রাত ১০:০৯ ; রবিবার ;  ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯  

যবনের তীর্থদর্শন । মুহম্মদ মুহসিন । পর্ব-৮

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আমার এই কাদামাটির অনুভব লজ্জাজনকভাবে আরও একটি ঘটনা থেকে স্মরণ করতে হচ্ছে। সেটি ছিল হেরার গুহায় ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে। পাকিস্তানি ড্রাইভার ড. সিন্ধির স্মৃতি মাথায় নিয়ে, আর ট্যাক্সিতে না গিয়ে, রুট অনুযায়ী বাসে চড়ে ও হেঁটে পৌঁছেছিলাম জাবালে নূরে। পাহাড় জাবালে নূরের চূড়া থেকে একটু নিচুতে দুনিয়া বিখ্যাত এই হেরা গুহা। আমি ও জাকারিয়া ভাই সকাল সকাল পৌঁছলাম জাবালে নূরের পাদদেশে, যাতে রোদ চড়ার আগে চূড়ায় ওঠা সম্ভব হয়। জাবালে নূরে ওঠা আর সাধারণ ভাবে পাহাড়ে ওঠা একেবারে এক কথা নয়। জাবালে নূরে ওঠা আর কোনো টাওয়ারের সিড়ি ভাঙা বরং সমার্থক। জাবালে নূরে পাথরের পর পাথর সাজিয়ে পাহাড়ের পুরো পথটাই এখন প্রায় এক সিঁড়িতে রূপান্তর করা হয়েছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই হলো। পুরো পথে দুই জায়গায় আরোহীদের বিশ্রাম নেয়ার মতো বসার জায়গা রয়েছে। সেখানে কফি পেপসি জাতীয় সতেজীকরণ ড্রিংকসের ব্যবস্থাও রয়েছে। অবশ্য বিনা পয়সায় নয়। সতেজীকরণের যাহা নেই তাহা হলো শুধু এক দমকা সুনির্মল বাতাস কিংবা ছায়াদায়ী কোনো বৃক্ষ। সারাটা পাহাড় জুড়ে শুধুই পাথর। মাঝে মাঝে মরা মরা কিছু আগাছা জাতীয় গুল্ম। এতটুকু চোখ জুড়ানো সবুজ কোথাও নেই।

হয়তো আমিও পাচ্ছিলাম সেই পাথরের স্পর্শ যে পাথর বুকে আগলে ধরে আছে রাসুল(সঃ) এর স্পর্শের পবিত্র স্মৃতি। এই অনুভবে মাঝে মাঝেই শিহরিত বোধ করছিলাম এবং উঠে চলছিলাম এমন সঞ্জীবিত শক্তিতে যে এক সময় দেখলাম জাকারিয়া ভাই আমার অনেক পিছনে পড়ে আছেন

যাক সে কোনো হাস্রতের বিষয় নয়। উঠছি সেই পাহাড়ে যে পাহাড়ের গুহায় মহানবী (সঃ) ৬০৮ খৃস্টাব্দ থেকে ৬১০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত দিনের পর দিন ধ্যান করেছেন এবং যে পাহাড় বেয়ে উঠে হযরত খাদিজা তাঁর জন্য দিনের পর দিন খাবার দিয়ে আসতেন। যাচ্ছি সেই গুহা দেখতে যেখানে ধ্যানস্থ অবস্থায় মুহম্মদ (সঃ) এর ওপর হজরত জিব্রাইল এসে পৃথিবীর বুকে নাযিল করেছিলেন মহান কুরআনের প্রথম আয়াত- ‘ইক্বরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক’। এই বিষয়াবলি মনে ও চোখে ভেসে উঠতেই অনুভব করছিলাম এক উজ্জীবনী আনন্দ। হয়তো আমিও পাচ্ছিলাম সেই পাথরের স্পর্শ যে পাথর বুকে আগলে ধরে আছে রাসুল(সঃ) এর স্পর্শের পবিত্র স্মৃতি। এই অনুভবে মাঝে মাঝেই শিহরিত বোধ করছিলাম এবং উঠে চলছিলাম এমন সঞ্জীবিত শক্তিতে যে এক সময় দেখলাম জাকারিয়া ভাই আমার অনেক পিছনে পড়ে আছেন।

উঠতে উঠতে প্রথম বিশ্রাম পয়েন্টে পৌঁছে গেছি। একটু বসলাম। জাকারিয়া ভাইকে দেখা যাচ্ছে বেশ নিচুতে। বসে ঘন শ্বাসটা পাতলা হতে দিলাম এবং বিশেষ করে ‘আবরাজ আল বাইত’ বা ক্লক টাওয়ারের দিকে তাকালাম। এর মধ্যে হঠাৎ পাশে খাস বাংলা কথা শুনে মাথা ঘুরালাম। মাথা ঘুরালাম ঠিকই, কিন্তু ঘুরায়ে সে মাথা স্থির রাখতে পারছিলাম না। কথা যা শুনছি সে যে খালি বাংলা তা-ই নয়, সে একেবারে খাস বাংলার চেয়েও খাস বাংলা, খাস বরিশালের কালাম যাকে বলে। সে কথার বক্তা আমার পাশে পবিত্র জাবালে নূরে বিশ্রাম পয়েন্টে মাটিতে বসে তসবিহ পাথর আতর সুরমা ইত্যাদির দোকান সাজিয়ে কোনো এক দুর্বল চিত্তের ধার্মিক ক্রেতার জন্য বসে আছে। আর যাকে উদ্দেশ্য করে সে কালাম চলছে সে নিশ্চিত এক রমণী এবং সেই রমণী-শ্রোতা সুদূর বাঙাল মুলুকের কোনো এক গ্রাম-গঞ্জের পুকুর পাড়ে বা চুলার ধারে হয়তো বসে আছে। সেই পুকুর পাড়ে বা চুলার ধারে বসে বসে সে দূরদেশের তার সাধের প্রেমিকের কাছ থেকে কোনো বরিশাইল্যা বাৎসায়নের কামসূত্র শিখছে।

জাবালে নূরের পবিত্রতা হরণে আর এক বরিশালের পয়জার এ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে- এই আশংকায় খুব তাড়াতাড়ি ছুটলাম। ওপরের দিকে ছুটছি আর ভাবছি জাবালে নূরের পবিত্র পাথর এত পবিত্র কেন যে তারা ঐ বরিশালের মালের মতো ইতরদের বিহিত করতে তাদের মাথা বরাবর একের পর এক ছুটে আসে না?

আর এই শেখাশিখি কিংবা কথাকথি হচ্ছে কথার যন্ত্র মোবাইলে। যে কামসূত্রের কালাম মোবাইলে খাস বাংলায় পরিবেশিত হচ্ছে জাবালে নূরে দাঁড়িয়ে সেই কালাম শুনে মাথা স্থির রাখা খুবই কঠিন। হয়তো তার ধারণা তার এই খাহেশি ও বাৎসায়নী কালাম জাবালে নূরে ভ্রাম্যমান আরবী, ইরানী, তুর্কী জনতা কেউই এক অক্ষরও ঠাহর করতে পারবে না। সুতরাং তার ভয় কিংবা দ্বিধা কিসের? তাইতো নিঃসংকোচে চলছে খাস বরিশাইল্যা বেশরম অশ্লীলতায় ছয়লাব তার যৌনালাপী কালাম। কিন্তু সেই নিঃশঙ্ক ও নিঃসংকোচ উচ্চারণের মাঝে এক উটকো অঘটন হয়ে দাঁড়ালো আরেক বরিশালের পয়জার- আমার- উপস্থিতি। এই বরিশালের মালের দিকে মাথা ঘুরিয়ে মাথাকে সেই দিকে ধরে রাখা সত্যিই আমার আর সম্ভব হলো না। জোর পায়ে আবার উঠে পড়লাম। পাছে এই বরিশালের মাল টের পেয়ে যায় যে, জাবালে নূরের পবিত্রতা হরণে আর এক বরিশালের পয়জার এ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে- এই আশংকায় খুব তাড়াতাড়ি ছুটলাম। ওপরের দিকে ছুটছি আর ভাবছি জাবালে নূরের পবিত্র পাথর এত পবিত্র কেন যে তারা ঐ বরিশালের মালের মতো ইতরদের বিহিত করতে তাদের মাথা বরাবর একের পর এক ছুটে আসে না?

আমাকে বিশ্রামপয়েন্ট থেকে এতো তাড়াতাড়ি উঠে যেতে দেখে জাকারিয়া ভাই হয়তো ভেবেছেন আমি নিশ্চিত কোনো এক আধ্যাত্মিক শক্তিতে এতোটা বলীয়ান হয়ে উঠছি। আমি ভাবছিলাম এই মিথ্যা ভাবাও হয়তো ভালো, সত্যিকারে যা ঘটেছে তা বুঝে ওঠার চাইতে। সেই না বোঝানোর স্বার্থেই আমি তখন জোরকদম চলছি। সেই জোরে বিশ পচিশ মিনিটের মধ্যেই আমি পৌঁছে গেলাম জাবালে নূরের সর্বোচ্চ বিন্দুতে। হেরা গুহায় যেতে অবশ্য জাবালে নূরের সর্বোচ্চ বিন্দু পার হয়ে ঘুরে অন্য পথে নিচে নামতে হয়। সেই পথে নামতে একটি বিশাল পাথরের চাঁইয়ের নিচ দিয়ে যেতে হয়। জানিনা মহম্মদ (সঃ) কেও এই পথে যেতে হতো কি-না। পাথরের সেই ছোট্ট সুড়ঙ্গ পথ পার হয়ে একটু আগাতেই দেখলাম আমি একটি লাইনের সবার পিছনের জন হিসেবে দাঁড়িয়েছি। লাইনটি প্রায় নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। তিন-চার মিনিট গেলে লাইনটি একটু নড়েচড়ে ওঠে, এক দেড় ফুট আগায়। এরপর আবার ঝিমিয়ে পড়ে। সামনে কী রয়েছে এবং কী ঘটনায় এই ঝিমিয়ে পড়া তা তখনো আমি বুঝে উঠতে পারছি না। এর মধ্যে দেখলাম আমি লাইনে একেবারে পিছনের জন আর নেই। পিছনে জনতিনেকের একটি দল এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে যিনি ঠিক আমার পিছনে দাঁড়িয়েছে তিনি একজন মধ্যবয়সী মহিলা। মুখ খোলা রেখে হিজাব পরিহিত। চেহারায়, ত্বকের উজ্জ্বলতায় ও দৈহিক উচ্চতায় মনে হলো মহিলা লেবানীজ বা সিরিয় জাতিগোষ্ঠির হবেন। তার পেছনের দু’জন ভদ্রলোকে প্রায় তার বয়সেরই। সবাই একই জাতিগোষ্ঠির লোক হবে বলে মনে হলো।

কিন্তু আমি যতোই এভাবে সামনে এগিয়ে পিছনের সাথে একটু দূরত্ব তৈরী করতে চাই, হেরা গুহার মতো পবিত্র স্থানের প্রতি প্রেম ও আকর্ষণ আমার পিছনের রমণীকে ততোই টেনে আনে সামনের দিকে এবং তিনি যেন তার শরীরটির ওজন ও আকারের গুরুত্ব অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার হকদার এই কথা বোঝাতে আমার এই পুচকে অস্তিত্বের ওপর তার শরীরখানা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যান

আমি এবার একটু সচকিত ও সচেতন। আমার পিছনে একজন সুন্দরী লেবানীজ রমণী। সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি পবিত্র হেরা গুহার অল্প দূরে। আমি এমন ভাবে দাঁড়াতে চাই যাতে এই মহান পবিত্র স্থানের সবটুকু পবিত্রতা রক্ষিত হয়। যতোটা পারি আমার জানা শরীয়তি বিধান মোতাবেক পাশাপাশি দাঁড়ানো দুজন নারী ও পুরুষের জন্য বিহিত সর্বতো পর্দা বা হিজাব রক্ষা করে আমি দাঁড়াতে চাই। বাঙ্গালি সন্তান হিসেবে সৃষ্টিকর্তাই আমাকে যথেষ্ট সংকুচিত একখানা মনুষ্য শরীর দিয়েছেন। সেখানাকে আমার সাধ্যমতো আরো সংকুচিত করে সামনের পুরুষ ব্যক্তির শরীরের সাথে সম্পূর্ণ মিশে গিয়ে আমি দাঁড়াতে চাই। কিন্তু আমি যতোই এভাবে সামনে এগিয়ে পিছনের সাথে একটু দূরত্ব তৈরী করতে চাই, হেরা গুহার মতো পবিত্র স্থানের প্রতি প্রেম ও আকর্ষণ আমার পিছনের রমণীকে ততোই টেনে আনে সামনের দিকে এবং তিনি যেন তার শরীরটির ওজন ও আকারের গুরুত্ব অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার হকদার এই কথা বোঝাতে আমার এই পুচকে অস্তিত্বের ওপর তার শরীরখানা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যান। তার রূহানি জযবা হয়েতো এতো শক্তিমান যে তিনি অনুভবই করছেন না তার শরীরটি সেঁটে আছে যার শরীরের সাথে সে কোনো বেগানা পুরুষ মানুষ জাতের কিছু। হয়তো আমার বানর সাইজের পুঁচকে বাঙালি শরীরটিকে একটা ধেড়েমার্কা শিশু শরীরের চেয়ে বেশি কিছু মনেই হয়নি তার। যেমনটা ঘটেছিল ব্রবডিঙনাগিয়ান দেশে গালিভারের ক্ষেত্রে। চল্লিশ ফুট উচ্চতার নয় বছরের এক মেয়ে ইংল্যান্ডদেশীয় সক্ষম সোমত্ত ত্রিশবর্ষীয় পুরুষ গালিভারকে হাগাচ্ছে মুতাচ্ছে ন্যাংটো করছে কাপড় পরাচ্ছে কিন্তু কখনো মনেই করছে না যে সে এগুলো করছে একটি সোমত্ত পুরুষ জাতের শরীর নিয়ে। তুলনাটি একটু ফুলানো ফাঁপানো হয়ে গেল হয়তো। কিন্তু আমার পিছনের লেবাননী মহিলার আচরণে গালিভারের অভিজ্ঞতার নয় বছরের মেয়েটির আচরণের সাথে সাদৃশ্য ছিল যা আমি কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারছি না।

কিন্তু আমি তো দক্ষিণ বাংলার কাদাজলের মানুষ। এখানে নারীর শরীরের স্পর্শ এক রকম দাগ কাটে, পুরুষের শরীর আরেক রকম, বিশেষ করে সে নারী যদি পারিবারিক পরিচয়-নিবিড়তায় রক্তের সম্পর্কের মতো আপন কেউ না হয়। আমার পিছনে দাঁড়ানো লেবাননী নারীর শরীরকে আমি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাই নারীশরীরের বাইরে কোনোরূপে অনুভব করতে পারিছিলাম না। আমার কষ্ট হচ্ছিলো। দেখলাম তিনি আরবিতেও কথা বলেন, ইংরেজিতেও বলেন। তিনি ইংরেজি বলছেন দেখেও আমি তার সাথে একটিও কথা বললাম না, পাছে নিজের কাছেই মনে হতে শুরু করে যে, আমি তার সাথে কথা বলতে বিশেষ আগ্রহ পোষণ করছি কারণ সে নারী। আমি সরে গিয়ে দুজনের পিছনে গিয়ে দাঁড়াই না, পাছে ভদ্র মহিলার মনে হতে পারে আমি একটি নারীশরীররের স্পর্শে এমন করছি যার মানে খুব ঠুককো ঈমান আমার। এমন শত প্রচেষ্টায় নিজের ঈমানে ও অনুভবে বিশেষ দার্ঢ্য অর্জনের চেষ্টা করছি এবং বারবারই অনুভব করছি জল-কাদা বর্ষার দেশের মানুষের এই দার্ঢ্য একটি অসম্ভব বিষয়।

ফজিলত যেহেতু হাদীস-কোরানে নেই এর প্রতি রমণীসুলভ (বরিশালের বাংলায় ‘মাইগ্যা জাতের’) কোনো বাসনাও আমার নেই। তাই আমি আর এগোবো না সিদ্ধান্ত নিলাম। লাইন থেকে বের হয়ে এলাম। এভাবে লাইন থেকে বের হয়ে আসতে দেখে অনেকেই চোখ গোল গোল করে আমার দিকে তাকালো

এভাবেই একসময় গুহার কাছাকাছি চলে আসি। সামনে তিন চার জন মানুষ পার হলেই আমি গুহার ভেতরে চলে আসতে পারবো। কিন্ত যে গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য এতো ঈমানী প্রচেষ্টা তার ভেতরটা তো এতক্ষণে দেখাই যাচ্ছে। যারা অভ্যন্তরে ঢুকছে তারা সেখানে দুরাকত নামাজ পাড়ছে। ওপরটা পাথরে ঢাকা বলেই এটিকে গুহা বলতে হচ্ছে। কিন্তু ভেতরটা একেবারে সমতল ও মসৃণ পাথর। ওপরের পাথরটাকে একটি কুঠুরির ওপরের ছাদ বলাই বেশী সংগত মনে হলো। বুঝলাম কেন লাইনটি এগোচ্ছিল না। কারণ ভিতরে দু’টি মাত্র জায়নামাজ বিছানো। সেখানে ভালোভাবে একজন এবং গাদাগাদি করে দুজনের বেশি একত্রে নামাজ পড়া সম্ভব নয়। দুজন দুজন করে নামাজ পড়ে বের হচ্ছে আর একটু একটু করে লাইন এগোচ্ছে। আমি দেখে ফেলেছি এবং অনুভব করলাম হেরা গুহা নিয়ে আমার ঔৎসুক্যও নিবৃত্ত হয়েছে। ওর ভেতরে ঢুকে নামাজ পড়ার বিশেষ কোনো ফজিলত যেহেতু হাদীস-কোরানে নেই এর প্রতি রমণীসুলভ (বরিশালের বাংলায় ‘মাইগ্যা জাতের’) কোনো বাসনাও আমার নেই। তাই আমি আর এগোবোনা সিদ্ধান্ত নিলাম। লাইন থেকে বের হয়ে এলাম। এভাবে লাইন থেকে বের হয়ে আসতে দেখে অনেকেই চোখ গোল গোল করে আমার দিকে তাকালো। কয়েকজন আরবিতে কিসব বললো ও হাসলো, কিছুই বুঝলাম না। আমার পিছনের লেবাননী বা সিরিয় তিন জনের পুরুষ একজন বললেন- 'Then why been waiting so long’! কিছুই বললাম না এবং ভাবলাম যেনো কিছুই বুঝিনি। আর ভিতরে ভিতরে ইংরেজি কথাটির ক্রিয়ার অবাঙালিসুলভ গঠনটি ভালোই লাগলো। আমি প্রত্যুত্তরে কিছু না বললেও দেখলাম- আমার পিছনের মহিলা প্রতিক্রিয়া জানালেন। তিনি বললেন - You should rather appreciate. He has saved our time। মনে মনে রমণীকে ধন্যবাদ জানালাম। জানিনা এই ধন্যবাদের মধ্যেও ফ্রয়েডীয় কোন গন্ধ আছে কিনা।

বের হয়ে এলাম। বের হয়ে এলাম হেরা গুহা থেকে। এই গুহায় মহম্মদের (দ:) ধ্যান-অনুধ্যান থেকে কায়েম হলো যে জীবন ব্যবস্থা পৃথিবীর সাতটি মহাদেশে শত কোটী মানুষ আজ সেই জীবন ব্যবস্থাকে ধারণ করছে। আর সেই গুহা থেকে বের হলাম আমি- ভাটির দেশের বাঙ্গাল- অনুভব করতে পারলাম না কিছুই- অর্জিত হলো না ধ্যান অনুধ্যানের এক কণাও। সাধে কি কয়?- গজাল দেশে থাকলেও গজাল, বিদেশে গেলেও একই গজাল।

হোটেলে এসে এই নিয়ে ভেবে ভেবে ঠিক করলাম ফজিলতের জায়গা ছেড়ে এবার কিছু আম যায়গায় যাবো। আওয়ামীলীগের দেশের আম পাবলিক হিসেবে সেটিই হয়তো আমাকে বেশি মানাবে। আর আম মানুষ হিসেবে আম জায়গায় আমে আমে একটি ফজলি বা ফজিলতি ভাব উপজাত আকারে তৈরী হয়েও যেতে পারে। এমন ভাবনার মধ্যেই জাকারিয়া ভাই এক বিকালে বললেন - ‘চলেন, জেদ্দা থেকে বেড়িয়ে আসি’। আমি দেখলাম জেদ্দা একেবারেই আম জায়গা। যেই বলা, সেই কাজ। বাবাকে ‘ঘুরে আসি’ বলে নেমে পড়লাম। মক্কা থেকে জেদ্দা বাস যায়। আবার জনপ্রতি ভাড়া সিসেবে ট্যাক্সিও যায়। একেবারে কাবার সামনে থেকে। উঠলাম ট্যাক্সিতে। অনেক ডেকেডুকেও আর যাত্রী না পাওয়ায় আমাদের দুজন নিয়েই ট্যাক্সিওয়ালা যাত্রা শুরু করলো। জোহর কাবা শরীফে পড়ে সাথে সাথে রওয়ানা হলাম আর আসরের জামাত শেষ হওয়ার বেশ পরে পৌঁছলাম জেদ্দা। তার মানে ট্যাক্সি খুব দেরি করেছে তা নয়। আসল কাহিনিটি অন্যত্র। আরবে যখন আসরের আজান দেয় আমাদের দেশের সিস্টেমে বেলাটা তখনো ভর জোহর। আমাদের দেশে আমরা হানাফি মাজহাবের হিসাবে যে নিয়মে জোহরের নামাজের সময়সীমা মাপি তা হলো কোনো বস্তুর নিজ দৈর্ঘ্যের দ্বিগুণের সাথে ঐ বস্তুর মধ্যাহ্নের ছায়া যোগ করে যে পরিমাণ দৈর্ঘ্য হবে বিকালে বস্তুর পূর্বমুখী ছায়াটি ঐ পরিমাণ লম্বা হওয়া পর্যন্ত জোহরের নামাজের সময় থাকবে। সে নিয়মে আমরা যখন জেদ্দা পৌঁছেছি তারপর আরো অন্তত একঘন্টা পর্যন্ত জোহরের ওয়াক্ত থাকে। কিন্তু মক্কা-মদিনা-জেদ্দায় জোহরের সীমা এভাবে মাপে না বলেই অনেক আগেই তাদের আসর হয়ে যায়। এবিষয়ে সম্ভবত আমাদের দেশের আহলে হাদীস গ্রুপের মাপ আর মক্কামদিনার মাপ একজাতের। এদের দুদলেরই আসর খুব তাড়াতাড়ি শুরু হয়, মাগরিবও। দেশে বসে আমাদের হানাফিরা আহলে হাদীসের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে, কিন্তু মক্কামদিনা গিয়ে তারাই আবার আহলে হাদীস কায়দায় অনেক জওক-শওকের সাথে আসর মাগরিব এবং অন্যান্য নামাজ আদায় করে। তখন সমস্যা হয় না।

জেদ্দায় জনৈক খালেদ আমাদেরকে রিসিভ করবেন এমনটিই ছিল জাকারিয়া ভাইর আয়োজন। বানারিপাড়া বা এদিকে কোথাও খালেদের বাড়ি। খালেদ সাহেব জাকারিয়া ভাইর মোটামুটি কাছেরই কোনো আত্মীয় হবেন। চিটাগাঙেরর ভাষায় বলা যায় ‘আত্মীয়-ফান’। এই ‘আত্মীয়-ফান’ খালেদ জাকারিয়া ভাইকে হয়তো অনেকবারই জেদ্দায় দাওয়াত দিয়েছেন। জাকারিয়া ভাইর কবুল করা হয়নি। সেই দাওয়াতই আজ জাকারিয়া ভাই আমাকে নিয়ে কবুল করতে যাচ্ছেন। বোধ হচ্ছিল জাকারিয়া ভাইর প্রত্যাশা যে, খালেদের কাছ থেকে খুব ঐশ্বর্যময় এক Treat তিনি পাবেন। পরবর্তীতে মনে হলো মি. খালেদেরও ভাবনা তিনি বেশ বড়লোকি কায়কারবারে জাকারিয়া ভাইকে চমকে দিবেন। এই দুই চমক বাসনার মাঝে আমাকে নিজেকে বেশ ভাগ্যবানই মনে হচ্ছিলো।

কোনো কারণে গাড়ি ওয়ার্কশপে নিতে হয়েছিল বলে খালেদ সাহেবের আসতে একটু দেরি হলো। মাগরিবের পরপরই তিনি গাড়ি নিয়ে আমরা যেখানে অপেক্ষা করছি সেখানে হাজির। গাড়ি তিনি নিজেই ড্রাইভ করছেন। আমরা উঠলাম। গাড়ি ছুটলো লোহিত সাগরের দিকে। কিছুক্ষণেই আমরা জেদ্দা শহরকে ডানে রেখে লোহিত সাগরের পাশ ধরে ছুটছি। মরুভূমির দেশ, অথচ এখানে ঠাণ্ডা বাতাস। দূরে সাগরে হরেক রকম আনন্দ-আয়োজন, হরেক রকম ছোটাছুটি। প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ কিলোমিটার চলে গাড়ি থামলো এক জায়গায়। সেখানে পার্কিং আছে। সাগরের পানিকে নিচে রেখে ওপরে গড়ে উঠেছে অনেক রেস্তোরাঁ ও কুইজিন। ভাবেই বোঝা যায় রেস্টুরেন্টগুলো বেশ দামীই হবে।

হয়তো ভাবতেন ‘আর ফিরে যাবো না, সাগরের আজদাহা ঢেউয়ের কাছে প্রাণটা বেঘোরে ফিরে দেয়ার চেয়ে এই পুণ্যভুমিতে ধুঁকে-ধুঁকে দেহদান অনেক অনেক শান্তির- অনেক নিরাপত্তার’। কিন্তু ভাবনা যা-ই হোক, দেহদান অতো সহজ হতো না। এই ঢেউ ভেঙ্গেই আবার তাদেরকে ফিরে যেতে হতো দূর দূর সমুদ্র বন্দরে- করাচী, কলম্বো, বোম্বে, চিটাগাঙে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশে-গঞ্জে-গ্রামে।

এরকম একটি রেস্টুরেন্টেই খালেদ সাহেব এই বাঙালদেরকে নিয়ে উঠলেন। বসে মেনু দেখে স্বাভাবিক ভাবেই চক্ষু চড়কগাছ। মনে মনে হিসেব করে দেখলাম আমার বর্তমান মাসিক বেতন দিয়ে (সাকুল্যে ৫০,০০০/- টাকা) এই রেস্টুরেন্টে খেয়ে মাস চালাতে হলে মাসের ছয় তারিখ থেকে আমার উপোস শুরু হতো। খালেদ সাহেব সেখানেই আমাদের সন্ধ্যার চা-পর্বের ব্যবস্থা করলেন। সাগরের ওপর ভাসমান প্রায় উন্মুক্ত স্থানে বসার ব্যবস্থা। স্নাকস কফি খাচ্ছি- আর দিগন্তহীন অসীম সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখছি এবং ভাবছি আমাদের দাদা-পরদাদাদের সময়ের কিংবা তারও পূর্বের হজ্জযাত্রীরা মাসের পর মাস জাহাজে ভেসে এই সমুদ্রের পাড়ে এসে নামতেন এখানে জেদ্দায়। মাসের পর মাস সাগরের কঠিন ঢেউয়ের ধাক্কায় ওলট-পালট খেয়ে যখন এই কিনারা দেখতেন তখন তারা ধড়ে প্রাণ ফিরে পাওয়ার শান্তি অনুভব করতেন। হয়তো ভাবতেন ‘আর ফিরে যাবো না, সাগরের আজদাহা ঢেউয়ের কাছে প্রাণটা বেঘোরে ফিরে দেয়ার চেয়ে এই পুণ্যভুমিতে ধুঁকে-ধুঁকে দেহদান অনেক অনেক শান্তির- অনেক নিরাপত্তার’। কিন্তু ভাবনা যা-ই হোক, দেহদান অতো সহজ হতোনা। এই ঢেউ ভেঙ্গেই আবার তাদেরকে ফিরে যেতে হতো দূর দূর সমুদ্র বন্দরে- করাচী, কলম্বো, বোম্বে, চিটাগাঙে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশে-গঞ্জে-গ্রামে। সাথে নিয়ে যেতো মক্কামদিনার পুণ্যস্মৃতি আর সাগরের পরাক্রমশালী ঢেউয়ের দীর্ঘ ত্রাসের কাহিনি। আমরা সুদূর বাংলাদেশের বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার আলগী গ্রামে ছোট্ট গোলপাতার ঘরের বারান্দায় বসে সেই কাহিনি বিস্ময় ও মুগ্ধতায় আটকে থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা শুনতাম হাজী আব্দুল জব্বার, হাজী কাজেম আলী, হাজী নূর মহম্মদ প্রমুখের মুখে।

মুগ্ধতার সেই কাহিনির চৌম্বকাংশে অন্য অনেককিছুর মতোই নিয়মিত থাকতো জেদ্দা ও লোহিতসাগর। সেই লোহিতসাগরের ওপর ভাসছে আমাদের রেস্টুরেন্ট। ভাসছি আমরা আমাদের সান্ধ্য চায়ের আসর সাজিয়ে। দূরে দেখছি রেস্টুরেন্ট ছাড়াও এমন অনেক ভাসমান বসার জায়গা। সে সব বসার জায়গায় অনেক অনেক মানুষ। এছাড়াও রয়েছে পানিতে বড় বড় পাথরের চাই ফেলে তৈরি বসার জায়গা। এই পাথরের চাই কিংবা ভাসমান ডেক সব জায়গায়ই ছোট ছোট বৃত্তাকারে মানুষের কুন্ডলী। প্রায় সব কুন্ডলীতেই এক বা একাধিক উঠতি বা মাঝবয়সী যুবক আর তাদের সাথে এক বা একাধিক কালো কাপড়ের স্তূপ। দূর থেকে এমন মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যাবে কালো কাপড়ের স্তূপগুলো আসলে কাপড়ের স্তূপ নয়। সেগুলো সবই কালো কাপড়ের কঠিন সব বোরখায় ঢাকা মেয়ে মানুষ। মেয়ে না ছেলে তা দেখে নিশ্চিত হওয়ার তো উপায় নাই- তবে বোঝা যায়- যেহেতু সৌদি আরব এবং যেহেতু কালো কাপড়ের স্তূপে আবৃত, সেহেতু মেয়ে মানুষ। অবশ্য এই স্তূপগুলোর ভেতরে যে নিশ্চিতই মেয়ে মানুষ রয়েছে এমন অন্তত একটি প্রমাণ আমার স্মৃতিতে আছে।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে কিছুদূর হাঁটাহাঁটি করে, আবার গাড়িতে উঠে এলাম নতুন একটি পয়েন্টে। সেখানে বড় বড় পাথরের চাই ফেলে ফেলে একটা দীর্ঘ এলাকা আগাতে আগাতে সাগরের অনেকখানি ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে। দুপাশে ঢেউ ভাঙছে। মাঝে এসব পাথরের ওপরে বসে অনেক মানুষের ছোট ছোট গ্রুপ স্বচ্ছ পানির বিশাল ঢেউগুলোর মাথা ভেঙ্গে জেগে ওঠা ফেনার রাশি উপভোগ করছে। আমরা পাথর মাড়িয়ে মাড়িয়ে সাগরের ভেতর অনেক দূর এগিয়ে গেলাম। ঠিক কোথাও বসছিনা। হাঁটছি এবং দেখছি। যাচ্ছি আর দেখছি প্রতি পাথরের শরীরে হুমড়ি খেয়ে কীভাবে ঢেউয়েরা ভাঙছে। ঢেউ ভেঙ্গে পানির ঝাপটা আমার গায়ে লাগছে। পানিটা একেবারে স্বচ্ছ। একটুও বালি নেই যেমনটা আছে আমাদের সবগুলো সাগর পাড়ে। তবে পানির লবণ আমাদের চেয়ে একটুও কম নয়। এমন একটি জায়গায় পাথরের ওপর বসে চতুর্দিকে দেখছি। এরই মধ্যে দেখলাম অদূরে একটি পাথরের ওপরে একটি কালো কাপড়ের স্তূপ ফুঁড়ে একটি পনের বিশ বছরের মেয়ে বেরিয়ে পড়েছে। সে এক ঘন সাদা আরবী যুবতী দেহ। পরনে টাইট জিনস এবং উর্ধাঙ্গে টাইট টি-শার্ট। আমি একবার দেখে- গায়ে চিমটি কেটে আরেকবার দেখতে যাওয়ার আগে দেখে নিতে চাইলাম আমার সঙ্গীরা আমার এই বেহায়া দৃষ্টিকে আবার দেখে ফেললো কি-না। এই আয়োজন সেরে যখন আবার তাকালাম ততক্ষণে হারিয়ে গেল সে দৃশ্য। ততক্ষণে সে ফিরে গেছে তার কালো কাপড়ের স্তূপাকারের পুরনো রূপে। আমি ফাঁকে শুধু এইটুকু চোখে দেখা নিশ্চয়তায় জেনে রাখলাম যে, সৌদি রাস্তাঘাটে দোকানে ময়দানে স্থির কিংবা চলমান যত কালো কাপড়ের স্তূপ দেখা যায় তার প্রতিটির মধ্যে একটি করে নারী দেহ রয়েছে। এর মধ্যে কোনো ভুল নেই। আমি চাক্ষুষ সাক্ষী।

(চলবে)

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন— যবনের-তীর্থদর্শন-পর্ব-৭ যবনের-তীর্থদর্শন-পর্ব-৬ যবনের-তীর্থদর্শন-পর্ব-৫ যবনের-তীর্থদর্শন-পর্ব-৪ যবনের-তীর্থদর্শন-পর্ব-৩ যবনের-তীর্থদর্শন-পর্ব-২ যবনের-তীর্থদর্শন-পর্ব-১

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।