রাত ০৮:২০ ; বুধবার ;  ২৫ এপ্রিল, ২০১৮  

আলফ্রেড খোকনের কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[আলফ্রেড খোকন নব্বই দশকের অগ্রগণ্য কবি। জন্মেছেন ১৯৭১ সালে। পেশায় গণমাধ্যম কর্মী। তার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৭টি, গ্রদ্যগ্রন্থ ৩টি এবং ছড়াগ্রন্থ ১টি। তার কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজি ভাষায়। বাংলা ট্রিবিউন-সাহিত্যে তার একটি নতুন কবিতা ছাপা হলো। সঙ্গে একটি প্রকাশিত কবিতা ও তার আলোচনা।]

  নতুন কবিতা সাফল্যর আসা যাওয়া সাফল্য আমার কাছে আসে রোজ বিকেলবেলায় আমার এবসেন্ট মনের হাত ধরে সন্ধ্যা হওয়ার পর দুই পেগ পান করে মিনতি শেষে গ্রীনরোডের দিকে চলে যায় রাত আটটার পর গ্রীনরোডে ভীড়, ছিনতাই টাকাপয়সা, সোনাদানা ওই সময়টা তাই সাফল্যের এইদিকে আসতে মানা রাত এগারটার পর আবার সে আসে ঘাসে তখন শিশিরের কণা পা ডুবিয়ে বসে, গলাও ডোবাতে চায় অপেক্ষমান তার ঘৃণা সাফল্য’র মনে এত দুঃখ এত কাছে থেকেও আমি তা জানি না তার তো দুঃখ, প্রেম, অপ্রাপ্তি থাকার কথা নয় গ্রীনরোডে রয়েছে গ্রীন স্টোর থরে থরে সাজানো দেশি দুঃখ, ক্ষোভ, ঘৃণা বঞ্চনা আর একটুখানি ঘোর; সারাদিন উল্লাস, পত্রিকার পাতায় রঙিন ছবি টেলিভিশনে তার অনতিদূরের মহিমা তুবও সে এসে আমার পাশে বসে থাকে বিকেলবেলায়; তার এই আসা-যাওয়ার চর্চা আমি মন দিয়ে দেখি, কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আবার সে গ্রীনরোড ধরে চলে যায়।   প্রকাশিত কবিতা নির্বোধ কোকিলের জন্য চৈত্রগীতি যদি বলি... মহুয়ার ফলগুলি ছাড়া আর কেউ জেগে নাই এইরাতে, এমত মদির মধ্যরাতে তারে চিবিয়ে খাই খুলে বলি... কয়েকটি বাদুড় যেহেতু সুগভীর আঁধার দেখিতে পারে কতিপয় নতুন কিশোর কিংবা কিশোরী বসে ছাদের কিনারে চুল খুলি... গত চৈত্রে যারা হয়েছে যুবক এবং যারা যারা যুবতী গত সন্ধ্যার আগেই যারা শিখে ফেলছে রাত ও রতি খুলে বলি... মধ্যরাতে ঘর থেকে বের হল যে আমাকে নিতে সে আমারে ভুলে গেছে চৈত্র-পীড়িতে আসে অলি... ভোরে মাখো মাখো শিশির রাতের রতির গন্ধ নিয়ে আজ যে প্রথম ওড়না পড়ল কাল সকালে তার বিয়ে! যদি বলি... তোমাকেই চাই, তোমাকেই চেয়েছিল হরপ্পার লুই মহুয়ার মাতাল আধাঁরে রচি আমি তো কানুই   ‘নির্বোধ কোকিলের জন্য চৈত্রগীতি’ কবিতার আলোচনা হে কোকিল হে বেদনা বিধান সাহা

‘কবিতা অনেক রকম।’ জীবনানন্দ দাশের এই কথাটিকে জানার পর থেকেই শিরোধার্য করেছি। দেখেছি, একেক কবিতা একেক কথা বলে। একেক মুহূর্তের অনুভূতি প্রকাশ করে। পাঠক যখন কবির প্রকাশিত মুহূর্তটির সাথে একাত্ম হয়ে পড়েন তখন সেই লেখাটি সেই পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়। নইলে পাঠক ভুল বুঝতে পারেন। রিয়াক্টিভ পাঠক হয়ত অকবিতা, কাঁচা- কবিতা, না-কবিতা, নানা অভিধায় অভিযুক্ত করতে থাকেন সেই লেখাটিকে। কিন্তু আমি তো দেখেছি ভিন্ন ভিন্ন মুডে কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতাও পাল্টে পাল্টে যায়।

‘নির্বোধ কোকিলের জন্য চৈত্রগীতি’তে কি দেখতে পাই আমরা? দেখা যায় খণ্ড খণ্ড দৃশ্য রচনার ভেতর দিয়ে কবি আলফ্রেড খোকন নির্মাণ করেছেন কোনো এক মহুয়া সন্ধ্যার মাতাল অনুভূতিমালা। বলা যায় কয়েকটি সুষম দৃশ্যের কোলাজ এই কবিতাটি। কিন্তু কবিতা হিসেবে এই দৃশ্য-কোলাজ কতখানি উৎরে উঠলো সেটাই আলোচ্য বিষয়। কবিতায় প্রথম স্তবকেই কবি তার অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছেন-

‘মহুয়ার ফলগুলি ছাড়া আর কেউ জেগে নাই এইরাতে, এমত মদির মধ্যরাতে তারে চিবিয়ে খাই।’

এই স্তবক পাঠশেষে পাঠকের আর বোঝার অপেক্ষা থানে না যে কবিতাটি কোনো এক বেদনা বিধুর মধ্যরাতের আলেখ্য। যেখানে একমাত্র মহুয়ার ফলগুলি ছাড়া আর কেউ জেগে নাই। এবং কবি নিরুপায় সেই মহুয়ার সেবক তখন। এর পরের স্তবকে কবি তার দৃষ্টিকে প্রসারিত করেন দূর্লক্ষে, সমকালীন সংকটের দিকে।

‘খুলে বলি... কয়েকটি বাদুড় যেহেতু সুগভীর আঁধার দেখিতে পারে কতিপয় নতুন কিশোর কিংবা কিশোরী বসে ছাদের কিনারে

চুল খুলি... গত চৈত্রে যারা হয়েছে যুবক এবং যারা যারা যুবতী গত সন্ধ্যার আগেই যারা শিখে ফেলছে রাত ও রতি’

কয়েকটি বাদুড় বলতে এখানে আমরা সটান বাদুড় বুঝি না। আমাদের অবচেতন বাদুড় বলতে অন্যকিছুর দিকে মনকে পরিচালিত করে। মনে হয় এইখানে কবি তার অর্ন্তদৃষ্টি প্রসারিত করেছেন। বাদুড় প্রতীকের আড়ালে তিনি এখানে তুলে এনেছেন সমকালীন সংকট ও সুযোগ সন্ধানীদের। যারা ছাদের কিনারে চুল খুলে বসে থাকে কিংবা গত চৈত্রে যারা যুবক অথবা যুবতী হয়েছে আর সন্ধ্যার আগেই শিখে ফেলেছে রাত ও রতি- গভীর অন্ধকারে তাদেরও দেখতে পায় তারা। এই সমকালীন সংকটের সাথে এর পরেই কবি নিজেকে যুক্ত করেছেন কবিতায়-

‘খুলে বলি... মধ্যরাতে ঘর থেকে বের হল যে আমাকে নিতে সে আমারে ভুলে গেছে চৈত্র-পীড়িতে’

ইদানিং চৈত্র-পীড়া ভুলিয়ে দিচ্ছে প্রিয় মানুষ আর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যকে। এই বেদনার কথা, এই দুঃখবোধের কথা ভীষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আরো বেশি আলগা হয়ে ওঠে মানুষের মনে। সে তখন গোপন বেদনাবোধে আক্রান্ত হতে হতে আত্মপ্রকাশের তাড়নায় ন্যূজ হতে থাকেন। লিখে ফেলেন কোনো এক চৈত্রের পংক্তিমালা।

আবার শেষ স্তবকে তিনি বলছেন-

‘যদি বলি... তোমাকেই চাই, তোমাকেই চেয়েছিল হরপ্পার লুই মহুয়ার মাতাল আধাঁরে রচি আমি তো কানুই’

এই ‘তোমাকে’ বলতে কাকে বুঝিয়েছেন কবি? যিনি পথ হারালেন তাকে? নাকি আজ যে প্রথম ওড়না পড়লো তাকে- যার কালই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে?

কবির জীবন তো দ্বন্দ্বমুখর। কবিই দ্বিধাগ্রস্থ এক অভিশপ্ত জীবনের গর্বিত উত্তরাধিকার।

আলফ্রেড খোকনের এই কবিতাটি পড়ার আগে শিরোনামে একটু চোখ বুলিয়ে নিলে ভালো হয়। ‘নির্বোধ কোকিলের জন্য চৈত্রগীতি’। নির্বোধ কোকিলটা কে? এমন আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা পাঠের পর পাঠকের মনে ভেসে ওঠে সেই নির্বোধ বালিকাটির কথা- যে মধ্যরাতে ঘর থেকে বের হয়ে চৈত্র-পীড়ায় কবিকে নিতে ভুলে যায়। মাঝ পথে পথ হারায়।

সেই নির্বোধ কোকিলের জন্য তখন পাঠকের ভেতরে একটা গোপন বেদনা তৈরী হয়। পথ হারানোর পরে তার পরবর্তী জীবন সম্পর্কে জানার তীব্র আগ্রহ জন্ম নেয়।

পাঠকের ভেতর একটা অন্যতর কৌতুহল বা জিজ্ঞাসা তৈরী করে দেয়াটাও একটি কবিতার সার্থকতা বলে মনে হয়, মাঝে মাঝে।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।