দুপুর ০৩:২৩ ; সোমবার ;  ২০ মে, ২০১৯  

বিজ্ঞানীদের অবসরের বয়স: চার বছর ধরে ঘুরছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বিশেষ প্রতিনিধি॥

গবেষক ও বিজ্ঞানীদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর করা নিয়ে মন্ত্রণালয়গুলো চিঠি চালাচালি করে ক্লান্ত হয়ে এখন পারস্পরিক আলোচনা শুরু করেছে। এতদিন সংশ্লিষ্ট পাঁচটি মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে দায় এড়াতে একটি আরেকটির ওপর দায়ভার চাপিয়ে আসছিল। কিন্তু, মন্ত্রণালয়গুলো সিদ্ধান্ত দিতে না পেরে আইন করে এবং আন্তমন্ত্রণালয় সভা ডেকেও বিষয়টি চূড়ান্ত করতে পারেনি।

এ অবস্থার মধ্যে আজ বুধবার সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভা হয়েছে। সভার সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে- সরকারি কর্মচারীদের অবসর আইনের সঙ্গে বিজ্ঞানীদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর করার বিষয়টি যুক্ত করা হবে। এ ছাড়া অবসরের বয়স বাড়ানোর জন্য সব মন্ত্রণালয় মিলে একটি 'এপেক্স বডি' গঠন করা হবে। ওই বডি বিজ্ঞানীদের মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে বয়স বাড়ানোর সুপারিশ করবে।

২০১০ সালের ২৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণার আলোকে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়। এর ১২() ধারায় বলা হয়, বিশেষ মেধা ও যোগ্যতার গবেষকদের উৎসাহিত করা ছাড়াও তাদের মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ব্যবহারের লক্ষ্যে চাকরির বয়স হবে ৬৭ বছর।

অবসরের বয়স বাড়ানোর এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আইনের ব্যাখ্যা জড়িত থাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিধি ও প্রবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চায়। তা ছাড়া ৫৯ থেকে একবারে আট বছর বাড়ানো যৌক্তিক হবে কী না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ কে হবে, তা নিয়েও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় অবসরের বয়স বাড়াতে আইন করলেও গবেষকের সংজ্ঞা ঠিক করেনি। মৌলিক গবেষণা, গবেষণার সুফল এবং আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে মানসম্মত প্রবন্ধ প্রকাশিত না হলে তাকে গবেষক বলা যায় না।

আইন করে বয়স ৬৭ বছর করা হলেও কারা এ সুবিধা পাবেন তা নিয়েও সৃষ্টি হয় মতপার্থক্য। এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তোলেন- বয়স বাড়ানোর বিষয়টি কে নির্ধারণ করবে এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত কে দেবে?

তবে আরও প্রশ্ন উঠেছে, যাদের চাকরির বয়স বাড়বে তাদের স্বেচ্ছা অবসর, বাধ্যতামূলক অবসর এবং অবসরোত্তর ছুটির সুবিধা কীভাবে ঠিক হবে?

এ ছাড়া সরকারের কোনও পরিষদের সদস্য বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক গবেষক হিসেবে গণ্য হবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

এর আগে আইনি পরামর্শ চেয়ে বিজ্ঞান মন্ত্রণালয় চিঠি দিলেও আইন মন্ত্রণালয় মতামত না দিয়ে গত ৪ মার্চ আন্তমন্ত্রণালয় সভা ডাকে। সভা থেকে মেধা ও যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বা সিদ্ধান্ত চেয়ে বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, বিষয়টি আন্তমন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত হওয়ায় সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের ওই পরামর্শের আলোকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় গত ২৫ মার্চ বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। আইন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ অনুযায়ী এ চিঠি দিয়ে আবারও হতাশ হয় বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়। কারণ গত ১৫ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়ে দেয়, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় হিসেবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ই বিধি প্রণয়ন করতে পারে। এ বিষয়ে এককভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক পরামর্শ দেওয়া সমীচীন হবে না।

এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে বিজ্ঞানীদের অবসরের বয়স বাড়ানোর বিষয়ে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কাছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য চেয়েছে।

এ ছাড়া গবেষক ও বিজ্ঞানীদের অবসরের বয়স বাড়ানোর সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, গবেষকদের সঙ্গে প্রযুক্তিবিদদের সম্পৃক্ত করার প্রক্রিয়াও চলছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আইন হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মরত বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা চাকরির বয়স বাড়ানোর আবেদন করছেন। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় জড়িত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ কোনও মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এর জবাব দিতে পারছে না।

জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট একটি মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, সবাই মিলে এ বিষয়ে আইন করতে হবে। এটা না হওয়া পর্যন্ত অবসরের বয়স বাড়ানো সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

তবে ভুক্তভোগী একজন বিজ্ঞানী জানান, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশের চার বছর পার হয়েছে। প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে দেরি করেছে আমলাতন্ত্র। এর দায় বিজ্ঞানীদের নয়। তাই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা যেন কার্যকর হয়-এমনটাই দাবি সদ্য অবসরে যাওয়া ওই বিজ্ঞানীর।

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।