সকাল ১০:৩৬ ; বুধবার ;  ১৩ নভেম্বর, ২০১৯  

চামড়া সংগ্রহে কওমি মাদ্রাসার শিশুরা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

সালমান তারেক শাকিল॥

ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারাদেশের সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক আগেই ছুটি হয়েছে। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের অনেকে পরিবারের সঙ্গে চলে গেছে গ্রামের বাড়ি। তবে পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাতে বাড়ি কিংবা পরিবারের কাছেই যেতে পারেনি স্বায়ত্বশাসিত কওমি মাদ্রাসার শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা।

সাধারণত কোরবানি ঈদের পরের দিন থেকে ছুটি থাকার নিয়ম রয়েছে কওমি মাদ্রাসার প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এ নিয়মকে থোড়াই কেয়ার করছে মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ।

ঈদের দিন কোরবানির পশুর চামড়ার সংগ্রহ ও বিক্রি থেকে মাদ্রাসার আনুষাঙ্গিক খরচ, লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিম ছেলেদের থাকা-খাওয়ার খরচ যোগান দেওয়া হয়। অার তাই চামড়া সংগ্রহের পরিমাণে বেশি করতেই প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পশু জবাইয়ের ধারালো ছুড়ি। বাবা-মার সঙ্গে ঈদ আনন্দ করার বদলে শরীরে পশুর রক্ত মেখে এ গলি থেকে ও গলিতে চামড়া সংগ্রহ করাই হচ্ছে এ শিশু-কিশোরদের কাজ।

সোমবার ভোর থেকে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ চিত্র দেখা গেছে।

IMG_20141006_122935_9CSকওমি মাদ্রাসাসূত্রে জানা গেছে, বছরের একটি দিন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সর্বোচ্চ আর্থিক লাভের আশায় প্রতিবছর কোরবানির দিন প্রাপ্তবয়স্কদের ছুটি বাতিল করে কওমি মাদ্রাসাগুলো। কোরবানির পশুর চামড়া আদায়ের জন্য স্ব স্ব এলাকার প্রতিটি বাসাবাড়িতে জনসংযোগ করে। বিলি করে বিভিন্ন রঙের লিফলেট। কোরবানির আহ্বান। নিয়মনীতি। এবারও ব্যতিক্রম ছিল না। কোরবানির ঈদের অন্তত ১০ দিন আগে থেকে এলাকা ভাগ করে দেওয়া, লিফলেট বিতরণ,

কোরবানিকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনসহ নানা কাজে পৃথক পৃথক করে টিম করে দেওয়া হয়েছিল প্রতিটি কওমি মাদ্রাসায়।

জানা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কওমি মাদ্রাসার চামড়া সংগ্রহের নিয়ম অনেক দিন আগের। তবে শিশুদের ব্যবহার করার নিয়ম নেই। কওমি আলেমদের আকাবির হিসেবে পরিচিত আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ., মুফতি শায়খুল হাদিছ আল্লামা আজিজুল হক রহ., মুফতি ফজলুল হক আমিনীসহ শীর্ষ আলেমরা তাদের মাদ্রাসায় কখনোই শিশুদের চামড়া সংগ্রহে ব্যবহার করতেন না। এমনকি নিষেধও ছিল তাদের। গত কয়েক বছর ধরেই এ নিয়ম মানা হচ্ছে না।

তবে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের সহ-সভাপতি শায়খুল হাদিছ মাওলানা আশরাফ আলী বলেন, ছোট শিশুদের মাদ্রাসায় রাখার নিয়ম নেই। আমাদের মাদ্রাসায় আমরা এ নিয়মেই চলি। ঢাকায় কেউ অনিয়ম করে থাকলে আলোচনা সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সোমবার ঈদের সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কওমি মাদ্রাসার কয়েক হাজার শিশু প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে চামড়া সংগ্রহে বের হয় রাজধানীর অলিগলিতে। মোহাম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া, লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া, মিরপুর আরজাবাদ মাদ্রাসা, মিরপুর ১৩ নাম্বার, ৬ নাম্বার মাদ্রাসা, বড় কাটারা মাদ্রাসা, বনশ্রী আব্বাস আলী জামিয়া ইসলামীয়া, ঢালকানগর মাদ্রাসা, আজিমপুর ফয়জুল উলুম মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ চিত্র দেখা গেছে।

সকাল সাড়ে নয়টায় কথা হয় রামপুরা বনশ্রী প্রজেক্টের আব্বাস আলী জামিয়া ইসলামীয়ার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র দায়িত্বরত নুরুল ইসলামের সঙ্গে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, আমি সকাল সাড়ে সাতটায় বের হয়েছি। ফজরের নামাজের সময় ওঠে, এরপর খেয়েছি। গরুর গোশতো আর সাদা ভাত। এরপর কাজে এসেছি। ঈদে বাড়ি যাবে না? এমন প্রশ্নের উত্তরে নুরুল ইসলাম বলেন, যাব। তবে আজকে সন্ধ্যায়, না হলে আব্বা কাল আসলে যাব।

এ ব্যাপারে পাশেই দাঁড়ানো ওই মাদ্রাসার একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি নিজের গলায় ঝুলানো কার্ড নামিয়ে নেন। কথা না বলেই প্রস্থান করেন।IMG_20141006_123217_8CS

এ ব্যাপারে কথা হয় লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া থেকে দাওরায়ে হাদিছ (মাস্টার্স) পাস মাওলানা সালাহুদ্দীন জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মন্তব্য নেই তবে এটুকু বলতে পারি, একবার মিরপুর একটি মাদ্রাসায় পড়ার সময় বাবা ফোন করেছিলেন ঈদের আগের দিন। বলেছিলেন, চলে আয়। তখন আমার দু বোনের বিয়ে হওয়ায় তারা বাড়ি ছিল না। অথচ পাশের ঘরের ছেলে-মেয়েরা বাবা-মার সঙ্গে ঈদ করছেন। কিন্তু আমি নেই, তাই বাবা ফোনে কেঁদেছিলেন।’

কওমি মাদ্রাসার সূত্রমতে, ঢাকার বড় বড় কওমি মাদ্রাসাগুলোয় কয়েক হাজার চামড়া সংগৃহিত হয়। ছোট ও মাঝারি মানের মাদ্রাসাগুলোয় ২শ' থেকে এক হাজার পর্যন্ত পশুর চামড়া ওঠে। রাজধানীর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ পার্সেন্ট পশুর চামড়াই যায় কওমি মাদ্রাসার যাকাত-ফিতরা তহবিলে।

গত বছর শুধু লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া, মুহাম্মদপুর, ঢালকানগর মাদ্রাসার চামড়া থেকে আয় হয় কোটি টাকার ওপরে। তবে সবচেয়ে বেশি আয় করে মিরপুর আরজাবাদ মাদ্রাসা। ওই মাদ্রাসায় কোরবানির ঈদের চামড়া থেকে সংগৃহিত অর্থ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই মাদ্রাসায়ও এবার ছোট শিশুদের চামড়া সংগ্রহে নিযুক্ত করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে কথা হয় সোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব ও ইক্বরা মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইসলামে মানে কোরআনে-হাদিছে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কোনও কথাই নেই।

কওমি মাদ্রাসায় চামড়া সংগ্রহের কাজটি ২৫-৩০ বছর ধরে চলছে। এটি মাদ্রাসার উন্নয়ন, এতিমদের পেছনেই খরচ হয়। তবে শিশুদের দিয়ে এ কাজ না করানোই ভাল। আমিতো আমার মাদ্রাসায় সব ছাত্রদের ছুটি দিয়েছি। একদম দাওরা (বড়) পর্যন্ত। বলেছি বাড়ি যাও, বাবা-মার সঙ্গে ঈদ করো।

(ছবিগুলো রাজধানীর বনশ্রী, রামপুরা, কাকরাইল, মালিবাগ থেকে তোলা।)

/এএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।