রাত ১০:১৯ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

কার্টুনিস্ট কী বার্তা দিচ্ছেন সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ : খলিল রহমান

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[বাংলাদেশের কার্টুন জগতে তরুণদের মধ্যে অগ্রগণ্য খলিল রহমান। তাঁর কার্টুন বিশ্বের নানা প্রান্তে সমাদৃত হচ্ছে। তিনি রাজনীতি, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য, ঢাকার যানজটসহ বিভিন্ন অসঙ্গতির চিত্র কার্টুনের মাধ্যমে তুলে ধরেন। খলিলের কার্টুন সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী (রনবী) বলেছেন, ‘আমি তাঁর কার্টুন দেখি এবং চমৎকৃত হই।’ খলিল রহমান ১৯৮৩ সালে ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুল জীবনেই তাঁর কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে। তবে কার্টুনিস্ট হিসেবে তার ক্যারিয়ার শুরু ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউ নেশনে। সম্প্রতি খলিলের ৪৮টি কার্টুন নিয়ে একটি নির্বাচিত অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। সেখান থেকে কয়েকটি কার্টুন প্রকাশ করা হলো। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন, শিল্প সমালোচক আবুল কালাম আজাদ।]

আবুল কালাম আজাদ : আপনার কার্টুনিস্ট হয়ে ওঠার গল্পটা বলবেন? খলিল রহমান : ছোটবেলা থেকেই আঁকা-আঁকির প্রতি কেনো জানি অসম্ভব একটা ভালোলাগা ছিল। অঙ্ক খাতার পাতাগুলো শেষ করতাম ছবি এঁকেই। স্কুল জীবনেই বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার ছোটদের পাতায় কার্টুন পাঠাতাম। ছাপাও হতো। সেই থেকেই বলা যায় আমি পত্রপত্রিকার সঙ্গেই আছি। ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ঢাকায় এলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে। গ্রাম থেকে যে সব পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটিং করতাম সে সব পত্রিকার অনেকের সঙ্গেই সরাসরি পরিচয় হলো। ফলে পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ আরও বেড়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকায় কার্টুন করতে থাকি। কিছুদিন পর ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউ নেশনে-এর প্রথম পাতায় রাজনৈতিক কার্টুন করার একটা অফার পেলাম। আমি অফারটি সানন্দে গ্রহণ করি। নিউ নেশনেই প্রথম সুযোগ পেলাম প্রথম পাতায় কাজ করার। তারপর থেকে আঁকতে আঁকতেই আজ এ পর্যন্ত। আবুল কালাম আজাদ : কীভাবে কার্টুন করেন একটু বলবেন? খলিল রহমান : যখনই কার্টুনের উপযোগী কোনো ঘটনা ঘটে বা এমন কোনো খবর থাকে তখন সেটির ওপর একটা আইডিয়া চিন্তা করি। আইডিয়াটা স্থির হলে এরপর পেন্সিলে রাফ ড্রইং করি। তারপর কালো কালি, তুলি ও কলম ব্যবহার করে আউটলাইনের কাজটি সম্পন্ন করি। এরপর সেটিকে স্ক্যান করে ফটোশপে কালার করি। কখনও কখনও পুরো কাজটিই হাতে আঁকি। হাতে কাজ করার অন্য রকম একটা আনন্দ আছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর কোনো কারণে ছোটখাট কিছু পরিবর্তন করতে চাইলে সেটি করা সম্ভব হয় না। সংবাদপত্রের পলিসি অনুযায়ী অনেক সময় ছোটখাট কিছু কারেকশনের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে ফটোশপে কালার করাটাই ভালো মনে করি। অনেকে মনে করেন কম্পিউটারের কোনো সফটওয়ারের মাধ্যমে কার্টুন আঁকা যায়। ধারণাটি সঠিক নয়। মূল কাজটি হাতেই করতে হয়। আবুল কালাম আজাদ : আপনার কার্টুনে বিষয় হিসেবে রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়, কারণ কি? খলিল রহমান : বাংলাদেশের রাজনীতি কার্টুনের বিষয় হিসেবে বেশ উপযোগী। তাছাড়া রাজনৈতিক কার্টুনের প্রতি আমার একটা বিশেষ ভালোলাগা রয়েছে। আবুল কালাম আজাদ : কার্টুনে আপনি অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিকদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেন, এতে কি তারা কখনো আপনার প্রতি বিরাগভাজন হন? আর হলেও এটা আপনি কিভাবে নেন? খলিল রহমান : কখনো কখনো বিরাগভাজন হন, কিন্তু সেটার প্রভাব আমার পর্যন্ত আসে না, পত্রিকার সম্পাদক কিংবা কর্তৃপক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরে অবশ্য জানতে পারি। তবে অনেকে আবার কার্টুন ইনজয় করেন। সমকালের এক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সদ্য বহিষ্কৃত মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী আমাকে বললেন, ‘তুমি আমাকে নিয়ে কোনো কার্টুন করো না কেন?’ আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কার্টুন করলে রাগ করবেন না তো?’ উনি বললেন, ‘কার্টুন মজার বিষয়, এটাকে আমি ইনজয় করি। এতে রাগ করার কি আছে?’ আবুল কালাম আজাদ : কার্টুন একটি দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে বলে আপনি মনে করেন, গণতন্ত্র আর কার্টুনের মধ্যে সম্পর্ক কী ? খলিল রহমান : কার্টুন সম্পর্কে বলা হয়, একটা দেশে কতটা গণতন্ত্র আছে তা সহজে বোঝার উপায় সে দেশের কার্টুনিস্টরা কতটা স্বাধীনতা ভোগ করেন- তা দিয়ে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া কখনই গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। শুধু ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ নয়, বরং দুঃশাসন, দুর্নীতি ও অগণতান্ত্রিক সকল কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্টুনে উঠে আসে তীক্ষ্ম সমালোচনা ও তীব্র কটাক্ষ। কখনো কখনো কার্টুন হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিবাদ। সরকারের বা প্রভাবশালী কোনো মহলের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরে সমালোচনা করাই একটি রাজনৈতিক কার্টুনের লক্ষ্য- যা সুস্থ গণতন্ত্র চর্চার সহায়ক। সুতরাং গণতন্ত্রের সঙ্গে কার্টুনের একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আবুল কালাম আজাদ : আপনি চারুকলায় পড়েননি তারপরও আপনার কার্টুন আঁকার দক্ষতা সবাইকে মুগ্ধ করে। এ সম্পর্কে বলুন- খলিল রহমান : সম্ভবত পৃথিবীর সকল সৃজনশীল কাজ নিজে নিজেই শিখতে হয়, কোনো প্রতিষ্ঠান শেখাতে পারে না। যেমন কবিতা, গল্প, উপন্যাস লেখা শেখার কি কোনো প্রতিষ্ঠান আছে? কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়ে কি কবি কিংবা লেখক হওয়া যায়? চেষ্টা আর সাধনার মধ্য দিয়েই এগুলো শিখতে হয় বলে আমার ধারণা। কার্টুনও গল্প-কবিতা লেখার মতোই। চেষ্টা সাধনা থাকলে যে কেউ কার্টুন আঁকতে পারবেন। এজন্য চারুকলায় পড়তে হবে এমনটা আমি মনে করি না। বিশ্ববিখ্যাত বেশিরভাগ কার্টুনিস্টই চারুকলায় পড়েননি। তাছাড়া চারুকলা কার্টুন আঁকা শেখায় না। কার্টুন শুধু আঁকা-আঁকির বিষয়ও না। শুধু শিল্পমান বিবেচনায় কার্টুনের মানও বিবেচিত হয় না। এখানে বার্তাটিই মূখ্য। একটি কার্টুনে কার্টুনিস্ট কী বার্তা দিচ্ছেন সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবুল কালাম আজাদ : আপনার তুলির নিখুঁত আঁচড়ে উঠে এসেছে আমাদের সমাজ ও রাজনীতির নানা অসঙ্গতি। এ সম্পর্কে কিছু বলুন- খলিল রহমান : যেটুকু সম্ভব চেষ্টা করি তুলে ধরতে। তবে সবসময় তা সম্ভব হয় না। সংবাদপত্রগুলোও অনেক কার্টুন ছাপতে সাহস পায় না। আবুল কালাম আজাদ : আপনার কার্টুন অনেক সময় মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। এতে আপনি কখনো মৌলবাদীদের রোষের মুখে পড়েছেন? খলিল রহমান : না এখনো পর্যন্ত পড়িনি। আবুল কালাম আজাদ : বাংলাদেশের সংবাদপত্রে কার্টুন কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? খলিল রহমান : বাংলাদেশের সংবাদপত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি স্টোরির সাথে কার্টুন ব্যবহার হয়ে থাকে, অর্থাৎ স্টোরিটির মূল ভাষ্য তুলে ধরা হয় কার্টুনে। যা প্রকৃতপক্ষে কার্টুন নয়, বরং এটি ইলাস্ট্রেশন। ইলাস্ট্রেশনের বিভিন্ন ফর্ম রয়েছে। এটিকে রাজনৈতিক ইলাস্ট্রেশন বলা হয়। রাজনৈতিক কার্টুন ইলাস্ট্রেশনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। রাজনৈতিক কার্টুন কোনো স্টোরির সাপোর্টিং ম্যাটার নয়, বরং এটি নিজেই একটি স্টোরি। আমাদের দেশে কার্টুনের চেয়ে ইলাস্ট্রেশন বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবুল কালাম আজাদ : পেশা হিসেবে কার্টুনের ভবিষ্যৎ কী? খলিল রহমান : বাংলাদেশে এখন অনেক মিডিয়া। কার্টুনের ভবিষ্যৎ অনেক ভালোই দেখতে পাচ্ছি। আবুল কালাম আজাদ : কার্টুন নিয়ে আপনার ভাবনা কী? খলিল রহমান : তেমন কোনো ভাবনা নেই। যেভাবে কাজ করছি এভাবেই করে যেতে চাই। আবুল কালাম আজাদ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। খলিল রহমান : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।   খলিল রহমানের কার্টুন- 01-12-13   12-01-2014   23-02-2014   26-09-2013   1526108_356627264479168_234113979_n   10543565_445612122247348_5253607785829905812_o   bush

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।