সন্ধ্যা ০৬:২৩ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-১০

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

‘আসরের আজানের সময় তখন কাছাকাছি। এক লোককে দেখলাম উঁচু সিঁড়ি মাড়িয়ে ওপরে উঠতে। জেদ্দায় যে বাসের হেলপার দেখেছিলাম লোকটি প্রায় সেই চেহারার। মুখে দাড়ির সাইজ অনেকটা দুই-তিন দিন শেইভ না করলে যে সাইজের হয় সেই সাইজের। ভাবলাম মাইকের টেকনিশিয়ান জাতীয় কিছু হবে। মুয়াজ্জিনের জন্য মাইক রেডি করতে হয়তো ওপরে উঠছে। এই লোক মাইক রেডি করে রেখে গেলে মুয়াজ্জিন এসে আজান দিবেন। কিন্তু এ কী বেসম্ভব কাণ্ড দেখছি! সেই দাড়িছাঁচা লোকটির মুখ থেকেই ধ্বনিত হতে শুরু করলো মসজিদে নববীর আজান’

পূর্ব প্রকাশের পর এইসব বলতে বলতে ইউসুফ ভাইয়ের হোটেল স্যুট থেকে বের হলাম। নিচে নামতে নামতে ইউসুফ ভাইর সাথে কথা হলো সৌদি আরবের দৈনিক পত্রিকা বিষয়ে। বললাম- সারা মক্কা নগরীতে কোনো নিউজ কর্নার দেখলাম না। হোটেলের টিভিতে খেজুর গাছমার্কা একখানা চ্যানেলই সবসময় চলে তাতে সবসময়ই সরাসরি কাবার সম্প্রচার। ইউসুফ ভাই বললেন- পত্রিকা এখানে পাওয়া যায় সুপারশপে। এই টাওয়ারেরই নিচ তলায় বিন-দাউদ সুপারশপ আছে। সেখান থেকে একটি কেনা যাবে। নিচে নেমে ঢুকলাম বিন-দাউদে। একটিমাত্র ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র পাওয়া গেল। নাম আরব নিউজ। তারিখ ৩০ মার্চ ২০১২। হোটেলে ঢুকে এটি খুলে বসলাম। কিন্তু চোখ বুলিয়ে মনে হলো এতো সংবাদপত্র নয়, ফুল ডিমাই সাইজের ২৮ পৃষ্ঠাব্যাপী একখানা প্রশংসাপত্র। এডেনে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের কাছ থেকে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ছাড়াতে সৌদি সরকারের প্রশংসনীয় কার্যক্রম, প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স সালমান কর্তৃক বাদশাহ আব্দুল্লাহ কালচারাল সেন্টার উদ্বোধন, প্রিন্স আল ওয়ালীদের বিরুদ্ধে আনা যৌন হয়রানির অভিযোগ থেকে স্প্যানিশ কোর্টে কীভাবে মুক্তি মিলেছে তার গাথা, ড. সুলাইমান আল হাবিব হাসপাতালে কাঁধের হাড় পরিবর্তন সার্জারিতে সাফল্য, সাউথ কোরিয়ার সহযোগিতায় বিশাল পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ ইত্যাকার মহা মহা কীর্তি গাথার সংবাদপত্র ‘আরব নিউজ’। পড়লে মনে হবে সৌদি সরকার তার জনগণের জন্য যা করছে তা বেহেশতবাসীদের জন্য ফেরেশতারা যা করবে তার চেয়ে খুব একটা কম নয়। পড়লাম আর ভাবলাম- সংবাদপত্র এতদিন না পেয়েছিলাম তা-ও খারাপ ছিলো না। অবশ্য পুরনো অভ্যাসবশত পরবর্তীতে মদিনায় ৪ এপ্রিল তারিখে আবার এই আরব নিউজের একটি কপি কিনেছিলাম। এবারও সেই বিন-দাউদ থেকেই। তবে এটিতে একটি আশার সংবাদ দেখলাম। ব্যাক পেইজে বড় একটি শিরোনাম: Criteria Set for Oskar Poet Prize. দেখেই চমকে উঠলাম। মক্কা কি তাহলে তার সাহিত্যের একটি পুনরুজ্জীবনের কথা ভাবছে! তাইতো দেখা যাচ্ছে। গত ছয় বছর ধরে মক্কার গভর্নর ইসলাম-পূর্বসময়ে অনুষ্ঠিত ওকাজ মেলা আবার শুরু করেছে। সেই প্রাচীনকালে তায়েফের একটি স্থানে ওকাজ মেলা হতো। সেখানে বিশাল হেজাজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ক্রয়বিক্রয়ের জন্য আসতো। বাণিজ্যিক এই মিলন মেলায় সংস্কৃতিক আয়োজন থাকতো। থাকতো সাহিত্য প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় যে প্রথম হতো তার কবিতাটি প্রথম স্থান অর্জনের সম্মানস্বরূপ কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো। মুয়াল্লাকা শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘যা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে’। পরবর্তীতে হামাদ আর রাইয়া নামের একজন কবি ও পণ্ডিত সেই ঝুলানো কবিতা থেকে সাতটি বেছে নিয়ে একটি পুস্তিকায় রূপ দেন যার নাম সাবা মুয়াল্লাকা। আরবী চিরায়ত সাহিত্যের উদাহরণ হিসেবে এই গ্রন্থের নাম বিশ্বব্যাপী সুবিদিত। গ্রন্থনাম ‘সাবা মুয়াল্লাকা’ শব্দকে বাংলায় অর্থ করলে দাঁড়ায়- কাবায় ঝুলানো সাতটি কবিতা। কাবায় ঝুলানো কবিতার মধ্য থেকে এই গ্রন্থের উৎপত্তির সাথে জড়িয়ে আছে তায়েফের ওকাজ মেলা। কারণ, এর প্রতিটি কবিতাই ওকাজ মেলায় পাঠের জন্য লিখিত হয়েছিলো। ওহাবী অকিদার সৌদি আরবে সেই ওকাজ মেলার পুনঃপ্রচলনের সংবাদ দেখে তাই সত্যিই আমার চক্ষু ছানাবড়া। প্রতিবেদনটিতে দেখা গেল জেদ্দায় মক্কার গভর্নর প্রিন্স খালেদ আল ফয়সালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে- এখন থেকে ওকাজ মেলায় ৬টি বিভিন্ন বিষয়ে পুরস্কার প্রদান করা হবে: সাহিত্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ক্যালিওগ্রাফি, ফটোগ্রাফি, হস্তশিল্প এবং ফোকলোর বা ফোকআর্ট। এর মধ্যে সাহিত্যে প্রদত্ত পুরস্কারের সম্মানমূল্য ৩ লক্ষ রিয়াল এবং অন্য কোনো বিষয়েই পুরস্কারের মূল্যমান ১ লক্ষ রিয়ালের কম নয়। ছয় বিষয়ের মধ্যে সাহিত্যে রয়েছে দুটি পুরস্কার এবং হস্তশিল্পে রয়েয়ে চারটি পুরস্কার। এই পুরস্কারই শেষ নয়। সভায় আরো সিদ্ধান্ত হয়েছে ক্ল্যাসিক সাহিত্যিক আন্তারা বিন শাদ্দাদের জীবন ও কর্ম উপজীব্য করে এই মেলায় একটি নাটকও মঞ্চায়িত হবে। মেলায় নারী পুরুষের সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ আরো দুই বছর আগে থেকেই প্রবর্তিত হয়েছে। পুরো ব্যাপারটাই কেমন তালগোল পাকিয়ে দেয়ার। পশ্চিমা জগতে ফিলিস্তিন শব্দটা যেমন মূর্খ, স্থুল ও গোঙা জাতীয় কাউকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (বাইবেলের এতদরূপ বয়ানের কারণে), ওহাবী উত্থানের পর হতে মুসলিম জগতেও ‘আরব’ বলতে এমন একটা অর্থ প্রায় প্রচলিত হয়ে উঠেছে। এতদিন মক্কায় ঘুরে আরবদেরকে যেভাবে দেখেছি (অধ্যাপক মিসয়ালের বাসা ব্যতিরেকে) তাতে আমার কাছেও ‘আরব’ শব্দের এই অর্থ খুব অবান্তর মনে হয়নি। কিন্তু ৪ এপ্রিল ২০১২ তারিখের আরব নিউজে এই খবর পড়ে একটু ধাক্কা লাগলো। এই ধাক্কা আমার পূর্বাপর চিন্তাগুলো যেন একটু নড়িয়ে চড়িয়ে দিলো। বলা বাহুল্য, এই নড়াচড়ার আগেই আমরা নড়েছিলাম মক্কা থেকে মদিনার দিকে।

জ্যাম নেই, ঝাঁকি নেই, কোনো গাড়ির হর্নও নেই। দেখতে দেখতে মক্কা নগরী দূরে মিলিয়ে গেল। সুউচ্চ ক্লক টাওয়ারটিও মিলিয়ে গেল দিগন্তে। বাবা ওদিকেই তাকিয়ে থাকলেন। আমার হয়তো আশা আছে আমি আবার আসবো। বাবা শেষ বিদায় জানালেন। রসুলের জন্মভূমি, ইব্রাহীম (আঃ) এর নির্মিত পবিত্র কাবার ভূমি, সারা বিশ্বের মুসলমানের হৃদয়ে স্থান-নেয়া সবচেয়ে পবিত্রভূমি মক্কাকে বাবা চোখের পানিতে বিদায় জানালেন

মক্কা থেকে মদিনার দিকে যাত্রার দিনটা সম্ভবত রোববার ছিল। সকাল ৯ টার দিকে হোটেল হেরার সামনেই বাস দাঁড়ালো। আমরা জমজমের পানি ও পুরনো বোঝাটুকুসহ উঠলাম বাসে। আমার বাবা বাসে এসি’র বাতাসে সারা পথ অস্বস্তি প্রকাশ করে চললেন। মাথার ওপরে এসি’র বাতাস নিয়ন্ত্রণে যে ডিভাইস তা নাড়িয়ে-চাড়িয়ে যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা গেল তা দিয়ে তার অস্বস্তি ও উষ্মা প্রকাশের চিরকালীন শব্দ ‘ধোৎতোমাইর‌্যা’ থেকে আমার মুক্তি জুটলো না। রাস্তা সম্পূর্ণ মসৃণ ও নির্ঝঞ্ঝাট। জ্যাম নেই, ঝাঁকি নেই, কোনো গাড়ির হর্নও নেই। দেখতে দেখতে মক্কা নগরী দূরে মিলিয়ে গেল। সুউচ্চ ক্লক টাওয়ারটিও মিলিয়ে গেল দিগন্তে। বাবা ওদিকেই তাকিয়ে থাকলেন। আমার হয়তো আশা আছে আমি আবার আসবো। বাবা শেষ বিদায় জানালেন। রসুলের জন্মভূমি, ইব্রাহীম (আঃ) এর নির্মিত পবিত্র কাবার ভূমি, সারা বিশ্বের মুসলমানের হৃদয়ে স্থান-নেয়া সবচেয়ে পবিত্রভূমি মক্কাকে বাবা চোখের পানিতে বিদায় জানালেন। এই বিদায়ের ব্যথা মুছতে না মুছতেই বাসটি মাঝপথে দাঁড়ালো। দাঁড়ালো একটি হাইওয়ে রেস্টুরেন্টের সামনে। ঢাকা-চট্টগ্রামের অনেক হাইওয়ে রেস্টুরেন্টের চেয়েই এটিকে জৌলুসে বেশ নিচু মনে হলো। এই জৌলুসহীনতায় মনে করতে পারলাম আমাদের দেশেও কিছু না কিছু আছে যা এই ধনী দেশের তুলনায় ঐশ্বর্যময় এবং জৌলুসপূর্ণ। আর এই সুখানুভব সারা রাস্তা জুড়ে ছিল ডানে বায়ে সব দিকে তাকিয়ে। কারণ ডানে বাঁয়ে যেদিকেই তাকিয়েছি একটু সবুজের আঁচড় সহজে চোখে পড়েনি। শুধু ধূ ধূ মরুভূমি আর মাঝে মাঝে প্রাণহীন ইটের দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইমারত দিয়ে স্থাপিত ছোটোখাটো বাজার বা শহর। যতোটা মনে পড়ে আমরা শেষ জোহর গিয়ে মদিনায় মসজিদে নববীতে পড়লাম। এবারের হোটেল মক্কা থেকে ঠিক করা। বাস থেকে যেখানে নামলাম সেখানেই কম টাকায় ভালো হোটেলের খোঁজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম অনেক বাঙালি দালাল। সেইসব দালাল পাশ কাটিয়ে আমরা হোটেলে এসে পৌঁছলাম। রিসেপশন রুমের জৌলুস দেখে হোটেলটিকে পুরো থ্রিস্টার মানের মনে হলো। কিন্তু মূলরুমে গিয়ে অতো জৌলুস আর টিকলো না। তারপরও একেবারে খারাপ লাগলো না। এমনকি আমাদের ইউসুফ ভাই যাকে সন্তুষ্ট হতে খুব কম দেখেছি তাকেও হোটেল বিষয়ে এবার অসন্তুষ্ট মনে হলো না। হোটেল থেকে মসজিদে নববী পর্যন্ত হেঁটে যেতে চার-পাঁচ মিনিট লাগে। কাবা শরীফের স্থাপনা এবং তার এক্সটেনশন যতটা অপরিকল্পিত ও অগোছালো মনে হয় মসজিদের নববীর স্থাপনা ও এক্সটেনশন অতোখানিই সুপরিকল্পিত ও সুসজ্জিত মনে হলো। কাবা শরীফের মাতাফের বাইরে এক এক বাদশার নামে নির্মিত এক্সটেনশন দেখে মনে হয় বাদশা কাবার সৌন্দর্য বৃদ্ধির চেষ্টার চেয়ে তার নিজ নির্মাণের মাহাত্ম্য ও জৌলুস প্রমাণেই বেশি ব্যস্ত। একদিকে বাদশাহ আবদুল্লাহর এক্সটেনশন, একদিকে বাদশাহ আবদুল আজিজের এক্সটেনশন, আরেকদিকে বাদশাহ ফাহাদের এক্সটেনশন। বলতে গেলে যতো বাদশাহ ততো এক্সটেনশন। মনে হয় কাবার পিঠ পাজড়া কোল এর মধ্যে যে-বাদশাহ যেখান থেকে পেরেছে ধরে টান দিয়ে নিজ নামে এক একখানা জৌলুসময় এক্সটেনশন সম্পন্ন করেছেন। এভাবে কাবার চতুষ্পার্শ্বে হঠাৎ হঠাৎ এক এক জায়গা দিয়ে কোলঘর পিঠঘর ইত্যাদি বেরিয়ে বেরিয়ে পুরো কাবা চত্বরকে এক কিম্ভূত রূপে দাঁড় করিয়েছে। আবার গেটগুলো যেসব নাম নিয়ে দাড়িয়ে আছে জৌলুস ও ঐশ্বর্য দ্বারা সেসব নামের মর্যাদাও সঠিক মাত্রায় রক্ষিত হচ্ছে না। জৌলুসের দিক দিয়ে আব্দুল্লাহ গেটের সাথে হযরত ওমর (রা.) গেট কিংবা হযরত আলী (রা.) গেটের তুলনা করলে মনে হয় বাদশাহ আব্দুল্লাহর তুলনায় হজরত ওমর কিংবা আলী অত্যন্ত দীনহীন নাদান কোনো ব্যক্তিত্ব। জৌলুস ও ঐশ্বর্যে শ্রেষ্ঠ গেটটি যেখানে বাদশাহ আবদুল্লাহর নামে সেখানে একটি অপ্রশস্ত মলিন গুরুত্বহীন গেট হজরত আলী (রা.) কিংবা হজরত ওমরের (রা.) নামে হলে সেটি কি হজরত আলী কিংবা ওমরকে অপমানের শামিল হয় না? এইটুকু বোধ বাদশাহ আবদুল্লাহর পরিবারে আছে বলে মনে হয় না। এই অসঙ্গতির কিছুই মসজিদে নববীতে নেই। মসজিদে নববীর পুরো কাঠামো অসাধারণভাবে পরিকল্পিত। কতটা পরিকল্পিত তা এর বহিরাঙ্গের ছাতাগুলোর দিকে তাকিয়েই বোঝা যায়। ছাতাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায় এবং একটির স্থানে আরেকটি এমনভাবে মিলে যায় যে, বিন্দু পরিমাণ ফাঁকা থাকে না। আবার যখন ছাতাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুটিয়ে যায় তখন বর্গবিন্যাসে সুদৃশ্য কতিপয় কলাম আকারে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার মসজিদের আন্ডার গ্রাউন্ডে বাথরুম ও অজুখানার আয়োজন পার্কিং সবই চমৎকার পরিকল্পনায় নির্মিত। মসজিদের নববীর পরিকল্পনা আর কাবা শরীফের অপরিকল্পিত এক্সটেনশন দেখে মনে হয় না এই দুই পবিত্র স্থানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এক ও অভিন্ন। অবশ্য ২০২০ সালে সমাপ্য কাবা সম্প্রসারণ পরিকল্পনার যে সামান্য অংশ লিক-আউট হওয়ায় ইউটিউবের মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে থ্রিডি সেই ভিডিও দেখে মনে হয়েছে ২০২১ সালে কাবার দিকে তাকিয়ে কাবার বর্তমান এক্সটেনশনাদি নিয়ে ওপরের মন্তব্য বিষয়ে আমাকে যথেষ্ট লজ্জিত হতে হবে। এই সম্প্রসারণের নকশায় নিয়োজিত বৃটিশ প্রকৌশলী নরমান ফস্টার ও ইরাকি প্রকৌশলী জাহা হাদিদের মস্তিষ্ক থেকে এমন নিখুত পরিকল্পনা প্রসুত হোক এটাই কামনা।

এখানে স্থাপত্য বিষয়ক শ্রী-বিশ্রী নিয়ে এমন কথাবার্তা খুব জরুরি কি? স্থাপত্য সৌন্দর্যের প্রতি এমন বস্তুবাদী চোখ পড়া এই জায়গাগুলোয় হয়তো ঈমান-আমানের সাথে মোটেই খুব ভালো যায় না। এটি তো চোখের সৌন্দর্যের জায়গা নয়। এটিতো রূহানী সৌন্দর্যের জায়গা। সেই সৌন্দর্যই এখানে ভক্তদেরকে আচ্ছন্ন করে রাখে

এতক্ষণ যা বললাম একদিক দিয়ে বিবেচনায় এগুলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথাই হতে পারে না। মক্কা-মদিনা তো মুসলমানদের জন্য আধ্যাত্মিক নান্দনিকতার জায়গা। এখানে স্থাপত্য বিষয়ক শ্রী-বিশ্রী নিয়ে এমন কথাবার্তা খুব জরুরি কি? স্থাপত্য সৌন্দর্যের প্রতি এমন বস্তুবাদী চোখ পড়া এই জায়গাগুলোয় হয়তো ঈমান-আমানের সাথে মোটেই খুব ভালো যায় না। এটি তো চোখের সৌন্দর্যের জায়গা নয়। এটিতো রূহানী সৌন্দর্যের জায়গা। সেই সৌন্দর্যই এখানে ভক্তদেরকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কাবা শরীফের সেই সৌন্দর্যের নাম হুসনে জালালিয়াত, আর মসজিদে নববীতে সেই সৌন্দর্যের নম হুসনে জামালিয়াত। হুসনে জালালিয়ত হলো সেই সৌন্দর্য যা ভক্তের হৃদয়ে ভক্তির এবং আল্লাহর মহিমা উপলব্ধির এক তেজস্বী উন্মাদনা সৃষ্টি করে। সে উন্মাদনায় ভক্তরা এবাদতে- তাওয়াফে এমন জজবায় পৌঁছে যায় যে, সে খাওয়া দাওয়া ঘুম সব প্রায় ভুলে যেতে বসে যায়। অস্থির দুনিয়া ও আখিরাতের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক থেকে নিষ্পাদিত তৃতীয় অনুভবরূপে এশকে মাহবুবের এক অস্থিরতা দেহমন জুড়ে বিরাজ করতে থাকে। এর বিপরীতে মসজিদে নববীর হুসনে জামলিয়াত হলো রূহানি জগতে এক স্থির প্রশান্তির সৌন্দর্য। ঈপ্সিত সুন্দর ও মহামহিমের কাছে পৌঁছে গিয়ে যে পরিতৃপ্তির অনুভব অর্জিত হয় সে অনুভব এখানে পূর্ণতা ঘটে। তাই এখানে অস্থিরতা নেই, আছে স্থিরতার প্রশান্তি। এক উত্তেজনাবিহীন আনন্দের উদ্ভাস। এই উত্তেজনাহীন প্রশান্তির মাঝে একটু অস্থিরতা লাগলো ভিন্ন একটি অসঙ্গতি নজরে পড়ায়। আমরা মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন কিংবা মাদ্রসার ছাত্র-শিক্ষকদেরকে মনে করতে চাই এমন ফেরেশতা-জাতের মানুষ যে তারা সুন্নতের খেলাফ কিছু করতে বা ভাবতে পারে না। তাদের মাঝে সুন্নতের খেলাফ কিছু দেখলে আমরা ছি ছি করে উঠি। হাটহাজারীস্থ মেখল মাদ্রাসার একছাত্র একবার দাড়ি সুন্নতী মাপে এক মুঠো পরিমাণের চেয়ে খাটো করায় তাকে সবার সামনে মাঠে নামিয়ে এমন গরু-পিটান পিটানো হয়েছিল যে তা দেখে অনেকেরই চেখে পানি এসে গিয়েছিলো। দাড়ি সুন্নতি মাপের চেয়ে খাটো করা কতটা অন্যায় ঐ ঘটনা থেকে সে বিষয়ে এক বেজায় ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। সেই ধারণা নিয়ে মসজিদে নববীতে এক মুসিবতের মধ্যে পড়ে গেলাম।

এই বেত নে, আমি তোরে খাটো দাড়ির জন্য সেদিন তোরে যেভাবে পিটিয়েছিলাম আমার এই বেহুদা লম্বা দাড়ির জন্য আজ আমারে সেভাবে পিটিয়ে সেদিনের পিটানোর বদলা নে। অস্থিরভাবে এসব ভাবছিলাম

মসজিদে নববীতে যেখান থেকে আজান দেয় সেই জায়গাটা ইমাম সাহেবের দাঁড়ানোর মেহরাব এরিয়া থেকে অনেক পেছনে। জায়গাটা একটু উঁচু। সিঁড়ির মতো কয়েকটি ধাপ মাড়িয়ে উঠতে হয়। এই উঁচু আজানের জায়গাটির নিচে বেশ কিছুখানি এলাকা মসজিদের মধ্যে খুবই ফজিলতি জায়গা। এর নাম রিয়াজুল জান্নাহ্। মসজিদের এই অংশটুকুকে সহজেই আলাদা করে চিনে নিতে এই অংশের কার্পেটের রং সবুজ রাখা হয়েছে। এই জায়গাটুকু জোহরের পর কিছু সময় মহিলাদের জন্য ঘের দিয়ে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। সম্ভবত আসরের ঘণ্টা খানেক আগে এটি আবার পুরুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এসময় পুরুষদের এখানে ঢোকার হুড়োহুড়ি লেগে যায়, সেই হুড়োহুড়িতে ঢুকে জায়গা পেলাম যেখানটায় ঠিক তার ওপরেই উক্ত আজানের জায়গা। ফলত ঐ আজানের জায়গার নিচে বসেই আল্লাহ-বিল্লাহ করছি। আসরের আজানের সময় তখন কাছাকাছি। এক লোককে দেখলাম উঁচু সিড়ি মাড়িয়ে ওপরে উঠতে। জেদ্দায় যে বাসের হেলপার দেখেছিলাম লোকটি প্রায় সেই চেহারার। মুখে দাড়ির সাইজ অনেকটা দুই-তিন দিন শেইভ না করলে যে সাইজের হয় সেই সাইজের। ভাবলাম মাইকের টেকনিশিয়ান জাতীয় কিছু হবে। মুয়াজ্জিনের জন্য মাইক রেডি করতে হয়তো ওপরে উঠছে। এই লোক মাইক রেডি করে রেখে গেলে মুয়াজ্জিন এসে আজান দিবেন। কিন্তু এ কী বেসম্ভব কাণ্ড দেখছি! সেই দাড়িছাঁচা লোকটির মুখ থেকেই ধ্বনিত হতে শুরু করলো মসজিদে নববীর আজান। তিনি মোটেই বাস হেলপার বা টেকনিশিয়ান জাতীয় কিছু নন। তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ মসজিদ- পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের জিগরি-মহব্বত ও তামান্নার মসজিদ- মসজিদে নববীর মহান মুয়াজ্জিনদের একজন। যে-মসজিদে আজান দিতেন হযরত বেলাল (রাঃ) সেই মসজিদে আজ আজান দেন এমন এক দাড়িছাঁচা এক মুসলমান। দেখে মনটার মধ্যে অস্থিরতার এক কঠিন ধাক্কা লাগলো। ভাবলাম মেখল মাদ্রাসার সেই গহীরার হুজুর যিনি তার ছাত্রকে দাড়ি এক মুঠোর চেয়ে ছোট করার কারণে দুই হাত লম্বা বেত দিয়ে গরু পিটান পিটিয়েছিলেন, তিনি যখন হজ্জ করতে এসে মসজিদে নববী তথা নবীজির রওজা মোবারক জিয়ারতে আসবেন এবং দেখবেন মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিনের দাড়ির এই হাল, তিনি কি সেদিন স্থির করবেন যে, দেশে ফিরে গিয়ে ঐ ছাত্রকে সারাদেশ খুঁজে হলেও বের করে তার কাছে মাফ চাইবেন? কিংবা তিনি কি সারাদেশ খুঁজে বের করে ঐ ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বলবেন- ‘মসজিদে নববীর মুয়াজ্জিনের দাড়ির ঐ সাইজ অথচ আমার দাড়ি এত লম্বা, সুতরাং নে, এই বেত নে, আমি তোরে খাটো দাড়ির জন্য সেদিন তোরে যেভাবে পিটিয়েছিলাম আমার এই বেহুদা লম্বা দাড়ির জন্য আজ আমারে সেভাবে পিটিয়ে সেদিনের পিটানোর বদলা নে। অস্থিরভাবে এসব ভাবছিলাম। আর এ অস্থিরতার সাথে ধীরে ধীরে মদিনার দিনগুলোতে যোগ হচ্ছিলো আরো অনেক প্রসঙ্গ। (চলবে) আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন- যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৯ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৮ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৭ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৬ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৫ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৪ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৩ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-২ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-১

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।