রাত ০১:৫২ ; সোমবার ;  ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

ক্যাননের প্রিন্টার কারখানায় এক বেলা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম, হ্যানয় (ভিয়েতনাম) থেকে ফিরে॥

কম্পিউটার প্রিন্টারের সঙ্গে অামার পরিচয় ২০ বছর অাগে, অক্টোবরের এক সন্ধ্যায়, এই শহর ঢাকায়। তখন থেকেই অামার কাছে এক অপার বিস্ময়ের নাম প্রিন্টার। কম্পিউটারে তো কাজ হয়, দেখাও যায় কী কাজ, কিন্তু এর থেকে প্রিন্টার দিয়ে প্রিন্ট হয় কীভাবে? অার বানানোই বা হয় কীভাবে? ২০টা বছর ধরে মাথায় ঘুরপাক খেল এই এক জিজ্ঞাসা।

সেই অপার জিজ্ঞাসার জবাব মিলল ২০ বছর পরে, অারেক অক্টোবরে। এ এক অদ্ভুত কাকতাল!

ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত অ্য‌‌‌াসোসিও সামিট-২০১৪ কাভার করতে গিয়ে সুযোগ মিলল ক্যানন প্রিন্টার তৈরির কারখানা দেখার। কীভাবে প্রিন্টার তৈরি করা হয়, রোবট কীভাবে মান নিয়ন্ত্রণ (বিশেষ করে ফিনিশিং টাচ) করে ইত্যাকার নানান বিষয় স্বচক্ষে দেখতে পারার সুযোগ তাই হাতছাড়া করলাম না।

বাংলাদেশে ক্যানন পণ্যের পরিবেশক (ক্যানন অথরাইজড সোল ডিস্ট্রিবিউটর অব বাংলাদেশ) জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অাবদুল্লাহ এইচ কাফির কাছ থেকে এমন অফার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলাম।

দিনক্ষণ ঠিক হলো ৩০ অক্টোবর। সকাল সাতটায় অামাদের যাত্রা শুরু হবে। নির্দিষ্ট সময়ে তৈরি থাকলাম। অামাদের নিয়ে যাওয়া হলো ক্যানন কারখানায়।

অামাদের মানে, অামরা তিন সাংবাদিক (প্রথম অালোর পল্লব মোহাইমেন ও ইত্তেফাকের মোজাহেদুল ইসলাম ঢেউ এবং অামি) এবং ক্যাননের কয়েকজন এক্সক্লুসিভ ডিলার। অামাদের টিম লিডার ছিলেন জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ইনচার্জ (ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা) আজিম আবদুল্লাহ কাফি। এসময় প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক কবির হোসেনও অামাদের সঙ্গে ছিলেন।

রাজধানী হ্যানয় থেকে ঘণ্টা খানেক দূরত্বের থাং লং প্রদেশের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে নিয়ে যাওয়া হলো অামাদের। দূর থেকেই চোখে পড়ল বিশাল অায়তনের এক কারখানা। অামাদের জন্য কারাখানার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কারখানার কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে ছিলেন কারখানার মহাব্যবস্থাপক মি. তানিগুচি, কারখানা ব্যবস্থাপক মিজ সাওয়া এবং সিস্টেম ম্যানেজার ত্রান থি জুয়ান।

সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে অামাদের নিয়ে যাওয়া হলো দোতলার সভাকক্ষে। সেখানে কারখানা সম্পর্কে সংক্ষেপে জানা-বোঝার এক অায়োজন ছিল। মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনার মাধ্যমে কারখানা সম্পর্কে অামাদের অল্প বিস্তর জানিয়ে অাচম্বিতে অভ্যাগতদের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন কারখানার কর্মকর্তারা। "আচ্ছা বলুন তো, আমাদের এই কারখানায় নারী কর্মী কত শতাংশ?’

অামরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে একেক জন একেক উত্তর দিলাম। কিন্তু উত্তরে অামাদের যা জানানো হলো তা অামাদের অনুমিত ধারণার চেয়েও ঢের দূরে!

কারখানার সিস্টেম ম্যানেজার ত্রান থি জুয়ান জানালেন তিন হাজার ৮৫১ কর্মীর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৯০ শতাংশ। অারও জানানো হলো কর্মীদের মধ্যে ৭৮ শতাংশ এসেছে বিভিন্ন প্রদেশ (হ্যানয় বাদে) থেকে।

অামরা জানলাম, এ কারখানায় মাসে ৬ লাখ ১১ হাজার পিস প্রিন্টার তৈরি হয়। বছরে যার সংখ্যা ৭৩ লাখ ৩২ হাজার।

e645df47-6451-4cf2-9505-659b7150783b

ত্রান থি জুয়ান অারও বলেন, কারখানার নারী কর্মীরা ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেন। প্রয়োজনে ছুটি আরও এক মাস বাড়ানো হয়। গর্ভকালীন সময়ে কোনও নারী কর্মী যেন জটিলতায় না ভোগেন সে কারণে তাদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা হয়।

হ্যানয়ের থাং লং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ক্যাননের এ কারখানায় ইঙ্কজেট, লেজার ও অল-ইন-ওয়ান প্রিন্টার এবং স্ক্যানার উৎপাদন হয়। জানা গেল, ভিয়েতনামে এটিই একমাত্র নয়, এরকম অারও দুটো কারখানা রয়েছে যেখানে প্রিন্টার তৈরি হয়।

ত্রান থি জুয়ান অারও জানান, ভিয়েতনামে ২০০২ সালে ক্যাননের এই কারখানা চালু হয়। শ্রমমূল্য কম এবং ভৌগোলিক অবস্থান সুবিধাজনক হওয়ায় ভিয়েতনামে কারখানা স্থাপন করা হয়েছে।

অার তানিগুচি জানান, এ কারখানায় বর্তমানে প্রতি মাসে ৭০ লাখ পণ্য উৎপাদন হয়। প্রিন্টার ও স্ক্যানারের প্রতিটি অংশই এখানকার বিভিন্ন বিভাগে তৈরি হয়। যন্ত্রগুলোর পিসিবি বোর্ড, চিপস সংযোজন থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের খাপ তৈরি সবকিছুই ধাপে ধাপে হয় এখানে।

অামাদের কারখানার শুরুর প্রান্তে (যেখানে প্রিন্টার তৈরির প্রাথমিক কাজ হয়) নিয়ে যাওয়া হলো। তার অাগে অামাদের পায়ে পরানো হলো বিশেষ মোজা, মাথায় বসানো হলো ক্যানন লোগো খচিত সাদা টুপি।

কারখানায় চোখে পড়ল ৭টি বিভাগ। এর মধ্যে রয়েছে স্ক্রু টাইট দেওয়া, গ্রিজ লাগানো, ক্যাবল ও কানেক্টর, স্প্রিং ঢোকানো, স্টিক পার্টস, প্যাকিং ও ম্যানুয়াল এবং জেনারেল মেশিন বিভাগ। এসব বিভাগের রয়েছে একাধিক উপ-বিভাগ।

একটি প্রিন্টার তৈরি কালে প্রতিটা বিভাগ ঘুরে ঘুরে গিয়েই তবে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রিন্টার তৈরি হয়। যদিও পরিপূর্ণ রূপে বের হওয়ার অাগে রোবটিক যন্ত্র প্রিন্টারগুলো পরীক্ষা করে দেখে সব ঠিকঠাক অাছে কি না।

কারখানায় অামরা দেখলাম হাতে-কলমের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবেও কাজ হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় কাজের জন্য শিল্প-রোবট এবং রোবটিক আর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে।

জিনিসপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার জন্যও রয়েছে রোবট। অথচ বোঝার উপায় নেই। মনে হচ্ছে কে যেন ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কাছে গিয়ে কাউকে ট্রলি ঠেলে নিয়ে যেতে দেখা গেল না। দেখা গেল, ব্যাটারি সদৃশ একটি রোবট ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রলিটির উপরিভাগ নানান যন্ত্রপাতিতে ঠাসা। তবে দেখা গেল, সার্কিট বোর্ড পরীক্ষা করা হচ্ছে নিজেদের তৈরি ক্যানন ক্যামেরাযুক্ত যন্ত্র দিয়ে।

তবে স্ক্রু, আঠা, স্টিকার লাগানো ও সংযোজনের কাজ করছে নারী কর্মীরা। বেশিরভাগ পুরুষ কর্মীদের দেখা গেল বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে ঘুরে দেখছেন কাজকর্ম সব ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা।

১২ ও ৮ ঘণ্টা, এই দুই শিফটে কাজ চলে কারখানায়। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে ক্লান্ত হয়ে গেলে বিশ্রাম নেওয়ারও ব্যবস্থা রয়েছে। কারখানা ঘুরে দেখার সময় চোখে পড়ল কারখানার বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় চৌকি পাতা। সেখানে নারী কর্মীরা ঘুমিয়ে, শুয়ে, বসে গল্প করে বিশ্রাম নিচ্ছেন। অপেক্ষা, ক্লান্ত শরীরটাকে চাঙ্গা করে অাবারও কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া।

প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অামাদের ঘুরিয়ে দেখানো হলো দুই লাখ বর্গমিটার আয়তনের কারখানাটি।

/এইচএএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।