দুপুর ০২:০৯ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৭ জুন, ২০১৯  

পাত্রী চাই

হেলথ ইকোনোমিকসের র‌্যাগ ডে

প্রকাশিত:

আসাদুজ্জামান লিমন।।

সবুজ ঘাসের উপর ব্যাক্সে একটা কেকের অর্ধেকটা পরে আছে। কেকটাকে আড়াল করতে তারপাশে ব্যাগ স্তূপ করে রাখা হয়েছে। আর কেকসমেত ব্যাগের মালিকেরা মাঠের মাঝে বৃত্ত তৈরি করে হল্লা করছে। একটু পর পর যার যেমন ইচ্ছে, অমনি উড়ে এসে মুখে এক টুকরো কেক তারপর আবার বৃত্তের মাঝে বসে পড়া। ওভারকোর্টের মতো সবার পরনে সাদা টি-শার্ট শোভা পাচ্ছে। তাতে লেখা ‘অ্যারো র‌্যাগ ডে’। মাঠের মাঝে সাদা টি শার্ট পড়ুয়াদের কাছে যেতেই অদ্ভুত সব লেখা চোখে পড়ল। একজনের টি-শার্টে লেখা পাত্রী চাই। যার টি-শার্টে পাত্রী চাই লেখা হয়েছে। সে ঐ লেখা নিয়ে এর ওর পিঠে টি শার্টে সমানতালে লিখে যাচ্ছে। ‘ভালো থাকিস বন্ধু, ভুলিস না আমায়, তোদের খুব মিস করব’ ইত্যাদি শব্দ নিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখেই চলেছেন একে অপরের পিঠের টি-শার্টে। এমন দৃশ্যের দেখা মিলল টিএসসির মাঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ ইকোনমিকস বিভাগের প্রথম ব্যাচের র‌্যাগ উৎসব উপলক্ষ্যে এমন আয়োজন।

টিএসসির সবুজ ঘাসের মাঠটাকে যদি খেলার মাঠ ভাবা হয়, তবে গ্যালারিও খুঁজে পাওয়া যাবে। মাঠের চারপাশে অনেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেন। র‌্যাগ ডে পালন করতে আসা এক ঝাঁক তরুণ-তরুণীদের ছেলে মানুষী দেখছিলেন তারা সবাই। বলা যায় বিনা টিকেটে এমন আয়োজন দেখা। তবে এসবের প্রতি ভ্রূক্ষেপ নেই কারো। দুপুরের নরম রোদে তারা মেতে ওঠে আপন উৎসবে। কার পিঠে কে কি লিখল সেটাই সবার দেখার বিষয়। ‘দোস্ত তুই আমার পিঠে উল্টা-পাল্টা কিছু লিখিস না আবার।’ ‘কি আমি উল্টা-পাল্টা লিখি? ঠিক আছে আমি তোর টি-শার্টে কিছু লিখুমই না।’ এই বলে চটে গেলেন একজন। তার মান ভাঙাতে অনেক সময় লাগে। শেষমেষ সে তার বন্ধুর হেলান দেয়া পিঠে লিখে দেয়, ‘আমার বন্ধু একটা পাগল’ । যার পিঠে লেখা হয়েছে, সে তো সেই লেখা পড়তে পাড়ছে না। তাই অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঐ তরুণী বলল, দ্যাখ তো দোস্ত ও আমার পিঠে কি লিখছে। যাকে পিঠের লেখা পড়তে ডাকা হলো, সে এক ঝলক দেখেই হো হো করে হেসে উঠল। তারপর বলল, ‘ভালোই লিখছে। তুই যা তাই লিখছে। তুই একটা পাগলী।’ কি আমাকে ও এসব লিখেছে। দাঁড়া তোদের দুজনকেই আমি আজ দেখাচ্ছি মজা। এই বলেই ঐ দুই বন্ধুকে তাড়া করতে থাকে তরুণী। এমন কপট রাগ, খুনসুটি আর নষ্টালজিক স্মৃতিতে চলে একে অপরের টি শার্টে লেখালেখি।

তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ইদানিং সেলফি তোলার হিড়িক লেগেছে। দাত বের করে বিজ্ঞাপন মার্কা হাসি দিয়ে কিংবা মাথার ওপর আঙুল তুলে শিংয়ের মতো বানিয়ে সেলফি তোলা হয়। এরই মধ্যে একজন বলে ওঠে শাম্মি তুমি তো আমার টি-শার্টে কিছু লিখে দাওনি। তার সঙ্গে সুর মেলায় আরেক তরুণ। শাম্মি আমারটায় লিখে দেয়নি। তরুণ দুজন তখন অভিমান করে বলে ঠিক আছে তোরটায়ও আমরা কিছুই লিখুম না। শাম্মি তখন ওদের মান ভাঙানোর জন্য বলে ওঠে ‘না দোস্ত রাগ করিস না। দেখসিস না, লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। দে তোদেরটা দে এখনই লিখে দিচ্ছি। এদিক শাম্মিকে রাইসা পাকড়াও করে। সে বলে, কিরে শাম্মি ওরা ছেলে বন্ধু বলে ওদেরটায় আগে লিখে দিলি? আমি কি দোষ করেছি? শাম্মি তখন বন্ধুদের টানা হ্যাচড়ায় দ্বিধান্বিত। সে বলে, আমি সবারটাতেই লিখে দিব। তবে মনে রাখিস আমার দূর্গার মতো দশটা হাত নেই ।

একজনকে দেখা গেল সবুজ ঘাসের ওপর হেলান দিয়ে আয়েশি ভঙ্গীতে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতে। গেল চার বছরের হিসেবে নিকেশ মেলাচ্ছিল যেন। আওলাদ নামের ঐ শিক্ষার্থীর কাছে গিয়ে কথা বলতেই তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ সেশনে হেলথ ইকোনমিকসের প্রথম ব্যাচ শুরু হয়। দেখতে দেখতে চার বছর পার হল। ডিসেম্বরের দুই তারিখ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। চার বছরের ভালোবাসার বন্ধনটাকে সুদৃঢ় করতে এমন আয়োজন। আবার কবে কার সঙ্গে দেখা হবে তার তো ঠিক নেই। তাই ব্যাচের সবাইকে একসঙ্গে করা হয়েছে। মূলত একসঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এখানে মিলিত হওয়া।

এদিকে ঘাসের উপর রাখা আধ-খাওয়া একটা কেকের উপর বড় সাইজের একটা মাছি ভো ভো আওয়াজ তুলে উড়ে বেড়াচ্ছিল। ঠিক যেন অবতরণের জায়গা খুঁজছিল সে। কিছুক্ষণ ওড়াওড়ির পর প্যাস্ট্রি কেকের নকশা করা একটা ফুলের ওপর অবতরণ করে সে। কিছুটা খেয়ে নেয়। আবার কেকের ওপর চক্কর দিতে থাকে। দেখতে দেখতে মাছির সঙ্গী জুটে যায়। ঠিক তখুনি র‌্যাগারদের একজন প্লাস্টিকের চাকু হাতে নিয়ে মাছি বসা ফুল সমেত ঐ কেকের টুকরাটি মুখে দেয়। এই দৃশ্য দেখছিলেন টিএসসির বারান্দায় বসা অন্য বিভাগের একজন ছাত্র। কেক খেতে না পারার অক্ষেপেই বুঝি তার সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে বললেন— দ্যাখ, এই হচ্ছে হেলথ ইকোনমিকস ছাত্রদের কাণ্ডজ্ঞান।

অন্যেদের এমন টিপ্পনিনিতে কান না দিয়ে সকাল থেকেই চলে র‌্যাগ ডে উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠান। সকালে টিএসসির মিলনায়তনে শুরু হয় স্মৃতি-রোমন্থন পর্ব। এরপর দুপুরে কেক কেটে মাঠে রোদ পোহানো। এরই মাঝে মধ্যাহ্ন ভোজ সারা হয়। এরপর বিকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এভাবেই নস্টালজিক স্মৃতি হাতড়ে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় যে যার ঘরে ফেরে। ঠিক তখনই টিএসসির সাইবার ক্যাফের পাশের বরই গাছটিতে শিশির জমে। গাছে বরই ধরেছে। বয়সে সেও তরুণ। একটা একটু করে বেড়ে উঠছে সে। ছাত্রদের মতোই সেও এগিয়ে যায় পরিপক্বতার দিকে। এমন করে গাছে আবারও নতুন বরই ধরবে। শ্রেণিকক্ষেও নতুন শিক্ষার্থী আসবে। রয়ে যাবে কেবল প্রকৃতি আর অনুষঙ্গ।

/এমবিআর/


 


 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।