সন্ধ্যা ০৭:৪৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ জুলাই, ২০১৯  

যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৯

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

‘‘কারণ উটতো জন্মের সময় মায়ের পেটে থেকেই ছাগলের চেয়ে একটু বড় সাইজ নিয়েই বের হওয়ার কথা। তাহলে কি আমাদের লাহম মিনদির উটটাকে মায়ের পেট থেকেই ধরে নিয়ে এসে ঘিতে ভেজে এখানে প্লেটে প্লেটে সার্ভ করে দিলো? এমনটা ভিজুয়ালাইজ করতে রুচিরোচনে সমস্যা হয়ে যায় বিধায় ভাবনাটা বাদ দিলাম।’’

পূর্ব প্রকাশের পর যা দেখলাম আর না-দেখলাম সাথে যারা ছিলেন তাদেরকে কিছুই বললাম না। প্রথমে মনে হয়েছিল এক কঠিন দৃশ্য দেখে ফেলেছি। পরে মনে হলো আজ বাড়ির পাশের ঢাকা বা কোলকাতার রাস্তায়-মার্কেটে-পার্কে নারীদেহ মানেই তো এমন দৃশ্য। তো সেই দৈনন্দিনের নিয়মিত একটি দৃশ্যকে এমন কঠিন কেন মনে হলো? প্যারিস-ভিয়েনায় পুরো বস্ত্রহীন উদোম একখানা নারীদেহ দেখেও তো আমার মতো কঠিন কিছু দেখে ফেলেছি বলে কেউ মনে করবে না। এমনটা কেন হলো? পুরোটাই পরিবেশের সৃষ্টি। যাহা কোলকাতার রাস্তায় খুবই নিয়মিত ও শালীন দৃশ্য তাহাই জেদ্দার রাস্তায় দেখলে হয়ে যায় কঠিন ন্যাংটো দৃশ্য। সবই মানবিক পরিবেশ। এই মানবিক পরিবেশের দিকে আর নয়। আল্লাহর সৃষ্ট পরিবেশের চিররহস্যময় চিরসুন্দর নিঃসীম সমুদ্রের দিকেই বরং তাকিয়ে থাকি। তাকালাম আবার লোহিত সাগরের দিকে। তখন রাত হয়ে গেছে। বিভিন্ন পয়েন্টে অনেক শক্তিশালী সোডিয়াম লাইট। সে আলোতে দেখা যাচ্ছিল তখনো অনেকে সার্ফিং করে যাচ্ছে। অনেকে দ্রুত বোট বা এ জাতীয় কিছুতে রেসিং করে যাচ্ছে। জানি না কর্তৃপক্ষ এই সার্ফিং বা রেসিং রাত ক’টা পর্যন্ত করতে দেয়। আমাদের অবশ্য আর বেশিক্ষণ থাকার কথা নয়। আমাদের ফিরতে হবে মক্কায়। এছাড়া খালেদ সাহেবের Treat ও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়েছে বলে মনে হয় না। জাকারিয়া ভাই-ই তাগিদ দিলেন। আমরা উঠে পড়লাম। এবার গাড়ি ছুটলো শহরের দিকে।

ভেতরে টেবিল চেয়ারের কোনো কারবার নেই। দুই-আড়াইফুট উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা অনেকগুলো কোঠা কোঠা করা। কোঠার মধ্যে চমৎকার কার্পেট। তিন চারটা করে তাকিয়া এবং ছোট ছোট হেলান দেয়ার কুশন। সিস্টেম হলো কাস্টমাররা চার-পাঁচজন এক এক গ্রুপে এক এক কোঠায় গোল হয়ে বসবে। বসে আরামের জন্য তাকিয়া ব্যবহার করবে। সামনে দস্তরখানে খাবার দিবে। সকলের জন্য খাবারের বর্তন বা থালা থাকবে একখানা মাত্র।

খালেদ ভাই দেখলাম ফোনে আরবি ও বাংলায় অনেকের সাথে কথা বলছেন। উদ্দেশ্য একটি ভালো জাতের আরবীয় রেস্তোরাঁর খোঁজ নেয়া। অনেক খুঁজে একটির সামনে গাড়ি থামালেন। দেখলাম সেখানে বাইরে বিশাল এক হুক্কা। অনেকগুলো নল দেয়া। চেয়ারে বসে বা কার্পেটে বসে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে সুন্দর গুড় গুড় করার সুযোগ রয়েছে। ভাবলাম এখানে থামলে খারাপ হয় না। অনেক ছোট বেলায় দাদিবুড়ির হুক্কায় গুড়গুড়ি দেয়ার পরে এই সুযোগ আর হয়নি। কিন্তু আরো ভালো কিছুর আশায় এখানে শেষ পর্যন্ত থামা হলো না। পরে বেশ ঘুরেফিরে এক জায়গায় থামলাম। রেস্টুরেন্টটির নাম মনে পড়ছে না। তবে মনে পড়ছে এর মালিক মিশরীয়। সৌদি আরবে এদের অনেক শাখা। ঢুকলাম এই রেস্টুরেন্টে। ভেতরে টেবিল চেয়ারের কোনো কারবার নেই। দুই-আড়াইফুট উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা অনেকগুলো কোঠা কোঠা করা। কোঠার মধ্যে চমৎকার কার্পেট। তিন চারটা করে তাকিয়া এবং ছোট ছোট হেলান দেয়ার কুশন। সিস্টেম হলো কাস্টমাররা চার-পাঁচজন এক এক গ্রুপে এক এক কোঠায় গোল হয়ে বসবে। বসে আরামের জন্য তাকিয়া ব্যবহার করবে। সামনে দস্তরখানে খাবার দিবে। সকলের জন্য খাবারের বর্তন বা থালা থাকবে একখানা মাত্র। চারজন বসলে চারজনের সাইজের থালা, দুইজন বসলে দুই জনের সাইজের থালা। পুরোপুরি সুন্নতি সিস্টেম। এই সিস্টেমের এক মিনি ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র প্রোটোটাইপ প্রথমদিন জেদ্দা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে দেখেছিলাম। সেকথা রবার্ট লিণ্ডের অনুভবের উদ্ধৃতিসহ আগে একবার বলেও এসেছি। মক্কায় আলবাইক নামে আরেকটি ব্রান্ড রেস্টুরেন্টে খেয়েছিলাম। সেখানে কিছু অংশ টেবিল-চেয়ার ভিত্তিক, কিছু অংশ এমন কোঠা ও তাকিয়া ভিত্তিক। পুরোপুরি চেয়ার-টেবিল ভিত্তিক ইউরোপীয় সিস্টেমের রেস্টুরেন্ট মক্কা মদিনায় একমাত্র বাঙালি, পাকিস্তানি এবং ইন্ডিয়ানদেরই দেখেছি। আরবরা ইউরোপীয় কলোনি ছিল না। আমরা ইন্ডিয়া পাকিস্তান বাংলাদেশ কলোনি ছিলাম। সৌদি রেস্টুরেন্টগুলোও তা বলে দিচ্ছে। আমি ভাটির দেশের বাঙাল এই প্রথম বিশুদ্ধ আরবীয় রেস্টুরেন্টে আরবীয় কেতায় খেতে বসলাম। আমরা সম্ভবত চারজন ছিলাম। জেদ্দা বিএনপির নেতাগোছের একজন এই রেস্টুরেন্টে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। খুব রাজনৈতিক কথাবার্তা হচ্ছিলো। খালেদকে মনে হলো কিছুটা আওয়ামী। ফলে আরবীয় রেস্টুরেন্টে একেবারে বাঙালি চায়ের দোকানের আলোচনা। এর মধ্যে খাবার এলো। খাবারের নাম লাহাম মিনদি। উটের গোস্তের বিরানি জাতীয় একটি আইটেম। যে-চাউলে রান্না হয়েছে সেটা মোটেই আরবীয় নয়, বিশুদ্ধ পাকিস্তানি। আরবীয় কেতায় পাকিস্তানি চাউলের রান্নায় খেতে বসলাম আমরা চার বাঙালি। পাকিস্তানি বাশমতি বিরিয়ানি দেখতে পুরো নুডলসের মতো। চালগুলো কতখানি লম্বা ছিল জানি না, তবে ভাতগুলো আধা ইঞ্চির খাটো না একটাও। খাটো লম্বা যাই হোক খেতে খারাপ লাগলো না। উটের নলা বলে বিরিয়ানির মধ্যে পাওয়া যে হাড়টাকে পরিচয় করানো হলো তা দেখে উটটাকে আমার মোটামুটি ছাগল সাইজের মনে হলো। একটা উটকে ছাগল সাইজের ধরতে গেলে বড়ই মুশকিল বেঁধে যায়। কারণ উটতো জন্মের সময় মায়ের পেটে থেকেই ছাগলের চেয়ে একটু বড় সাইজ নিয়েই বের হওয়ার কথা। তাহলে কি আমাদের লাহম মিনদির উটটাকে মায়ের পেট থেকেই ধরে নিয়ে এসে ঘিতে ভেজে এখানে প্লেটে প্লেটে সার্ভ করে দিলো? এমনটা ভিজুয়ালাইজ করতে রুচিরোচনে সমস্যা হয়ে যায় বিধায় ভাবনাটা বাদ দিলাম। মজাটা জিহ্বায় ধরে রেখে উপরের ভাবনাটা মাথা থেকে সরিয়ে দিয়ে নামলাম রেস্টুরেন্ট থেকে।

প্রথমত ধন্দ লাগলো- এ কি জেদ্দা? নাকি গুলিস্তান? পরপর অনেক বাস রাখা। প্রত্যেকটির কাছে পুরো গুলিস্তান কায়দায় এক বা একাধিক হেলপার জাতীয় লোক। তারা শুধু ডেকে যাচ্ছে- বাক্কা, বাক্কা, বাক্কা কিংবা হেরোম, হেরোম, হেরোম; যেমনটা গুলিস্তানে কানের তালি ফাটিয়ে দিয়ে ডাকতে থাকে শ্রীপুর, শ্রীপুর, শ্রীপুর...

রাত এশার আজান ছাড়িয়ে গেছে যথাসম্ভব। লিডারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার খালেদের গাড়ি। খালেদ বলছিলেন, পরের দিন তার একটু কাজ আছে না হয় তার গাড়িতে করেই তিনি মক্কা পর্যন্ত দিয়ে আসতেন। তবে খালেদ আরো বলছিলেন, জাকারিয়া ভাই যদি অনুমতি দেন যে, খালেদ গাড়ি নিয়ে আবার আজ রাতেই ফিরে আসতে পারবে তাহলে সে এখন আমাদেরকে মক্কায়ই দিয়ে আসতে পারে। একথা শুনে আমি খালি প্রমাদ গুনছিলাম যাতে জাকারিয়া ভাই এই মত বা অনুমতি দিয়ে না বসেন। মত দিয়ে ফেললে আমার গ্রামের সেই চাচার কাহিনিই আবার ঘটবে বলে আমার যথেষ্ট সন্দেহ হচ্ছিলো। আমার গ্রামের ঐ চাচার ছেলেকে একজন জিগ্যেস করেছিল- এই, তোর বাপে নাকি এবার মক্কা যাইবে? ছেলে উত্তরে বললো- ‘হেয়া কমু ক্যামনে, যে পাগলের পাগল যাইতেও পারে’। খালেদের আতিথেয়তার এতক্ষণের কর্মকাণ্ডে আমার সহি এতেকাদ জমে গেছে- এই খালেদ, মাশাআল্লাহ, যে পাগলের পাগল এমন মত পাইলে গাড়িখানা গিয়ারে লাগইয়াা বলেই উঠতে পারেন- চলেন, আল্লাহর নাম লইয়া যাই মক্কা। জাকারিয়া ভাই এমন মত একেবারেই দিলেন না। ফলে খালেদ আমাদের কে নামালেন এক বাসস্টান্ডে। সেখান থেকে মক্কা বাস যায়, ট্যাক্সিও যায়। আমরা নামলাম। খালেদ অনেক ভদ্রতা ও আত্মীয়তাসুলভ আচরণে আমাদের বিদায় দিলেন। আমরা খালেদকে বিদায় দিয়ে রাস্তার ওপারে বাসের দিকে আগালাম। বাসের দিকে কাছাকাছি পৌঁছে আমার একটু ধন্দই লাগালো। প্রথমত ধন্দ লাগলো- এ কি জেদ্দা? নাকি গুলিস্তান? পরপর অনেক বাস রাখা। প্রত্যেকটির কাছে পুরো গুলিস্তান কায়দায় এক বা একাধিক হেলপার জাতীয় লোক। তারা শুধু ডেকে যাচ্ছে- বাক্কা, বাক্কা, বাক্কা কিংবা হেরোম, হেরোম, হেরোম; যেমনটা গুলিস্তানে কানের তালি ফাটিয়ে দিয়ে ডাকতে থাকে শ্রীপুর, শ্রীপুর, শ্রীপুর, কিংবা- দস্স্যগারো বারো, দস্স্যাগারো বারো কিংবা পল্লবী, পল্লবী ইত্যাদি। গুলিস্তানে যারা ডাকে তাদের হাতে একখানা বিড়ি বা সিগারেট থাকে, এখানে যারা ডাকছে তাদেরও প্রায়ের হাতেই একখানা সিগারেট ঝুলছে এবং মুখ থেকে নাক থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। পার্থক্য এতুটুকুই- গুলিস্তানে যে ডাকে ওর গায়ে থাকে বোতাম-না-দেয়া একখানা শার্ট বা গেঞ্জি এবং পরনে থাকে জীবনে কোনোদিন-না-ধোয়া একখানা জিনসের প্যান্ট। আর এখানে যারা ডাকছে তাদের গায়ে ঈদের নামাজের ইমামের চেয়েও লম্বা জুব্বা, মাথায় ঝুলছে দীর্ঘ সৌদি রুমাল। হাতের সিগারেটটা ফেলে দিতে পারলে আর মুখে এক গোছা লম্বা দাড়ি লাগিয়ে দিতে পারলে বাংলাদেশের যে কোনো আজিমুশশান হালকায়ে জেকের ও মাহফিলে নির্দ্বিধায় পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়- ইনি হচ্ছেন পিরে হাক্কোন্নুরী কিংবা পিরে দিলদবদবার খাস খলিফা ওলিয়ে কামেল জিন্নাতুল্লাহ ইরফানী। এই রকম ওলিয়ে কামেলরা বাসের পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে ডেকে যাচ্ছে- বাক্কা বাক্কা বাক্কা- কিংবা হেরোম-হেরোম- হেরোম। সে এক ক্যামেরাবন্দীযোগ্য দৃশ্য! কিন্তু আমার ক্যামেরা ছিল না।

হেসে বললেন- চলেন এরই একটায় ওঠেন- দেখবেন বাক্কা কীভাবে মক্কা হয়ে যায়। উঠলাম, বসলাম। এবার ধীরে ধীরে জাকারিয়া ভাই মক্কার নাম নিয়ে অনেক কথা বললেন। সেসব থেকে নাদানের ঘিলুতে মনে আছে এইটুকুই যে, যাহাই মক্কা তাহাই বাক্কা।

দ্রুতই মাথায় খেললো অন্য জিনিস। এই বাক্কা বাক্কা কিংবা হেরোম হেরোম ডাকা বাসে আমাদের প্রয়োজন কী? আমরা যাবো মক্কা। তাতে এই বাক্কা বাক্কা কিংবা হেরোম হেরোম ডাকা বাসস্টান্ডে আমরা কেন নামলাম? এখানে আমাদের কী প্রয়োজন? হাবলুদের যা স্বভাব- খটকা একটা মাথায় ঢুকলে ধীরেসুস্থে সে নিয়ে ভাবার ধৈর্য কোনোভাবেই তাদের থাকে না। স্বাভাবিকভাবেই সে ধৈর্য আমারও হলো না। সোজা জিগ্যেস করলাম- জাকারিয়া ভাই, বাক্কা যাওয়ার বাসস্টান্ডে আমাদের মক্কাওয়ালাদের কী কাজ? হাবলুদের প্রশ্নে বিজ্ঞরা যেভাবে হাসেন তিনিও সেভাবে একটু হাসলেন। হেসে বললেন- চলেন এরই একটায় ওঠেন- দেখবেন বাক্কা কীভাবে মক্কা হয়ে যায়। উঠলাম, বসলাম। এবার ধীরে ধীরে জাকারিয়া ভাই মক্কার নাম নিয়ে অনেক কথা বললেন। সেসব থেকে নাদানের ঘিলুতে মনে আছে এইটুকুই যে, যাহাই মক্কা তাহাই বাক্কা। পরবর্তীতে জাকারিয়া ভাইর আলোচনার সূত্র ধরে খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া গেল মক্কার নামের ইতিহাসের এক দীর্ঘ বয়ান। সে বয়ানে দেখা যায় কোরান শরীফের সুরা আল-ইমরানের ৯৬ নং আয়াতে মক্কাকে ‘বাক্কা’ বলা হয়েছে। আবার সুরা আল-ফাত্হ এর ২৪ নং আয়াতে ইহাকে মক্কাই বলা হয়েছে। প্রমাণিত হয় ‘মক্কা’ ও ‘বাক্কা’ দুই নামই কোরান-অনুমোদিত। কোরান শরীফে মক্কাকে আরো বলা হয়েছে ‘বালাদিল আমিন’ ও ‘উম্মুল ক্বুরা’। সুরা আল-আনয়ামের ৯২ নং আয়াতে মক্কাকে ‘উম্মুল ক্বুরা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কোরানে উল্লেখিত এই সর্বশেষ নামানুসারেই মক্কার ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ‘উম্মুল ক্বুরা বিশ্ববিদ্যালয়’, যে-বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালের জাঁদরেল শিক্ষক সাজ্জাদ হোসাইন শেষ জীবনে ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইতোপূর্বে অনেকবারই আলোচনায় এসেছে। মক্কার আরো দুটি নাম হলো ‘ফারান’ ও ‘তিহামাহ’। এসবের মধ্যে ‘বাক্কা’ ও ‘ফারান’ নামদ্বয় দ্বারা ওল্ড টেস্টামেন্ট তথা তাওরাতেও মক্কাকে বোঝানো হয়েছে। এতদ্বিধ নামসমূহের মধ্যে একমাত্র ‘মক্কা’ ও ‘বাক্কা’ নামদ্বয়ই ধ্বনিগতভাবে বেশ সাযুজ্যপূর্ণ। এর কারণ ব্যাখ্যায় বলা হয়ে থাকে যে, এ দুটি মূলত একই শব্দ। ইসলামের আবির্ভাবকাল ও এর কাছাকাছি সময়ে দক্ষিণ আরবের আরবিতে ‘ম’ ও ‘ব’ ধ্বনি অনেক ক্ষেত্রে সমার্থক তথা interchangeable ছিল। একারণেই তখনকার উচ্চারণরীতিতে যাহাই মক্কা তাহাই বাক্কা। হেল্পারদের মুখে বাক্কার সাথে ডাকার অন্য শব্দটি ছিল হেরোম। জাকারিয়া ভাই বললেন ‘হেরোম’ মানে ‘হেরম’ মানে ‘হেরেমশরীফ’ আর্থাৎ কা’বা শরীফ। ‘হেরোম’-এর এই অর্থ হতে পারে বলে আমারও কিছুটা অনুমান হয়েছিল। একটা অর্থ যে আমি প্রায় ধরে ফেলতে পেরেছিলাম সে থেকে আমার মনে তখন একটা সুখ সুখ অনুভব চলছে। একই সাথে জেদ্দার বাসের হেল্পার পিরসাহেবরা ‘হেরম’ বলতে গিয়ে ‘হা’ এর যে উচ্চারণ করছিলো আমি ছোটবেলায় মক্তবে ঐ হায়ে হুত্তির অবিকল উচ্চারণ রপ্ত করতে পেরেছিলাম দেখেও আমারা ভেতরটায় তখন আনন্দের বেশ একটা অনুরণন চলছিল। এই আনন্দের অনুরণন বুকে নিয়েই বসেছিলাম। কিছুক্ষণে চোখ ঢুলু ঢুলু হয়ে উঠলো। হঠাৎ টের পেলাম বাস থেকে সবাই নামছে। মক্কা এসে গেছি। নেমে দেখলাম কাবা দেখা যায় না এবং চতুষ্পার্শে পরিচিত কিছুই দেখা যায় না। এমন কি দেখা যাচ্ছে না সুউচ্চ ক্লক টাওয়ারটিও। তবে এনিয়ে হাবলুর মতো আর প্রশ্ন বাড়ালাম না। জাকারিয়া ভাইর পিছন ধরে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে একসময় দেখলাম সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি। উপরে উঠে দেখি- কি তামশা, সব ফকফকা! একেবারে কাবার বহিঃচত্বরে উঠে দাঁড়িয়েছি। তার মানে আমরা নেমেছিলাম যে স্টপেজে সেটি ঠিক কাবার নিচে। অর্থাৎ কাবার চত্বরের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ সড়ক পথ রয়েছে। যাক জানা হলো। মক্কার দিন শেষ হয়ে এসেছে। অথচ এক মিউজিয়াম ছাড়া মক্কায় এখনো একা একা খুব ঘুরে দেখা হলো না। যেথায় যেটুকু গিয়েছি মোটামুটি জাকারিয়া ভাইর হাত ধরেই গিয়েছি। কিন্ত এর আগে যেসব দেশে গিয়েছি এমন হাত ধরার লোক তো কোথাও খুব একটা ছিল না। এবার এমন হাত-ন্যাওটা হয়ে গেলাম কেন। এই প্রশ্নের সাথে জড়ানো লজ্জা থেকেই চিন্তা করলাম পরদিন একাই বের হবো। কোথায় যাব? ভেবে দেখলাম মক্কা মিউজিয়াম থেকে আসার পথে পাবলিক লাইব্রেরি চোখে পড়েছিল। একাই যখন যাবো- পাবলিক লাইব্রেরিতে যাবো। মাস্টার মানুষ কোথায়ই বা আর যায়?

এমনকি বই ইস্যুর কোনো ক্লার্ক বা কর্মচারীও কোথাও চোখে পড়লো না। আমি ধারণায়ই আনতে পারলাম না এটি কেমন পাবলিক লাইব্রেরি- কেমন এর ম্যানেজমেন্ট- কারা এখানে পড়তে আসতে অনুমতিপ্রাপ্ত। সবমিলিয়ে কিছুই বুঝলাম না।

ইব্রাহিম খলিল সড়ক ধরে কাবার বহিরাঙ্গন অতিক্রম করে এগিয়ে গেলে বামে আইয়ামে জাহিলিয়া যুগের মাকবারাহ বা কবরখানা। জাকারিয়া ভাই বলেছিলেন এই কবরখানায় আইয়ামে জাহিলিয়া যুগে মেয়েশিশুদের জ্যান্ত কবর দেয়া হতো। অবশ্য সাথে সাথে তিনি এ-ও বলেছেন যে এ তার শোনা বয়ান। এবিষয়ে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক ভিত্তি তার জানা নেই। সেই কবরখানা পার হয়েই বাসস্টান্ড। এখান থেকে আড়াই টাকার টিকিট কেটে বাসে উঠলাম। মিউজিয়ামের সামনে নামিয়ে দিলো। বাস থেকে নেমে একটু পিছনে এসে লাইব্রেরি। লাইব্রেরি ভবনের গেট সামনে। কিন্ত খোলা নয়। সেখানে একজন ইশারা ইঙ্গিতে বলে দিলেন পেছনে গেট রয়েছে যেটি খোলা। পেছনে যাওয়ার পথে পেলাম একসাথে বসা তিনজন লোক। আমি একটু ইংরেজি জানি বলে জায়গা-বেজায়গায় ভাব নিয়ে ঐটা দিয়েই শুরু করি। তাতে ঐ তিনজনের একজন ক্ষেপে গিয়ে খাস বাংলায় ছাড়লো- ‘ইংরেজি থোন্, বাংলায় কন, বাংলায়’। ভদ্র লোকের কথায় একটু থতমত খাইলাম ঠিকই, তবে বাংলায় বলতে পারবো এমন এক ফেসিলিটি পেয়ে অন্তরে একটু একটু আমোদই অনুভব করলাম। বোঝা গেল তিনজনই বাংলাদেশী। অল্পের মধ্যেই জানা গেল বাড়ি একজনের বরিশাল, দুজনের কিশোরগঞ্জ। নাম ঠিকানা এখন আর মনে নেই। এদের মধ্যে বরিশাইল্যা জনের মাঝে ফেলোফিলিংস জাতীয় একটু অতিরিক্ত আন্তরিকতা অনুভূত হলো। তিনজনই একটু চমকিত। ওমরাহ করতে এসে পাবলিক লাইব্রেরি খুঁজে বেড়ায় এমন পাবলিক তাদের হাতে আর পড়ে নাই। তিনজনই অর্ডারলি গোছের চাকুরি করে। তাদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের একজনকে মনে হলো লাইব্রেরির ওপরমহলের সাথে একটু খায়খাতিরওয়ালা। আমি ইংরেজি সেকশনের বই দেখতে চাই বলায় সে আমাকে একটু বড়জাতের এক অফিসারের রুমে নিয়ে গেল। অফিসারের রুমের নেমপ্লেট আরবিতে বলে আমি বুঝতে পারলাম না তিনি কোন মানের অফিসার। সেখানেও আমি পূর্ববৎ ঠাঁট নিয়ে ইংরেজিতে কিছু বলতে গেলে আমার কিশোরগঞ্জী রাহবর আমাকে চোখরাঙানি দিলো। আমি যথেষ্ট লজ্জার সাথে খামুশ হয়ে গেলাম। রাহবর আমাকে টেনে নিয়ে লিফটে তিন বা চার তলায় উঠলো। সেখানে এক রুমের কর্নারে দুই-তিন শেলফ ইংরেজি বই। সেগুলো দেখিয়ে দিয়ে রাহবর বললো- দেখেন, কোনগুলো আপনার পছন্দ। পছন্দগুলো কি হবে? ইস্যু করা যাবে নাকি কেনা যাবে? এর কিছুই আমার কাছে স্পষ্ট নয়। তাই একটু কম কম করে বেছে খান আটেক বই আমি জড়ো করলাম। কিশোরগঞ্জী রাহবর দুটো পলিব্যাগ নিয়ে এলো। বই ক’খানা ভাগ করে দুই ব্যাগে ঢুকালো। ঢুকিয়ে ব্যাগদুটো নিজ হাতে রেখেই বললো- চলেন । আমি সে-রুম থেকে বের হয়ে বললাম- লাইব্রেরির বিশেষ করে রিডিংরুমগুলো আমি একটু ঘুরে দেখতে পারি কি-না। এ কথা শুনে রাহবর আমাকে ‘দাঁড়ান’ বলে দাঁড় করিয়ে রেখে বইগুলো নিয়ে লিফটে ঢুকলো। মিনিটদুই পরে এসে বললো- চলেন। এরপর দুই ও তিন তলা জুড়ে তিন চারটি পাঠকক্ষ আমরা ঘুরলাম। একটি কক্ষে দুতিনজন কৃষ্ণাঙ্গকে কয়েকটি বই সামনে নিয়ে কথা বলতে দেখলাম। এছাড়া আর কোনো রুমে কোনো লোকজন দেখলাম না। এমনকি বই ইস্যুর কোনো ক্লার্ক বা কর্মচারীও কোথাও চোখে পড়লো না। আমি ধারণায়ই আনতে পারলাম না এটি কেমন পাবলিক লাইব্রেরি- কেমন এর ম্যানেজমেন্ট- কারা এখানে পড়তে আসতে অনুমতিপ্রাপ্ত। সবমিলিয়ে কিছুই বুঝলাম না।

পাবলিক লাইব্রেরিতে এভাবে বিদেশ-বিভূঁইয়ের দর্শনার্থীদের নামে কীভাবে বই ইস্যু হয় ? নাকি এগুলো বিনামূল্যে বিতরণের বই? তাও-তো বইয়ে কোথাও লেখা নেই। এসব নিয়ে কিছুই বুঝতে না পেরে ভদ্রলোককে জিগ্যেস করলাম- এগুলো ফেরত দিতে হবে কবে? হেসে উত্তর দিলো- না, না, ফেরত দিতে হবে না; এগুলো আপনাকে দিয়ে দিলাম।

এমনকি আমার কিশোরগঞ্জী রাহবারকে দুচারটা প্রশ্ন যা করলাম তার উত্তরগুলো গুছিয়েও তেমন কোনো ধারণা দাঁড় করাতে পারছি না দেখে তাকে তার ভাবনায়-অবান্তর এতসব প্রশ্ন করে আর বিরক্তও করলাম না। বললাম- চলেন যাই। বের হয়ে আসলাম। সরাসরি ভবনের গেটের বাইরে। গেটের বাইরে আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে আমার কিশোরগঞ্জী রাহবর বললো- একটু দাঁড়ান। আমাকে দুতিন মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখে সেই বই-ভরা পলিথিন ব্যাগ দুটো নিয়ে সে হাজির। ব্যাগদুটো আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো- নিন, আপনার বই। বুঝতে পারলাম না এগুলো কীভাবে আমার বই হলো। এগুলো কি আমার নামে ইস্যু হয়েছে? পাবলিক লাইব্রেরিতে এভাবে বিদেশ-বিভূঁইয়ের দর্শনার্থীদের নামে কীভাবে বই ইস্যু হয় ? নাকি এগুলো বিনামূল্যে বিতরণের বই? তাও-তো বইয়ে কোথাও লেখা নেই। এসব নিয়ে কিছুই বুঝতে না পেরে ভদ্রলোককে জিগ্যেস করলাম- এগুলো ফেরত দিতে হবে কবে? হেসে উত্তর দিলো- না, না, ফেরত দিতে হবে না; এগুলো আপনাকে দিয়ে দিলাম। ‘মানে? পাবলিক লাইব্রেরির বই আমাকে দিয়ে দিলেন’! ‘হ্যাঁ, মনে করেন আপনাকে আমরা গিফট দিলাম’। পাবলিক লাইব্রেরিরর বই এইভাবে দিয়ে দেয়া যায়- এ আমি কোনোভাবেই বুঝতে পারলাম না। তখনো পারিনি, এখনো পারছি না। বুঝি আর না বুঝি বই পেয়েছি এটাই আনন্দ। বই নিয়ে বের হচ্ছি আর ভাবছি- ‘ধন্য মক্কা, ধন্য আরব। কী আজব পাবলিক লাইব্রেরি। এখানে বেড়াতে আসলে পছন্দের বই মাগনা দিয়ে দেয়!!’ ভেতরে অবশ্য একটু খটকাও থেকে গেল। বইগুলো কি সত্যিকারে পাবলিক লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষই দিলো, নাকি আমার দেশি ভাইরা কোনো কায়দা করে আমাকে দেশি ভাইয়ের ভালোবাসায় সরকারের মাগনা বই ফ্রি দিয়ে কিছুটা খাতির করলো? এমনটাই যদি হয়ে থাকে, আর এ নিয়ে এইসকল দেশি ভাইদেরকে যদি পরবর্তীতে জবাবদিহি করতে হয় এবং সে জবাবদিহিতায় সন্তোষজনক সদুত্তর দিতে না পারায় যদি তাদের কোনো সমস্যায় পড়তে হয় তাহলে অংশত হলেও তাতে আমার দায় থেকে যায়। এই কল্পনাজনিত অপরাধবোধও তখন আমাকে অল্প অল্প পীড়া দিচ্ছে। এই অপরাধ বোধ, আরবের পাবলিক লাইব্রেরির আজবতার আমোদ ইত্যাদি বিচিত্র অনুভুতি সংশ্লেষ সাথে নিয়ে হাঁটছি। পাবলিক লাইব্রেরিরর সামনের রাস্তা পার হয়ে ওপারে দেখি আরেক লাইব্রেরি? অবশ্য দেখেই বোঝা গেল যে সেটি পাবলিক লাইব্রেরি নয়। বাইরের দোকান। নাম মোস্তফা লাইব্রেরি। ভাবলাম ঢুকেই দেখি না। নির্দিষ্ট জায়গায় হাতের ব্যগদুটো রেখে ঢুকলাম। মোটামুটি বড় দোকান। উম্মুল করা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা শাখাটি নিকটে। এই নৈকট্যই বোধ হয় এখানে বড় লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে। বিষয়ভিত্তিক শেলফ। তবে সাহিত্যের শেলফ নেই। দোকানের ম্যানেজার জাতীয় লোকটির বাড়ি বাংলাদেশের খুলনায়। পুরো পরিবার নিয়ে মক্কায় থাকেন। পরিচয় হওয়ার পর অপ্রত্যাশিতরকম সমীহ করলেন। ইংরেজি সাহিত্যের বই দেখতে চাওয়ায় যা দেখালেন তা হলো আট-দশ খানা ইংরেজি ক্লাসিক উপন্যাস। ডিকেন্স, ডিফো, সুইফট ও সম্ভবত গোল্ডিং এর। আর কয়েকটি ক্লাসিকের সংক্ষেপিত ভার্সন, শেক্সপীয়রের কয়েকটি নাটকের আরবি অনুবাদসহ ইংরেজি টেক্সট দেখলাম। সাবয়া মুয়াল্লাকার ইংরেজি অনুবাদ না পেলাম পাবলিক লাইব্রেরিতে, না পেলাম এখানে। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সাহিত্যের দেশের লাইব্রেরিতে সাহিত্যের সংগ্রহ দেখে অল্প অল্প কষ্টই অনুভব হলো। মদিনা নগরীর একখানা ম্যাপ কিনে বের হলাম। মক্কার ম্যাপ কোথাও পেলাম না। পাবলিক লাইব্রেরি থেকে এতগুলো বই ফ্রি পাওয়ার আনন্দে একখানা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে রওয়ানা হলাম। পথে এক জায়গায় দেখলাম ফুটবল খেলা চলছে। শর্টপ্যান্ট পরে ছতর ঢাকার ফরজ তরক করে কাবা শরীফের একদেড় কিলোমিটার দূরে এমন বেশরিয়তি খেলা দেখে একটু ধাক্কা খেলাম। পরে মনে হলো আমরা যে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনি সে রেস্টুরেন্টে টিভিতে ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলোয় নাচগান তো সবসময়ই চলে। এই খেলার ফরজ তরকের চেয়ে ইন্ডিয়ান নায়িকাদের অজন্তা নাভির নাচের দৃশ্য কি কম বেশরিয়তি। কোন ‘কাদা-বইন্যা’র দেশ বাংলাদেশের বরিশাল থেকে এসে মক্কা নগরী নিয়ে এমন মনোভাবটি ধারণ করাই কি বেশরিয়তি নয়?

শেষে এক ইউসুফ ভাইয়ের সাথে একদিন পরিচয় হয়। তিনি ‘হোটেল প্যালেস্টাইন’-এ সম্মানজনক কোনো পদে চাকুরি করেন। একইসাথে এই টাওয়ারের একটি হোটেলে বাংলাদেশী সালমান এফ রহমানের কেনা একটি স্যুটের তত্ত্বাবধান করেন। সেই সুবাদে তিনি এই টাওয়ারে তথা উক্ত হোটেলস্যুটে আসার জন্য আমাদেরকে দাওয়াত দিলেন।

মক্কা নগরীর এই পাঁচালী এখানেই ক্ষান্ত দিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু মক্কা নগরীর এমন দীর্ঘ পাঁচালীতে ক্লক টাওয়ার বা জমজম টাওয়ার নিয়ে দুই বাক্যও না থাকলে ব্যপারটা একটু খাপছাড়াই থেকে যায় বলে মনে হচ্ছে। এটি সেই টাওয়ার যা প্রথম রাতে জেদ্দা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে মক্কা নগরীতে ঢোকার বিশ-পঁচিশ কিলোমিটার আগেই জাকারিয়া ভাই ঘুম থেকে জাগিয়ে এই টাওয়ারের ঘড়িটিকে দেখিয়েছিলেন। মুসল্লিরা একে জমজম টাওয়ার বললেও এর জনপ্রিয় নাম ক্লক টাওয়ার। পুরো কমপ্লেক্সের আসল নাম আবরাজ আল বাইত। প্রথম রাতে ২০-২৫ কিলোমিটার দূর থেকে দেথার সাথে সাথেই এটি নিয়ে একটি কৌতূহল তৈরী হয়েছিল। কিন্তু কা’বা-হেরার এই শহরে আধুনিক স্থাপত্যের কোনো বিষয়ের ওপর কৌতূহল দানা বাঁধার সুযোগ কম। প্রতিদিন কাবায় ঢোকা বের হওয়ার পথে শতবার এর দিকে তাকিয়েও মনের মধ্যে এর বড় কোনো আঁচড় টের পাইনি। শেষে এক ইউসুফ ভাইয়ের সাথে একদিন পরিচয় হয়। তিনি ‘হোটেল প্যালেস্টাইন’-এ সম্মানজনক কোনো পদে চাকুরি করেন। একইসাথে এই টাওয়ারের একটি হোটেলে বাংলাদেশী সালমান এফ রহমানের কেনা একটি স্যুটের তত্ত্বাবধান করেন। সেই সুবাদে তিনি এই টাওয়ারে তথা উক্ত হোটেলস্যুটে আসার জন্য আমাদেরকে দাওয়াত দিলেন। এক বিকালে সে দাওয়াতে উপস্থিত হলাম। সেখানেই ইউসুফ ভাইর কাছ থেকে শুনলাম এই টাওয়ার সম্পর্কে কিছু ইতিহাস ও বিবরণ। পরবর্তীতে উইকিপিডিয়া দিলো আরো অনেক তথ্যের খোঁজ। এইসব তথ্য ও বিবরণের প্রথম কথাটিই আঁতকে দেয়ার। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম এই কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাতা হলো সৌদি বিন লাদেন গ্রুপ। বিন লাদেন মানে হলো সেই ওসামা বিন লাদেনের পরিবার যার কথা শুনলে আমি আপনি-আমি তো ছার, জর্জ বুশও কেঁপে ওঠে। অবশ্য আর কাঁপাকাঁপির দরকার নেই। আমরা নিশ্চিত বারাক ওবামা তাকে সফলভাবে খতম করেছেন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যেই হোক এ ভবনের মালিকানা সৌদি সরকারের। বাদশাহ অব্দুল আজিজ এনডাওমেন্ট প্রজেক্টের অর্থে এটি নির্মিত হয়েছে। নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে, শেষ হয়েছে ২০১২ সালে। খরচ হযেছে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডালার, যা বংলাদেশি টাকায় মাত্র এক লক্ষ বিশ হাজার কোটি টাকা। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, যমুনা ব্রিজ নির্মাণে আমাদের খরচ হয়েছিলো সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। তার মানে দাঁড়ায় আবরাজ-আল-বাইত নির্মাণের টাকা দিয়ে প্রায় ২৭টি যমুনা ব্রিজ নির্মাণ করা সম্ভব। কাবা থেকে এই টাওয়ারের দূরত্ব মাত্র কয়েক মিটার। বলা যায় আবরাজ-আল-বাইত কাবার বহিরাঙ্গনেই অবস্থিত। কাবার ইমাম যে মাইকে নামাজ বা খুৎবা পড়ান তার সাউন্ডবক্স এখানের হোটেলের অনেক রুমে সংযুক্ত। তাছাড়াও কাবার ইমামতির অধীনে নামাজ পড়ার জন্য এখানে নামাজের একটি বিশাল কক্ষ রয়েছে যেখানে দশহাজার লোক একত্রে নামাজ পড়তে পারে। ‘আবরাজ-আল-বাইত’ কথাটির মধ্যে আবরাজ শব্দটি মূলত আববি বুরুজ শব্দের বহুবচন। বুরুজ অর্থ হলো উচুঁ ভবন যাকে ইংরেজি শব্দে আমরা টাওায়ার বলি। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ‘আবরাজ-আল-বাইত’ মানেই অনেকগুলো টাওয়ারের একটি কমপ্লেক্স। এখানে সাতাটি টাওয়ার রয়েছে। টাওয়ারগুলো হলো: (১) ক্লক টাওয়ার/ হোটেল টাওয়ার (২) হাজার টাওয়ার (৩) জমজম টাওয়ার (৪) মাকাম টাওয়ার (৫) কিবলা টাওয়ার (৬) মারওয়াহ টাওয়ার ও (৭) সাফা টাওয়ার। এর মধ্যে ক্লক টাওয়ার বা হোটেল টাওয়ারটিই সবচেয়ে উঁচু। এর উচ্চতা ৬০১ মিটার অর্থাৎ ১৯৭২ ফুট। এটিতে ১২০টি তলা রয়েছে। এটি বর্তমানে পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম টাওয়ার। এর চেয়ে উঁচু পৃথিবীর অন্য টাওয়ার দু’টি হলো দুবাইর ‘বুরজ খলিফা’ ও চীনের ‘সাংহাই টাওয়ার’। এর চেয়ে উঁচু টাওয়ার বিশ্বে আরো দুটি থাকলেও এই টাওয়ারে অবস্থিত টাওয়ার ঘড়িটি পৃথিবীর উচ্চতম এবং বৃহত্তম টাওয়ার ঘড়ি। আকারে এর সাথে তুলনীয় অন্য যে সকল টাওয়ার ঘড়ি রয়েছে উইকিপিডিয়া এই ঘড়ির সাথে সেই-সকল ঘড়ির আয়তনের একটি তুলনামূলক চিত্র প্রদান করেছে। সে চিত্রে দেখা যায় অন্য কোনো টাওয়ার ঘড়ি আয়তনে এর চারভাগের একভাগও নয়। এই ক্লক টাওয়ারের চার দেওয়ালেই ঘড়ির মুখ রয়েছে, যাকে বলা হয় ফোর-ফেস ক্লক। প্রতি দেওয়ালেই এর উচ্চতা ১৫১ ফুট, প্রস্থও ১৫১ ফুট। টাওয়ারের ৪৫০ মিটার উচ্চতার পরে এই ঘড়ি অংশ শুরু। আবার ঘড়ি অংশটি ১৫১ ফুট উঁচু, তার মানে শুধু ঘড়ি অংশটুকু একটি ১৬ তলা বিল্ডিং এর সমান উঁচু। ১৬ তলা বিল্ডিং সমান একটি ঘড়ি! কল্পনা করে দেখুনতো। ঘড়ি অংশের পরে একটি ৯৩ মিটার অর্থাৎ ৩০৫ ফুট উঁচু চূড়া রয়েছে। সেই চূড়ায় একটি অবজারভেশন টাওয়ার আছে, একটি চাঁদ দেখার গ্যালারি আছে এবং পুরো আবরাজ-আল-বাইতের কন্ট্রোল টাওয়ারটিও এখানে অবস্থিত। ৯৩ মিটারের এই চূড়ার উপরে ২৩ মিটার অর্থাৎ ৭৫ ফুট উঁচু একটি ঈদের চাঁদ বা ক্রিসেন্টের ভাস্কর্য রয়েছে।

অর্থ দাঁড়ায় এই যে, মক্কার আবরাজ-আল-বাইতের চূড়ার ওপর স্থাপিত চাঁদের ভাস্কর্যটি তৈরি করতে যে টাকা খরচ হয়েছিল তা দিয়ে বাংলাদেশে অন্তত দশটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা যায়।

আবরাজ-আল-বাইতের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ছিল বিন লাদেন গ্রুপ এবং স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর দায়িত্বে ছিলো দার আল-হানদাস। কিন্তু এর ঘড়ি অংশ, চূড়া ও ক্রিসেন্ট মুনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ছিল ভিন্ন। ঘড়ি অংশের ডিজাইনার ছিলো জার্মান ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদ বোদো রাস্ক (Mahmoud Bodo Rasch) এবং ঘড়ির নির্মাতা ছিলো জার্মান প্রতিষ্ঠান PERROT Gmbtt & Co.। ঘড়ির পরের ৯৩ মিটার উঁচু চূড়া ও চাঁদের ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছে দুবাইর প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার কম্পোজিট টেকনোলজি। চাঁদের নির্মাণ উপাদান রূপে ব্যবহৃত হয়েছে ফাইবার গ্লাসের ওপর মোজাইক গোল্ড। চাঁদটির ওজন ৩৫ টন। এই চাঁদটির নির্মাণ খরচ পড়েছিল বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৮৯ কোটি টাকা। উল্লেখ করা যেতে পারে, এই চাঁদের নির্মাণকালীন সময়ে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ সরকার কবি নজরুল বিশ্বদিবদ্যালয় নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেছিল ১৬ কোটি টাকায়। অর্থ দাঁড়ায় এই যে, মক্কার আবরাজ-আল-বাইতের চূড়ার ওপর স্থাপিত চাঁদের ভাস্কর্যটি তৈরি করতে যে টাকা খরচ হয়েছিল তা দিয়ে বাংলাদেশে অন্তত দশটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা যায়। চাঁদটিকে দশ টুকরা করে দুবাই থেকে মক্কা আনা হয়েছিল। চাঁদের নিচে চূড়ায় স্থাপিত হয়েছে কাবার আজানের লাউড স্পিকার। সাত থেকে দশ কিলোমিটার দূর থেকে এই আজানের শব্দ শোনা যায়। এই চূড়ায় প্রজ্জ্বলিত একুশ হাজার ইলেকট্রিক বাতি রাতে অন্তত ত্রিশ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আলো ছড়ায়। আর চূড়ার নিচের ঘড়িটিতে কম করে হলেও ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে সময় দেখা যায়। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই টাওয়ারের নির্মাণের সূচনাপর্বটি কিন্তু খুব গৌরবের বা প্রশংসার ছিলো না। এটি যে স্থানে নির্মিত হয়েছে সেখানে বুলবুল নামে একটি পাহাড় ছিল এবং পাহাড়ের ওপর ছিল তুর্কী সুলতানদের আমলে মক্কার শরীফ অর্থাৎ গভর্নর সুরোর বিন মুসায়েদ কর্তৃক ১৭৮১ সালে নির্মিত একটি সুরম্য দুর্গ। দুর্গটি নির্মিত হয়েছিলো কাবা শরীফের নিরাপত্তা বিধানের স্বার্থে। তবে কাবার নিরাপত্তা বিধানের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে দুর্গটি সৌন্দর্যে, সৌকর্যে ও আড়ম্বরে ছিলো যথেষ্ট প্রণিধানযোগ্য। সৌদি সরকার এই দুর্গ ও পাহাড় ভেঙে গুড়িয়ে ধূলায় মিশিয়ে দিয়ে তার ওপর নির্মাণ করেছে এই আবরাজ-আল-বাইত। বেশিরভাগ মানুষেরই মত, এই নির্মাণের মধ্য দিয়ে তুর্কী স্থাপনা ও ইসলামী হেরিটেজে তুরস্কের অবদান বিনাশ করতে সৌদি সরকারের যে প্রচ্ছন্ন পরিকল্পনা রয়েছে তা আরো এক ধাপ সফল হলো। তবে পরিপূর্ণভাবে না জেনে কোনো নিন্দাবাচক মন্তব্য না করাই ভালো। এইসব বিষয়ে দীর্ঘ কথাবার্তার পরে ইউসুফ ভাইর মতামতও অবশ্য এমনটাই ছিলো। (চলবে) আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন- যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৮ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৭ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৬ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৫ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৪ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-৩ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-২ যবনের তীর্থদর্শন | মুহম্মদ মুহসিন | পর্ব-১

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।