রাত ০৯:৫৮ ; শুক্রবার ;  ১৮ অক্টোবর, ২০১৯  

জীবনের শিলালিপি: রসঘন বয়ানে জীবনসত্য

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

  এ বছর একুশে গ্রন্থমেলায় যে বইগুলো মননশীলতা ও নিরীক্ষার কারণে আলোচিত হয়েছে  তা থেকে নির্বাচিত  বই নিয়ে আমাদের এই পরিচয়পর্ব। লিখেছেন রহমান মতি কাজী শাহেদ আহমেদ-এর আত্মজীবনী ‘জীবনের শিলালিপি’। এই গ্রন্থ জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় খোদিত। সৎ বর্ণনাভঙ্গির একান্ত বিশ্লেষণে ভাষার রসবোধ, যুক্তি ও ঘটনা প্রবাহের সাবলীল ভারসাম্যপূর্ণ লেখনীর অপূর্ব সম্মিলন পাওয়া যাবে বইটিতে। লেখক তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে বর্ণনা করতে কোন রাখঢাক রাখেননি। কথা বলেছেন মন খুলে। উৎসর্গপত্রে বলেছেন- ‘যাহা লিখিলাম তাহা সত্য। যাহা ছাপিলাম না তাহাও সত্য, যাহা ত্রিশ বছর পর ছাপা হইবে তাহাও সত্য’। বর্তমান ও ভবিষ্যতকে এক সুতোয় বেঁধে অন্তরঙ্গ হয়েছেন পাঠকের কাছে। ছেলেবেলা থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পেরিয়ে কর্মজীবনের বর্ণাঢ্য বিবরণে বইটি এগিয়েছে। ছেলেবেলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখার ভয়াবহ অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে হেসেখেলে বেড়ানো শৈশবের ইতিহাস শুরু হয়। তখন অভাবের সংসারে ক্ষুধার যন্ত্রণা যে কত বড় বাস্তবতা ছিল লেখক নিঃসঙ্কোচে তা বলেন বড় ভাইয়ের মুখ থেকে- “শন্তু, এখনই আব্বা এসে যাবে। চাল আসবে, ভাত হবে, তুই খাবি।” পারিবারিক বন্ধনে অনবদ্য আখ্যান ছেলেবেলার অংশটি। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের পরেই বিয়ের আয়োজন। বিয়ে সম্পর্কিত পারিবারিক তোড়জোড়, আমোদ ফূর্তি, অন্যান্য সাংস্কৃতিক আবহ নিপূন লেখনীতে ছবির মতো এসেছে। নাপিতের দোকানে বড় ভাই বলেন- ‘মোচ নিয়ে কেউ কি বিয়ে করে?’।  বাসর রাতের মুহূর্তকে তিনি ‘পুলসিরাত’ বলেন অনায়াসে। পাঠকের প্রণোদনাকে চারিয়ে নিতে এমন রসবোধ তার সহজাত। সংসার জীবন বর্ণনার পাশাপাশি এসেছে সমসাময়িক রাজনীতি প্রসঙ্গ। আইয়ূব খানের শাসনামল, কুটনৈতিক বিষয় ইত্যাদি। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, অবিভক্ত ভারতবর্ষে অর্থাৎ ইংরেজ শাসনামলে, সে সূত্রে পাকিস্তান আমলও তার ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় ছিল। সে সময়গুলো নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং ছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলে এদেশের স্বাধীনতার স্পর্শ পাওয়া ও প্রথম দিনগুলোর কথায় আবেগাপ্লুত বর্ণনা থাকাই স্বাভাবিক এবং হয়েছেও তাই। প্রথম কর্মক্ষেত্র রংপুর, কুমিল্লার স্মৃতি, নৌ-বাহিনীতে যোগদান ইত্যাদি বাংলাদেশ ইতিহাসের মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনস্রোতের অংশ। কর্মজীবনে তিনি বৈচিত্র্য এনেছেন নানা নতুন কাজের উদ্যোক্তা হিসেবে। ক্রীড়া, সংবাদপত্র, কোম্পানি ভিত্তিক ব্যবসায়িক চিন্তা করেছেন এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে তিনি সফল। সংবাদপত্রে বাংলাদেশে দিক পরিবর্তনকারী ‘আজকের কাগজ’ এর প্রতিষ্ঠাতাও তিনিই। এ পত্রিকা নিয়ে নিন্দা ও রাজনীতি হয়েছিল। সেসব দিন তিনি ধৈর্য্য নিয়ে পার করেছেন। প্রগতিশীল আন্দোলনের চেতনায় প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্যের দিককে নতুন আঙ্গিক দিয়েছেন। তাঁর চেতনার অংশবিশেষ পাঠকদের চোখে পড়বে- “ ‘আজকের কাগজ’ ছিল মূলত একটা আন্দোলন, একটা বিপ্লব। আজকের কাগজের দর্শন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। আর লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করা।”এর পর ৯০-এর গণজাগরণ ও মৌলবাদী তৎপরতা, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে রাজনৈতিক নতুন মোড়কে সাহসী কলমে তুলে আনেন। আত্মজীবনীতে লেখা নেপথ্যে ‘শেষকথা’ নামের একটি অংশ বইটির শেষে আছে। সেখানে লেখকের জীবন দর্শন ফুটে উঠেছে- “জীবনে আমার অর্জন ও প্রাপ্তির অন্ত নেই। এক্ষেত্রে ব্যবসায়িক সাফল্যের চেয়ে বড় ব্যাপার একটি সুন্দর পরিবার। আমাদের নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব; গল্পে হাসিতে দিন কাটানো। পরিচিতির চেয়েও বড় ব্যাপার মানুষের ভালোবাসা।” অসামান্য এ উচ্চারণ কাজী শাহেদ আহমেদকে আত্মজীবনী রচনার মহৎ উদ্দেশ্য ও দায়বদ্ধতার পাশে পাঠকের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। আত্মবিশ্লেষী মানুষ হিসেবে ব্যক্তি ও সমষ্টির তাৎপর্যে নিজেকে ফিরে পেতে কালে কালে যারা কলম হাতে তুলেছেন কাজী শাহেদ আহমেদ তাদেরই একজন। আমরা বইটির বহুল পঠন ও মূল্যায়ন আশা করি। জীবনের শিলালিপি। কাজী শাহেদ আহমেদ। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৪। প্রকাশক: আগামী প্রকাশনী। প্রচ্ছদ- এ.জি আরিফ। মূল্য-৮০০ টাকা।    

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।