রাত ০৮:৫৪ ; রবিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৯  

ঘাড়-কোমরের ব্যথায় লেজার সমাধান

প্রকাশিত:

ডা. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী॥

মেরুদণ্ডে রয়েছে ছোট ছোট অনেকগুলো হাড়। যার নাম কশেরুকা (ভাটিব্রা)। দুটি কশেরুকার মাঝে চাপ শোষণকারী ডিস্ক থাকে- যা মেরুদণ্ডের এক হাড় থেকে অন্য হাড়কে আলাদা রাখে ও নড়াচড়ায় সাহায্য করে। মেরুদণ্ডের শক্ত হাড় ছাড়াও দুই হাড়ের মাঝখানে নরম আরেকটি হাড় (ইন্টারভার্টেব্রাল ডিস্ক) থাকে- যা শক এবজরভারের কাজ করে। এসব হাড় কিংবা ডিস্কে কোনও সমস্যা দেখা দিলেই কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা দেখা দিতে পারে।


ব্যথার পেছনে

সাধারণত ভারি জিনিস ওঠানো, আঘাত, ঝাঁকি খাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ডিস্কের স্থানচ্যুতির (প্রোলাপ্স) কারণে সংলগ্ন মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) অথবা স্নায়ুমূল (নার্ভরুট) অথবা উভয়ের ওপরই চাপ পড়তে পারে। কোমরের (লাম্বার) ডিস্ক প্রোল্যাপ্সে রোগী কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভব করে। ফলে রোগী বসতে বা দাঁড়াতে পারে না।

কোমরের স্নায়ুগুলো কোমর থেকে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে কোমর ব্যথার পাশাপাশি একপাশ বা উভয় পাশের উরু, হাঁটু, হাঁটুর নিচের গোছা, গোড়ালি বা পায়ের আঙুল পর্যন্ত যে কোনও জায়গায় ব্যথা হতে পারে। এ ছাড়াও শরীরের এসব জায়গায় ঝিন-ঝিন করে, পায়ের বোধশক্তি কমে যায়, পর্যায়ক্রমে পা দুর্বল হয়ে যেতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রোগী হাঁটতে, দাঁড়াতে এমনকি বসতেও পারে না।

অন্যদিকে মানুষের ঘাড়ে (সারভাইকাল) উৎপন্ন স্নায়ুগুলো ঘাড় থেকে হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। কাজেই ঘাড়ের ডিস্ক প্রোল্যাপ্সে প্রাথমিক পর্যায়ে ঘাড়ের ব্যথার পাশাপাশি ডান বা বাম হাত বা উভয় হাতে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। লাম্বার ডিস্ক প্রোল্যাপ্সের মতো এখানেও হাত ঝিন-ঝিন করা বা বোধশক্তি কমে যায়। একপর্যায়ে হাত দুর্বল হয়ে যেতে পারে- এমনকি হাত-পা উভয়ই দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

মেরুদণ্ডের নরম হাড় বা ইন্টারভার্টেব্রাল ডিস্ক গঠনগতভাবে নিউক্লিয়াস প্যালপোসাস (কেন্দ্রমধ্যস্থিত জেলির মতো পদার্থ) এবং অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস (চারপাশের শক্ত ফাইবার বা আঁশ ও ছোট ছোট রক্তানালী) দিয়ে তৈরি। মানুষের দাঁড়ানো অবস্থায় বা ওজন বহনকালে কেন্দ্রে থাকা জেলির ওপর চাপ পড়ে কিন্তু শক্ত অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস সেই চাপ নিয়ন্ত্রণ করে ডিস্কের গঠন ঠিক রাখে। কিন্তু বেশি ওজন বহনে বা অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ায় নিউক্লিয়াস প্যালপোসাসের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বা অসম চাপ পড়লে সেই অতিরিক্ত চাপ অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে নিউক্লিয়াস প্যালপোসাস অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস এবং কখনও কখনও অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস ছিড়ে কোন একদিকে বের হয়ে আসে। ফলে মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) অথবা স্নায়ুমূল (নার্ভরুট) অথবা দুটোতেই চাপ পড়ে।


আছে চিকিৎসা

১৯৩৪ সাল থেকেই প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে পিঠের চামড়া, মাংস ও হাড়ের মাঝখান দিয়ে কেটে বেরিয়ে আসা বা প্রোল্যাপসড নিউক্লিয়াস প্যালপোস্যাসের অংশটুকু তুলে এনে স্নায়ু বা স্নায়ু রজ্জুর চাপকে প্রশমিত করা হয়। এছাড়া নিয়মিত ফিজিওথেরাপি গ্রহণের মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, পারকিউটেনিয়াস লেজার ডিস্ক ডিকম্প্রেশনের (পিএলডিডি) মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাত্রার ও নির্দিষ্ট ধরনের লেজার রশ্মি প্রয়োগ করে অতি সহজেই নিউক্লিয়াস প্যালপোসাসের অংশবিশেষ বাষ্পায়িত করে এর অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব। ফলে স্থানচ্যুত (প্রোলাপ্সড) ডিস্ক পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে এবং স্পাইনাল কর্ড ও নার্ভরুটের ওপর থেকে চাপ কমে রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

এছাড়া লেজারের অপটো-থারমো মেকানিক্যাল স্টিমুলেশনের মাধ্যমে ছিড়ে যাওয়া অ্যানিউলাস ফাইব্রোসাসের পুরো ক্ষমতা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে হাড়, মাংস ও চামড়া কাটার যেমন প্রয়োজন হয় না, তেমনি রোগীকে অজ্ঞান করারও প্রয়োজন হয় না। ফলে, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগীর ক্ষেত্রেও লেজার সার্জারিতে তেমন কোনও সমস্যা দেখা দেয় না।

উন্নত বিশ্বে ডিস্ক প্রোল্যাপ্সের বেশিরভাগ রোগীরই এখন আর কেটে অপারেশন করা হয় না। সারভাইক্যাল/লাম্বার ডিস্ক প্রোলাপ্সের বেশিরভাগ রোগীই পারকিউটেনিয়াস লেজার ডিস্ক ডিকম্প্রেশনের (পিএলডিডি) মাধ্যমে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে থাকে।

এখানে উল্লেখ্য যে, এই চিকিৎসায় যে ধরনের বা যে মাত্রার লেজার রশ্মি ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাতে কোনওরকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকে না বললেই চলে। আমেরিকার ফেডারেল ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন ইতোমধ্যেই পিএলডিডিকে নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।


 

লেখক: লেজার সার্জারি বিশেষজ্ঞ

পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব লেজার সার্জারি অ্যান্ড হসপিটাল

ই-মেইল: myalibd@hotmail.com

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।