রাত ১০:৩৮ ; বুধবার ;  ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯  

প্রেমের কবিতা পড়েই একটি ছেলে বিপ্লবী হবে : রণজিৎ দাশ

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[কবি রণজিৎ দাশ। জন্মেছেন ১৯৪৯ সালের ২৮ এপ্রিল, আসামের শিলচরে। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ১৩টি, এর মধ্যে কবিতা ৯টি, লিখেছেন প্রবন্ধ ও উপন্যাস। সত্তরের দশকে তিনি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমাদের লাজুক কবিতা’ দিয়ে নিজেকে আলাদা করে চিহ্নিত করেন। ফলে দুই বাংলায়ই তিনি তুমুল পাঠক প্রিয়তা পান। নির্মেদ বাক্যে তিনি লিখেছেন নাগরিক অনুসঙ্গের কবিতা। সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে এখন তিনি আত্মনিয়োগ করেছেন সম্পূর্ণ লেখালেখিতে। গত ২০ জুন তিনি জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের বিচারক হিসেবে বাংলাদেশে এলে ঢাকা ক্লাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন জাহিদ সোহাগ।] জাহিদ সোহাগ : আমি প্রথমেই জানতে চাই দেশভাগের পর আপনারা কলকাতা না গিয়ে আসামে কেনো গিয়েছিলেন? রণজিৎ দাশ : আমার আত্মজীবনীতে এর বিস্তারিত উল্লেখ আছে তবু তোমাকে বলি। ১৯৪৮ সালে দেশ বিভাগের পর যখন একটা অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল তখন আমার বাবা, তার বাবা-মাকে নিয়ে— বাবা তখন সদ্য বিবাহিত, তার স্ত্রী মানে আমার মাকে নিয়ে এবং আমি তখন মায়ের গর্ভে— যেটুকু আমি হিসেব করে জেনেছি— তো তখন তিনি বাস্তুহারা— বহু মানুষের সাথে ভারতে চলে গিয়েছিলেন— বাংলাদেশ থেকে সেভাবেই বাবা তার পরিবার নিয়ে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় আসামের শিলচরে এলেন। কারণ ওখানে আগে থেকে আমাদের কিছু আত্মীয়-স্বজন সেটেল হয়েছিলেন। তারা বললেন যে এদিকে চলে এসো একটা ব্যবস্থা হবে। ওখানে গিয়ে প্রচণ্ড দারিদ্র্য এবং অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেন বাবা। তারপরে আমরা ছয় ভাইবোন হলাম। প্রথমে আমি জন্মালাম। তুমি যেটা জানতে চেয়েছো যে আমরা কলকাতায় নয় কেনো? এ কারণেই। আমাদের কিছু আত্মীয়-স্বজন আগে থেকেই শিলচরে, করিমগঞ্জে— তখন করিমগঞ্জ তো সিলেটের ভেতরই ছিলো; ওখানে তারা আগে থেকেই ব্যবসায়ী হিসেবে সেটেল হয়েছিলেন, তারা বাবাকে বললেন। কলকাতা তো তখন একেবারে অনিশ্চিত জায়গা। বাবা ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন; বিরাট মানুষ ছিলেন, যে রকম হয় লোক-জীবনের মানুষেরা। জাহিদ সোহাগ : ওখানে যাবার পরে যেটা হয় যে একটা উদ্বাস্তু অবস্থা, শেকড় ছাড়া; এ রকম কী কোনো অনুভূতি আপনাদের মধ্যে কাজ করেছিলো বা আপনার ব্যক্তিগত জীবনে ছিলো কিনা? রণজিৎ দাশ : আমি যেমন ধরো জন্মেছি ১৯৪৯ সালে, কেমন? আবার বাবা ১৯৪৮ সালে শিলচরে চলে গেছেন। কাজেই আমার জ্ঞান হতে হতে ৫৪-৫৫ সাল। তো শিলচর একটা চমৎকার শহর। সেখানে আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন ছিলেন। আমার মামা বাড়িও কাছেই করিমগঞ্জে— করিমগঞ্জ ও শিলচর পাশাপাশি শহর, ফলে আমার যে খুব একটা উদ্বাস্তু অনুভূতি হয়েছিলো তা নয়। কিন্তু জিনিসটা আমি বুঝতে পারি বা পারতাম আমার বাবা, ঠাকুরদার কথায়। মায়ের পিসেমশাইরা গেলেন বাংলাদেশ থেকে, তারপর আরো অনেক আত্মীয়-স্বজন গেলেন— তারা অস্থায়ীভাবে আমাদের বাড়িতে থাকতেন, পিসিমা ও পিসেমশাই তো বহুদিন ছিলেন। ফলে উদ্বাস্তু হবার যে ভয়, তার মানসিক অস্থিরতা, তাড়না, বেদনা সেগুলো তো ছিলোই। সেগুলো আমরাও টের পেয়েছি কথায় কথায়। সমগ্র সংসারে প্রতিদিনের যে গ্রসাচ্ছাদনের অনিশ্চয়তা সে তো কল্পনাও করতে পারবে না। এখনও আমিও তা ভাবতে পারি না। জাহিদ সোহাগ : আপনার শৈশব, যৌবনের শুরুটা, বলা যায় মধ্যভাগ পর্যন্ত কেটেছে শিলচরে। এবং আপনি বলেছেন যে আপনার পরিবার বৈষ্ণব ঘরানার পরিবার— এই বৈষ্ণব ঘরানার মধ্যে আপনার পরিবার কখন কীভাবে ঢুকলো। এটা কি বিক্রমপুর থাকাকালীন সময়ে নাকি ওখানে যাবার পর? রণজিৎ দাশ : না, না এতো বিক্রমপর থাকাকালীন সময়ে। আমার ঠাকুরদার বাবার, তার বাবার— যবে থেকে চৈতন্য দেব বৈষ্ণব ধর্ম প্রবর্তন করলেন, তবে থেকেই সাধারণ বর্ণের হিন্দু মানুষ, যেমন আমরা বৈষ্ণব ধর্মের দিকে ঝুকলাম। ফলে এটা আমার ধারণা এটা অন্তত আমার তিন-চার-পাঁচ পুরুষ আগে থেকেই বৈষ্ণব অর্থাৎ এরা বহুদিনের বৈষ্ণব— তারা অত্যন্ত ধার্মিক বৈষ্ণব ছিলেন, আমি তো ছোটবেলা থেকেই নাস্তিক ছিলাম, সে কথা তো আলাদা— ঢাকা-বিক্রমপুর এই অঞ্চল বৈষ্ণব ধর্ম প্রসারের জন্য বিখ্যাত, সে সবের নানা ইতিহাসে আছে, আমি তা অত জানি না। এরা বহুদিনের বৈষ্ণব। আমি এই বৈষ্ণব আবহাওয়ার মধ্য দিয়েই কিন্তু মানুষ হয়েছি। আমাদের বাড়িতে কীর্তন হতো নিয়মিত। মা খুব ভালো কীর্তন গাইতেন। এমনকি আমার ছোট ভাই খোল বাজাতে পারতো, বাবা খোল বাজাতে পারতেন। ফলে ঐ আবহাওয়ার মধ্যে এবং বৈষ্ণব ধর্মের যে কতগুলো মূল্যবোধ আছে, সেগুলো মূল হিন্দু ধর্ম থেকে আলাদা। সেই জিনিসগুলোর প্রভাব আমার মনে আছে।                 জাহিদ সোহাগ : আপনি যেই আবহাওয়ায় ছিলেন, অন্তত সঙ্গীত আপনার চারপাশে ঘিরে ছিলো— কীর্তন হোক বা নাম কীর্তন যাই হোক— কিন্তু আপনি একজন গীতিকার বা সঙ্গীত সাধক না হয়ে কবি কেনো হলেন? কিভাবে আপনার এই মনোজগৎ গড়ে ওঠে? রণজিৎ দাশ : না, আমার চারপাশে যে সঙ্গীত ছিলো তা নয়; আমার চারপাশে ছিলো দারিদ্র্য এবং তার সাথে টিকে থাকার লড়াই। জাহিদ সোহাগ : বলেছিলেন যে আপনার মা গান গাইতেন রণজিৎ দাশ : মা গান গাইতেন তাতে কী, প্রত্যেকের বাড়ির মা গান গাইতেন; এটা দিয়ে একেবারে ভুল ধারণা হবে যে আমাকে সঙ্গীত ঘিরে ছিলো। একেবারে তা নয়, আমার বাবা উদয়াস্ত পরিশ্রম করছেন, মা একের পর এক সন্তান জন্ম দিয়েছেন, দিনরাত পরিশ্রম করেছেন, রান্না করা থেকে শুরু করে বাবাকে সাহায্য করা— সে সংগ্রাম তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না— বা আমি জানি না তোমার বাড়িতে আছে কিনা। শিল্প-সঙ্গীত, লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে বহুদূরে কৌম সমাজের মানুষ ছিলেন আমার পরিবার। এবং সেই পরিবারে, শিলচরে, আমি জন্মেছি। শিলচর একটা আধুনিক শহর, অত্যন্ত উচ্চমানের শিক্ষা-সংস্কৃতির শহর; মূলত শ্রীহট্টবাসীদের যে উন্নত মানের শিক্ষা-সংস্কৃতি তার কারণে তিনটি পুরোপুরি বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চল— ফলে আমার কপাল ভালো যে আমি ‘বেস্ট অফ বোথ ওয়ার্ল্ড’ পেয়েছি— কারণ বিক্রমপুর ঘরানার বিরাট ঐতিহ্য পেয়েছি, তুমি জানো— আমার বাবা, ঠাকুরদারা খুব শিক্ষিত না হলেও সেই ঐতিহ্যটা ছিলো— তার মানে সঙ্গীতের ভেতরে না; তুমি যেটা জানতে চেয়েছো যে, আমি কবি কী করে হলাম? কবি যে মানুষ কী করে হয় সেটা সে তো বলতে পারে না, তবু... জাহিদ সোহাগ : মানে পাঠ্য-পুস্তকের বাইরে কবিতার বই কীভাবে এলো আপনার হাতে? বা আপনার ঘরে প্রবেশ করলো কীভাবে? রণজিৎ দাশ : এগুলো আমার আত্মজীবনীতে কিঞ্চিত লিখে রেখেছি। আর এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না যে কেনো আমি কবি হলাম? কারণ আমার ধারণা তেরো-চৌদ্দ বছর থেকেই আমি টুকটাক ছড়া-ছন্দ মিলিয়ে লিখতে শুরু করেছি। জাহিদ সোহাগ : কোনো কৌতুহল ছিলো কিনা? রণজিৎ দাশ : প্রচণ্ড কৌতুহল ছিলো; এখনও আছে। এখনও আমি যা দেখি নোট নেই। তুমি তা কল্পনা করতে পারবে না। এখন আমি ঢাকায় এসেছি আমার সাথে তিনটি নোটবুক আছে। আমি রমনা পার্কে দেখলাম ছেলেমেয়েদের ঘনিষ্ট অবস্থায় বসা নিষিদ্ধ তা আমি লিখে নিয়েছি। কাজেই এগুলো আমার স্বভাব। এখনও আমার ৬৫ বছর বয়সেও আছে। যা আমার ১০ বছর বয়স থেকে করা আছে। কাজেই ওটা হচ্ছে ব্যাপার— মানুষ কবি কেনো হয়, ওটা হচ্ছে তার একটা মানসিক অবস্থা— যেটাকে বলে ‘প্রপেনসিটি অফ মাইন্ড’। কেনো মানুষ কারিগরি-শিল্প ভালোবাসে, কাজেই এগুলো খুব ব্যাখ্যা করে বলা মুশকিল। আমি তোমাকে সংক্ষেপে যেটা বলতে পারি, আমার বাড়িতে বই ছিলো সঞ্চয়িতা, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে, আর তারপর এলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছিন্নপত্র’ এবং ‘কথা ও কাহিনি’। এই তিনটি রবীন্দ্রনাথের বই বলতে পারো যে একেবারে আমার আদি কবি জীবনের বীজ বপন। জাহিদ সোহাগ : ছিন্নপত্রের মধ্যে পুর্ববঙ্গের যে প্রকৃতি-নিসর্গ আছে এর মাধ্যমে কি আপনি পূর্ববঙ্গকে অনুভব করতে পারতেন? রণজিৎ দাশ : একটা কথা আমার বরাবরই মনে হয়, আমরা লিখি পূর্ববঙ্গ-পশ্চিমবঙ্গ কিন্তু পূর্ববঙ্গ— পশ্চিমবঙ্গ তো আলাদা নয়, তা তো একটা রাজনৈতিক সীমারেখা টানা হয়েছে; কাজেই আমার শিলচরে যে প্রকৃতি আমি পেয়েছি, কুশিয়ারা-বরাক নদী— সেগুলো হয়ত অত বড় নদী নয় পদ্মা-মেঘনার মতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রও একটা অতুলনীয় বই। এই সম্প্রতি এর একটা ইংরেজি অনুবাদ বের হয়েছে। ভাবতে পারবে না যে বের হবার সাথে সাথে কলকাতা শহর থেকে মাত্র সাত দিনে শেষ হয়ে গেছে। ‘লেট আস ফ্রম এ ইয়ং পোয়েট’ এই নামে খুব সুন্দর একটি ছিন্নপত্র কী জিনিস এটা ভৌগলিকতার ব্যাপার না। ছিন্নপত্র পৃথিবীর মহত্তম সাহিত্য। এটা শুনে রাখো ছিন্নপত্র আমার কাছে ধর্মগ্রন্থের মতো। ছিন্নপত্রের মতো লেখা রবীন্দ্রনাথ জীবনে এতো লিখতে পারেননি। আমার এখন পর্যন্ত সঙ্গী। রবীন্দ্রনাথের নিজের সঙ্গী ছিলো ‘মেঘদূত’ এটা জানো কিনা জানি না। চশমা আর মেঘদূত না থাকলে নাকি রবীন্দ্রনাথ... জাহিদ সোহাগ : এ জন্য রবীন্দ্রনাথের উপর কালিদাসের প্রভাব দেখতে পাই বিশেষত বিরহ ধারণায়... রণজিৎ দাশ : কালিদাসের প্রভাব তেমন তার উপর নেই। আর বিরহ ধারণাটা শুধু কালিদাসের প্রভাব নয়। যাই হোক আদি প্রভাব হচ্ছে আমার নিজের মানসিকতা, একেকটা মানুষ অনুভূতিপ্রবণ হয়, কল্পনাপ্রবণ হয়, তার মনটা সেইভাবে গড়ে ওঠে। সেটা আমার মায়ের প্রভাব ছিলো— আমার মায়ের খুব শিল্পী মন ছিলো, এমনিতেই খুব স্বল্পশিক্ষিত গৃহবধূ ছিলেন, অত্যন্ত তেজস্বিনী ছিলেন, কিন্তু খুব ভালো গান গাইতেন। সমস্তÍ রকমের শিল্প ভালোবাসতেন। গল্পের বই পড়তেন পাগলের মতন যা আমি এনে দিতাম লাইব্রেরি থেকে। অত্যন্ত ভালো বলতেন এবং ভালো লিখতেন ওনার শিক্ষার তুলনায়। ফলে মায়ের প্রভাব, রবীন্দ্রনাথ তারপর এই রাজকীয় বর্ষা আমাদের উপত্যকার বা তোমাদের বাংলাদেশের যেকোনো জায়গার, এইসব মিলেমিশে— আসল কথা আমার অনুভূতিপ্রবণ মন, কল্পনাপ্রবণ মন, কবিতার প্রতি আকর্ষণ— প্রত্যেক কবি হয়তো ঐভাবেই তৈরি হয়। জাহিদ সোহাগ : আপনি বলেছিলেন শিলচরে আপনি যাদের সাথে মিশতেন, একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিলো, একটা চায়ের দোকানে আপনারা সবাই মিলিত হতেন সেখানে আপনার শিক্ষকরাও আসতেন— এটা কি শুরু থেকেই ছিলো বা এই আবহাওয়াটা কীভাবে তৈরি হলো? রণজিৎ দাশ : না, না, ওটা তো একটা জীবনী, কাজেই এটা তো একেবারেই তথ্যমূলক। এখানে তো ধোঁয়াশার কোনো জায়গা নেই। তার মানে তোমাকে আমি কী বললাম যে আমার আদি জিনিস সেটাতে আমার মায়ের প্রভাব রয়েছে। আমার চারপাশের যে বৈষ্ণব পরিবারের কীর্তন, গান, আনন্দ, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব সেগুলোর প্রভাব রয়েছে। তারপর রবীন্দ্রনাথের প্রভাব রয়েছে। আর রবীন্দ্রনাথের প্রভাব আমার উপর বিপুলভাবে পড়ল ‘ছিন্নপত্র’ আর ‘কথা ও কাহিনি’ দিয়ে। ‘কথা ও কাহিনি’র অনেক কবিতা এখনও আমার মুখস্ত। শিলচরের পরিমণ্ডলটা আমি পেলাম যখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি তখন অবশ্যই শিলচরে একটা উন্নত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিলো। সাহিত্যের চর্চা বিশেষ করে ‘অতন্দ্র’ কবিগোষ্ঠী তখন কলকাতা বা শিলচরে একটা আধুনিক কাব্য আন্দোলনের সূচনা করে— একেবারেই ‘কৃত্তিবাস’ কাব্যান্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এদের সঙ্গে ‘অতন্দ্র’ কাব্যান্দোলনের কবিদের খুব বলিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো। আমাদের সেই কাব্যান্দোলনের অন্যতম কবি হচ্ছেন উদয়ন ঘোষ, তিনি আমার স্কুলের শিক্ষক হয়ে এলেন, বিজ্ঞানের শিক্ষক; আমি তখন শিলচর গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে ক্লাস টেনে পড়ি। তার ছোট ভাইও আমার সহপাঠী কৌশিক ঘোষ। সে আমাকে ‘অতন্দ্র’ কবিগোষ্ঠীর কিছু ‘অতন্দ্র’ পত্রিকা ও অন্যান্য কবিতার বই দিলো এবং ও জানতো আমার কবিতার প্রতি টান আছে এবং তারপর আমি লিখতে শুরু করলাম। একদিন উদয়ন দা’র কানে গেলো; ও আমার একটা কবিতার খাতা উদয়ন দাকে দিলো, মানে তখন তিনি আমার স্যার। উদয়ন দার সেটা পড়ে ভালো লাগলো। তিনি আমাকে ডাকলেন, বললেন, তাহলে তুমি শিলচরের... সেখানে শুধু অতন্দ্র গোষ্ঠীর কবিরা নয়; শিলচরের নানা বুদ্ধিজীবীরা বসে আড্ডা দিতেন। সেইখানে আমার ডাক পড়লো। তারপর আমি সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হয়ে গেলাম অতন্দ্র কবিগোষ্ঠীর। আর আমার কবি জীবন শুরু হয়ে গেলো। জাহিদ সোহাগ : আপনার প্রথম কবিতা ছাপা হয়? রণজিৎ দাশ : অতন্দ্র পত্রিকায়। জাহিদ সোহাগ : সেই কবিতাটি কি আপনি মনে করতে পারেন? রণজিৎ দাশ : না, সেই কবিতা আমি মনে করতে পারি না। আমার সংগ্রহে নেই। আমার কোনো বইয়েও নেই। তো আমার এটা মনে আছে, আমার বন্ধুরাও এটা জানিয়েছে, কেউ কেউ বলে নাম ছিলো ‘ছন্নছাড়া’। সেটা আমি একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় লিখেছিলাম। এবং ছাপাও হয়েছিলো একাদশ শ্রেণিতে থাকা অবস্থায়। যার প্রথম অংশটা এমন ছিলো— ‘ছন্নছাড়া লোকটা হঠাৎ নিজের মধ্যে হারিয়ে গেলো, তিনকূলে ওর কেউ ছিলো না একটা নেড়ি কুকুর ছাড়া।’ এই লাইন ক’টি মনে পড়ে আমার। স্বরবৃত্তের কবিতা। জাহিদ সোহাগ : এই কবিতার মাধ্যমেই কি লোকজন আপনাকে কবি বলে চিনতে শুরু করলো? রণজিৎ দাশ : না, না, কবি বলে লোকজন চিনতে শুরু করেছে আরো বছর খানের যাবার পর থেকে। ওখানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটা আমন্ত্রণ পেয়ে গেলেন, তখন আমার মাত্র ৬-৭ টা কবিতা ছাপা হয়েছে। কিন্তু এটা ঠিক যে কবি মহলে তখন সবাই ধরে নিয়েছে যে আমার খুব সম্ভবনা আছে। তখনই অতন্দ্র কবিগোষ্ঠীর যারা আমার অগ্রজ কবি ছিলেন; যারা আমার কবিতার শিক্ষক ছিলেন— শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, উদয়ন ঘোষ, বিজিত কুমার ভট্টাচার্য; শান্তুনু ঘোষ তো কৃত্তিবাস... সেটা একটা বিশাল ঘটনা ছিলো আমাদের ঐ অঞ্চলের সাহিত্য চর্চার উন্নতির ক্ষেত্রে। কাজেই এসব ক্ষেত্রে ‘কৃত্তিবাস’ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা যে কতটা কাজ করেছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তো তারপার শান্তুনু ‘কৃত্তিবাস’ পুরস্কার পেল, তখন তাদের সাথে আমার অষ্টপ্রহর ঘোরাফেরা। নামাবলি কেটে জামা বানিয়েছি। বাড়ি থেকে বাবা প্রায় বের করে দিতেন, জুতো নিয়ে তাড়া করেন। বাবা প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলেন, ভালো মেধাবী ছেলেটা স্কুলে ফার্স্ট বা সেকেন্ড হয়, এতো গরীব পরিবারের ছেলে সে কবিতা লিখে নষ্ট হচ্ছে। অথচ ঘুরছে শহরের মান্য লোকের সঙ্গে বলতেও পারছেন না। এইসব ছিলো। ফলে কবিখ্যাতি ছয়-সাতটা কবিতা লিখে; কবিখ্যাতি কী এখানে কারো কিছু হয়, মিডিয়া যদি তোমার বা তোমাদের এখানে যদি ডেইলি না ছাপে বা টিভিতে না দেখায়, তোমার কোনো কবিখ্যাতি হবে! কবিখ্যাতি কারো হয় না। আমাদের ওখানে গিয়ে দেখো, পশ্চিমবঙ্গে কয়জনের কবিখ্যাতি আছে, কবিখ্যাতি বলতে যা বোঝায় যে কোনো একটা শিক্ষিত পরিবারে নাম বললে চিনতে পারবে— ও! আচ্ছা উনি, হ্যাঁ শঙ্খ ঘোষ, আমরা তাকে জানি। কাজেই অতশত কথা নয়, ওখানে তো আমি এক পুচকে...। কিন্তু আমার খ্যাতি হয়ে গেলো কী করে সেই মজার কাহিনিটা শোনো— সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় গেলেন কবিতা পড়তে, প্রচণ্ড ভালোবাসতেন এই অতন্দ্র কবিগোষ্ঠীর যারা সিনিয়র কবি ছিলেন তাদেরকে। উনি গেলেন— তখন আমার কবিতা ছাপা হয়েছে তিন-চারটা। তখন পাশের শহরে সাহিত্যের কাগজ বের হতো, এখনও সেই কাগজ বের হয়। সুনীল দা কবিতা পড়বেন শিলচরের সম্ভবত একটা বিখ্যাত হলের মধ্যে; উপচে পড়া ভীড়। তাতে সুনীল দা কবিতা পড়তে উঠে— তখন সুনীল দা প্রচণ্ড বিখ্যাত— তার তিন-চার বছরের মধ্যেই তিনি আনন্দ বাজারে জয়েন করলেন— তখন সুনীল দা বাংলা সাহিত্যেরই নায়ক। ফলে প্রচণ্ড উৎসুক জনতার ঢল। শিলচরে উন্নত সব পাঠক রয়েছেন— তারমধ্যে সুনীল দা উঠে বললেন যে, নিজের কবিতা পড়ার আগে একটি কিশোর প্রায় তরুণ কবির একটা কবিতা আমি পড়ে শোনাবো, সে আপনাদেরই এই অঞ্চলেরই কবি বলে কেউ কিছু বুঝতে পারছেন না— তিনি একটা ম্যাগাজিন খুলে আমার ‘প্রতিটি শব্দের নাম নীলাঞ্জন’ নামে একটি কবিতা পড়লেন। পড়ে তিনি বললেন, এই কবির নাম রণজিৎ দাশ। সে এখানে বসে আছে— আমি তখন হাফপ্যান্ট পড়া, আমি তখন স্কুলে পড়ি— এ খুব ভালো লিখেছে, এর কবিতা আমার ভালো লেগেছে; এবার আমি আমার কবিতা পড়ব। তখন আমি শিলচর শহরে খুব রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলাম। জাহিদ সোহাগ :  আপনি পড়াশোনা শেষ করেই তো ’৭১ সালে কলকাতা গেলেন? রণজিৎ দাশ : অবশ্যই, কলেজ জীবন শেষ করেই তো... আমি বিজ্ঞানে স্নাতক, পদার্থ নিয়ে পড়েছিলাম। জাহিদ সোহাগ : সেখানে গিয়ে আপনি কাদের সাথে মিশলেন বা সহচর্যে... রণজিৎ দাশ : আমি তো কলকাতায় আসলাম উচ্চ শিক্ষার ছুঁতোয়। আসলে কবি হওয়ার নেশায়। যেটা আমি একাধিকবার লিখেছি নানান জায়গায়। তারপরে অনেক জটিল গল্প আছে যা আমি লিখেছি আত্মকথায়। আমার বন্ধু-বান্ধব বলতে শিলচরের অতন্দ্র কবিগোষ্ঠী, খেলোয়ার, কারণ আমি খেলাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতাম। আর কলকাতা শহরে বন্ধু-বান্ধব ছিলো— তখন অলরেডি আমি কলকাতা শহরে বিখ্যাত হয়ে গেছি ‘দেশ’ পত্রিকায় আমার দু’টো কবিতা ছাপা হয়ে গেছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই চেয়ে আমার লেখা ছেপেছেন। জাহিদ সোহাগ : কৃত্তিবাসে নিয়মিত ছাপা হচ্ছে বলা যায়... রণজিৎ দাশ : কৃত্তিবাসে নিয়মিত ছাপা হয়নি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থাকা অবস্থায় আমার দশটি কবিতা নিয়েছিলেন, তারপর উনি ছেড়ে দিলেন এবং বেলাল চৌধুরীকে দিলেন। সংখ্যা বেরুতে দেরি হলো। ততদিনে আমি নিজেই কলকাতায় চলে আসলাম। জাহিদ সোহাগ : আপনার প্রথম বই ‘আমাদের লাজুক কবিতা’ বের হওয়ার সময় কোনো বন্ধুর উৎসাহ কিংবা কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিলো কিনা। যা প্রত্যেক কবির ক্ষেত্রেই হয়? রণজিৎ দাশ : প্রথমত, দেখবে যে, আমার বই ১৯৭৭ সালে বের না হয়ে ৭২ সালেও বের হতে পারতো। তো অনেকেই বলেছেন যে আমার বই বের হতে দেরি হয়েছে— সেটা কথা নয়— আমি প্রথম থেকেই একটু আত্মমগ্ন ছিলাম, এখনও আছি। যাই হোক, কিন্তু আমার বন্ধুদের উৎসাহ প্রবলভাবে কাজ করেছে— তখনকার বন্ধুত্ব, হ্যাঁ তোমরা ঢাকায় হয়ত খানিকটা কল্পনা করতে পার, এখন কলকাতায় সেটা নেই। এটা সত্তরের দশকে ৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা শহরে এসে, কফিহাউস ছিলো আমার ঠিকানা বলতে গেলে, একটা হস্টেলে উঠেছিলাম; মা বাবাকে লুুকিয়ে লুকিয়ে টাকা পাঠাতো আর আমি কিছুদিনের মধ্যে টিউশনি করে, প্রচণ্ড কষ্ট করে জীবন অতিবাহিত করতাম। কিন্তু কফি হাউস ছিলো ঠিকানা। ভাবতে পারবে না তখন বোমা পড়ছে সমস্ত কলেজ স্ট্রিটে, প্রেসিডেন্সির সকল ভালো ছাত্ররা নকশাল হয়ে গেছে; ইউনিভর্সিটিতে আগুন জ্বলছে; কফি হাউসে দিনরাত মারপিট হচ্ছে; তারমধ্যে আমরা কবিরা ওইভাবে সারভাইব করছি। ফলে কোনো বই বা আমার বই করার পেছনে আমার বন্ধুদের যে কী পরিমাণ উৎসাহ ছিলো কল্পনা করা যায় না— হ্যাঁ, আমি নিজের টাকা দিয়েই ছেপেছিলাম, তখন সকলকেই ছাপতে হতো— আমার চার-পাঁচটে বই নিজের টাকায় ছেপেছিলাম। কিন্তু আমার একটা স্বভাব ছিলো, আমি আমার বন্ধুদের সাহায্য কখনো নেইনি। নিজে লুকিয়ে লুকিয়ে কাগজ কিনতাম, প্রেসে যেতাম, নিজে পাণ্ডুলিপি করতাম, কাউকে দেখাতাম না, বই হয়ে গেলে খালাসিটোলায় দাওয়াত দিতাম, তোমাদের ভাষায় আমাদের বাংলা মদের দোকান। যেখানে তখন সবাই যেত। তখন বুঝতে পারতো রণজিতের মনে হয় বই বের হয়েছে। তখন আমি বন্ধুদের বই বিলি করতাম। তবে প্রথম বই প্রকাশে সাহায্য করেছিলেন পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল। জাহিদ সোহাগ : আপনি বলেছেন, বোমা পড়ছে কিন্তু আপনার কবিতায় রাজনৈতিক প্রসঙ্গটা প্রবলভাবে কিন্তু আসে নাই কিন্তু, কেনো? রণজিৎ দাশ : না, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে তো কবিতা লেখা হয় না। পৃথিবীর কোন সময় তুমি দেখাতে পার যে রাজনীতি নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছে। সত্তরের দশকে তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলন। সেটা একটা মস্ত বড় ব্যাপার। সেটাও তো তোমাদের অনেকে নেগলেট করে বলে যে তৎকালে সমস্ত চিৎকার, শ্লোগান লেখা হয়েছিলো। কাজেই ঐ প্রশ্ন অনেক শুনেছি আমরা। সত্তরের দশকে আমাদের সংগ্রাম ছিলো কী করে শ্লোগান না লিখে কবিতা লিখবো, কারণ যত কবিতা আমি লিখবো, সেটা বিপ্লবের পক্ষে কাজ করবে। আর আমি শ্লোগান লিখলে তা বিপ্লবের পক্ষে কাজ করবে না। আর এটা এখনও সাহিত্যের তাত্ত্বিকদের মাথায় ঢোকে না। আমাকে প্রেমের কবিতাই লিখতে হবে। যে প্রেমের কবিতা পড়েই একটি ছেলে বিপ্লবী হবে, তাকে আমি উচ্চকিত কিছু লিখে দিলাম, তাতে তো তার বেশি দূর এগুবে না।        জাহিদ সোহাগ : আপনার কবিতায় লক্ষ্য করি— যেমন ‘প্রথম ম্যাটিনি শো’তে— শুরুতে বিচ্ছিন্নতাবোধ তারপরে কীভাবে যেন একটা সম্পর্ক হয়ে যায় এবং সে সম্পর্কটা একটু কাছাকাছির সম্পর্ক— এই ব্যাপারগুলো আপনি কীভাবে নির্মাণ করেন? রণজিৎ দাশ : না, নির্মাণের ব্যাপার না। তুমি যে কবিতার কথা বললে সেটা একেবারেই আমার তরুণ বয়সে লেখা কবিতা।   জাহিদ সোহাগ : যেহেতু আপনার কবিতায় সিনেমা হল আছে, সেহেতু, তা তো মানুষকে প্রভাবিত করে... রণজিৎ দাশ : হ্যাঁ, আমার তো প্রচণ্ড সিনেমা দেখার নেশা, এখনও আছে। বলতে গেলে সপ্তাহে আমি একটি সিনেমা দেখি। আর পৃথিবীর সব ভালো সিনেমা, খারাপ সিনেমা আমার দেখা। ফলে সিনেমা হল দেখবে আমার কবিতায় নানা ভাবে ঘুরেফিরে সিম্বলিক, ম্যাটাফোরিক্যাল বলো, বিভিন্নভাবে কবিতায় এসেছে, সেটা কথা নয়। প্রেমের কবিতা আসল কবিতা কারণ সব কবিরাই প্রেমিক, আমিও প্রেমিক, যিনি আমার স্ত্রী তিনি আমার প্রেমিকা ছিলেন, ছয় বছর পাগলের মতো প্রেম করেছি। খেতে পাই না, পরতে পাই না, সে আমার জন্য কষ্ট করে টিউশনি করছে, আমিও টিউশনি করছি, দু’জনে মিলে। ফলে প্রেমের কবিতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে। এখন তার ভেতরের ভাবগুলো, আগে বিচ্ছিন্নতা পরে মিলন, এটা তুমি দেখতে পাচ্ছো— এটা তো আমি বুঝতে পারিনি। জাহিদ সোহাগ : শুরুটা যেভাবে আসলো কিন্তু মাঝখানে মনে হলো তারা একটু কাছাকাছি এলো এবং শেষের দিকে একটা হাহাকার তৈরি করে তারা চলে গেলো। যা আমার কাছে মনে হয়েছে সিনেমার মতন। এ ব্যাপারে আপনি কি বলবেন? রণজিৎ দাশ : সেটা হচ্ছে যে একটা শিল্পকর্মের চরম উৎকর্ষ হচ্ছে কবিতা— মানে ভাষাশিল্পের, সঙ্গীত সেটা আলাদা, ফলে এটা তো একটা আমি মানে পুরো একটি বস্তু নির্মাণ করছি। এমন একটা ভাববস্তু নির্মাণ করছি যেটার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার ব্যক্তিগত জীবন থেকে উপাদানটা ঢুকেছে মাত্র। এই যে তুমি কবিতাটা পড়ে এতো কিছু পাচ্ছো, শুনে আমার খুব ভালো লাগছে। হ্যাঁ, কারণ আমি তো সচেতনভাবে আমার মনন দিয়ে চিন্তাশক্তি দিয়ে আমার এ কবিতাটি নির্মাণ করেছি। যাতে একটা প্রেমের সম্পূর্ণ ভাব আমার পাঠক তা থেকে পান। এবং তার রহস্যটাও চিন্তা করতে পারেন। জাহিদ সোহাগ : আর একটি কবিতা, যেটা আমি প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে বলে থাকি, যেমন আপনার ‘প্রেম’ কবিতাটা— এই প্রেম বা প্রেমের কবিতা নামে আমি অনেক কবিতাই পড়েছি, সেটা শক্তি থেকে শুরু করে অনেকেরই, সেখানে প্রেমটাকে যেভাবে দেখা হয়েছে— কিন্তু আপনি এখানে স্রেফ একটি টেলিফোন বুথের এবং সেখানে মনে হচ্ছে যে সেই টেলিফোনকে নিয়ে এর বিজ্ঞাপন। রণজিৎ দাশ : এ কবিতার ফর্মটাই হচ্ছে টেলিফোন বুথের বিজ্ঞাপন। কলকাতায় এটা লিখাই থাকতো। এর ভাষাটা প্রায় তারই মতন। তার মধ্যে শুধু মোচড়গুলো আছে। এটা হচ্ছে একটা অত্যন্ত ডার্ক একটি কবিতা। এটা হচ্ছে নাগরিক জীবনের শূন্যতার কবিতা। জাহিদ সোহাগ : আপনি কি মনে করেন কৃত্তিবাস আন্দোলনের দূরবর্তী সদস্য হিসেবেও কি আপনি যুক্ত— নাকি স্বাধীন স্বতন্ত্রভাবে... রণজিৎ দাশ : না, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বলতে— সুনীল সঙ্গোপাধ্যায় আমাকে চিঠি লিখছেন, আমি তখনও হাফপ্যান্ট পড়ি, আমাকে এতো ভালোবাসতেন। ফলে কৃত্তিবাসী আন্দোলন গোটা বাংলা কবিতারই একটা বৈপ্লবিক আন্দোলন। এর দোষগুণ অনেক আছে। অর্থাৎ কৃত্তিবাসী আন্দোলনের বাইরে নেই বাংলা কবিতা। সম্পূর্ণ বাংলা কবিতা পাল্টে গেছে কৃত্তিবাসী আন্দোলনের কারণে। কয়েকজন ব্যতিক্রমী ছিলেন। তাহলে তো শিলচরের অতন্দ্র কবিগোষ্ঠী তারা সচেতনভাবে কৃত্তিবাস আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত। জাহিদ সোহাগ : আপনাদের ওখানে নানাবিধ শিল্প আন্দোলন গড়ে ওঠে। যেমন— হাংরি জেনারেশন দারুণ প্রভাব ফেলেছিলো... তো এরকম হাংরি জেনারেশন বা আমাদের হাল আমলের পোস্ট মডার্নিজম বা এখন বলা হচ্ছে নিম্নবর্গের সাহিত্য— এসব ব্যাপারকে আপনি কিভাবে দেখেন? বা এসব আপনার কবিতায় কোনো প্রভাব ফেলেছে কিনা? অর্থাৎ কোনো ইজম দ্বারা তাড়িত হয়েছেন কিনা? রণজিৎ দাশ : তুমি যে ইজমগুলোর কথা বললে তার মধ্যে পোস্ট-মডার্নিজম সাহিত্যের অংশ আর হাংরি জেনারেশন হচ্ছে পার্ট অফ কৃত্তিবাস আন্দোলন। কিন্তু হাংরি জেনারেশনকে কৃত্তিবাসের বাইরে দেখি নাই। জেল খাটার মুখে তো চলে গিয়েছিলেন, উৎপল কুমারবসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। জাহিদ সোহাগ : ভাব ভাষার দিক থেকে দেখা যাবে মলয় রায়চৌধুরী তাদের ঘরানার থেকে কিন্তু একটু ভিন্ন... রণজিৎ দাশ : একটু না, অনেকটাই ভিন্ন। কিন্তু সমগ্র আন্দোলনটাই ছিলো একটি ব্যক্তিবাদী চেতনার, ব্যক্তির সম্পূর্ণ অর্থাৎ সমাজের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিক্ষোভ বা তার আন্দোলন। ফলে হাংরি আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে, হাংরি আন্দোলন আবার স্তিমিত হয়ে গেছে। আর নিম্নবর্গ সমাজের যে কথাটা বললে, তা দলিত আন্দোলন, ভারতবর্ষে যেটার বিরাট চল রয়েছে। মূলত মহারাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে। আমি দলিতে বিশ্বাস করি না। আর দলিতের যে কনসেপ্ট তাও আমার বিশ্বাস হয় না। আমি নিজে একজন নিম্নবর্গের হিন্দু সন্তান কিন্তু আমি সচেতনভাবে মনে করি যে, নিম্নবর্গীয়রা নিজের জন্য নিম্নে কারণ হিন্দু ধর্মে এই নিম্নবর্গী আমি মানবো কেনো? কে ব্রাহ্মণ কে ক্ষত্রিয় কে শূদ্র— কে বলেছে? আর মনুসংহিতার কী দাম আছে? কেনো একটা মানুষ নিজেকে শূদ্র মনে করবে? সে ব্রহ্মণ বাড়িতে গেলে জল দেবে না— এর থেকে অপমানকর আর কিছু নেই। কাজেই এটা আমি বহু দিন ধরে বহু লেখালেখিতে— আর আমি দলিত সাহিত্যটাকেই স্বীকার করি না। আমি মনে করি ভারতবর্ষে এই চর্চাটা একটা ভুল চর্চা। নিম্নবর্গীয় নিজেকে কখনো নিম্নবর্গীয় মনে করবে না, কেন মনে করবে সে? কেনো সে নিজেকে দলিত বলে মানবে? তাহলে তো সে ব্রহ্মণদের ফতোয়াটাই মেনে নিলো। মেনে নিয়ে সে মনে করলো এবার আমি বিরাট সাহিত্য রচনা করবো।   জাহিদ সোহাগ : অন্য একটা প্রসঙ্গের কথা বলি, যেটা আমি কবি আল মাহমুদকে বলেছিলাম— আমি, কবি শামীম রেজা, কবি মোহাম্মদ সাদিক একটা ইন্টারভিয়্যুতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, অনেক লেখার মধ্যেও কবির একটা বা দুইটা কাব্যগ্রন্থের প্রতি বিশেষ অনুরাগ থাকে— এমন কোনো অনুরাগ আপনার আছে কিনা? রণজিৎ দাশ : না, আমার তো... তুমি ঠিক বলেছো, থাকে, আমার ধরো ন’টা বই বের হয়েছে— ‘আমাদের লাজুক কবিতা’ থেকে ‘ধান ক্ষেতে বৃষ্টির কবিতা’ পর্যন্ত কিন্তু আমার একদিক থেকে বলতে পারো প্রথম বইটার প্রতি এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব, মায়ের যেমন প্রথম সন্তানের প্রতি থাকে, তেমন আমারও ছিলো। সেটা আমি অস্বীকার করতে পারবো না। তা আমার ‘আমাদের লাজুক কবিতা’ বইয়ের প্রতি ছিলো। কিন্তু তারপরও আমি চেষ্টা করি আমার পরের বইটা যেন আগের বইটার তুলনায় ভালো হয়। জাহিদ সোহাগ : আপনি নিজে এত লেখালেখির মধ্য দিয়েও আপনি কি মনে করতে পারেন, আমি যা লিখতে চেয়েছি, তা লিখতে পারছি এবং যা প্রকাশ করতে চেয়েছি বা জীবনটাকে যেভাবে প্রকাশ করতে চেয়েছি সেটা কবিতার মধ্যে কি প্রকাশ করতে পেরেছি, এমন কি আপনার কখনো মনে হয়? রণজিৎ দাশ : না, এটা যদি না মনে হতো তাহলে তো আমি লিখতেই পারতাম না। অনেকদিন আগেই আমি ভাবতাম যে তাহলে বোধহয় আমার হয়নি কিছু। ফলে এটা আমি বলবো না। এ প্রশ্নের উত্তর অনেকেই অনেক রকম দেন। কিন্তু আমি বলবো যে আত্মবিশ্বাস ছাড়া এতদূর এলাম কী করে? পঁয়তাল্লিশ বছর আমার কবি জীবন এটা যদি পুরোটা বা এতোটা সংশয়ের মধ্যে কাটতো যে আমি কী পারছি না— প্রত্যেক কবির প্রতিদিনই মনে হয়। জাহিদ সোহাগ : অর্থাৎ নিজের জীবনের একটা শেষ আকাঙ্ক্ষা থাকে। মানে একটি বিষয়ে আমি অনুসন্ধান করছি জীবনে... রণজিৎ দাশ : সেটা তো আছেই, প্রতিমুহূর্তেই চলছে। তার জন্যই তো পরের কবিতাটা লিখতে পারি। কাজেই আমি তোমাকে বরং অন্যভাবে বলবো যে আসলে আমরা যেটার দ্বারা তাড়িত হই, একটা বয়সের পর মানে ধরো, একজন কবি যদি পনেরো বছর বয়স থেকেই ভালো লিখতে না পারে তাহলে তার চান্স কম। পঁচিশ বছরের মধ্যে রীতিমতো তাকে প্রতিষ্ঠা পেতে হবে। প্রচণ্ড ছন্দ-কৌশলী হতে হবে। তিন-চার ফর্মে লিখে পাঠককে চমকে দেবে। তখন সবাই বলবে যে এ কবি খুব শক্তিশালী। তাহলে তার আসল কবি প্রতিভার যাত্রা শুরু হলো। পঁয়ত্রিশ বছর পর থেকে একজন কবির মূল যাত্রা শুরু হয়। আমি যেটা বলতে চাই— এজরা পাউন্ডের একটা কথাই আছে যে পঁয়ত্রিশ বছরের আগে সবাই ভালো কবিতা লিখতে পারে, ওগুলো আমাকে দেখিও না, পঁয়ত্রিশ বছরের পর কে ভালো কবিতা লিখেছে তা দেখাও। পঁয়ত্রিশ বছরের পর যে কবির মূল যাত্রা শুরু হয় সেটা সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জিজ্ঞাসা, দর্শন জিজ্ঞাসা এবং নিজের জীবনকে সততার পথে নিয়ে যাওয়া। জাহিদ সোহাগ : আমাদের এখানে প্রচলিত ছন্দে না লিখে ন্যারেটিভে লেখার একটা প্রবণতা আছে, এই গোষ্ঠীরা অত্যন্ত শক্তিশালী, বিশেষ করে নব্বই দশক এই চর্চা বেশি করেছে। তারা মনে করেন, ছন্দে লিখলে তাদের ভাবটা প্রকাশ করতে পারছেন না— আপনার মতো যারা অগ্রজ তারা আবার মনে করেন যে ছন্দ হচ্ছে কবিতার জন্য অনিবার্য বিষয়। আপনি নিজেও গদ্য ছন্দে কবিতা লিখেছেন— এই ছন্দ ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে দেখেন? রণজিৎ দাশ : আমি তো ছন্দ কবিতার জন্য অনিবার্য বিষয় তা কখনোই বলবো না। কারণ আমি গদ্যে এতো বেশি কবিতা লিখেছি যে, তা দিয়ে আমার দুটো কবিতার বই হবে। ফলে একেবারে বা সম্পূর্ণ গদ্যভাষা বা গদ্য ছন্দ ব্যবহার না করেও— গদ্য ছন্দও তো একটা মস্ত বড় জিনিস; তাতে যদি কেউ কবিতা লেখেন, তা ভালো হতেই পারে এবং তার ভুরিভুরি উদাহরণ আছে। শুধু তোমাদের এখানে ৯০ দশকে নয়, বহু আগে থেকেই আছে। নতুন বলে কিছু নেই সাহিত্যে। কিন্তু ছন্দ একটা প্রয়োজনীয় বিষয়। ছন্দ-জ্ঞান একজন কবির পক্ষে খুবই কার্যকরী বিষয় বলে আমি মনে করি এই কারণে যে, কবিতা তো একটা শিল্প এবং এই শিল্পের কিছু গ্রাউন্ড রুলস আছে। রুলস হচ্ছে যে এটা রসবস্তু হতে হবে, তার যদি আবেদন না থাকে— আমি নানান রকম লিখে ফেললাম, খুব দর্শন চিন্তা আমার আছে, হরহর করে নানান রকম গদ্যে আমি বহুকিছু লিখে ফেললাম কিন্তু কাব্যিক আবেদনটা কোথায়? ‘এস সিম্পল এস দ্যাট’ কবিতা হয়ে উঠতে হলে তার কতগুলো উপাদান আছে বহুকাল ধরেই, শাস্ত্র তুলে ফেলতে পারবে না, তাই না? সেই নন্দনশাস্ত্র এসে যাবে। ছন্দ, অলঙ্কার, চিত্রকল্প, উপমা, ভাব, রস, সৌন্দর্য— একদম বাংলা সাহিত্যের সিলেবাস এসে যাবে। সতরাং ছন্দ একটা প্রয়োজনীয় জ্ঞান কবির পক্ষে, এটা আমি মনে করি।    জাহিদ সোহাগ : বাংলাদেশে আপনি প্রথম কবে আসেন? রণজিৎ দাশ : বাংলাদেশে আমি প্রথম এসেছি ১৯৮৭ সালে। এর জন্য আমি আমার কবিবন্ধু মৃদুল দাশগুপ্তর কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ বাংলাদেশে ওর আগে থেকেই যাতায়াত ছিলো কিছুটা সাংবাদিক হিসেবে কিছুটা কবি হিসেবে। যখন আমার খুব আগ্রহ দেখলো যে আমার গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুর দেখতে চাই— ও তখন বললো, চল্ আমার সাথে। ও তখন সদ্য বিবাহিত, ওর স্ত্রী মাধবী, সুন্দর একটি দম্পতি, আমি ওদের সাথে ১৯৮৭ সালে ঢাকায় আসি। জাহিদ সোহাগ : ঢাকার বাইরে আপনি কোথায় কোথায় গিয়েছেন? রণজিৎ দাশ : ঢাকার বাইরে আমার বেড়ানো হয়নি দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কারণ বেশ কয়েকবার আমি বাংলাদেশে কবিতা উৎসবে এসেছিলাম, আমার স্ত্রী এসেছিলেন, শামীম রেজা তখন আতিথ্য দিয়েছিলো, তার আগে যখন ১৯৮৭ সালে এসেছিলাম কবিবন্ধু ফরিদ কবির, তুষার দাশ, সাজ্জাদ শরীফ এদের সঙ্গে একটা খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক হয়, সেটা এখনও আছে, এদের আতিথ্যে ছিলাম। কিন্তু সে বারে গিয়েছিলাম দেশের বাড়ি দেখতে মৃদুল আর আমি। সেইটুকুই আমার ঢাকার বাইরে যাওয়া। তাছাড়া আমার ঢাকার বাইরে যাওয়া হয়নি। এবার যদি তোমার সঙ্গে বরিশাল আর তুষার দাশের সঙ্গে চট্টগ্রাম যেতে পারি। জাহিদ সোহাগ : যেহেতু ঢাকায় বেশি সময় কাটিয়েছেন, লেখকদের পরিমণ্ডলে, তারপরও ঢাকাকে দেখা, বাংলাদেশকে দেখা, বাংলাদেশের মানুষকে দেখা, বাংলাদেশের সংস্কৃতি দেখা— এ বিষয়টা বা কোন বিষয়টা আপনার কাছে ভালো বা বিরক্ত লেগেছে? রণজিৎ দাশ : বিরক্ত লেগেছে বলতে নগর জীবনের যে কতগুলো অভিশাপ আছে, যেমন যানজট ইত্যাদি। সে তো কলকাতাতেও আছে, ঢাকাতেও আছে। তবে কলকাতার তুলনায় ঢাকায় একটু বেশি। ফলে বিরক্ত লাগাটা কথা নয়, ভালো লাগাটাই কথা যে আমার কী কী ভালো লেগেছে? সাহিত্যের পরিমণ্ডলে যে উষ্ণ আন্তরিকতা এটা কলকাতার তুলনায় এখানে অনেক বেশি। এটা একটা বিরাট আমার কাছে উপভোগ্য আনন্দের বিষয়। এটার টানেই আমি আসি। কারণ এখনও বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে সেটা একচুয়ালি আমারও সংস্কৃতি, আমার নিজের বাড়িতেও সেই আতিথিয়তা দেখেছি। কিন্তু কলকাতার নগর জীবনে সেটা তো একেবারেই নেই এবং সেই নগর জীবনের কালচারও একেবারেই আলাদা। তারমধ্যেই ৪০-৫০ বছর কেটে গেলো। ফলে আমিও এখন সেই হয়ে গেছি। কিন্তু তাহলেও সেই সংস্কৃতিটা রয়েছে ফলে ঢাকা শহরের সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের যে অত্যন্ত উষ্ণ আগ্রহ এবং আন্তরিকতা, বহুমুখি জানার জন্য একটা ব্যাকুলতা, কোনো কিছু করার জন্য একটা আন্তরিক চেষ্টা এবং অভিপ্সা। এইটা আমার এখানে অনেক জোরালো মনে হয়েছে। এটা কতদূর কে সফল হচ্ছেন না হচ্ছেন তার গুণমান কতটুকু হচ্ছে তা বিচার্য বিষয় কিন্তু এই জিনিসটা কিন্তু অর্থাৎ শিল্প-সাহিত্য নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা, অনেক বেশি আন্তরিকতা, ঢাকায় আমি পেয়েছি কলকাতার তুলনায়। জাহিদ সোহাগ : আপনার তো এখন অবসর জীবন। এখন প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাজকর্মে যুক্ত আছেন কিনা বা যুক্ত থাকার ইচ্ছা আছে কিনা? রণজিৎ দাশ : আমি অবসর তো নিয়েছি কিছুটা লেখালেখির কথা ভেবেই। তিন বছর আগে অবসর নিয়েছি; আমি আমার বয়সের আগেই। তো তারপরে এখন নিজেকে একজন সার্বক্ষণিক লেখক মনে করি এবং সেভাবে তৈরিও হয়েছি। কিন্তু মাঝখানে আমি এক বছর দিল্লিতে একটা কাজ করতে গিয়েছিলাম। ওখানে দিল্লির গোটা ভারতবর্ষের ‘ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান পাবলিকেশন্স’ বলে একটা বডি আছে অর্থাৎ সব রকম পাবলিকেশন্সদের একটা শীর্ষ সংগঠন; সেই সংগঠনের একটা জার্নাল আছে; বুলেটিন আছে। এক বছর ওদের জার্নালে কাজ করেছি, বুলেটিনে কাজ করেছি। ফলে দিল্লিতে একটা বড় অভিজ্ঞতা হয়েছে। দিল্লির সাহিত্য পরিমণ্ডল, দিল্লির রাজনীতি ইত্যাদি আমি দেখতে পেয়েছি। এখন আমি সম্পূর্ণ ২৪ ঘণ্টার লেখক। জাহিদ সোহাগ : মানে লেখালেখির বাইরে আর কিছু করতে চান কিনা? রণজিৎ দাশ : একটা ইচ্ছা ছিলো— সেই ইচ্ছে থেকেই দিল্লিতে কাজে গিয়েছিলাম; গোহাটিতে গিয়েছিলাম; গোহাটিতে আমি একটা সংবাদপত্রের এডভাইজার হিসেবে জয়েন করেছিলাম। সেটা আমার ভালো লাগলো না বলে, থাকার অসুবিধা হচ্ছিল বলে খুব তাড়াতাড়িই চলে এসেছিলাম। তো তখন আমার মনে হচ্ছিল যে আমার এত শারীরিক এবং মানসিক শক্তি রয়েছে যে কাজ তো করতেই পারি। কিন্তু এখন আর সেটা মনে হয় না। এখন লেখালেখি নিয়ে আমি এতো ব্যস্ত থাকি যে অন্য কাজ করার ইচ্ছে নেই। জাহিদ সোহাগ : ‘বিয়োগপর্ব’ লেখার পর আর কোনো উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আছে কিনা? রণজিৎ দাশ : অনেকদিন ধরেই আমার একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আছে সেটা হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে। যেহেতু আমার ঐ আত্মজীবনীতে, যদি পড়ে থাকো দেখতে পাবে যে আমি শিলচরে করিমগঞ্জে যেখানে আমি মানুষ হয়েছি বা আসামের কাছার জেলা, এটার প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ মুসলমান বা বাঙালি মুসলমান। এই অঞ্চলটা পুরোটাই বাঙালিদের অঞ্চল। আমার মুসলমান বন্ধু অনেক, ছোটবেলা থেকেই তাদের প্রতি আমি বেশ আকৃষ্ট। ফলে ইসলাম ধর্মের প্রতি, সমাজের প্রতি আমার নিজের একটা শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আছে। কারণ আমার এমন এমন বন্ধুরা— আমার স্কুল বন্ধু ছিলেন— এই দেখলে না আমি তখন ফোনে খোঁজ করছিলাম আতাউল হক লস্করের, যে শ্রীহট্টে শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছে, যে আমার ক্লাসমেট ছিলো। অদ্ভুত, ওর কথা আমি আত্মজীবনীতে লিখেছি। ফলে এই যে আমার আকর্ষণটা এইটা অনেক কাজ করে। তো হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে লেখা আমার বহু দিনের ইচ্ছা। তারপরে সাংঘাতিকভাবে আন্তর্জাতিক স্তরে যে বিভিন্ন রকমের সংকট দেখা দিয়েছে র‌্যাডিক্যাল ইসলামের সংকট বিশেষ করে ৯/১১ এর পরবর্তী সময়ে এবং ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতা এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতা— এইসব জিনিস আমাকে সারাক্ষণ ভাবায়। আমি নিজে যেহেতু মুসলমান সমাজের সাথে এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, বাংলাদেশের সাথে আমার এত সখ্য, ফলে এই নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আছে। আমার বাড়িতে গেলে দেখতে পাবে ৪-৫ টা কোরান শরিফের অনুবাদ আছে। এখান থেকে নিয়ে গিয়েছি দু’টো। কলকাতা থেকে কিনেছি। কিছু পড়াশোনা করেছি ধর্মতত্ত্ব নিয়ে। বিশেষ করে আল্লামা ইকবালের লেখা পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। শঙ্খ ঘোষই আমাকে বলেছিলেন ওর কথা এবং আমাকে বই দিয়েছিলেন। ফলে আমি বেশ পড়াশোনা করেছি ধর্মতত্ত্ব নিয়ে।     জাহিদ সোহাগ : ধর্ম নিয়ে লেখাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকা ইসলাম ধর্মকে যে দৃষ্টিতে দেখতে চায়, অনেক সময় লেখকরা সেই দৃষ্টি দিয়ে বুঝতে চায়। সে যাক আপনার নতুন উপন্যাস পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। আমাদের বরিশাল যাত্রা আশা করছি আনন্দদায়ক হবে। সময় দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। রণজিৎ দাশ : নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। তোমাকেও ধন্যবাদ।     এই সাক্ষাৎকারটি বাংলা ট্রিবিউনের ঈদসংখ্যায় পিডিএফ ফরম্যাটে প্রকাশিত হয়েছিলো। ফলে অনেকেই পড়তে পারেননি। তাই পাঠকের সুবিধার জন্য ফের প্রকাশ করা হলো।বি.স.                

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।