রাত ০১:৪৫ ; মঙ্গলবার ;  ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯  

প্যাত্রিক মোদিয়ানো `আমাদের কালের মার্সেল প্রুস্ত'

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:


[এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন প্যাত্রিক মোদিয়ানো। এটা একটা চমকও বটে। কারণ লেখক-পাঠক ও সমালোচকের পূর্বানুমানের তলানির দিকেই ছিলেন তিনি। তাঁর জনপ্রিয়তা তো নেই-ই পাশাপাশি তেমন আলোচিতও হননি ফ্রান্সের বাইরে। নোবেল প্রাপ্তিতে তিনিও খানিকটা চমকে গেছেনও হয়ত, তিনি বলেছেন, ‘আমার জানার খুব ইচ্ছে, আমাকে বেছে নেবার ব্যাপারটা তারা কীভাবে ব্যাখ্যা করে।’ ফলে তাঁর সম্পর্কে জানোশোনার সহজ রাস্তা অর্থাৎ ইন্টারনেটের দুনিয়ায় তিনি অনুপস্থিত। তাঁকে নিয়ে লিখেছনে তপন শাহেদ]


লেখকজীবনের মতো একটা অনিশ্চিত, অস্পষ্ট, ছায়াসম পেশায় আচ্ছন্ন ফরাসি লেখক প্যাত্রিক মোদিয়ানোর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি সমালোচকদের বিস্মিত করেছে। জাঁ পল সার্ত্রে, আলবেয়ার কামুর উত্তরসূরি প্যাত্রিক মোদিয়ানোর ৬৯ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কার লাভে তাঁর প্রায় পাঁচ দশকব্যাপী কাজ আর ফরাসি সাহিত্যের উৎকর্ষের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিললো। সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব পিটার ইংলান্ড তাঁকে আখ্যা দিলেন ‘আমাদের কালের মার্সেল প্রুস্ত’, কারণ তাঁর উপন্যাসগুলো যেন বিষয়গতভাবে একটি আরেকটির প্রতিধ্বনি, এবং, প্রুস্তের মতোই, ‘ব্যতিক্রমহীনভাবে একই জিনিসের রূপভেদ মাত্র―স্মৃতি, ক্ষতি, পরিচয় আর অনুসন্ধান।’ তিনি তাঁর নাতিদীর্ঘ, কখনো-কখনো স্বপ্নতুল্য উপন্যাসগুলোর পটভূমি হিসেবে প্রায়শই বেছে নিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ফ্রান্সে নাৎসি আগ্রাসনের সময়কালকে। [caption id="attachment_64774" align="alignleft" width="149"]যৌবনে প্যাত্রিক মোদিয়ানো যৌবনে প্যাত্রিক মোদিয়ানো[/caption] উপন্যাস, শিশুতোষ গ্রন্থ আর চিত্রনাট্য মিলিয়ে মোদিয়ানোর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩০। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘লা প্লাস দ্য লেতওয়াল’ দিয়ে খ্যাতির সূচনা। পৃথিবীর অনেক দেশেই তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে, এবং ডজনখানেক অনূদিত হয়েছে ইংরেজিতে। তবে ফ্রান্সের বাইরে তাঁর খ্যাতি খুব বেশি নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘নিখোঁজ’ সম্মানজনক প্রি গনকোর্ট পুরস্কার পায়, কিন্তু গোটা যুক্তরাষ্ট্রে এর মাত্র ২৪২৫ কপি বিক্রি হয়। তবে ফ্রান্সে মোদিয়ানো বহুলপঠিত। পুরস্কার ঘোষণার আগে নোবেল অ্যাকাডেমি মোদিয়ানোর নাগাল পাচ্ছিলো না। গ্যালিমার-এর সদর দপ্তরে ঘণ্টাব্যাপী সংবাদ সম্মেলনে মোদিয়ানো জানান, খবরটা তিনি পান তাঁর মেয়ের কাছ থেকে ফোনে, তিনি তখন রাস্তায় হাঁটছিলেন। ‘আমি খানিকটা বিস্মিত হয়েছিলাম, তবে আমি হাঁটা থামাইনি।’ পুরস্কার জেতার ব্যাপারটা তার কাছে ‘অবাস্তব’ ঠেকেছিলো। ১৯৫৭-তে কামু যখন পুরস্কার জেতেন তখনকার কথা তার স্পষ্টভাবে মনে আছে। পুরস্কারের জন্য নিজের নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারটা তাকে ধন্দে ফেলে দিয়েছিলো বলে জানান তিনি, ‘আমার জানার খুব ইচ্ছে, আমাকে বেছে নেবার ব্যাপারটা তারা কীভাবে ব্যাখ্যা করে।’ ১৯৪৫ সালের জুলাইয়ে প্যারিসের এক শহরতলিতে মোদিয়ানোর জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের প্যারিস দখলের সময়টাতে তাঁর বেলজিয়ান অভিনেত্রী মার সাথে তাঁর ইতালীয় ইহুদি বাবার দেখা হয়। সবসময়ই তিনি মিডিয়ার দৃষ্টি এড়িয়ে চলে নিজের নিভৃতি বজায় রেখেছেন। ২০১২ সালে লা ফিগারো পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাতকারে মোদিয়ানো জানান, নিজেকে আর নিজের বই নিয়ে কথা বলতে এখন তিনি অনেকটাই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। ‘শুরুতে আমার মনে হয়েছিলো লেখালেখির ব্যাপারটা একটা বোঝার মতো, অত অল্প বয়সে লেখকের জীবন বেছে নেওয়াটা খুব কষ্টের একটা ব্যাপার। এটা একজন মানুষের সাধ্যের বাইরে। এ জন্য তাকে এমন সব বায়বীয় জিনিস নিয়ে কাজ করতে হয় যার ভার অনেক। এখন আমি যখন আমার প্রথম দিককার পাণ্ডুলিপিগুলোর দিকে ফিরে তাকাই, বিস্ময়ে ভাবি, হাঁফ ছাড়ার মতো, নিশ্বাস নেবার মতো একটুখানি জায়গার কত অভাব সেখানে।’ [caption id="attachment_64771" align="alignright" width="280"]নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির খবর পাবার পর এক সংবাদ সম্মেলনে প্যাত্রিক মোদিয়ানো। ছবি: এএফপি নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির খবর পাবার পর এক সংবাদ সম্মেলনে প্যাত্রিক মোদিয়ানো। ছবি: এএফপি[/caption] নোবেল পাবার পর তাঁর বইয়ের বিক্রি বাড়বে নিশ্চিত। মোদিয়ানোর ফরাসি প্রকাশক ঘোষণা দিয়েছেন, এর মধ্যেই তাঁরা অতিরিক্ত এক লক্ষ কপি ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ডেভিড আর. গোডিন নামে যুক্তরাষ্ট্রের যে ছোট প্রকাশনী মোদিয়ানোর তিনটি বই ছেপেছিলো তারা সেগুলোর আরো পনের হাজার কপি ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখানে এখন অব্দি দুটি উপন্যাস আর একটি শিশুতোষ গ্রন্থ মিলে ঐ তিনটি বইয়ের মোট বিক্রি গোটা আমেরিকায় আট হাজারেরও কম। ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস মোদিয়ানোর তিনটি নভেলা ছাপার কাজ হাতে নিয়েছে। পুরস্কার ঘোষণার পর তারা প্রকাশনার তারিখ আগামি ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বরে এগিয়ে নিয়েছে। আর প্রথম মুদ্রণসংখ্যা পরিকল্পিত ২০০০ থেকে বাড়িয়ে ২০০০০ করেছে। মোদিয়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি গ্রন্থ: ১. লা প্লাস দ্য লেতওয়াল: ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত তাঁর এই প্রথম আধা-আত্মজৈবনিক উপন্যাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ফ্রান্সে ইহুদি বিদ্বেষের পরিণতি দেখানো হয়েছে, আর এই উপন্যাস তাৎক্ষণিকভাবে সমাদৃত হয়। ২. নিখোঁজ (Rue des boutiques obscures): ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত। স্মৃতি হারানো এক গোয়েন্দার জীবনকাহিনী। ৩. হানিমুন (Voyage des Noces): ১৯৯০ সালে প্রকাশিত। ডোরা ব্রুডার অদৃশ্য হবার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়, তার পূরণ করে এই উপন্যাস। ৪. ডোরা ব্রুডার: ফ্রান্স নাৎসিদের দখলে থাকার সময়কালে নিখোঁজ এক ইহুদি কিশোরীর এই কাহিনীতে গবেষণা, তত্ত্বায়ন আর কল্পনার সম্মিলন ঘটেছে। ৫. একটি বংশলতিকা (Un Pedigree): ২০০৫ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাস মোদিয়ানোর নিজের জীবনের ২১ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কাল নিয়ে রচিত।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।