রাত ০৯:৫১ ; মঙ্গলবার ;  ২৫ জুন, ২০১৯  

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হাসনাত সুহান || এ বছর কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার? -এই প্রশ্নের উত্তর চট করে দেয়া সম্ভব নয়। ল্যাডব্রোকের মতো পেশাদার বেটিং হাউসগুলোও রীতিমতো তুলাকালাম কাণ্ড করে যাচ্ছে এর উত্তর খুঁজতে।তবে চূড়ান্ত ফলাফল পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে এ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৮ সদস্যের সুইডিশ একাডেমি ইতোমধ্যে হ্রস্ব তালিকায় মনোনীত লেখকদের সাহিত্যকর্ম চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ফেলেছেন।গোপন ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত ভাগ্যবানের নামটিও ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরেও থেমে নেই সম্ভাব্যদের নিয়ে জল্পনা কল্পনা। কারা আছেন এই তালিকায়? ল্যাডব্রোকের তালিকা অনুযায়ী, এ পুরস্কারের সবচেয়ে বেশি দাবিদার ভাবা হচ্ছে জাপানের জনপ্রিয় সাহিত্যিক হারুকি মুরাকামিকে। তিনি গতবারও তালিকায় শীর্ষে ছিলেন। কিন্তু পুরস্কার জোটেনি। এবারও কী উপেক্ষিত থেকে যাবেন এই জাপানিজ? জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকলেও নোবেল পাননি এমন লেখকদের তালিকা দেখলে মুরাকামির অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস হয়তো আরও দীর্ঘ হবে। কারণ, ওই তালিকায় সাম্প্রতিককালে জায়গা নিয়েছেন ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ, নাইজেরীয় কথাসাহিত্যিক চিনুয়া আচেবে, মেক্সিকোর কথাসাহিত্যিক কার্লোস ফুয়েন্তেস কিংবা মার্কিন নাট্যকার আর্থার মিলার। নোবেল পুরস্কারের ১১৩ বছরের ইতিহাসে, নোবেল কমিটির সুনজরে আসেননি এমন বিশ্ববরেণ্য, জনপ্রিয় লেখকদের তালিকাটা আরও দীর্ঘ। যেমন তলস্তয় বা আন্তন চেখভ এই রুশ গুরুদ্বয়ের কেউই সুইডিশ একাডেমির সুনজরে আসেননি! খোদ সুইডিশ নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ আর নরওয়েজীয় নাট্যকার হেনরিক ইবসেনকে নোবেল দিয়ে নিজেদের সম্মানিত করতে পারেনি সুইডিশ একাডেমি। অতএব, মুরাকামি জনপ্রিয় হলেও, পুরস্কার নাও পেতে পারেন তিনি। তাহলে তাঁর পরে কে আছেন তালিকায়? এক্ষেত্রে ল্যাবড্রোকসের বাজির ঘোড়া আফ্রিকান লেখক নগুয়ি ওয়া থিঙ্গো। দিন দিন তাঁর বাজির পাল্লা ভারীই হয়েছে। নগুগির সম্ভাবনা ল্যাবড্রোকসের বাজিকরদের মতে ৩৩/১ থেকে ১০/১-এ এসেছে। আরেকটি বাজি ধরা কম্পানি অ্যালেক্স ডোনোহিউও এই কেনিয়ানের পক্ষে জোরেশোরে কথা বলছে। কেনিয়ায় সমাজের অসাম্য ফুটিয়ে তোলা নগুগি কারা অভ্যন্তরে টয়লেট পেপারে লিখেছিলেন উপন্যাস Caitani Mutharabaini (Devil on the Cross)। আর তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল Ngaahika Ndeenda (I Will Marry When I Want) নাটকটি লেখার অপরাধে। তাই নোবেল কমিটি যদি রচনাশিল্পের রাজনৈতিক নির্যাসটুকুকে কিঞ্চিৎ গুরুত্ব দেয়, তাহলে নগুগি-র সম্ভাবনা যে কারও চাইতে এগিয়ে। ঠিক তেমনি তালিকায় নতুন হলেও এবার এগিয়ে আছেন, ইউক্রেনের লেখিকা সেভেতলানা এলেক্সিয়েভিচ।রুশ-ইউক্রেন দ্বৈরথে টালমাটাল ইউরোপ যে নতুন করে পড়ছে তাঁর লেখা! সাম্প্রতিককালে, তাঁর ‘ভয়েস ফ্রম চেরনোবিল’ উপন্যাস সমালোচকদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। যদিও এই লেখিকার সাহিত্যকর্মের প্রকৃতি নোবেল পুরস্কার উপযোগী সাহিত্য নয় বলে যথেষ্ট আপত্তি আছে কারও কারও! সেভেতলানা’র সম্ভাবনার বাজি কমে কমতে পারে অন্য আরেকটি কারণে। গত বছর এলিস মুনরো পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার। তাই নোবেল কমিটি এ বছরও আরেকজন নারীকে বিবেচনায় আনবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা থেকে যায়। ঠিক একই কারণে বাদ পড়তে পারেন আলজেরিয়ার জনপ্রিয় লেখিকা আসিয়া জাবের, ইতালিয়ান লেখিকা দারসিয়া মারাইনি। যদিও পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দু’জনই সমান্তরালভাবে যোগ্য। কানাডার নারীবাদী লেখিকা ও সমাজকর্মী মার্গারেট এটউড এবার যোগ্য হলেও, ভাগ্য খারাপই বলতে হয়। কারণ, স্বদেশী লেখিকা এলিস মুনরো পুরস্কার পেয়েছেন গত বছর। নোবেল কমিটির ভোটাভুটিতে যদি এটি প্রভাব ফেলে, তাহলে হতাশই হতে হবে তাঁকে। জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ঠাঁই নিতে হবে এজরা পাউন্ড, ভার্জিনিয়া উলফ, সিমোন দ্য বুভ্যোয়া প্রমুখ নারীবাদী দিকপালদের কাতারে। তাঁদের কাউকেই মূল্যায়ণ করতে পারেনি নোবেল কমিটি। ২০ বছরের খরা কেটে মার্কিনীদের কপালে এ বছরের পুরস্কারটি জোটে কিনা- সেটা দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন অনেকেই। গতবারের মতো এবারও আমেরিকার করম্যাক ম্যাকার্থি, থমাস পিনচন ও জয়েস ক্যারোল ওটসের নাম শোনা যাচ্ছে। আছেন ডন ডেলিলো, বব ডিলান কিংবা লেখালেখি থেকে সদ্য অবসর নেয়া ফিলিপ রথ। বব ডিলানের নিজস্ব কিছু পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে, যারা আশাবাদী ডিলানকে নিয়েই। ডন ডেলিলো তাঁর লেখনীর স্বকীয়তার জন্য ইতোমধ্যে বেশ সমাদৃত, ইউরোপের পাঠকদের কাছে। ফিলিপ রথ বুড়িয়ে গেছেন। কিন্তু, যোগ্য দাবিদার নিঃসন্দেহে। ফিলিপ রথের  সাথে বুড়োদের তালিকা ভারী করেছেন সার্ব লেখক ডোবরিকা কোসিকে, চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা এবং সিরিয়ান কবি অ্যাডোনিস (আলী আহমদ সাঈদ)। নোবেল কমিটির সামনে সুযোগ রয়েছে মিলান কুন্ডেরাকে সম্মান জানিয়ে এন্তন চেখভের প্রতি নিজেদের অবিচারের দায় মেটানোর। ঠিক তেমনি সুযোগ মিলেছে অ্যাডোনিসকে সম্মান জানিয়ে কবি মাহমুদ দারবিশেকে উপেক্ষার ক্ষত মুছে ফেলার। ৮৪ বছর বয়সী সিরিয়ান অ্যাডোনিসকে আরব বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সিরিয়ায় জন্মালেও দীর্ঘ সময় লেবাননে অভিবাসী জীবন কাটিয়েছেন তিনি। দামেস্ক, ফ্রান্স, আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি কবিতা বিষয়ে পাঠদানকারী অ্যাডোনিসের নাম প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, প্রগতি ও আধুনিকতার সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আরব বসন্তকালীন সময়ে তারুণ্যের কাছে তিনি ছিলেন প্রজ্জ্বলিত নক্ষত্রের মতো। তাই সাম্প্রতিককালে আইসিস ঝড়ে দিশেহারা মধ্যপ্রাচ্যের তারুণ্যকে স্বস্তি কিংবা অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য হলেও অ্যাডোনিসকে বিবেচনায় আনা উচিত। বিবেচনায় আসতে পারেন আলবেনিয়ান কবি ইসমাইল কাদারে। বিশ্বের ৪০টি ভাষায় তাঁর লেখনী অনূদিত ও প্রশংসিত হয়েছে। The Castle, The Pyramid, Broken April -এর মতো বইয়ের লেখক আলোচনায় শুরুর দিকে না থাকলেও পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন। ডাচ্ লেখক সিজ নুটিবুমের (কর্নেলিস জোহান্স জ্যাকোবাস মারিয়া নুটিবুম) ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যোগ্যতার মাপকাঠিতে অনেকটা শুরুর দিকেই আছেন অ্যাডাম জাগাঝেস্কি, পিটার হ্যান্ডক। তবে, শেষ পর্যন্ত নামজাদা গ্রেটদের ভীড়ে তাঁদের মূল্যায়ন কতটুকু মিলবে, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। সোমালিয়ার নুরুদ্দিন ফারাহ, ইসরায়েলের লেখক অ্যামোজ ওজের সম্ভাবনাকে খারিজ করা যাচ্ছে না। আইরিশ লেখক জন বানভিল, পর্তুগিজ লেখক মনস্তাত্ত্বিক অ্যান্তোনিও লোবো অ্যান্তোনাসকেও ধরা হচ্ছে সম্ভাব্যদের কাতারে। নতুনভাবে বিবেচিতদের তালিকায় রয়েছেন, ফকনার ও পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত আমেরিকার ঔপন্যাসিক রিচার্ড ফোর্ড, স্পেনের ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও কলামিস্ট জেভিয়ার মারিয়াস এবং নরওয়ের নাট্যকার জন ওলাভ ফসি। তাঁদের মধ্যে কেউ একজন পুরস্কারটা পেয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। 'প্যারালাল স্টোরিজ' খ্যাত হাঙ্গেরির পিটার নাদাস ও চিনের বেই দাও রয়েছেন তালিকায়। উভয়েরই বাজির দর ২০/১। ‘বুকার অব দ্য বুকারস’ জয়ী সালমান রুশদির সম্ভাবনা রয়েছে এবার। ৬৪ বছর বয়সী এ লেখককে নোবেল লরিয়েট হিসেবে দেখলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এশীয়দের মধ্যে মুরাকামি ছাড়াও রয়েছেন তাঁর স্বদেশি কাজুও ইশিগুরো। তবে, মুরাকামি যেখানে পাদপ্রদীপের আলোয়, সেখানে খানিকটা অনুজ্জ্বল কাজুও ইশিগুরো। এই দুই জাপানি ছাড়াও সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার কো উন। উপন্যাস, ট্রাভেলগ, কাব্যগ্রন্থ, আত্মজীবনী মিলিয়ে ১৪০টির মতো বইয়ের লেখক দক্ষিণ কোরিয়ার কো উন অনেক দিন ধরেই বিশ্বের প্রতিনিধিত্বশীল লেখক। তবে, তাঁর নামটা তালিকার বেশ নিচের দিকে। দক্ষিণ এশিয়দের মধ্য থেকে মহাশ্বেতা দেবী আলোচনায় ছিলেন বেশ ক’বছর। এবার আর তেমন সাড়াশব্দ নেই। আগামীতে হয়তো ঝুম্পা লাহিড়ী, অরুন্ধতী রায়কে নিয়ে আশা করা যেতে পারে। কিন্তু এ বছর কেউই আলোচনায় নেই। আলোচনায় ঠাঁই নেয়া বিশ্ব বরেণ্য লেখকদের মধ্যে সবারই যোগ্যতা রয়েছে নোবেল প্রাপ্তির।  তবুও সকল প্রকার যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নোবেল কমিটিকে একজনের নামই ঘোষণা করতে হবে। আমাদের শুধু অপেক্ষা। চলতি মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার আজ। কে পাচ্ছেন এবার সাহিত্যে নোবেল? উত্তর মিলবে সেদিনই।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।