সকাল ০৯:৩৬ ; সোমবার ;  ২৩ জুলাই, ২০১৮  

'ফেসবুক গুগলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে কিছু নেই'

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম ও অারশাদ অালী॥

ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে ইউরোপজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ফোনে আড়িপাতা বিষয়ে এডওয়ার্ড স্নোডেনের বোমা ফাটানোর চেয়েও এ নিয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য বেরিয়ে আসছে।
 
কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির মোবাইল ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারির জন্য 'ডার্ট বক্স' ব্যবহার করছে। যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার  মোবাইল ব্যবহারকারীদের সব তথ্যে তারা নজরদারি করতে পারে।

আর এবার জানা যাচ্ছে, শুধু সরকারই নয় বিভিন্ন অ্যাপস, ফেসবুক, গুগল ও মাইক্রোসফট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অজান্তেই কম্পিউটার, মোবাইল, স্মার্টফোন থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ (কপি) করছে। ফেসবুক চাইলেই যে কোনও ব্যবহারকারীর ছবি তুলতে পারবে। এমনকি ভিডিও রেকর্ডও করতে পারবে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনের ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা পড়েছে চরম হুমকির মুখে। নতুন প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ওয়েবসাইটগুলো কুকি (এক ধরনের টেক্সটভিত্তিক বিজ্ঞাপন যা অন্য সাইটে যেতে ব্যবহারকারীকে প্রলুব্ধ করে, এর সঙ্গে হ্যাকাররা জড়িত থাকে বেশিরভাগ সময়। সংশ্লিষ্ট সাইটে ঢুকলে ব্যবহারকারীর তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে হ্যাকাররা) ব্যবহার করে বিভিন্ন ডিভাইস ও তার ব্যবহারকারীদের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে।

নতুন ওয়েবসাইট ও বিজ্ঞাপনের শর্তাবলী সম্পর্কে প্যান ইউরোপীয় ডাটা নিয়ন্ত্রণকারী গ্রুপের সাম্প্রতিক মতামত এ বিতর্কে ঘি ঢেলেছে। এ গ্রুপটির দাবি, 'ডিভাইস ফিঙ্গার প্রিন্টিং' পদ্ধতিতে কুকিজ ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো।

আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক ব্রিটেনের একটি সংসদীয় কমিটির এমপিরা বলছেন, ফেসবুক সরাসরি ব্যবহারকারীদের অজান্তেই ছবি তুলতে ও ভিডিও রেকর্ড করতে পারবে। কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ফেসবুক মেসেঞ্জার মোবাইল অ্যাপস বিশ্বের প্রায় ২০ কোটি লোক ব্যবহার করছে। এর মানে ওই লোকগুলোর মোবাইল, ট্যাব, স্মার্টফোনের মালিকদের অনুমতি ছাড়াই ছবি তোলা ও ভিডিও রেকর্ড করতে পারবে যে কোনও সময়।

কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রু মিলার এমপি জানান, পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারকারীদের অনুভূতি নিয়ে ফেসবুকের এ পরীক্ষা উদ্বেগজনক। যদিও টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনে সম্মত হয়ে যে কেউ ফেসবুক ব্যবহার করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ লোকই না পড়েই এতে সম্মতি দেয়। কারণ এগুলো অনেক দীর্ঘ এবং আইনি ব্যাপার যে তা বুঝতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করা লাগবে।

উভয় মতামতেই পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তথ্য মোবাইল, স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের তথ্য ওয়েবসাইট ও বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো নজরদারি করতে পারছে। পরোক্ষভাবে ওই ব্যবহারকারীর ওপরই নজর রাখা হচ্ছে নীরবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যে ব্যবহারবিধি করা হয়েছে তার ২৯ ধারা পর্যালোচনায় এসব বিতর্ক ও মতামত উঠে এসেছে। ওই ধারা অনুসারে যেকোনও ওয়েবসাইট কুকি ব্যবহার করলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটি নোটিশ দেখাবে। কিন্তু ফেসবুক, গুগল এবং মাইক্রোসফটের কুকি পলিসিতে নোটিশকে পাশ কাটানোর পদ্ধতি রয়েছে।
 
২০১২ সাল থেকে ইন্টারনেটে ওয়েবসাইটগুলো কুকির ব্যবহার শুরু করে। ওয়েব প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারকারীদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য কুকির প্রচলন করে। প্রত্যেকটি ডিভাইসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ওয়েবসাইটগুলো এর মাধ্যমে সংগ্রহ করে। তবে কুকি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত একটি নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
 
গুগল, মাইক্রোসফট এবং ফেসবুক তাদের ব্যবহারকারীদের যেকোনও গেম খেলা, ক্রয়-বিক্রয়, ব্রাউজিং তথ্য বিজ্ঞাপনের জন্য সংরক্ষণ করে। এসব ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীদের পক্ষে এটা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তাই ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষার্থে কুকি ব্যবহারের আইনটি সংশোধনের দাবি তোলা হয়েছে।

গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য গুগল, ফেসবুক ও মাইক্রোসফটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে অাগামী ১ জানুয়ারি থেকে ফেসবুক নিয়ম চালু করতে যাচ্ছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এরই মধ্যে নোটিফিকেশন অাকারে ওই মেসেজ পাচ্ছেন। ফেসবুক তাদের টার্মস (নিয়ম-কানুন), ডাটা পলিসি, কুকিজ পলিসি অাপডেটেড করতে যাচ্ছে। এ ছাড়াও বিজ্ঞাপনভিত্তিক অ্যাপস ও সাইটটি দেখতে কেমন হবে সে বিষয়ে নোটিফিকেশন দিচ্ছে। বলা হচ্ছে ফেসবুক পেজে যেসব বিজ্ঞাপন দেখা যায় চাই ব্যবহারকারী তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

কীভাবে তা করা যাবে তা জানা যাবে https://www.facebook.com/about/terms-updates/?notif_t=data_policy_notice এই লিংক থেকে।

ফেসবুক এবং গুগলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের প্রযুক্তিবিদরাও। তারা বলেন, ফেসবুক এবং গুগলের ব্যবসায়িক পলিসিটাই এরকম যে তারা ফ্রি সার্ভিস দিয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দেয়। ওই শর্ত মেনে যারা সামনে এগুবেন তারা থাকবেন, অার যারা চাইবেন না তারা সরে যাবেন। কিন্তু অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়ায় যে কেউই অার সরে অাসতে পারে না। শর্ত মেনে নিয়েই তাকে থেকে যেতে হয়।

বিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সাবেক সভাপতি মোস্তাফা জব্বার বলেন, ফেসবুক ও গুগলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে কিছু নেই। ইন্টারনেট বিষয়টাই হলো উন্মুক্ত। অামি যখন তাদের শর্ত মেনে নিয়ে তাদের সাইটে ঢুকছি তার অর্থ অামার সব তথ্য তাকে দিয়েই তো অামি তাতে প্রবেশ করছি। সংযুক্ত থাকলে অামার সব সব তথ্যই ফেসবুক, গুগলের কাছে থাকছে, চাইলে তারা একসেসও করতে পারে।

তিনি অারও বলেন, ফেসবুক, গুগলের কোনও সেবা ফ্রি নয়। সরাসরি চার্জ না নিলেও পরোক্ষভাবে তারা চার্জ নেয়। অামরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছি, তারা অামাদের বিজ্ঞাপন দেখতে বাধ্য করছে। এসবের জন্যই তো তারা মূল্য পাচ্ছে। গুগল ও ফেসবুক ভবিষ্যতে হয়তো কোনও কোনও সেবায় চার্জ বসাতে পারে কিন্তু তারপরও তারা এর পাশাপাশি ফ্রি সার্ভিস চালু রাখবে বলে তিনি অাশাবাদ ব্যক্ত করেন। তার মতে, সব সার্ভিসে চার্জ বসালে তাদের বিজনেস মডিউল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিশ্চয়ই তারা তা চাইবে না।

এদিকে সম্প্রতি একটি 'তথ্য' সারাবিশ্বে বেশ অালোড়ন তুলেছিল। ওই তথ্যে বলা হয়েছিল, ফেসবুক তার ব্যবহারকারীদের ওপর চার্জ বসাতে পারে এবং তা হবে মাসিক ভিত্তিতে। জানা গিয়েছিল, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মাসে অাড়াই ডলার (প্রায় ২০০ টাকা) চার্জ দিতে হবে। বিভিন্ন অান্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ হলে সারা বিশ্বে বিতর্কের ঝড় ওঠে। খবরে বলা হয়, বড় ধরনের এই বিতর্ক এড়াতে ফেসবুক তার কৌশল থেকে সরে অাসে। যদিও এখন পর্যন্ত ফেসবুক এ বিষয়ে মুখ খোলেনি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রযুক্তি বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক অপারেটর্স গ্রুপের (বিডিনগ) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুমন অাহমেদ সাবির বলেন, সম্প্রতি অাইজিএফ (ইন্টারনেট গভর্নেন্স ফোরাম) এবং বিডিনগের বিভিন্ন ফোরামে ফেসবুক ও গুগলে ব্যক্তির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা সম্পর্কে অালোচনা হচ্ছে। কারণ এ দুটো সংস্থা তাদের বিভিন্ন ধরনের সেবায় শর্ত অারোপ করতে যাচ্ছে।

তিনি জানান, ব্যক্তির নিজস্ব ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সেবা ফ্রি থাকলেও করপোরেট বা বাণিজ্যিক সেবায় চার্জ অারোপ করতে পারে। তিনি জি-মেইলের উদাহরণ দিয়ে বলেন, অাগে কোনও চার্জ না থাকলেও এখন করপোরেট ই-মেইলে গুগল চার্জ বসাচ্ছে।

ফেসবুকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সারা বিশ্বেই ফেসবুকে পেজ খুলে ব্যবসা করা হচ্ছে। যারা ফেসবুক থেকে অায় করছে তাদের বিষয়ে ফেসবুকের দৃষ্টিভঙ্গি, তুমি অায় করলে অামাকেও ভাগ দিতে হবে। অর্থাৎ ফেসবুককে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হলে চার্জ অারোপ করা হতে পারে। বিষয়টা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, গুগলে অাপনার যা কিছু থাকে তার সব কিন্তু গুগল ড্রাইভ ব্যাকঅাপ নিয়ে নিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ব্যাকঅাপ নেওয়ার সময় গুগল একটা অ্যালার্ট পাঠাতে পারে এই বলে যে, সে ব্যাকঅাপ নেবে কি না। তাহলে হ্যাঁ-না'র ব্যাপারটা সামনে অাসে। ফেসুবকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, ব্যবহারকারীকে নোটিফাই করা যে, সে কোনও তথ্য নিতে পারবে কি না।

এসব ব্যাপার নিয়ে ফোরামে অালোচনা হচ্ছে। সেসবের সুপারিশ যথাযথ জায়গায় উপস্থাপন করা হবে বলে তিনি জানান।

/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।