রাত ১০:১৮ ; শনিবার ;  ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯  

তারা জাতির সামনে মিথ্যাচার করছে: মুসা ইব্রাহীম

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

এভারেস্টজয়ী প্রথম বাংলাদেশি মুসা ইব্রাহীম। ২০১০ সালের ২৩ মে এক  সুন্দর সকালে তিনি এ শ্যামল গ্রহের সর্বোচ্চ বিন্দু হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্ট চূড়া স্পর্শ করেন। বাংলাদেশকে নিয়ে যান এভারেস্টসম চূড়ার উচ্চতায়। কিন্তু সমতলে নেমে আসার আগেই 'মুসা এভারেস্ট জয় করেনি, করতে পারে না' এমন সব অভিযোগের তীর নিক্ষেপ হতে থাকে তার দিকে। এরপর পেরিয়ে গেছে চার বছর। এই চার বছরে অসংখ্যবার বিতর্ক উঠেছে মুসার এভারেস্ট জয় নিয়ে। কেন এতো বিতর্ক?  মুসা কী বলেন? গত ১৫ মে সন্ধ্যায় মুসার প্রতিষ্ঠিত এভারেস্ট একাডেমিতে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন হিটলার এ. হালিম। মুখোমুখি আলাপচারিতায় মুসা তাকে নিয়ে চলমান বিতর্ক, সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। দিয়েছেন আরো অনেক নতুন তথ্য। বাংলা ট্রিবিউন: আপনার এভারেস্ট জয় নিয়ে কেন এতো বিতর্ক? এই বিতর্ক তৈরির পেছনে আপনার ভূমিকার কথা জানতে চাই। মুসা ইব্রাহীম: আমি তো বিতর্ক তৈরি করিনি। কাজেই এক্ষেত্রে আমার আর কী ভূমিকা থাকবে। ১৯৫৩ সালে এভারেস্ট জয়ের পর এভারেস্ট চূড়ায় স্যার এডমন্ড হিলারির ছবি না থাকা; হিলারি না কি শেরপা তেনজিং নোরগে-কে আগে এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছেছিলেন তা নিয়ে এখনও বিতর্ক চলে। সুতরাং কেউ কেউ বিতর্ক করেই আনন্দ পায়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ এভারেস্ট জয় করেনি বলে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে, অভিযোগ করে। তাদের উদ্দেশ্যে আমার একটাই কথা, দেশের সম্মানকে এভাবে খাটো করা ঠিক নয়। এই সন্দেহ নিয়ে তারা যখন আমার এভারেস্ট অভিযানের সহযাত্রীদের মেইল করে, ফোন করে- তখন আসলে দেশকেই ছোট করা হয়। আমি ২০১০ সালের ২৩ মে ভোরে (বাংলাদেশ সময় ৫টা ৫ মিনিটে) দু’জন শেরপাসহ এভারেস্ট চূড়া জয় করি। আর ৫টা ১৬ মিনিটে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছি। আমি ক্যামেরায় সময়ও সেট করে নিয়ে গিয়েছিলাম। তবে যখন বেস ক্যাম্পে ফিরে এসে  সার্টিফিকেট নিয়েছি, তখন তাতে দেখি এভারেস্ট জয়ের সময় ভোর ৬টা ৫০ মিনিট। সার্টিফিকেটে এটা তারা চায়নিজ সময় হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই যে যারা বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করে তারা কিন্তু কোনো প্রমাণ দেয় না যে মুসা এভারেস্টে যায়নি, ২০১০ এভারেস্ট জয় হয়নি। তারা প্রমাণ দিয়ে কিছু বললে ভালো হতো। মানুষ এখন কনফিউজড। তারা আসলে মানুষকে কনফিউজ করতে চেয়েছে। যেহেতু এটা বাংলাদেশ। সব কিছু বলে ফেলা যায়, বলে পারও পাওয়া যায়। কোনো জবাবদিহি নেই। তাই তারা এটা করছে। বাংলা ট্রিবিউন: এ বিতর্কের শেষ কোথায়? মুসা ইব্রাহীম: আমি জানি না কোথায় গিয়ে এ বিতর্ক থামবে বা শেষ হবে। এভারেস্ট জয়ের প্রমাণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় থাকে, যেমন ছবি তোলা। আমরা কিন্তু প্রথম এভারেস্ট জয়ী এডমন্ড হিলারির এভারেস্ট চূড়ার কোনো ছবি দেখিনি। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি তিনি এভারেস্ট জয় করেছেন। এভারেস্টের চূড়ায় বুদ্ধমূর্তি আছে তার সামনে ছবি তোলা। এভারেস্ট চূড়ার চার পাশে লোৎসে, চোয়ু, পুমরি পর্বতের চূড়া আছে। এভারেস্ট চূড়ায় ছবি তোলার সময় পেছনে বা পাশে ওইসব পর্বতের চূড়া থাকলে ধরে নিই যে কেউ এভারেস্ট জয় করেছেন। কোনো কারণে ছবি তোলা না গেলে সহযোগী শেরপাদের সাক্ষ্য, সহযাত্রীদের সাক্ষ্যকেও প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। এটাই সর্বজন স্বীকৃত রীতি। এর সবই আমার আছে, কিন্তু যারা অভিযোগ করে তারা এর মাধ্যমে নিজের দৈন্য দশাকেই প্রকাশ করছে। বাংলা ট্রিবিউন: একটি দল বা গোষ্ঠী বরাবরই দাবি  করে আসছে, আপনার কাছে এভারেস্ট জয়ের যথেষ্ঠ প্রমাণ, ব্যাখ্যা নেই। আপনি কী বলেন? মুসা ইব্রাহীম: আমার কাছে ব্যাখ্যা নেই, প্রমাণ নেই এটা তারা কীভাবে বলেন। কেউ যদি জেগে ঘুমায় তাহলে তাকে জাগানো যায় না। আমার মনে হয় তারা জেগেই ঘুমাচ্ছেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘‌পাহাড় চূড়ার হাতছানি: কেওক্রাডং থেকে এভারেস্ট' বইতে আমার এভারেস্ট জয়ের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এমন বর্ণনা আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই। ওই বইয়ের সফট ভার্সন আমার ওয়েবসাইটে দিয়ে দেওয়া আছে। এখন নিজেকে তো আপডেট করতে হবে। তা না করে তারা যদি পুরোনো তথ্য নিয়েই থাকে তাহলে বলতেই হবে তারা জেগে জেগে ঘুমাচ্ছেন। আমি জানি না তারা কেন এই দাবি করছেন। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবে। তারা যদি আমার অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় তাহলে প্রমাণ দিয়ে দাবি করুক। কিন্তু তারা কোনো প্রমাণও দেয় না। ২০১০ সালে তারা এ বিতর্ক তুলেছিল। আবার ২০১৪ সালে এসে আবারও বিতর্ক তুলেছে। আমি যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করি তাহলে প্রমাণ দিয়ে অভিযোগ করব, এই যে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ। এর সত্যতা প্রমাণ করেন। বাংলা ট্রিবিউন: আপনার মনে পড়ে আপনি এভারেস্ট চূড়ায় কতক্ষণ ছিলেন? ছবি তুলেছিলেন কয়টি? কোনো খাবার খেয়েছিলেন কীনা? মুসা ইব্রাহীম: আমি এভারেস্ট চূড়ায় আধ ঘণ্টার মতো ছিলাম। সে সময় আমি কিছু খাইনি। খাওয়া সম্ভবও নয়। কাউকে কিছু খেতেও দেখিনি। একটা চকলেট বের করেছিলাম কিন্তু তা ছিল পাথরের মত শক্ত। বরং কিছুটা পথে বেয়ে নামার পরে আমি পানি, জুস এবং পাওয়ার জেল খেয়েছিলাম। আমার শেরপা কৈলাস ও লাকপা, অস্ট্রেলিয়ান এভারেস্টজয়ী ব্রেন্ডান ও’মাহনি এবং স্কটিশ অভিযাত্রী স্টিফেন গ্রিন আমাকে এসব খাইয়েছিল। আমি এভারেস্ট অভিযানে সব মিলিয়ে (প্লেনে ওঠা থেকে শুরু করে এভারেস্ট জয় করে আবার বেসক্যাম্পে ফিরে আসা পর্যন্ত) ৪৫৯টি ছবি তুলেছি। আর এভারেস্ট চূড়া থেকে ছবি তুলেছিলাম ২০টি। সব ছবি আমার ওয়েবসাইট ও ফ্লিকারে দেওয়া আছে। [caption id="attachment_7519" align="aligncenter" width="300"]একান্ত আলাপচারিতায় মুসা ইব্রাহীম                        ছবি: ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি একান্ত আলাপচারিতায় মুসা ইব্রাহীম      ছবি: ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি[/caption] বাংলা ট্রিবিউন: আপনার এভারেস্ট জয়ের পর থেকেই অভিযোগের জন্ম। আপনাকে প্রকাশ্যে কখনও অভিযোগের জবাব দিতে দেখা যায়নি। এই সুযোগটাই কী বারবার বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে? মুসা ইব্রাহীম: এরা যে অভিযোগগুলো করে তার উত্তর দেওয়াটা আমার কাছে আসলে খুবই খেলো মনে হয়। এমন যদি কোনো ভালো কথা বলত তাহলে হয়তো আমি আনন্দবোধ করতাম। কিন্তু তারা ভালো কথা বলে না। এটা আমার কাছে নিচু মনমানসিকতার মনে হয়। ওই লেভেলে বা ওই স্ট্যার্ন্ডার্ডে আসলে আমার পক্ষে নামা সম্ভব নয়। বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত চারজন এভারেস্ট জয় করেছেন, কেবল আপনার জয় নিয়েই কেন এত কথা হচ্ছে? মুসা ইব্রাহীম: তারা একজন বিশেষ মানুষের সঙ্গে যুক্ত এই কারণে। ওই বিশেষ মানুষটি সবাইকে শিখিয়ে দেয় কাকে কী বলতে হবে বা কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে। বাংলা ট্রিবিউন: যারা এই দাবি করছে তাদের স্বার্থ কী? কেন তারা এমনটি করবেন? মুসা ইব্রাহীম: ভালো কোনো স্বার্থ দেখি না। ভালো কাজের একটা প্রতিযোগিতা হলে ভালো হতো। বাংলাদেশকে এই বিশ্বে বহু কাজের মাধ্যমে পরিচিত করানো যায়। সেখানে প্রথম হওয়া আসলে কঠিন কিছু নয়। তারা এই প্রতিযোগিতা করে না কেন? আসলে তাদের তো কোনো ক্ষতি নেই। তারা সবার মধ্যে একটা সন্দেহ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। হয়তো নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার একটা চেষ্টাই করছে তারা। বাংলা ট্রিবিউন: পাঠ্য বইয়ে আপনার ওপর লেখায় বেশ কিছু ভুল তথ্য রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযোগ আপনি কীভাবে খন্ডাবেন? মুসা ইব্রাহীম: আমি তো বলি তারা না জেনে এসব বলে। পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্য বইয়ে আমার এভারেস্ট জয় নিয়ে লেখা প্রবন্ধ ‘‌হিমালয়ের শীর্ষে বাংলাদেশের পতাকা'য় কিছু তথ্যগত ভুল ছিল। ২০১৩ সালের পাঠ্য বইয়ের ওই সংস্করণটা ছিল পরীক্ষামূলক সংস্করণ। ২০১৪ সালে এসে সেসব ভুলের প্রায় ৯৫ শতাংশ সংশোধন করা হয়েছে। আর পরীক্ষামূলক সংস্করণের অর্থটা হলো এই সংস্করণটি সংশোধন, পরিমার্জন করা যাবে। তার মানে যারা অভিযোগ করেন, তারা নিজেদের আপডেট করেননি। ভুলগুলো যে সংশোধন করা হয়েছে তা না দেখে তারা জাতির সামনে মিথ্যাচার করছেন। বাংলা ট্রিবিউন: চুলু ওয়েস্ট ও লাংসিসা রি পর্বত জয় নিয়েও কিন্তু আপনার বন্ধু মহল অভিযোগ তুলেছে। মুসা ইব্রাহীম: বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের (বিএমটিসি) চুলু ওয়েস্ট পর্বত জয় নিয়ে তারা আমাকে অভিযুক্ত করছেন। আমি তো সেই পর্বত জয় করার কোনো দাবি কখনই তুলিনি। আমি সেই অভিযানে হাই ক্যাম্পে রয়ে গিয়েছিলাম। আর দু’জন গিয়েছিলেন চূড়া জয় করতে। কিন্তু তারা চুলু ওয়েস্ট পর্বতের মূল চূড়ায় না গিয়েই চূড়া জয়ের দাবি করতে থাকেন। তারা সেই জায়গা থেকে হাই ক্যাম্পে নেমে আসার পর তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা যে জায়গায় গেছেন, তা কিভাবে চূড়া জয় হতে পারে? সে সময়ে একজন বলেন, এটাই চূড়া, এটাই আমরা জয় করেছি। সেটা তখন সরল মনে বিশ্বাস করে আমি বিএমটিসি’র নিউজলেটারে আর পত্রিকায় লিখেছি যে আমরা চুলু ওয়েস্ট জয় করেছি। কিন্তু পরে যখন এই অভিযানের আরেক সদস্য নেপালের সারিন প্রকাশ প্রধানের সঙ্গে ফের কথাবার্তা হলো, তিনি তখন জানালেন যে যারা চূড়া জয়ের দাবি করেছিল, তাদের মধ্যে একজন শেরপাকে চাপ দিয়েছিল সেই জায়গাটাকেই চূড়া হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য। নয়তো তার বেতনের টাকা দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই তারা চালিয়ে দিয়েছেন যে চুলু ওয়েস্ট জয় করেছেন। এ তথ্য জানার পর যখন বিএমটিসি’র প্রধানকে আমি মূল ঘটনা জানালাম, তখন তিনি আমাকে কয়েক মাসের জন্য চুপ থাকতে বলেছিলেন। সেভাবে আসলে বিএমটিসিতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই আমি ওই সংগঠন ছেড়ে বেরিয়ে আসি। এখন সেই সুযোগটাই তারা নিতে চায়। আমাদের নিজেদের সংগঠন নর্থ আলপাইন ক্লাব বাংলাদেশ (এনএসিবি) প্রতিষ্ঠা করেছিলাম এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশ্যে। মিশন ছিল ২০১০ সালের মধ্যে এভারেস্ট জয়। এর প্রথম অভিযান ছিল লাংসিসা রি পর্বতে। সেখানে এনএসিবির সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও সংগঠনের বাইরের তিনজনকে নিয়ে অভিযানে গিয়েছিলাম আমরা। নেপালে যাওয়ার পর দেখা গেল অভিযানে আমাদের যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, তা নেই। ফলে অভিযান প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল। সে সময়ে নেপালের সারিন প্রকাশ এবং তার ব্যবসায়িক সহযোগী কোমল অরিয়াল আমাদের অর্থ ধার দিয়ে সহায়তা করে। ঢাকায় ফিরে সেই অর্থ আমরা সবাই মিলে ফেরত দিব-এমন একটা সমঝোতা হয়েছিল সে সময়। কিন্তু চূড়া জয়ের পর ঢাকায় ফিরে যখন এই অর্থ তাদের কাছে চাইতে গিয়েছি, তখন এই অভিযানের এক সদস্য তার অংশটুকু দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনিই এখন বলে চলেছেন যে লাংসিসা রি পর্বত জয় হয় নি। যদি না হয়েই থাকে, তাহলে তিনি কেন সেই পর্বতের চূড়ায় ভিডিও করলেন চূড়া জয় হয়েছে বলে? কেন তিনি অভিযান থেকে কাঠমান্ডুতে ফিরে নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন থেকে সনদ এবং শেরপাদের কাছ থেকে সংবর্ধনা নিয়েছিলেন। এমনকি ঢাকায় ফিরেও সংবর্ধনা নিয়েছিলেন। তখন তার মনে একবারও সন্দেহ জাগেনি যে তিনি লাংসিসা রি পর্বত জয় করেননি। কিন্তু যখন তার কাছে টাকাটা চাওয়া হলো, তখন থেকেই তিনি বলতে শুরু করলেন যে লাংসিসা রি পর্বত জয় হয়নি। বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বাংলা চ্যানেল কতবার জয় করেছেন? আপনার বাংলা চ্যানেল জয় নিয়েও কিন্তু অভিযোগ উঠেছে? মুসা ইব্রাহীম: বাংলা চ্যানেলের জনক কাজী হামিদুল হক জীবিত থাকলে ভালো হতো। এই অভিযোগের জবাব তিনিই ভালো দিতে পারতেন যে মুসা বাংলা চ্যানেল জয় করেছিল কি না। আমি আসলে প্রকৃত সাঁতারু নই। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জটি নিয়েছিলাম। পেশাদার সাঁতারু না হয়েও বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলাম। আমি দু'বার বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিই। প্রথমবার ২০১১ সালের মার্চে। আমাদের অভিযানের দিন জাপানে সুনামী ছিল। ফলে সাগর ছিল উত্তাল। আমার সাঁতারের সময় অন্য অভিযানের একটি নৌকা আমাকে খুব বিরক্ত করছিল। সাঁতারের এক পর্যায়ে একটি ট্রলার আমার গায়ের ওপর চলে আসছিল বারবার। একবার আমি প্রায় বোটের নিচে চলে যাচ্ছিলাম। ওই সময় বোটের ইঞ্জিন বন্ধ ছিল। ওরা আমাকে উদ্ধার করার জন্য বোটে টেনে তোলে। আমি মানা করেছিলাম, আমাকে টেনে না তুলতে। আমি বোটে ৫-৭ মিনিট ছিলাম। ওই সময় আমি বুঝতে পারি বাকি পথটা আমি সাঁতরে যেতে পারব। তবে ওই সময় বেশ জোরে বাতাস বইছিল। ইঞ্জিন বন্ধ থাকায় বাতাস নৌকাটিকে মিয়ানমারের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। ওই ৫-৭ মিনিট সময়কে সমালোচকরা ১ ঘণ্টা বানিয়ে ফেলে। এতো সময় বোটে থাকলে তো আমি সেন্টমার্টিনেই পৌঁছে যেতাম। ওই সময় আমাদের সাঁতারের পথ ছিল টেকনাফের বদর মোকাম থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত (১৪ কিলোমিটার)। ২০১২ সালেও আমরা বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিই। ওইবার আমাদের যাত্রা পথ ছিল টেকনাফের ফিশারিজ জেটি থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত, ১৬ কিলোমিটার বা ১০ মাইল। এইবার আরো বেশি লম্বা পথ। ‘ফিনা’ নামের একটি সংগঠন যারা বিশ্বব্যাপী ‘‌লং ডিসটেন্স ওপেন ওয়াটার সুইমিং' তত্ত্বাবধান করে। তাদের মতে পানি পথে ১০ মাইল মানে পানির ম্যারাথন। ওই সময় একজন ডাচ সুইমার ভ্যান গুল মিলকো আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে ওপেন ওয়াটার লং ডিসটেন্স সুইমিংয়ের লিস্টে এখন বাংলাদেশের নামও আছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন। আমরা আসলে চেয়েছিলাম এইভাবে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে। বাংলা ট্রিবিউন: এতো এতো বিতর্ক। কখনও কী আপনার মনে হয়েছে, এভারেস্টের পথে না হাঁটাই ভালো ছিল। আর ১০ জনের মতো একটা ভালো চাকরি, ৯-৫টা অফিস, বাসায় ফিরে মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে সময় কাটিয়ে জীবনটা পার করে দিলেই ভালো হতো। মুসা ইব্রাহীম: তাদের সমালোচনাই আসলে আমার পথ চলার শক্তি। মানুষ বিশ্বাস করতে চাইত না বলেই আমরা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম। এভারেস্ট জয় করে মানুষকে বিশ্বাস করাতে পেরেছি যে আমরাও পারি। ফলে বেশি বেশি চ্যালেঞ্জ করেন, সমালোচনা হোক। অসুবিধা নেই। আপনারা যত পারেন সমালোচনা করেন। আমি শুদ্ধ হব, প্রেরণা পাব। আমি যে কোনো সমালোচনা, বিতর্ককে স্বাগত জানাই। তবে তা অবশ্যই প্রমাণসহ হতে হবে। তারা তো এর আগে অভিযোগ করেছিল, এভারেস্ট চূড়ায় তোলা আমার ছবিগুলো টেম্পার করা। পরে তারাই বলেছিল ছবি টেম্পারড নয়। তারা ছবির ফরেনসিক টেস্টও করেছিল, গবেষণা করে বলেছিল যে সব ছবি ঠিক আছে এবং তা এভারেস্টের চূড়ায় তোলা। এরপর তারা ভুল স্বীকার করেন। তারাই ২০১০ সালে বিতর্ক তুলেছিল আবার সবকিছু প্রমাণের পরে তারাই বিতর্ক থামিয়েছিল। বাংলা ট্রিবিউন: আপনি একটা লক্ষ্য অর্জন করেছেন, স্বপ্ন পূরণ হয়েছে আপনার। কিন্তু বাংলাদেশ, ১৬ কোটি মানুষও তো এভারেস্টসম উচ্চতায় উঠেছে। এই প্রাপ্তিটাকে কীভাবে দেখেন? মুসা ইব্রাহীম: এভারেস্ট অভিযানের শুরুর সময়ে ভাবিনি এরকম বিশাল একটা কাজ করে ফেলব। যখন সত্যি সত্যি পৌঁছে গেলাম, সবার দোয়া-ভালোবাসা নিয়ে, তখন ভাবলাম দেশের জন্য একটা কাজ করে ফেলেছি। ওইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, মানুষের অবহেলা, উপেক্ষাকে জয় করে বিশ্বের সবচে উঁচু জায়গায় দেশের পতাকা ওড়ানো- এটাতো অবশ্যই গর্বের একটা বিষয়।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।