রাত ১০:৫৬ ; রবিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৮  

বুকার জয়ী উপন্যাস ‘দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ’

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:


‘দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ’ উপন্যাসের জন্য এ বছর ম্যান বুকার পুরস্কার পেলেন তাসমানিয়ার লেখক রিচার্ড ফ্ল্যানাগান। তাসমানিয়ায় জন্ম নেয়া এই লেখক তৃতীয় অস্ট্রেলীয় হিসেবে এই পুরস্কার পেলেন। এই পুরস্কারের ৪৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম এটির মধ্যে সব দেশের লেখকের ইংরেজি ভাষায় লেখা এবং যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত রচনাকে বিবেচনার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রিচার্ড ফ্ল্যানাগান এই পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে তাঁর অস্ট্রেলীয় পূর্বসূরি থমাস কেনিলি (শিন্ডলার্স আর্ক, ১৯৮২) এবং পিটার ক্যারি (দি হিস্টরি অভ দ্য কেলি গ্যাং, ২০০১)-এর সাথে এক সমৃদ্ধ সাহিত্য ধারায় যোগ দিলেন। রিচার্ড ফ্ল্যানাগানের ষষ্ঠ উপন্যাস এটি। অনেকের মতেই তিনি অস্ট্রেলিয়ার সেরা ঔপন্যাসিক। এই উপন্যাস নিয়ে লিখেছেন তপন শাহেদ


 মহান জাপানি হাইকু কবি বাশো-র লেখা একটি বিখ্যাত বইয়ের শিরোনাম থেকে উপন্যাসের নাম নেয়া হয়েছে

[caption id="attachment_66367" align="alignright" width="178"]প্রচ্ছদ প্রচ্ছদ[/caption] দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত সময়কালে তখনকার শ্যাম (আজকের থাইল্যান্ড) থেকে বার্মা অব্দি ৪১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মাণ করা হয়। এর আরেক নাম “মৃত্যুর রেলপথ”। এই নামের কারণ হলো তখনকার জাপান সাম্রাজ্যের জন্য যে শ্রমিকেরা এটা বানিয়েছিলো, তাদেরকে শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়েছিলো। এদের মধ্যে কমবেশি আড়াই লক্ষ ছিলো এশীয় শ্রমিক, এবং একষট্টি হাজার মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবন্দি হওয়া সৈনিক। আনুমানিক নব্বই হাজার এশীয় শ্রমিক এবং ষোলো হাজার যুদ্ধবন্দি মারা যায়। রেলপথটি নির্মাণের সময় দাস-শ্রমিকদের জীবনযাপন আর কাজের পরিবেশের নিদারুণ অবস্থা―যার মধ্যে ছিলো টানা প্রায়োপবাস, নির্মম প্রহার, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পশুর মতো কাজ, আর নানা রকম ক্রান্তীয় রোগ―ছিলো এই উচ্চ মৃত্যুহারের কারণ। অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর এক ডাক্তার আর তার মামার স্ত্রীর এই প্রেমকাহিনী অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময়কালকে উন্মোচিত করেছে। মহান জাপানি হাইকু কবি বাশো-র লেখা একটি বিখ্যাত বইয়ের শিরোনাম থেকে উপন্যাসের নাম নেয়া হয়েছে। উপন্যাসের অস্ট্রেলীয় নায়কের নাম ডোরিগো ইভান্স, পেশায় সার্জন। যুদ্ধ যখন শেষ হলো, সে অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলো যে গোটা অস্ট্রেলিয়ায় সে রীতিমতো কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে জাপানি দখলদারদের বিরুদ্ধে তার বীরত্বের জন্য। মাঝবয়সে পৌঁছে সে রীতিমতো একজন জাতীয় বীর―“দাতব্য কাজের প্রচারপত্র থেকে শুরু করে স্মারক মুদ্রা পর্যন্ত” সবকিছু থেকে তার নিজের মুখ তার দিকে চেয়ে থাকে। ডোরিগোর বাল্যকাল কিন্তু কাটে বৃহৎ বিশ্বের সুখ-দুঃখ থেকে বহু দূরে। যেখানে ও ওর পরিবারের সাথে থাকতো, তখনো সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, আর তারা ঘুমাতো ফাঁদ পেতে ধরা ‘পোসাম’-এর চামড়া গায়ে দিয়ে। বৃত্তি পেয়ে সে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পায়, আর অ্যাডেলেইডের একটা বইয়ের দোকানে খুব ভালো বেতনের একটা কাজ। সেনাবাহিনীতে ডাক্তারের চাকরি পাবার পর তার পরিচয় হয় অ্যামি নামের এক ছোটোখাটো, উজ্জ্বল চোখের, উত্তেজক মহিলার সাথে। প্রেমটা এখন মোটামুটি অনুমোদনযোগ্য, কেননা “যুদ্ধ বাধ্য করছে, যুদ্ধ সব এলোমেলো করে দিচ্ছে, যুদ্ধ ধ্বংস করছে, যুদ্ধ সবকিছু মাফ করে দিচ্ছে।” তাই অ্যামি ডোরিগোর মামার স্ত্রী, কাহিনীর এই তথ্যটা অন্য ক্ষেত্রে হলে অবাস্তব আর ফাঁপা শোনাতো, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে।

তাদের বিবাহিত জীবনটা খুব কর্তব্যপরায়ণ, কিন্তু অসুখী এবং মুক্তিহীন, তবু তা টিকে থাকে―যেন “অভিজ্ঞতার এক ষড়যন্ত্র”। অন্যদের কাছে ডোরিগো এবং নাকামুরা দুজনকেই বন্দি শিবিরটার বাইরের জগতটাতে অভিনেতা বলে মনে হয়

কাহিনী এগিয়ে যায়: জংলি এঁটুলিতে নাজেহাল আর মেটামফেটামাইন-এ আসক্ত থাই রেলওয়ে ক্যাম্পের জাপানি কমান্ডার নাকামুরা-র সাথে যখন আমাদের দেখা হয়, আমরা বুঝতে পারি যে সেও এই প্রজেক্টের একজন বন্দি। ডোরিগো এখন এক হাজার জ্বরগ্রস্ত আর ঘা-আক্রান্ত লোকের একটা দলের নেতা, তার সামনে রুখে দাঁড়ায়; আসলে সে “একটা দুর্বল মানুষ যাকে ঐ এক হাজার লোক তাকে নিয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষার রূপে নির্মাণ করছিলো, যে সে শক্তিশালী।” ঐ এক হাজারের মধ্যে এখনো কর্মক্ষম যারা, তাদের সংখ্যাটা নাকামুরাকে জানায় সে। কিন্তু “সংখ্যাটা আসলে তিনশ তেষট্টি নয়...কারণ, ডোরিগো ইভান্স ভাবে, সংখ্যাটা আসলে শূন্য।” লোকগুলো আদি ও অকৃত্রিম তরুণ অস্ট্রেলীয়, প্রত্যেকের নাম পৃথিবীর এই অপর প্রান্তের মাটির জন্য লাগসই―মোরগ ম্যাকনীস, কাল্লু গারডিনার, ভেড়ার মাথা মর্টন, মাংসের রস বেকার, টিকটিকি বার্নকাসি, মাছের টোপ ফ্যাহে। সবকটা মরতে বসেছে, কিন্তু মৃত্যুর এঁকে দেওয়া সীমানারেখাটার সঠিক পার্শ্বে টিকে থাকার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। আর এই ক্ষমতা তাদের দিয়েছে ডোরিগোর চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা যে সে তার হতাশাকে বাধ্য করবে “অর্থ আর নিশ্চয়তার” মুখটা বয়ে বেড়াতে। তবুও যুদ্ধক্ষেত্রে “হিংসাই সবকিছুর কেন্দ্রে, বিরাট এবং একমাত্র সত্য, এমনকি যেসব সভ্যতাকে সে সৃষ্টি করেছে, তাদের চেয়েও বিরাট।” “তুমি কি এখনো ঈশ্বরে বিশ্বাস করো, মাংসের রস?” ডোরিগো তার এক লোককে জিজ্ঞেস করে। “না, কর্নেল। আমার যাকে নিয়ে বিস্ময় জন্মাতে শুরু করেছে, সে হলো মানুষ।” ডোরিগোর যদিও স্মৃতির ক্ষমতায় সন্দেহ আছে, যুদ্ধের পর দেশে ফিরে আসা ক্যাম্পের সবাইকে তার স্মৃতি অনুসরণ করে। তাদের মধ্যে নাকামুরাও আছে―সে তখন যুদ্ধাপরাধের বিচার এড়িয়ে একটা বিধ্বস্ত রাজধানীতে ক্লান্তি আর নোংরার মধ্যে ভিড় ঠেলছে। আর ডোরিগোর লোকগুলোর ক্ষেত্রে, শান্তির এই নতুন পৃথিবীতে, টিকে থাকা টিকে থাকা নয়। “ওরা দ্রুত আর অদ্ভুতভাবে মরে শেষ হয়ে যায়―গাড়ি দুর্ঘটনায়, আত্মহত্যা করে, আর চামড়ার রোগে।” একদিন কাল্লু গারডিনার-এর কথা মনে পড়ায় ডোরিগোর লোকেরা হঠাৎ ক্ষেপে উঠলো, তারপর হোবার্টের এক মাছের দোকান আক্রমণ করে বসলো। মাছের ট্যাঙ্কগুলো আক্রমণ করে সেগুলোকে কনস্টিটিউশন ডকে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ছেড়ে দিলো; কারণ হঠাৎ তাদের মনে হয়েছে যে কোনো একভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা উচিত।

ফ্ল্যানাগানের এই উপন্যাস দেখতে চেয়েছে, একই মানুষের একই সাথে ভালো এবং খারাপ হওয়াটা কেমন এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসে বেঁচে থাকাটা কত কঠিন

[caption id="attachment_66369" align="alignleft" width="153"]রিচার্ড ফ্ল্যানাগান রিচার্ড ফ্ল্যানাগান[/caption] ডোরিগো নিজে অবশ্য যুদ্ধ শেষের পরেও অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীতে রয়ে যায়। “এই প্রতিদিনের বেঁচে থাকাই আমাদের শেষ করে দেয়,” এক অফিসার তাকে বলে। সে আর অ্যামির কাছে ফিরে যায় না, যায় মেলবোর্নের এক মেয়ের কাছে, যে তাকে তার আসল নাম ধরে ডাকতেই পছন্দ করে―“অ্যালভিন”। তাদের বিবাহিত জীবনটা খুব কর্তব্যপরায়ণ, কিন্তু অসুখী এবং মুক্তিহীন, তবু তা টিকে থাকে―যেন “অভিজ্ঞতার এক ষড়যন্ত্র”। অন্যদের কাছে ডোরিগো এবং নাকামুরা দুজনকেই বন্দি শিবিরটার বাইরের জগতটাতে অভিনেতা বলে মনে হয়। তবু যুদ্ধক্ষেত্রের স্মৃতিই তাদেরকে শাসন করে এবং নিঃশেষ করে দেয়। ডোরিগো সম্বন্ধে ফ্ল্যানাগান লেখেন, “যুদ্ধের পরের কয়েক দশকে ওর মনে হয় ওর আত্মা ঘুমাচ্ছে, এবং একের পর এক, কখনো-বা একই সাথে একাধিক পরকীয়া, রাগের বিস্ফোরণ, কখনো কারো জন্য অর্থহীন সহানুভূতির প্রদর্শন, কিংবা বেপরোয়া সার্জারি, এসবের আঘাত আর বিপদ দিয়ে সেই ঘুমন্ত আত্মাকে আবার ব্যবহার করার কঠিন চেষ্টা সত্ত্বেও তাতে কোনো ভালো ফল হয়নি।” ফ্ল্যানাগানের এই উপন্যাস দেখতে চেয়েছে, একই মানুষের একই সাথে ভালো এবং খারাপ হওয়াটা কেমন এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসে বেঁচে থাকাটা কত কঠিন। ক্যানসার-আক্রান্ত নাকামুরা তার স্ত্রীর মহত্ত্বে অভিভূত, আর সেটাকে সে যুদ্ধক্ষেত্রের বন্যতার সাথে খাপ খাইয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করে। ডোরিগো আর নাকামুরার মধ্যবয়সের দগদগে জীবনের কাহিনী বন্দিশিবিরে সার্জনের কাটাকুটির বর্ণনা পড়ার মতোই বেদনাদায়ক। ফ্ল্যানাগান একটা বর্ণময় ট্যাপেস্ট্রি রচনা করেছেন, এ কথা বললে উপন্যাসটার একটা উপরি-উপরি প্রশংসা করা হয়। যে কোনো পাঠক তাঁর কাহিনীর তোড়ে ভেসে না গেলে খেয়াল করবেন, চরিত্রগুলোর জন্য বরাদ্দ করা সময়, বর্ণনার নিশ্চিতি, বিরতি দেবার আত্মবিশ্বাস আর তারপর লাফিয়ে এগিয়ে চলা, সময় নিয়ে খেলা―সবকিছু দারুণভাবে সফলভাবে সমাধা হয়েছে। তবে এসব পাঠক খেয়াল করেন না। ফ্ল্যানাগানের বর্ণনার ওস্তাদি আমাদের তা করতে দেয় না।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।