সকাল ০৮:৩৪ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

'লাশে নয়, স্বাধীনতাবিরোধী চেতনায় জুতা মেরেছি'

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

তিনি ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে বলেছিলেন, গোলাম আযমের জানাজা বায়তুল মোকাররমে হতে দিব না। শেষ পর্যন্ত রুখতে পারেননি জানাজা। তবে জুতা ছুড়েছেন ঠিকই। ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটাই কথা শোনা যাচ্ছে, তিনি একাই জাতিকে রক্ষা করেছেন বড় লজ্জার হাত থেকে। নাম তার মাহমুদুল হক মুন্সী বাঁধন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রাজপথের পরিচিত মুখ ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার জামায়াত-শিবির কর্মীর সামনেই জুতা ছুড়ে মেরেছেন গোলাম আযমের লাশবাহী গাড়িতে। বললেন, এই জুতা গোলাম আযমের লাশে মারা হয়নি, এটি মারা হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী চেতনায়।

২৫ অক্টোবরের সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কথা বললেন বাঁধন। কথা বলেছেন গণজাগরণ মঞ্চের বর্তমান অবস্থা এবং মঞ্চ থেকে নিজের সরে আসার কারণ সম্পর্কেও। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক মিজানুর রহমান।

 

বাংলা ট্রিবিউন: গোলাম আযমের জানাজা বাইতুল মোকাররমে হবে এমন ঘোষণা আসার পর অনলাইনে ক্ষোভ দেখা গেলেও সেই অর্থে ঐক্যটা দেখা যায়নি। ওই অবস্থায় আপনি কীভাবে ইভেন্টের ডাক দিলেন? আপনার সঙ্গে কারা সেখানে উপস্থিত হয়েছিল?

বাঁধন: ২৪ অক্টোবর রাতে চিন্তা করেছি দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের জানাজা আমাদের জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমে কেন হবে? এই চিন্তা থেকে রাত ১২টার সময় আমি 'রাজাকার গোলাম আযমের জানাজা বায়তুল মোকাররমে হতে দেব না' নামে একটি ইভেন্ট খুলি। সিদ্ধান্ত নিই, আমরা মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে হাতে জুতা বা স্যান্ডেল নিয়ে প্রেসক্লাব হতে মিছিল নিয়ে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইটে অবস্থান নিব। আমি ছাড়াও সেখানে ব্লগার অমি রহমান পিয়াল ছিলেন, ছিলেন ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন একটিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান) ও ছাত্র মৈত্রীর কয়েকজন কর্মী মিলিয়ে ১৫-২০ জন। আমরা প্রেসক্লাবের সামনে জড়ো হই। আমি নিজে কোনও সংগঠনের ব্যানারে যাইনি। প্রেসক্লাবের সামনে যেয়ে আমরা ইসলামী ঐক্যজোটকে পাই। এরপর সবাই মিলে মিছিল নিয়ে পল্টন মোড়ে গেলে পুলিশ আটকে দেয়। এরপর সেখানেই অবস্থান নিই।

যখন দেখলাম আমরা একেবারে অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখছি গোলাম আযমের লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। পুলিশ ও সহযোদ্ধাদের ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে 'জয় বাংলা' বলে মিছিলের একদম কাছাকাছি গিয়ে জুতোটা গোলাম আযমের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের দিকে ছুড়ে মারি।

badhon-1

বাংলা ট্রিবিউন: গোলাম আযমের লাশ কীভাবে আনা হয়েছিল?

বাঁধন: দেখলাম ৫০-৬০টা মোটরসাইকেলের পেছনে হাজারখানেক লোকের একটি মিছিল সহযোগে অ্যাম্বুলেন্সে করে গোলাম আযমের লাশ আনা হচ্ছিল। অ্যাম্বুলেন্সটি জামায়াত শিবিরের কর্মীরা ঘিরে রেখেছিল। আমি আগেই স্যান্ডেল খুলে হাতে নিয়েছিলাম ঘৃণা প্রদর্শনের জন্য। কিন্তু যখন দেখলাম আমরা একেবারে অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখছি গোলাম আযমের লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। পুলিশ ও সহযোদ্ধাদের ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে 'জয় বাংলা' বলে মিছিলের একদম কাছাকাছি গিয়ে জুতোটা গোলাম আযমের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের দিকে ছুড়ে মারি।

বাংলা ট্রিবিউন: জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা আক্রমণ করেছিল?

বাঁধন: ওরা আসলে প্রথমে বুঝতে পারেনি কী হয়ে গেল। বুঝতে পেরে আমাকে আক্রমণ করলে আমি পুলিশের গায়ের উপর পড়ে যাই। এরপর মৃত্যু অনিবার্য দেখেও ঘুরে দাঁড়াই।

বাংলা ট্রিবিউন: উদ্ধার করে নিয়ে আসার পর সহযোদ্ধাদের প্রতিক্রিয়া কেমন দেখলেন?

বাঁধন: আমাকে উদ্ধার করে প্রেসক্লাবের সামনে আনার পর আমি সহোযোদ্ধাদের সকলের চোখেই পানি দেখেছি। সবার ভেতরেই জানাজা না ঠেকাতে পারার আক্ষেপ ছিল।

বাংলা ট্রিবিউন: এর মাঝে একটা বিতর্ক উঠেছে অনলাইনে, অনেকে প্রশ্ন তুলছেন লাশের ওপর জুতা মারা কতটা নৈতিক? এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

বাঁধন: গোলাম আযমের লাশ শুধু একটি মৃতের লাশ নয়। গোলাম আযমের লাশকে কেন্দ্র করে তারা একটি রাজনৈতিক শো-ডাউন করতে চেয়েছিল। আর আমি কিন্তু গোলাম আযমের লাশে জুতাটা মারিনি। মেরেছি যুদ্ধাপরাধী সংগঠনগুলোর চেতনায়।

বাংলা ট্রিবিউন: জুতাটি মারার পর স্যোশাল মিডিয়ায় তো আপনি ব্যাপক অভিনন্দনে সিক্ত হয়েছেন। পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

বাঁধন: আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাকে সবসময়ই উৎসাহ দিয়ে এসেছেন। জুতা মারার ঘটনা জানতে পেরে বাবা শুধু ওখানকার নিরাপত্তার বিষয়েই জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আর পরিবারের ভেতর আমার জন্য এক ধরনের টেনশন সবসময়ই কাজ করে। আর দেশ ও দেশের বাইরে থেকে হুমকি-ধামকি নিয়মিতই পাচ্ছি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার পরিবারকে কী কোনও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বা হেনস্তা করা হচ্ছে?

বাঁধন: এটা আসলে হুমকির পর্যায়ে না। আমার পরিবারের সদস্যদের জামায়াতি মন মানসিকতার লোকজন কটাক্ষ করছে। অনেকে বলছে এই কাজের শাস্তি একদিন হবে। তবে আমার পরিবারের সবাই বিশ্বাস করেন আমি যা করেছি ঠিক কাজটিই করেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: জানাজা ঠেকানোর বিষয়ে গণমানুষের সাড়া এখন আর নেই কেন?

বাঁধন: আমি দীর্ঘদিন ধরে গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে জড়িত নেই, তবে আমার মনে হয় গণজাগরণ মঞ্চের আদর্শ বিচ্যুতির কারণে সাধারণ মানুষের মনে এ ধরনের আন্দোলনের ওপর একটা অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এর অনেক কারণ রয়েছে যেমন, গোলাম আযমের জানাজার সময় গণজাগরণ মঞ্চ তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা না করে 'অভিশাপ দিচ্ছি' নামে একটি হাস্যকর কর্মসূচি পালন করেছে। আমার মতে অভিশাপ তারাই দেয় যাদের আসলে কিছু করার ক্ষমতা থাকে না। পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে আনা ঠেকানোর আন্দোলনের সময় গণজাগরণ মঞ্চের অবস্থান দেখেও আমার মনে হয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ আদর্শচ্যুত হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: সবশেষে জানতে চাইবো, বাকি এক পাটি জুতা কোথায়?

বাঁধন: নিজের কাছে সযত্নে রেখেছি। পরে কখনও প্রদর্শনের জন্য যদি কোনও মিউজিয়াম চায়...।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।