রাত ০৯:৪৫ ; বৃহস্পতিবার ;  ২০ জুন, ২০১৯  

বাংলাদেশি সাফিয়াকে দুবাই টিভির মরণোত্তর সম্মাননা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আহসান কবীর॥ আবুধাবির সমুদ্র সৈকতে ডুবন্ত চার শিশুকে প্রাণে বাঁচানো বাংলাদেশি গৃহকর্মী সাফিয়াকে মরণোত্তর সম্মান জানিয়েছে দুবাই টিভি। মারা যাওয়ার আগে সাফিয়ার উদ্ধার করা ওই চার শিশু ও তাদের অভিভবাকদের এ উপলক্ষে সম্প্রচারিত টিভি অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করা হয়। আরব আমিরাত প্রবাসী সাফিয়া মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই চার শিশুর একজনের পরিবারে গৃহকর্মীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। উপস্থাপক অনুষ্ঠানের শুরু করেন এভাবে... মনিবের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি (সাফিয়া) নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। উপস্থাপক তার বক্তব্যে সাফিয়ার ঘটনাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে পবিত্র কোরআনের সুরা আর রাহমানের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন ('হাল জাজাউল এহসান ইল্লাল এহসান' অর্থাৎ সৎকাজের প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে?) এসময় উপস্থাপক আরও বলেন, সাফিয়ার আত্মত্যাগের এই ঘটনা আরব আমিরাতে গৃহকর্মীদের বিরুদ্ধে বিরাজমান অভিযোগগুলোর বিপরীত চিত্রই উপস্থাপন করে। Brave-Safia-Edited প্রসঙ্গত, আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিদেশি গৃহপরিচারিকাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের পাশাপাশি মনিব পরিবারের বিরুদ্ধে গৃহকর্মীদের করা হত্যাসহ নানা অপরাধের কাহিনী খুবই পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্যের মিডিয়ায় এ ধরনের খবরও দেখা যায় যে, গৃহকর্মীরা মনিবের পরিবারের ওপর কালো যাদুর চর্চাও করছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশুগুলো বয়ান করে সাফিয়া তাদের চিৎকার শুনে কিভাবে পাগলের মতো ছুটে গিয়ে তাদের ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন। একটি শিশু বলে, 'তিনি আমাদের একের পর এক পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন কিন্তু প্রবল ঢেউ তাকে কেড়ে নেয়!' ওই ঘটনার আগে শিশুগুলো আরব সাগর তীরবর্তী আবুধাবি শহরের দাবিয়া সৈকতে খেলা করছিল। খেলতে খেলেতে একপর্যায়ে তারা সাগরে নেমে পড়ে। গত বৃহস্পতিবার আরব আমিরাতের অনলাইন পত্রিকা এমিরেটস২৪/৭ এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানায়, ডুবন্ত শিশুদের ভয়ার্ত চিৎকার শুনে সাফিয়া ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সাগরে। এরপর একে একে চারটি শিশুকেই উদ্ধার করে তীরে তাদের স্বজনদের হাতে তুলে দেন। এ কাজ করিতে গিয়ে প্রবল হয়ে ওঠা উত্তাল সাগরের সঙ্গে লড়ে তিনি মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়েন। তারপরও চারজনকেই উদ্ধার না করে থামেননি তিনি। শেষ শিশুটিকে স্বজনদের হাতে তুলে দিয়েই যেন নিস্তেজ হয়ে পড়েন তিনি। আবু আব্দুল্লাহ নামের এক আমিরাতি, যিনি ওই চার শিশুর একজন আব্দুল্লাহর পিতা, সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘আমি সৈকতে এসে দেখি প্রবল স্রোত এড়িয়ে সাফিয়া প্রাণপনে স‌‌‌াঁতরে পাড়ে আসার চেষ্টা করছেন… তিনি বারবার ডুবে যাচ্ছিলেন আবার পরক্ষণেই ভেসে উঠছিলেন। একপর্যায়ে আমরা তাকে পাড়ে টেনে তুলতে সক্ষম হই, কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি প্রাণ ত্যাগ করেন।‘ বাঙালি নারীর আত্মত্যাগে মুগ্ধ ওই আমিরাতি কৃতজ্ঞ কণ্ঠে আরও বলেন, ‘তিনি আমার ছেলে ও তার তিন সঙ্গীর প্রাণ বাঁচিয়ে খুবই বীরত্বের কাজ করেছেন। এই নারীর কাছে আমরা সবাই ঋণী আর তাঁর মৃত্যুতে শোককাতর হয়ে পড়েছি।‘ সাফিয়ার নিজের প্রাণ দিয়ে উদ্ধার করা ওই শিশুগুলোর বয়স ছয় থেকে দশের মধ্যে। আবু আব্দুল্লাহর পরিবারের সঙ্গে গত চার বছর ধরে ছিলেন সাফিয়া। তিনি জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন সাফিয়া। কিন্তু তা আর হলো না। চোখেমুখে গভীর শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি নিয়ে আবু আব্দুল্লাহ আরও বলেন, ‘তিনি খুবই সাহসী ছিলেন এবং আমাদের সন্তানদের জন্য কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই তার প্রাণ কোরবান করলেন। এই দুঃসাহসিক আর মানবিক কাজে সাফিয়া তার নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন!’ আবু আব্দুল্লাহ জানান, এরইমধ্যে বাংলাদেশে সাফিয়ার পরিবারে সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তিনি। মরদেহ শিগগিরই দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে কোন এলাকায় তার বাড়ি সংবাদ মাধ্যম তা জানায়নি। তিনি আরও জানান, যেসব পরিবারের সন্তানদের সাফিয়া রক্ষা করেছেন তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে যাতে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য সম্মানজনক একটি তহবিল সংগ্রহ করে পাঠানো যায়। এ প্রসঙ্গে আবুধাবিতে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক খোকন হক বাংলা ট্রিবিউনকে টেলিফোনে জানান, এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশিদের নয়, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত সব দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের মুখকে উজ্জ্বল করেছে। সাফিয়ার জন্য বাংলাদেশিরা গর্ব অনুভব করছে। দূতাবাসের উচিৎ বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করা। দুবাই প্রবাসী সাংবাদিক আব্দুল্লাহ অাল মামুন বলেন, প্রবাসে আমাদের সবাইকে হেয় নজরে দেখে। বাংলাদেশিদের ছোটখাট খারাপ কাজগুলোকে বিশাল করে ছাপায় এখানকার মিডিয়া। বাংলাদেশিদের ভালো কোনও খবর প্রচার করে না। এতে ভূমিকা রাখে ভারত-পাকিস্তান প্রভাবিত এখানকার মিডিয়াগুলো। তাই সাফিয়ার ঘটনাও যতটা গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ, তা পায়নি। এ নিয়ে আমাদের কাজ করা উচিৎ'। সৌদি আরব প্রবাসী সাংবাদিক আল আমিন বলেন, 'সাফিয়ার অসাধারণ আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং আরবদের এটা সব সময় মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য দূতাবাসের উচিৎ তার নামে কিছু একটা করার উদ্যোগ নেওয়া। সৌদি আরব প্রবাসী সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আল আমিন আরও বলেন, 'বাংলাদেশি সবার উচিৎ এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে পান থেকে চুন খসলেই বাংলাদেশিদের বেকায়দায় পড়তে হয় অন্যদের চেয়ে বেশি। এখন এই ইতিবাচক ঘটনাকে তুলে ধরতে হবে।' উপসাগরের অপর তেলসমৃদ্ধ দেশ কুয়েত প্রবাসী মিজান আল রহমান বলেন, 'ওই দেশটির মিডিয়া এবং সরকারি মহলে সাফিয়া প্রসঙ্গ তাজা থাকতে থাকতে তাদের কাছে জোরালোভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা খুবই দরকার। কুয়েত সিটির চ্যাম্পিয়ন হেল্থ গ্রুপ ও হেল্থ ক্লাবের অপারেশন টিম লিডার মিজান আরও বলেন, 'সাফিয়ার মতো ঘটনা ভারত, পাকিস্তান এমনকি শ্রীলঙ্কার কোনও নাগরিক করলে তারা তার সুফল অনেকভাবে তুলতো নিজেদের দেশের শ্রমিকদের স্বার্থে। সুতরাং আমাদেরও তা করা উচিৎ।' /একে/এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।