সকাল ০৯:৩৭ ; রবিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৮  

হাইটেক পার্ক কত দূর...

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম॥

দেশের একমাত্র হাইটেক পার্কের জন্য প্রযুক্তিপ্রেমীদের অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। মাসের পর মাস এমনকি বছরও (অন্তুত ৩ বছর) পার হয়ে যাচ্ছে, তবু ঠিক হচ্ছে না 'কে' নির্মাণ করবে হাইটেক পার্ক।

৩ বছর অাগে একবার গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করে প্রায় শেষ করে অানা হয়েছিল। কিন্তু এক 'রহস্যময়' কারণে ৩ বছর পর অাবার গোড়া থেকেই কাজ শুরু করা হচ্ছে।

এতদিন পর জানা গেল, বর্তমানে অারএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। ২টি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র মূল্যায়ন শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে অারা বেগম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'হাইটেক পার্ক নির্মাণের ইতিবাচক অগ্রগতির পথে রয়েছি অামরা। এখন অারএফপি মূল্যায়নের শেষ পর্যায়ের কাজ করছি।'

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ২৩২ একর জমির ওপর দেশের প্রথম হাইটেক পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। পরে অবশ্য পার্কে নতুন করে অারও প্রায় ১০০ একর জমি যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি বলতে প্রকল্প এলাকায় সরকারের ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করা হয়েছে প্রশাসনিক ভবন, পার্কের ভেতরের রাস্তা, গেটওয়ে, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) পার্কে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা চালু, বিদ্যুৎ বিভাগ পার্কের পাশে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া ঢাকা থেকে হাইটেক পার্কে শাটল ট্রেন চালুর উদ্যোগের কথাও শোনা গেছে।

এদিকে গত অাগস্ট মাসে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (অাইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ অাহমেদ পলকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মালয়েশিয়ার বিভিন্ন হাইটেক পার্ক পরিদর্শনে যান।

এ সময় প্রতিনিধি দল টেকনোলজি পার্ক মালয়েশিয়া, কুলিম হাইটেক পার্ক, সেনাই হাইটেক পার্ক এবং সাইবার জায়া পরিদর্শন করেন এবং এসব পার্কের অবকাঠামো, নির্মাণ, বাণিজ্যিক সুযোগ সুবিধা, প্রযুক্তিপণ্য নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানদের উন্নয়ন এবং গবেষণা কেন্দ্র ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জুনাইদ অাহমদে পলক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অামাদের অভিজ্ঞতা ভালো। কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক নির্মাণ বিষয়ে একটা ভাসা ভাসা অবস্থায় ছিলাম। ওইসব পার্ক পরিদর্শন করে স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছি। অাশা করছি এ অঞ্চলের মধ্যে অামরাই সবচেয়ে ভালো হাইটেক পার্ক তৈরি করতে পারব।

ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি এএইচএম মাহফুজুল অারিফ। তিনি বললেন, মালয়েশিয়ার ওইসব হাইটেক পার্ক যদি অামরা অাদর্শ ধরি, তাহলে অামাদের পক্ষে ওদের চেয়ে ভালো পার্ক তৈরি করা সম্ভব। সরকার ওই পথেই হাঁটছে।

এর অাগে ২০১১ সালে হাইটেক পার্ক নির্মাণের জন্য সরকার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলে দেশি-বিদেশি ১৫টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তবে দুটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত পর্যায়ে অংশ নেয়। কিন্তু হাইটেক পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু হতে না হতেই জটিলতা দেখা দেয়। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে কম নম্বর পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে বিষয়টি উচ্চ অাদালত পর্যন্ত গড়ায়। ফলে প্রথমবারের অাহ্বান করা দরপত্রের মাধ্যমে অার হাইটেক পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কেটিপিসি দেশের এসপিএল, আইওই ও কেএইচএলের সঙ্গে একটি কনসোর্টিয়াম করে টেন্ডারে অংশ নিয়ে হাইটেক পার্ক নির্মাণের জন্য মনোনীত হয়।

কিন্তু পার্ক তৈরির আগেই নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়াত্ত্ব প্রতিষ্ঠান কুলিম টেকনোলজি পার্ক কর্পোরেশন (কেটিপিসি) টেন্ডারের মাধ্যমে মনোনীত হওয়ার পরও বাংলাদেশের এসআইএমসিএল নামের দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে (কনসোর্টিয়াম) ‘মানবিক’ কারণ দেখিয়ে হাইটেক পার্কের একটি অংশ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করলে কেটিপিসি কনসোর্টিয়াম অাপত্তি তোলে।

হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, দরপত্র বাছাই এবং কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে প্রথম হয় কেটিপিসি-এসপিএল-আইওই-কেএইচএল কনসোর্টিয়াম (৮৯ দশমিক ২৯ নম্বর)। অন্যদিকে এসআইএমসিএল কনসোর্টিয়াম পায় পায় ৭৭ দশমিক ৯৩ নম্বর। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটি কম নম্বর পেয়েও হাইটেক পার্ক নির্মাণের কাজ চায়।

জানা যায়, মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান যাদের হাইটেক পার্ক নির্মাণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের (কুলিমকে) বাদ দিতে (টেন্ডারে মনোনীত হওয়ার পরে) কেটিপিসি-এসপিএল-আইওই-কেএইচএল কনসোর্টিয়ামের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক ডিফল্টার কিনা তা জানার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেয় হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ।

কনসোর্টিয়াম জবাব পাঠানোর পরে আবারও চিঠি পাঠানো হয় এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ডিফল্টার কিনা সে সম্পর্কে জানতে। চিঠির সব ধরনের জবাবও পাঠায় কুলিম কনসোর্টিয়াম। এসব বিষয়কে অনৈতিক আখ্যা দিয়ে কনসোর্টিয়ামের মুখপাত্র সাদী আবদুল্লাহ বলেন, সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আমরা কাজ পেয়েছিলাম। ঠুনকো অজুহাতে পরে আমাদের কাজ দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে হাইটেক পার্কের এই প্রকল্প প্রস্তাবনা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হলে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে অাইন মন্ত্রণালয় তা অাইসিটি মন্ত্রণালয়ে (বর্তমানে বিভাগ) ফেরত পাঠায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব অনিয়মের তথ্য জানতে পেরে অাইন মন্ত্রণালয় তা ফেরত পাঠায়।

অন্যদিকে হাইটেক পার্ক নিয়ে এসব কারসাজির খবর মালয়েশিয়ার বার্তা সংস্থা বারনামার বরাত দিয়ে সে দেশের সংবাদপত্রে ছাপা হলে সার্বিক অবস্থা নিয়ে সে সময় অসন্তোষ প্রকাশ করে মালয়েশীয় সরকার।

এর পরে হাইটেক পার্ক নিয়ে উচ্চ অাদালতে একটি রিট হয়। ওই রিটের কারণে দীর্ঘদিন হাইটেক পার্কের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। উচ্চ অাদালতে রিটটি নিষ্পত্তি হওয়ার পরে অাবারও নতুন করে (অাগের সব কিছু বাদ দিয়ে) হাইটেক পার্কের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

/এইচএএইচ/এফএ

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।