রাত ১০:২২ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

এই কারণে আমার জীবনটা শুধু বিচ্ছেদের ইতিহাস : জয় গোস্বামী

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[জয় গোস্বামী দুই বাংলার তুমুল জনপ্রিয় কবি। জন্মেছেন ১৯৫৪ সালের ১০ নভেম্বর কলকাতা শহরে। ছোটবেলায় তাঁর পরিবার রানাঘাটে চলে আসে। ১৯৮৯ সালে তিনি ‘ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ২০০০ সালের আগস্ট মাসে তিনি ‘পাগলী তোমার সঙ্গে’ কাব্য সংকলনের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। গত ১৯ নভেম্বর তিনি হে ফেস্টিভ্যালে যোগ দিতে ঢাকা আসেন। কলকাতা ফিরে যান ২২ নভেম্বর। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি খালেদ হোসাইন।- বি. স.]

খালেদ হোসাইন : এই কথা সবাই বিশ্বাস করে- যারা কবিতার, যারা সাহিত্যের অনুরক্ত- জয় গোস্বামী বাংলা সাহিত্যে পূর্বাপর যে পরিক্রমণ, সেখানে একটা ব্যাপার হয়ে উঠেছেন। এটা এক ধরনের স্তুতি হতে পারে। আমার নিজেস্ব অনুভব এরকম যে, এ কথার মাঝে সত্যতা আছে। আমার নিজের অনেক ভালোলাগা কবি আপনি। তো কবিতায় আপনার জড়ানো মানে কিভাবে কবিতায় আপনার বিশেষ আবেগ এবং কবিতা কেনো আপনাকে এতো প্রবলভাবে টান দেয়?


জয় গোস্বামী : খুব সহজে একটা উত্তর এখন আমি খুঁজে পাই না। তবে যখন আমি স্কুলে পড়তাম তখন আমি আমার স্কুলের বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করতাম না। খেলাধুলা করতে পারতাম না শারীরিক অসুবিধার জন্য। কিন্তু আমার কথা জানার জন্য আমি বই পড়তাম। এই মনের কথা জানার পর থেকে আত্ম-উপলব্ধি করলাম। এরপর থেকে সেগুলো একটা সময় এঁকেবেঁকে কবিতার চেহারার মধ্যে নামে। তারপর এখনো মনের কথা জানবার চেষ্টা করি। এটাই হচ্ছে মূল কথাটা।


খালেদ হোসাইন : সাহিত্যের অন্যান্য আঙ্গিকে তো সহজেই আপনার একটু বিচরণ আছে। যেমন, অনেকেই মনে করেন সাঁঝবাতির রূপকথারা আপনার কবি সত্তারই প্রকাশ। অথবা অন্য কোনোভাবে কাব্যবোধের যে উচ্চারণ সেটাই আসলে লক্ষ করা যায়। এখানে আমার মনে হয় যে, পূর্বাপরই আপনি যা কিছু লেখেন না কেনো, যা কিছু করেন না কেনো তার মধ্যে কবি বলতে আমাদের মনে যে ধারণার জন্ম দেয় তার একটা অভিব্যক্তি আমরা পাই। প্রকাশটা আমরা লক্ষ করি। এটা নিশ্চয়ই আপনারও লক্ষ করার বিষয়।

 

জয় গোস্বামী : আমি সাধারণত যে উপন্যাস লিখি এর মধ্যে শুধু রূপকথার নয়, যে কটা পর্ব আমি লিখেছি তা উপন্যাস আকারে ছাপা হয়েছে। তা লিখেছি, আমি একটা পত্রিকায় কাজ করি সেখানে যিনি সম্পাদক তিনি আমাকে লিখতে বলেছেন। প্রথম লেখার পর আমি যে এটা চালিয়ে যাব, চালিয়ে যাবার পুঁজি ছিল না আমার। তখন কাবেরী আমি সংসার করেছি। সে বলল, বছরে কুড়ি হাজার টাকা তুমি কি অন্য কোনোভাবে উপায় করতে পারবে? আমাদের মেয়েটা ছোট। তুমি ভেবে দেখো যে, জিনিসটাকে গ্রহণ করবে কি না? আমি কিছু কিছু বছরে, একটা করে গদ্য রচনা করে যা উপন্যাস আকারে ছাপা হয়েছে, তা লিখতে থাকি। তবে সেগুলো কোনোটাই আমার উপন্যাস বলে মনে হয় না। সাংবাদিকতা করার সময় আমি যে পাড়ায় থাকতাম, সে পাড়ায় অমিতাভ ব্যানার্জী নামে একজন শিল্পী থাকতেন। তিনি দোতলায় তার কাজ করতেন। তখন তিনি বেশ বড়, তার সমস্ত চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে। এখন আমার যে বয়স ওর তখন তাই বয়স। তখন গদ্যটা একদিন সকাল বেলা শুরু করলাম। তখন তিন পাতা কিংবা এক-দু পাতা লিখেছি তখন পাউরুটি কিনতে গেলাম। সকাল বেলা পাউরুটি খেতাম। পাউরুটি কিনে যখন ফিরে আসছি তখন দেখি অমিতাভ ব্যানার্জী একটা বড় ক্যানভাস হাতে করে ধরে সরিয়ে দুতলার ঘরে রাখছে। আমি দেখতে পেলাম রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়। তারপর বাড়িতে গিয়ে যখন লিখতে বসলাম আমার চরিত্রটা সেই চরিত্রকরণ হয়ে গেল।

 

খালেদ হোসাইন : একজন কবি আসলে কেনো, কিভাবে কবিতা লেখেন? তারপরেও প্রত্যেকের একটা নিজস্ব ভঙ্গি আছে। আপনারও নিশ্চয়ই তাই। আমার প্রথম মনোযোগ আকর্ষণ করে আপনার ‘ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা’। এর বিষয়ে আমি আলোচনা করেছিলাম। আমার সঙ্গে যারা থাকত তাঁদের কবিতাটা আমি শোনাতাম। ওদের ভালো লাগত। এখানে আসলে কবিতার মধ্যে নামকরণ করার একটা প্রবণ আছে। যেমন তারিখ কবিতার শিরোনাম।


জয় গোস্বামী : আসলে ‘ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা’ তখনের দিনটা খুব বিশেষ ছিল। সবার কাছে হয়ত বিশেষ নয়। তখন একটা মেয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। কলকাতার পথে পথে দুজনে কিছুক্ষণ ঘুরেছিলাম। ত্রিশ বছর আগে।

 

খালেদ হোসাইন : কবিতাটা দেশ পত্রিকায় যখন ছাপা হয়েছিল, তখন আমরা জানতে পারলাম যে, জয় গোস্বামী এরকম একটা ঘটনা ঘটিয়েছে।

জয় গোস্বামী : তখন আমি চাকরি করতাম না। কবিতাপত্রে বের হবার আগে প্রতিক্ষণ পত্রিকায় কবিতাটি প্রথম বের হয়েছিল।


খালিদ হোসাইন : এটা বিষয় না, কবিতা ভালো লাগার একটা বিষয় হচ্ছে প্রিয় একটা...

জয় গোস্বামী : ভুল বিষয় আছে। আসলে বইটা পছন্দ হয়েছে এর নামকরণের জন্য। ‘ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা’ এই নামটায় দেখুন ঘুমিয়েছ এর পরে একটা কমা আছে। প্রথমে আছে ঘুমিয়েছ এর পর ঝাউপাতা। আবার বইটায় যদি দেখেন যে, কবিতা সাজানো আছে, তার প্রথম কবিতা তুমি ঘুমিয়েছ আলো নামে একটা কবিতা আছে। যেই কবিতার নাম হচ্ছে আলো। ঠিক তারপরের কবিতা হচ্ছে ঝাউ পাতাকে রুগ্ন কবির চিঠি। আসলে এই কবিতাগুলো লেখা হয়েছিলো চার-পাঁচ বছর ধরে। আসলে সেই সময় তারিখ দেওয়ার কারণ, একটি মেয়ের সঙ্গে সারাদিন কলকাতার রাস্তায় ঘুরেছিলাম। তখন তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়। তখন আমি প্রায় উন্মাদের মতো হয়ে গেছি। সে আবার শেষ হতে তিন মাসের বেশি লাগে না। তিন মাসের মধ্যে অনেক কবিতা লেখা হয়ে যেত। এবং তারপরেই আমি একটা কিছু কালের শূন্যতার মধ্যে থাকতাম। এইট-টি নাইনে চার-পাঁচ বছর পরে আরেকজন আসে। আমি জানি যখন একজন মানুষের স¤পর্ক ভেঙে যায় তখন দ্বিতীয় একটা জায়গায় আশ্রয় খোঁজে।

আরেকটা বিষয়, ভয় পেয়ে যায়। সে পিছুতে থাকে। অর্থাৎ আমি এর মধ্যে গেলে আবার বিপদে পড়ব। আবার ঐ ভয়ানক কষ্টটা আমার মধ্যে ফিরে আসবে। আরেকটা কারণ, ঐ-যে, যে আনন্দময় স্মৃতি ছিলো তা ভুলে যায় দুঃসহ যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে। আমার এমন হয়েছিলো যে, জলযোগ নামে একটা মিষ্টির দোকান আছে। আপনি জানেন কলকাতায় জলযোগ নামে মিষ্টির দোকান আছে? এই মিষ্টির দোকান দেখলে আমার কষ্ট হত। জলযোগের সামনে দিয়ে আমরা হাঁটতাম। তাই এই জলযোগ মিষ্টির দোকান দেখলে আমার কষ্ট হত। এবার তাহলে দ্বিতীয় মেয়েটি এসে পৌঁছাল। এরা দুজনই ছিল অত্যন্ত উচ্চ শিক্ষিত এবং খুব সফিস্টিকেটেড ভালো বাড়ির মেয়ে। দুজনেই আমারা কবিতা পড়েছিলাম। এই দ্বিতীয়জনকে নিয়ে লেখা হচ্ছে ঝাউপাতাকে রুগ্ন কবির চিঠি। যখন বইটা বের করলাম তখন, মাঝখানে কমা দিয়ে দিলাম। বইটা আসলে দুজনকেই উৎসর্গ করা। ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা- এই দুজনেরই নাম রইল। একটা মেয়ে আমাদের বাড়িতে সারা রাত্রি ছিল, আগের মেয়েটি। আমরা সারা রাত্রি বারান্দায় বসেছিলাম। বাড়িতে আমার ভাই ছিল। আমাদের মধ্যে কোনো প্রকার শারীরিক সম্পর্ক হয় নাই। একটা বারান্দায় আমরা এদিক ওদিক বসে গল্প করছিলাম। বেশ খানিকটা দূরে বসেছিলাম। সেদিন ছিল সপ্তমী পুজোর দিন। অষ্টমীর দিন ভোরবেলা আমি তাকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে যাই তখন সূর্য ওঠে। তারপরে স্টেশনে পৌঁছে দিতে গিয়ে আমি কয়েকটা স্টেশন তার সঙ্গে যাই। যখন এসে পড়েছি তখন সূর্যটা সবে উঠেছে। আর সূর্যের আলো তার মুখে এসে আলোটা পড়ছে। তখন তুমি ঘুমিয়েছ আলো কবিতাটা লিখে ফেললাম। আর এই মেয়েটাকে নিয়ে লেখা ঠিক তার চার-পাঁচ বছর পরে ঝাউপাতাকে রুগ্ন কবির চিঠি বা ঝাউপাতার কবিতাগুচ্ছ। দেখবেন যে বসন্ত উৎসব নামে কয়েকটি কবিতা আছে। এইযে দুজনকে নিয়ে যে কবিতা এই বইতে রইল, তাই আমার মতো করে বোঝানোর জন্য আমি মাঝখানে একটা কমা দিয়ে দিলাম, ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা। আসলে মনে হচ্ছে যে একজনের কথা বলা হচ্ছে কিন্তু দুজন। যথারীতি সেই মেয়েটির সঙ্গেও আমার সম্পর্ক রইল না। এই কারণে আমার জীবনটা, শুধু নারীর ক্ষেত্রেই নয় পুরুষের ক্ষেত্রেও শুধু বিচ্ছেদের ইতিহাস।

 

খালেদ হোসাইন : আসলে মানুষের জীবন-মৃত্যু-স¤পর্ক নিয়ে কোনো ধারণা থাকে বলে আমার মনে হয় না। প্রত্যেকটা সম্পর্ক আসলে শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় এসে শেষ হয়।

জয় গোস্বামী : আসলে শেষ সময়টা এবং এর পরে কি যে আসবে তার পিছনে বিচ্ছেদের একটা অবদান থাকবে। এটা যেন স্থায়ী হয়ে থাকল।

 

খালেদ হোসাইন : দুঃখবাদীতার একটা ছাপ হয়ত থাকে কিন্তু শরীরে আনন্দের উত্থান লক্ষ করা যায়।

জয় গোস্বামী : এগুলো সব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। আমার এরকম একটা কবিতা আছে। কবিতাটার নাম হচ্ছে, এই একটা দুপুর। এটা আপনারা পড়েননি। আপনার একটা ব্যক্তিজীবন আছে। আর আপনি যখন লিখছেন তখন সেখানে জীবনের একটা টান আছে। লেখা পড়ছেন আর সেই টান আসছে। এরপর সেই পর্দা খুলে যায়। ঠিক সেরকম আরেকটা আসে। যদি বলেন তো, সেই কবিতাটা আমি পড়তে পারি। এই কবিতাটি লিখতে গেলে হয়ত আরো দশটি কবিতা লেখা হয়ে যেত। এরপর দেখা গেল অশান্তি লেগে গেল। তাই আর পরে লেখা হয়ে উঠেনি। (জয় গোস্বামী কবিতাটি আবৃতি করে শোনান)। এই কবিতাটি নিয়ে একটা বই বের করা যায়। কবিতাটা প্রায় দেড় পাতা।

খালেদ হোসাইন : শুধু একটা কবিতা। এই কবিতাটিই একটা বই। অসাধারণ।

জয় গোস্বামী : এই থিম আমাকে একটা কথাই বলে কিন্তু আমি সে অনুযায়ী কাজ করতে পারি না।

 

খালেদ হোসাইন : এক ধরনের আখ্যানমূলক কবিতা, যেখানে কাহিনী থাকে, সেখানে তো আপনার ঝোঁক আছে। আমি বলছি না যে সেটা সচেতনভাবে। তবে দেখা গেল যে কবিতাটা হবার পরে সেখানে আখ্যান তৈরি হয়েছে। পাঠক এখানে একটা প্লট দেখতে পায়।

জয় গোস্বামী : একটাই ধরন নিয়ে যে আমি কবিতা লিখব এমন কোনো ভাবনা নেই। তখন হয় কী- অন্যান্য পদ্ধতি যেগুলো বাংলা কাব্যের মধ্যে আছে যা আখ্যানধর্মী বা যা কথা ও কাহিনী লিখেছেন। তারপর একটা সময় মঙ্গলকাব্য লেখা হয়েছে। গল্পে বা উপন্যাসে আমি ঠিক সক্ষম হয়নি। আমি যা লিখেছি সেটা খুব সাফল্য পায়নি। আমার ঝোঁকটা সেদিকে বেশি নাই। আমার ঝোঁকটা হলো আমি যেসব চরিত্র দেখেছি সেসবের মধ্যে চলে এসেছে। প্রেমের আনন্দ থাকে অল্পক্ষণ কিন্তু বেদনা থাকে অসীম। দুঃসহ তার যন্ত্রণা যে তার সমস্ত আনন্দকে ভুলিয়ে দিতে চায়। যারা বাদ্যযন্ত্র বাজায় আপনি কি দেখেছেন তারা কিভাবে সুর বাঁধে? তারা যন্ত্র বাঁধে উন্নতমানের হস্ত কৌশল দিয়ে। আপনি যদি একবার সুর বাঁধা শিখে যেতেন তাহলে কিন্তু গান বাঁধা সহজ হবে। যেমন করে আলী আকবর সাহেব পারতেন। ঐ দিকে এখনকার জেনারেশন যাচ্ছে না। এখনকার জেনারেশন চাচ্ছে দর্শক যেন উন্মাদ হয়ে যাক তার সুর শুনে, তার কবিতা পড়ে। পুষ্পরাজ নাম একজন আছেন, তিনি সুরবাহার বাজান। ডাগর ব্রাদার্স-এর ছাত্র। দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, তিনি কমার্শিয়াল বাজনা বাজালেও তাতে গভীরতা আছে। কিন্তু আমি বাজাচ্ছি বা গাইছি আর দর্শক মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে এটা ভুলে যাবার শক্তি, এটা মুখ্য। আমি গাইছি এটা আমার মধ্যে ডুবে যেতে হবে।

 

খালেদ হোসাইন : এই বাস্তবতা আমাদের কবিতার মধ্যেও হয়। অনেক কষ্ট করে এসে চিত্তকে একটা নিবিড় সাধনা করা। নিজেকে নিয়ে আছেন, সৃষ্টি নিয়ে আছেন কিন্তু নিজস্ব গৌরব নেই, নিজস্ব স্বভাব নেই যে, প্রাণ থেকে প্রাণে ছড়িয়ে পড়বে। তুলনামূলক আমরা জনপ্রিয়-কাতর হয়ে পড়েছি।

জয় গোস্বামী : অন্যে কি আমার কবিতা পড়ল, আরেক জনের কাছে কি সেটা ভালো লাগল- ঠিক সেটা নয়। আমি কালকেও স্টেজে কবিতা পড়েছি। আবার এই ঘরের মধ্যে বসেও কবিতা পড়ছি, চার-পাঁচ জনের মধ্যে, তখনও সেটা আমার জন্য না।

 

খালেদ হোসাইন : এখন যে কবিতা লেখা হচ্ছে সামগ্রিকভাবে বাংলা ভাষায় পশ্চিমবঙ্গে, আসামে, ত্রিপুরায় আর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির কবিতা, আসলে সবটা নিয়ে আপনার ভাবনা কি?

জয় গোস্বামী : আমি যেটা বলব, আমি যথাসাধ্য পড়েছি সবারটা। আমি দেখেছি এরা খুব সচেতন। প্রথমত আমরা যখন কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম তখন থেকে বিশ্ব সম্পূর্ণ বদলে গেছে। যে প্রাণী পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারে না সে ধ্বংস হয়ে যায়। এই যে ইন্টারনেট এসেছে এটা সারা পৃথিবীকে এনে দিয়েছে আপনার কাছে। সারা পৃথিবীর সাহিত্যকে আপনি জানতে পারছেন। দ্বিতীয় কথা হল যে, তারা খুব সচেতন এবং খুব আত্মবিশ্বাসী। যেটা আমার কোনো দিন ছিল না, আর আমার ছিল না বলেই আমি খুব সাফার করেছি। আমি আরেকটু ঠিক পথে যেতে পারতাম। আত্মবিশ্বাসটা আমার ঠিক পথ নির্ধারণ করে। এদের মধ্যে কাঁচা মনও আছে। মানে একদম কাঁচা মন। যে মনটা প্রতিরোধ পায়নি। প্রতিরক্ষার উপায় পায় না। সে বাঁচে একটা ঘেরাটোপের মধ্যে। কিন্তু মনে হবে আমার কাচ ভেঙে চুরচুর হয়ে যাচ্ছে। এদের ভবিষ্যতের লেখা যে কি হবে সেটা দেখার বিষয়। এর মধে দিয়েও সে লিখে যাচ্ছে। আকাশে কত রকম পাখি, কত রকম উদ্ভিদ, কত রকম জলচর, মানুষের দেশে দেশে কত রকমের পোশাক, গায়ের রং- তার মানে কি কবিতা একেক রকম হবে? সুতরাং, এই তত্ত্বের বিচার হচ্ছে তারা মানুষকে বলে কবিতা হবে এইরকম অথবা এইরকম অথবা এইরকম।

 

খালেদ হোসেন : ঠিক আছে ধন্যবাদ। অনেক সময় নিলাম আপনার, অনেক কথা হল আপনার সঙ্গে।
জয় গোস্বামী
: আপনি তো জানেন নিজে কবি হয়ে এই কথা তো অন্তত, এই কথার কোনো শেষ নেই। এই যে মহাকাশ এটা একটা জায়গায় শুরু হয় একটা জায়গায় শেষ হয় কিন্তু আমরা আকাশের খানিকটা অংশ দেখতে পারি। মাত্র একটু খানি দেখতে পারি। আসলে একটা জায়গা থেকে শুরু হয়েছে আর চলেছে আর আমরা তার মাঝখানে রয়েছি। আর আমাদের আয়ুটাও তাই। আমাদের আয়ু কিছুদিন পর থাকবে না। তিপ্পান্ন সালে হয়েছে জন্ম। ঠিক তেমনি আমাদের কথা মাঝখানে ঝুলে থাকল।

 

খালেদ হোসেন : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জয় দা।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।