ভোর ০৭:৫২ ; মঙ্গলবার ;  ১৫ অক্টোবর, ২০১৯  

পানি বিশুদ্ধ করবে প্রাকৃতিক প্রযুক্তি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সৈয়দ সামিউল বাশার অনিক॥

কোনও যন্ত্র বা ছাঁকনি নয়, আস্ত একটি জলাভূমিই এবার কাজ করবে পানি পরিশোধক হিসেবে। ওই এলাকার এক পাশে ঢুকবে দূষিত পানি, অন্যপাশ দিয়ে বের হবে পরিষ্কার পানি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সফল এ গবেষণা করেছেন আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. তানভীর ফেরদৌস সাইদ ও তার অধীনস্থ শিক্ষার্থীরা।

পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তিতে পিভিসি পাইপ ব্যবহার করে একটা ম্যাট তথা চাদরের মতো বানানো হবে। ওই পাইপের ওপর লাগানো হবে বিশেষ কিছু গাছ। যে গাছের শেকড় ঝুলতে থাকবে পিভিসি-চাদরের নিচে। তারপর ওই চাদরের নিচে ছেড়ে দেওয়া হবে বিশেষ কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া, কিছু জলজ উদ্ভিদ ও মাটির স্তর। পুরো সেটাপটি থাকবে একটি পানির কলামের ওপর। ওই কলামের এক পাশ দিয়েই প্রবাহিত হবে দূষিত পানি। গাছের শেকড় ও ব্যাকটেরিয়া একসঙ্গে ওই পানি থেকে শুষে নেবে ই-কলাই ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য জৈবিক আবর্জনা। এরপর ওই কলামের অন্য পাশ দিয়ে প্রবাহিত হবে বিশুদ্ধ পানি।

. সাইদের মতে পুরো সিস্টেমটি স্থাপনে খরচ হবে আড়াই হাজার টাকা এবং এর পেছনে কোনও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও থাকবে না।

বাংলা ট্রিবিউনকে ড. তানভীর জানালেন, “ভাসমান জলাভূমির মাধ্যমে পানি পরিশোধনের প্রক্রিয়া অনেক দেশেই দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে এখনও এর প্রয়োগ নেই। প্রাকৃতিক এ প্রযুক্তিতে লেক ও বড় জলাশয়ের ক্ষতিকর বর্জ্য ও দূষিত উপাদানগুলোকে দূর করতে পারে।

পরিবেশ অধিদফতরের মতে, বাংলাদেশের নদীগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার টন মারাত্মক দূষিত ট্যানারি বর্জ্য মিশে যায়। রাজধানীতেই প্রতিদিন ৯ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। যার ৪৯ শতাংশই হলো গৃহস্থালী বর্জ্য, বাকিটা শিল্প-কারখানা ও মেডিক্যাল বর্জ্য।

আমরা এসব উপকরণ ব্যবহার করছি কারণ এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত উপকরণগুলো সহজলভ্য এবং সস্তা। যে জলজ উদ্ভিদগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলো সাধারণ জলাশয়েই পাওয়া যায়। তাছাড়া গাছগুলো যখন বড় হতে থাকে তখন এগুলোর শেকড় মাটি স্পর্শ করে। ওই শেকড়েই বেড়ে উঠবে ব্যাকটেরিয়ার কলোনি এবং সেগুলোই পানি পরিশোধন করবে।

অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটি থেকে পরিবেশে পিএইচডি অর্জন করার পর বাংলাদেশে ফিরে আসেন ড. তানভীর সাইদ। প্রথমে তিনি ইউনিভার্সিটির ছাদের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প গড়ে তোলেন। প্রথম তাতে ট্যানারি বর্জ্য পরিষ্কার করেন তিনি। এরপর গৃহস্থালীর বর্জ্য। প্রাথমিক প্রকল্পটাকে কার্যকর করতে টানা তিন বছর লেগেছে তার।

গবেষণাগারের পরীক্ষায় যখন দেখা গেল সব ঠিকঠাক কাজ করছে, তখনই আমরা বড় আকারে প্রকল্প হাতে নেই।

গবেষণাগারের প্রকল্পে দেখা গিয়েছিল দূষিত পানি থেকে ই-কলাই দূর হয়েছে ৮৯ শতাংশ, জৈবিক আবর্জনা দূর হয়েছে ৮৯ শতাংশ ও অন্যান্য ময়লা দূর হয়েছে ৯৯ শতাংশ।

প্রকল্প কিছু দূর এগুতেই দেখা গেল ই-কলাই ৯৫.৬৯ শতাংশই দূর হয়ে গেছে এবং অন্যান্য ছোটখাট আবর্জনা দূর হয়েছে ১০০ ভাগ।

আপাতত লালমনিরহাটের শুকান দিঘীতে পরীক্ষামূলক এ প্রকল্প চালু করেছেন ড. তানভীর। ৩৭ একরের ওই দিঘীতে ১০টি 'সিস্টেম' স্থাপন করা হয়েছে (১৮০ ফুট)। আগামী দেড় মাসের মধ্যেই ওই সিস্টেমের গাছগুলো ৩-৪ ফুট লম্বা হবে। পুরোদমে কাজ শুরু করবে আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে।

তানভীর সাইদ মনে করেন, এ পদ্ধতিতে রাজধানীর সকল লেকগুলোকে পরিচ্ছন্ন করা সম্ভব। তিনি বলেন, “গুলশান লেক এখন দারুণ দূষিত। এখানে ৩০টি 'সিস্টেম' স্থাপন করলেই যথেষ্ট। এতে খরচ হবে মাত্র ৬০ হাজার টাকা।রাজউকের সহায়তা পেলে আরও বড় পরিসরে এ প্রকল্প স্থাপন করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।