সকাল ০৯:৩৮ ; সোমবার ;  ২৩ জুলাই, ২০১৮  

জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের পছন্দ ইন্টারনেট ভয়েস ও ভিডিও কল

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম॥

বিনামূল্যে কথা বলার মাধ্যম হিসেবে দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে স্কাইপে, ভাইবার, ট্যাঙ্গো ও হ্যাং অাউট সেবা। ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে এসব ওটিটি (ওভার দ্য টপ) সেবার মাধ্যমে ভয়েস এবং ভিডিও কল করা যায়।

কিন্তু এই ওটিটি সেবা জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অারও বেশি পছন্দ। কারণ এতে সরকারের কোনও নজরদারি নেই। ফলে এ মাধ্যমটি ব্যবহার করে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অপরাধ সংঘটনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। শুধু তাই নয়, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে এ বিষয়ে কিছু তথ্য-প্রমাণও এসে পৌঁছেছে।

এনক্রিপটেড ফরম্যাটের বলে বেশিরভাগ ওটিটি মাধ্যমে ভয়েস (কথা) এবং ভিডিও কলের কোনও রেকর্ড থাকে না। এই সুযোগে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যরা দেশে-বিদেশে যোগাযোগ করছে বলে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা মনে করছে। ওই গোয়েন্দা সংস্থা এরই মধ্যে কিছু অালামতও উদ্ধার করেছে যা প্রমাণ করে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা এসব মাধ্যম ব্যবহার করছে।

দেশ-বিদেশে কথা বলার এই প্রযুক্তিটি সর্বসাধারণের কাছে হালে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা অাশঙ্কা করছেন, ওটিটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহারকারীর পক্ষে থাকায় অপরাধীরা এ মাধ্যমটিকে তাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম করে ফেলতে পারে। তাদের ধারণা, সন্ত্রাসী, জঙ্গি সংগঠনগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ রয়েছে। তারা এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে মোবাইলফোনে ভয়েসসহ অন্যান্য সেবা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে ১০০ গিগা ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হয়। এর মধ্যে সরকারি খাতের ২০ এবং বেসরকারি খাতের ৮০ গিগা ব্যান্ডউইথ রয়েছে। সূত্র জানায়, স্কাইপে, ভাইবার, ট্যাঙ্গো ও হ্যাং অাউটসহ অন্যান্য ও‌‌‌টিটি মাধ্যমে ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ গিগা।

জানতে চাইলে প্রযুক্তি বিশ্লেষক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক অপারেটর্স গ্রুপ (বিডিনগ) এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুমন অাহমেদ সাবির এ বিষয়ে বলেন, বেশিরভাগ ওটিটি সেবায় কোনও রেকর্ড থাকে না। ফলে কোনও ধরনের সন্দেহজনক কথাবার্তা বা ভিডিও বার্তা উদ্ধার করা কঠিন। তিনি জানান, যারা অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িত তাদের অনেকে প্রযুক্তি বিষয়ে উচ্চ ধারণা রাখে। ফলে বিষয়টিকে কোনওভাবেই হেলাফেলা করা ঠিক হবে না।

সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করে সুমন অাহমেদ সাবিরের মনে হয়েছে ওটিটি সেবায়ও নজরদারির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, বিষয়টি এখন অাশঙ্কায় পরিণত হয়েছে। তবে তিনি এ-ও বলেন, সব বিষয় নয়, ক্ষেত্র বিশেষে বিষয়টি মনিটর করা যেতে পারে। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলকে বিষয়টি অামলে এনে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি জানালেন, ওটিটি সেবায় ১০-১৫ গিগা ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হচ্ছে। এর সবটাই কি সাধারণ মানুষ ব্যবহার ব্যবহার করছে নাকি অন্য কেউ ব্যবহার করছে কেউ জানে না। বিষয়টি বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। যারা অনিষ্ট সাধন করতে চায় তারা তো এসব মাধ্যমই ব্যবহার করবে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিঅারসিও বিষয়টি মনিটর করে না। জানতে চাইলে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অবশ্যই বিষয়টি মনিটর হওয়া উচিত তবে এ বিষয়ে বর্তমানে বিটিঅারসি কোনও কার্যক্রম পরিচালনা করে না। তবে তিনি বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে অানবেন বলে জানান।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিঅাইডি) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বাংল‌‌‌া ট্রিবিউনকে জানান, এরই মধ্যে তারাও বিষয়টি অামলে নিয়েছেন। তিনি অারও জানান, সাম্প্রতিককালে দেশে সংঘটিত কয়েকটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে তারা অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িতদের (অাইনের অাওতায় অানার পরে) সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে তারা যোগাযোগের ক্ষেত্রে উচ্চ প্রযুক্তি (ওটিটি সেবা) ব্যবহার করে।

তিনি রাজধানীর রাজাবাজারে মাওলানা ফারুকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে  গ্রেফতারকৃতরাও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে উচ্চপ্রযুক্তি ব্যবহার করত বলে তিনি জানান।

সরকারের অপর একটি গোয়েন্দা সংস্থা গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এ বিষয়ে কিছু তথ্য উদঘাটনও করেছে বলে তিনি জানান।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অান্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ দেশের জঙ্গি এবং সন্ত্রাসীরা যোগাযোগ রক্ষা করছে এসব মাধ্যমে। দেশের ভেতরে তাদের অপতৎপরতা, কার্যক্রম বিস্তার, সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন প্রভৃতি বিষয় স্কাইপে, ভাইবার, ট্যাঙ্গো ও হ্যাং অাউট সেবা ব্যবহার করে তারা নির্দেশ দিচ্ছে এবং সেই মতে কাজ হচ্ছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।

এদিকে স্কাইপে, ভাইবার, ট্যাঙ্গো ও হ্যাং অাউট সেবার ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া দেশের মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর রাজস্ব অায়ের প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি ভর করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব টিঅাইএম নুরুল কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওটিটিতে যোগাযোগ বাড়লে মোবাইল অপারেটরদের রাজস্ব অায়ে চাপ পড়বে। ওটিটিতে কথা বললে এটা হয়।

তিনি বলেন, অামরা বিভিন্ন ফোরামে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। অামরা মনে করি, এ বিষয়ে একটা রেগুলেশন থাকা উচিত। তাহলে সবকিছু নজরদারির মধ্যে থাকবে।  

টেলিজিওগ্রাফি নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, টেলিফোন ও মোবাইলফোনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ প্রতিদিন কমছে। সেখানে জায়গা নিচ্ছে স্কাইপি। ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে স্কাইপির মাধ্যমে কথা বলার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৬ শতাংশ। সেখানে টেলিফোন ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ৭ শতাংশ কমেছে।
তবে গত কয়েক বছরের হিসাব বিবেচনায় নিলে এ পতনের হার ১৩ শতাংশের বেশি।


/এইচএএইচ/এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।