘রসুলের মাজার জেয়ারতও বেদয়াত’। এই কথায় তাকে দ্বিতীয়বার জেলে নেয়া হলো ১৩২৬ সালে এবং জেলেই তার মৃত্যু হলো। এই ইবনে তাইমিয়ার তথা আরো পূর্বের আহমাদ বিন হাম্বলের ভাবশিষ্য ইবনে আবদুল ওয়াহহাবও ভয় পেলেন না বেদয়াত এবং শিরকিয়াতের বিরুদ্ধে তার প্রচারে। তিনি তৎকালীন বেদয়াত ও শিরকিয়াতের পক্ষের আল্লামাদের সাথে অনেক বহস-বিতর্ক করলেন এবং তাদেরকে কোরানসুন্নাহর অকাট্য প্রমাণে হারালেন। অনেক আলোচনা বক্তৃতা করলেন। কিন্তু দেখলেন এতসব পরিশ্রম ও প্রয়াসেও বেদয়াত শিরকিয়াত উৎসাদনে বা উৎপাটনে ফললাভ হয়েছে স্বল্পই। এ প্রেক্ষিতে তিনি গেলেন তার এলাকার কাছের ছোট রাজ্য উইয়াইনার রাজা ইবনে মুয়াম্মারের কাছে। 
ইবনে মুয়াম্মার ব্যক্তিগতভাবে অবশ্য ইতোমধ্যে ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের মতের সমর্থক বনে গিয়েছিলেন। সেই সুবাদে বৃহত্তর পরিকল্পনা নিয়ে এবার ইবনে আবদুল ওয়াহহাব ইবনে মুয়াম্মারকে প্রস্তাব দিলেন যে ইবনে মুয়াম্মারকে তার রাজ্যসীমা বাড়াতে ইবনে আবদুল ওয়াহহাব সর্বতো সমর্থন ও সহযোগিতা করবেন যদি রাজা ইবনে আবদুল ওয়াহহাবকে সেই রাজ্যে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বর্তমান বেদয়াত-শিরকিয়াত উৎসাদন করে সুন্নাহভিত্তিক সমাজ গঠনে সাহায্য করেন। মুয়াম্মার এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। সেমতে কাজ শুরু হলো। ইবনে আবদুল ওয়াহহাব এবং তার মতানুসারীদের সহযোগিতায় এবং সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় রাজা ইবনে মুয়াম্মার পার্শ্ববর্তী নজদ রাজ্য অধিকার করে ফেললেন। এবার ইবনে মুয়াম্মারের রাজ্যে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠিার পালা। এই শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ঘটনা হলো বর্তমান রিয়াদের অদূরে অবস্থিত মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর বড় ভাই জায়েদ ইবনুল খাত্তাবের মাজারে চলমান বেদয়াত ও শেরকিয়াত উৎসাদনের জন্য এই মাজারটি ধূলিস্যাৎ করে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া। ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের দীক্ষাকে পুঁজি করে রাজা ইবনে মুয়াম্মার এই কাজটি করলেন। শুরু হলো ইবনে তাইমিয়ার তথা ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের সংস্কারের কঠিন কাহিনি। তবে একই সাথে শুরু হলো আরবের মাটি থেকে মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সকল উপাদান মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে আরবের চিরন্তন ইতিহাসপ্রেমকে মানুষের মন থেকে পর্যন্ত মুছে দেওয়ার পরোক্ষ প্রয়াস।

এমনকি মুহাম্মাদ বিন সৌদ কর্তৃক যে রাজ্যের প্রতিষ্ঠা শুরু হয় তার নামও সৌদি আরব ছিল না। তার নাম ছিল দিরিয়াহ আমিরাত। মুহাম্মাদ বিন সৌদের হাতে দিরিয়াহ সাম্রাজ্য দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ও ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের জামাতা আবদুল আজিজ বিন মুহাম্মাদের হাতে এর প্রসার ঘটে আরো দ্রুত


ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের সংস্কারের এই মহাযজ্ঞ অবশ্য খুব শীঘ্রই বাঁধাগ্রস্ত হলো। জায়েদ ইবনুল খাত্তাবের মাজার ভেঙ্গে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার খবরে আরবের রাজ্য আল-হাসা’র রাজা ইবনে গুরাইর ক্ষেপে গেলেন। আল-হাসা রাজ্যে ইবনে মুয়াম্মারের কিছু সম্পত্তি ছিল। ইবনে গুরাইর হুমকি দিলেন ইবনে মুয়াম্মার যদি ইবনে আবদুল ওয়াহহাবকে তার রাজ্য থেকে বিতাড়ন না করেন তাহলে তিনি ইবনে মুয়াম্মারকে আল-হাসার অন্তর্গত সম্পত্তির-কর সংগ্রহ করতে দিবেন না। এই হুমকিতে তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্রতর শক্তির রাজা ইবনে মুয়াম্মার দমে গেলেন। তিনি ইবনে আবদুল ওয়াহহাবকে তার উইয়াইনা থেকে চলে যেতে বললেন। ইবনে আবদুল ওয়াহহাব চলে গেলেন তবে চলে গেলেন উইয়াইনার রাজার চেয়ে শক্তিশালী জায়গায়। সেটি উইয়াইনার পাশেরই রাজ্য বর্তমান রিয়াদের এলাকা। সে রাজ্যের তখনকার নাম ছিলো দিরিয়াহ। রাজার নাম মুহাম্মাদ বিন সৌদ (মৃত্যু ১৭৬৫)। ইবনে আবদুল ওয়াহহাব মুহাম্মাদ বিন সৌদকেও একই প্রস্তাব দিলেন যেমনটা দিয়েছিলেন ইবনে মুয়াম্মারকে। ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের পান্ডিত্য ও শরীয়াহপ্রতির প্রতি মুহাম্মাদ বিন সৌদেরও শ্রদ্ধাবোধ ছিল। সেই শ্রদ্ধাবোধের সাথে যুক্ত ছিলো রাজার প্রতি শরীয়াহর সমর্থনের শক্তি। ফলত এ প্রস্তাব রাজার মনে ধরলো। রাজার এ সম্মতিকে এবার আরো শক্তিশালী দলিলে রূপান্তরের পরিকল্পনা করলেন ইবনে আবদুল ওয়াহাবের। কারণ তিনি এর আগে ইবনে মুয়াম্মারের কাছে ধরা খেয়েছেন। সেখান থেকে তাকে বিতাড়িত হতে হয়েছে। তাই এবার দলিল আকারে মুহাম্মাদ বিন সৌদের সাথে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। ১৭৪৪ সালে স্বাক্ষরিত এই ঐতিহাসিক চুক্তির শর্তাদির মোদ্দা কথা হলো সংস্কারপন্থী আল্লামাদের সমর্থন ও সহযোগিতায় অর্থাৎ কিনা বলা যায় শরীয়াহর শক্তি নিয়ে দিরিয়াহর রাজা মুহাম্মাদ বিন সৌদ রাজ্য বিস্তার করবেন। সে রাজ্যে প্রশাসনিক ও সামরিক প্রধান হবেন রাজা মুহাম্মাদ ইবনে সৌদ এবং তার ধারাবাহিকতায় তার পরবর্তী বংশধরগণ। অপরদিকে ধর্মীয় ও বিচারিক ব্যবস্থার প্রধান হবেন ইবনে আবদুল ওয়াহহাব এবং তার মৃত্যুর পরে তার উত্তরাধিকারীগণ। একেবারে মধ্যযুগীয় ইউরোপের ক্যাথলিক চার্চ ও রাজাদের দ্বৈত শাসন পদ্ধতির নকল। পার্থক্য এতটুকুই ইউরোপের ক্যাথলিক চার্চ ভিত্তিক দ্বৈত শাসনে রাজার উত্তরাধিকার থাকলেও পোপ ও আর্চবিশপগণ পুরোটা উত্তরাধিকারভিত্তিক ছিলেন না। ইবনে আবদুল ওয়াহহাব উদ্ভাবিত এই দ্বৈতব্যবস্থায় দুইদিকেই উত্তরাধিকার চালু হলো এবং আজ অবধি প্রায় ৩০০ বছর ধরে সৌদি আরবে এই দ্বৈতশাসন ও দ্বৈত উত্তরাধিকার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। 
তার মানে এই নয় যে মুহাম্মাদ বিন সৌদের প্রতিষ্ঠিত সৌদি আরবের বয়স ৩০০ বছর। এমনকি মুহাম্মাদ বিন সৌদ কর্তৃক যে রাজ্যের প্রতিষ্ঠা শুরু হয় তার নামও সৌদি আরব ছিল না। তার নাম ছিল দিরিয়াহ আমিরাত। মুহাম্মাদ বিন সৌদের হাতে দিরিয়াহ সাম্রাজ্য দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ও ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের জামাতা আবদুল আজিজ বিন মুহাম্মাদের হাতে এর প্রসার ঘটে আরো দ্রুত। ১৭৭৪ থেকে ১৭৮৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে এই সৌদ বংশ মক্কা মদিনা ছাড়া অর্থাৎ হেজাজ রাজ্য ছাড়া বিশাল আরবের প্রায় পুরোটাই দখলে নেয়। ১৮০৮ সালের পরে মক্কা-মদিনাও সৌদি রাজাদের অধীনে চলে আসে অর্থাৎ দিরিয়াহ সাম্রারাজ্যের অধীনে চলে আসে। ১৮১৬ সালে এই সমগ্র ভূখন্ড সৌদি রাজাদের হাত থেকে আবার চলে যায় তুরস্কের খেলাফতের অধীনে। ১৮২৪ সালে সৌদ বংশের উত্তরাধিকারীরা তাদের হারানো ভূখন্ড পুনর্দখল শুরু করে। ১৮২৪ থেকে ১৮৯১ পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় সৌদ বংশের বাদশাহী এবং একই সাথে ওহাবী বংশের ধর্মশাসন ক্ষমতা স্থায়ী হয়। ১৮৯১ সালে সৌদ বংশ আল রশিদ বংশের কাছে আবার তাদের রাজত্ব হারায়। ১৯০২ থেকে সৌদ বংশ রিয়াদ থেকে শুরু করে আবার তাদের হৃতভূমি দখল শুরু করে। এই দখল ১৯৩২ সালে পূর্ণতা লাভ করে, অর্থাৎ মক্কা মদিনাসহ যে আরবভূমি আজ সৌদি আরব বলে পরিচিত ১৯৩২ সালে সৌদ বংশের তখনকার নেতা, ১৯০২ সাল থেকে অনেক যুদ্ধে জয়ী বীর, রাজা আবদুল আজিজ আল সৌদ (১৭৮৬ - ১৯৫৩ খৃ.) সেই আরব রাজ্য প্রতিষ্ঠা সমাপ্ত করলেন। তিনিই এই রাজ্যের নাম দিলেন আল মালাকাহ আল আরাবিয়্যাহ আস-সাউদিয়্যা। ইংরেজিতে Kingdom of Saudi Arabia অর্থাৎ সৌদি আরব। আরবের নামের সাথে সৌদ বংশের নাম এভাবে ১৯৩২ সালে প্রথম যুক্ত হলো। এই সৌদি আরবের আয়তন ২১ লক্ষ বর্গমাইলেরও অধিক, অর্থাৎ আমাদের ১৫টা বাংলাদেশের সমান। হেজাজ, নজদ, আলহাসা ও আসিরের মত বিশাল রাজ্যগুলো এভাবে ১৯৩২ সালে সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্ত হলো। অন্তর্ভুক্ত হলো মুসলিম জগতের শ্রেষ্ঠ দুই পুণ্যস্থান মক্কা ও মদিনা। একই সাথে চিরায়তভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো সৌদি আরবে ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের ধর্মীয় শাসন ও সিদ্ধান্তের ক্ষমতা। 
আঠার শতকের মাঝামাঝি ১৭৪১ কিবা ৪২ সালে বেদয়াত বিরোধী ধর্মগুরুর হাতে জায়েদ ইবনুল খাত্তাবের মাজার গুড়িয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিলো রাষ্ট্রের ধর্মীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান ও শাসনে তার ক্ষমতার প্রথম বড় প্রকাশ। কবর পূজায় আসক্ত তৎকালীন আরবদেরকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এই ঘটনা দিয়েই শুরু হয়েছিল মাজার জাতীয় সকল স্থাপনা ভেঙে ফেলার ওহাবী ইতিহাস। শব্দটি শুদ্ধভাবে ওয়াহহাবী হওয়া উচিত যেহেতু এর পিছনের নামটি ইবনে আবদুল ওয়াহহাব, নামটি ওহাব নয়। কিন্তু আমাদের বইপত্রে পূর্বথেকে শব্দটি ‘ওহাবী’ রূপে চলছে বিধায় আমরাও এখানে ‘ওহাবী’ই লিখছি। এই ওহাবী আন্দোলনের ইবনে আবদুল ওয়াহহাব সাহেব বেঁচে থাকতে অবশ্য এই সকল মাজার জাতীয় স্থাপনার মূল কেন্দ্র মক্কা ও মদিনা তার তথা সৌদি বাদশাহর দখলে আসেনি। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকেননি তাই বলে সৌদি ধর্মীয় শাসনে এই স্থাপত্য ভাঙ্গার নীতি বা ইতিহাস মোটেও পাল্টায়নি। মক্কায় ওহাবীরা প্রথম প্রবেশ করতে পারলো এবং মক্কায় সৌদি শাসন কায়েম শুরু হলো ১৮০৩ সালে। মক্কায় প্রবেশ করেই তারা শুরু করলো তাদের ভাঙ্গাভাঙ্গির মহাযজ্ঞ। ভেঙ্গে ফেললো সাহাবীদের স্মৃতিবিজড়িত সকল স্থাপনা, এমনকি ভেঙ্গে ফেললো মহানবী মহম্মদ (সঃ) যে-ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই ঘরটিও। জমজম কূপের ওপর একটি গম্বুজ ছিল তারা সেটি ভেঙ্গে ফেললো। কাবার অদূরে জান্নাতুল মুয়াল্লা নামের পবিত্র কবরস্থানটিতে কবরে শুয়ে রয়েছেন মহানবীর স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা), মহানবীর মাতা হযরত আমিনা, মহানবীর চাচা আবু তালিব এবং মহানবীর দাদা আবদুল মুত্তালিব। এই মহান ব্যক্তিগণের কবরের ওপর যেসকল স্থাপনা ছিল সব ওহাবী ভাঙ্গার দল মাটিতে মিশিয়ে দিলো। কোনো চিহ্ন রাখলো না যাতে পরবর্তীতে বোঝা না যায় কার কবর কোনটি ছিল। 

ওহাবীরা এই সকল কবরের ওপর যত গম্বুজ বা স্থাপনা ছিল, যত নামফলক ছিল সব ভেঙে গুড়িয়ে দিলো। এমনকি মহনবীর রওজা মোবারক ও তার পাশে শায়িত হযরত ওমর ও আবুবকরের কবর দুটোও ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা তারা করেছিল


১৮০৫ সালে ওহাবীরা প্রথম মদিনায় প্রবেশ করলো, অর্থাৎ মদিনা সৌদি বাদশাহর তথা ওহাবীদের দখলে আসলো। মদিনায় ঢুকেও তারা শুরু করলো একইরকম ভাঙনের তাণ্ডব। ভেঙ্গে ফেললো জান্নাতুল বাকীর সব স্থাপনা। জান্নাতুল বাকী ছিল রসুলের নিজ হাতে কবর দেয়া মুসলমানদের প্রথম কবরস্থান। হিজরী তৃতীয় সাল মোতাবেক ৬২৪ খৃস্টাব্দে উসমান ইবনে মাওজুন নামে এক সাহাবীর মৃত্যু হলে মহম্মদ (সঃ) সমজিদে নববীর পূর্বপাশের বাগানে কয়েকটি গাছ কেটে একটু জায়গা করে সেখানে নিজ হাতে উক্ত সাহাবীর দাফন করেছিলেন। এই দাফনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো মুসলিম বিশ্বের  সবচেয়ে পবিত্র ও সম্মানিত কবরস্থান ‘আল বাকী’। ‘আল বাকী’ অর্থ বৃক্ষ উদ্যান। বৃক্ষ উদ্যানের মাঝে এই কবরস্থানের প্রতিষ্ঠা বলেই মহনবীর মুখেই এর নামকরণ হয়েছিল ‘জান্নাতুল বাকী’। কালক্রমে এই জান্নাতুল বাকীতে দাফন হলো মহানবীর শিশুপুত্র ইব্রাহীম, মহানবীর প্রিয়তম নাতী ইমাম হাসান, ইমাম হোসাইনের পুত্র ইমাম আলী, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আলী, ইমাম জাফর ইবনে মুহাম্মাদ প্রমুখ। এরা ছিলেন মহনবীর সাক্ষাৎ বংশধর। এছাড়া তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমানের (রা.) কবর এখানে। মহানবীর চাচি/ ফুফু সাফিয়ার এবং আতিকার কবর এখানে, হযরত আলী (রা.) এর মাতা ফাতিমা বিনতে আসাবের কবর এখানে। সাত হাজারের অধিক সাহাবীর কবর এই জান্নাতুল বাকীতে অবস্থিত। ওহাবীরা এই সকল কবরের ওপর যত গম্বুজ বা স্থাপনা ছিল, যত নামফলক ছিল সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিলো। এমনকি মহনবীর রওজা মোবারক ও তার পাশে শায়িত হযরত ওমর ও আবুবকরের কবর দুটোও ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা তারা করেছিল। কিন্তু ইবনে আবদুল ওয়াহহাব জীবদ্দশায় লিখে গিয়েছিলেন- ‘যদিও মসজিদের মধ্যে মহানবীর কিংবা অন্য যে-কারোরই কবর থাকাটা অগ্রহণযোগ্য ও নিঃসন্দেহে পাপাচার, তবু কবরটি মহানবীর বলেই আমি চাই না তার ওপরের সৌধটি ভাঙ্গা হোক’। ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের এই লিখিত বাক্যের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেলো মহনবীর রওজা মোবারক ও তার পাশে শায়িত হযরত ওমর ও আবুবকরের সমাধিসৌধ। উল্লেখ্য, মহানবীর কবরের ওপর এই গম্বুজ বা সৌধটি সাহাবীদের যুগে নির্মিত হয়েছিল না। এটি নির্মিত হয়েছিলো তুরস্কের সুলতানদের তত্ত্বাবধানে ১৮১৭ সালে এবং এর সবুজ রং করা হয় ১৮৩৯ সালে। অবশ্য এর বেশ আগে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ  বিন আবদুল মালিক ৭০৭ সালে মহানবীর ও প্রথম দুই খলিফার মাজার অংশটি মসজিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ ৭০৭ সালের পূর্বে মহানবীর এবং হযরত আবুবকর ও ওমরের মাজার মসজিদে নববীর বাইরে ছিল। যাই হোক মহানবীর মাজারের সৌধটি ওহাবীদের ভাঙ্গার হাত থেকে এভাবে বেঁচে যাওয়াটা অনেকটা মহানবীর মক্কা বিজয়ের সময়ের একটি ঘটনার মতো। মক্কা বিজয়ের পর কাবা শরীফের ৩৬০টি মূর্তি তিনি ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। কিন্তু মা মেরী অর্থাৎ ঈসা (আঃ) এর মাতা মরিয়মের ছবিটি তিনি না ভেঙ্গে রেখে দিয়েছিলেন। এই রেখে দেয়ার পেছনে ঈসা (আঃ) ও তার মাতার প্রতি যেমন একটি ভিন্নতর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করেছিলো তেমন একটি শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়েই ওহাবীদের ভাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা পেলো মহানবীর এবং হযরত আবুবকর ও ওমরের মাজারের ওপরকার সৌধ।  
১৮০৩ থেকে ১৮০৬ পর্যন্ত বাদশাহ সৌদ বিন আবদুল আজিজের নেতৃত্বে ওহাবীদের এই ভাঙনের তাণ্ডব চললো। সৌদ বিন আব্দুল আজিজের রাজত্বকাল ছিল ১৮০৩ থেকে ১৮১৪ পর্যন্ত। যদিও তখন তাদেরকে বাদশাহ বলা হতো না বরং বলা হতো ইমাম। এই ইমাম তথা বাদশাহ সৌদ বিন আবদুল আজিজ ১৮০৬ সালে বা তার পরবর্তী বছরে ঘোষণা করলেন ইরাক, সিরিয়া ও মিশরের কাউকে হজ্জ পালন করতে দেয়া হবে না। তিনি আরো ঘোষণা করলেন এই তিন দেশের বাইরে অন্যদেশের কাউকেও হজ্জ করতে হলে ওহাবী আকিদা আগে মেনে নিতে হবে। এই সকল তাণ্ডব ও আরোপিত বিধিনিষেধের প্রতিক্রিয়ায় মুসলিম দুনিয়া ফুঁসে উঠলো। সারা দুনিয়ার অনুরোধে তুরস্কের খেলাফত ইমাম তথা বাদশাহ সৌদ ইবনে আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে ১৮১১ সালে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। যুদ্ধের নেতৃত্ব দিলেন তুরস্কের মিশরীয় ভাইসরয় মুহম্মদ আলী পাশা ও তার ছেলে ইব্রাহীম পাশা। এদের সাথে যুদ্ধে চলমান অবস্থায় সৌদ বিন আবদুল আজিজ ১৮১৪ সালে  মারা যান। তার ছেলে আবদুল্লাহও একই ভাবে হারতে হারতে ১৮১৮ সালে সকল রাজ্যই তারা হারালো। ১৮২৪ সালে স্বল্পকিছু অংশ পুনরুদ্ধার করে সৌদ বংশের পঞ্চম বাদশাহ হিসেবে নযদ আমিরাত প্রতিষ্ঠা করলেও মক্কা মদিনা ১৮১৮ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত একশো বছরেরও অধিক কাল পুনরায় তুর্কী খেলাফতের অধীনেই থেকে যায়। মক্কা-মদিনা পুনরুদ্ধারের সাথে সাথে ১৮৪৮ সালে তুরস্কের খলিফা আব্দুল মজিদ মক্কা মদিনার সকল ভেঙ্গে ফেলা স্থাপত্য পুনরায় নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। অনেক গম্বুজ, অনেক সমাধিসৌধ, অনেক স্মৃতিফলক আবার নির্মিত হলো। ১৮৪৮ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত সময়কালে সাতলক্ষ পাউণ্ড খরচ করে নতুন অনেক স্থাপনাও মক্কা মদিনায় তিনি নির্মাণ করলেন। জান্নাতুল বাকী, জান্নাতুল মুয়াল্লায় আবার কবরের ওপর সুদৃশ্য স্থাপনা ও সুদৃশ্য স্মৃতিফলক শোভা পেতে লাগলো। বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদ ওরফে ইবনে সৌদ (১৮৭৬-১৯৫৩) ১৯২৫ সালে ইখওয়ানের সহায়তায় আবার হেজাজের তথা মক্কা মদিনার অধিকার গ্রহণ করলেন। মদিনা অধিকারের পরপরই ১৯২৫ সালের ২১ এপ্রিল রোজ বুধবার তিনি জান্নাতুল বাকীর সকল স্থাপনা পুণরায় ভেঙ্গে গুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিলেন। সেই ভাঙ্গাই স্থায়ী ভাঙ্গা হয়ে রয়ে গেল। আজ আর আমরা জানিনা জান্নাতুল বাকীর সাত হাজার সাহাবীর কবরের মধ্যে কার কবর কোনটি। একই বছর মক্কার জান্নাতুল মুয়াল্লায় তুরস্কের খলিফা কর্তৃক দ্বিতীয়বারে নির্মিত সমাধিসৌধ ও স্মৃতিফলকগুলোও একইভাবে আবার ভেঙ্গে গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হলো। 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।