রাত ১১:২৮ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

কাহিনীকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে ধরাটাই গল্পকারের দায়িত্ব : আফসানা বেগম

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[আফসানা বেগম কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক। তিনি এ বছর জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। তার গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে- জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় (নভেলা), ঝাঁপ ও অন্যান্য গল্প (অনুবাদ), রোমান সাম্রাজ্য (অনুবাদ)। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার ছোটগল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছেন সাহিত্য বিভাগের লিখিত প্রশ্নে]

  প্রশ্ন : আপনার গল্প লেখার শুরুর দিককার কথা শুনতে চাই। আপনি কি গল্পই লিখতে চেয়েছেন নাকি কবিতাও লিখেছেন? উত্তর : সাধারণভাবে এভাবেই হয়তো ভাবা যেতে পারে যে ছোট দু-এক লাইন কবিতা লেখার চেষ্টা করে কেউ তার লেখালেখি আরম্ভ করল, কিন্তু আমি ঠিক বলতে পারব না কেন আমার ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। আমি শুরু করেছি একটা উপন্যাস দিয়ে। তারপর ভাবলাম, দেখি ছোট গল্প লিখতে পারি কি না। কারণ আমার মনে হয়েছিল, যা বলতে চাই তা যত অল্প কথায় বলতে হবে, তার জন্য তত বেশি মুন্সীয়ানার দরকার আছে। আমার ভাবনাটা হলো, একজন কবি আটটি মাত্র লাইনে যা লিখে ফেলেন সেটা প্রকাশ করতে চাইলে আমাকে অন্তত হাজারখানেক শব্দ লিখতে হবে। ফলে কবির মত অনুভূতির ঘনত্ব আমার নেই। তাই গল্প দিয়েই শুরু। প্রশ্ন : আপনার গল্পে লক্ষ্য করি মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাপিত জীবন একটি শক্তিশালী অবস্থানে আছে। তাদের দাম্পত্য সংকট বা নারীর মনস্তত্ত্বকে আপনি কীভাবে দেখতে চান? উত্তর : যে শ্রেণিকে বেশি দেখার সুযোগ হয়েছে তাদের জীবন যাপন নিয়ে লিখব, এটাই আমার জন্য স্বাভাবিক। আমাদের সাধারণ জীবনযাপনের বিশেষ কোনো ঘটনা ছোটগল্পে তুলে আনতে হলে সেখানে দাম্পত্য সংকট খুবই বড় একটি জায়গা জুড়ে আছে। আর নারীর গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো অথবা বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে একজন বিশেষ নারী কী টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যায়, যা কিনা বাস্তব জীবনে অনেক সময়েই থেকে যায় অজানা বা উপেক্ষিত, সেসব আমাদের গল্পে উঠে আসা উচিৎ বলে আমি মনে করি। প্রশ্ন : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন- বাংলা ছোটগল্প মরে যাচ্ছে কি না- আপনি এই কথার বিবেচনায় বাংলা ছোটগল্পের মূল্যায়ন কিভাবে করেন? উত্তর : ইলিয়াসের এই প্রবন্ধ লেখার পরের বছরগুলোতে এত বৈচিত্র্যময় ছোটগল্প লেখা হয়েছে যে ভালো কিছু বা নতুন কিছু করার চেষ্টাটা মোটামুটি স্পষ্ট বলেই আমার মনে হয়েছে। তাই আমি আশাবাদী। প্রশ্ন : আপনি নিজেকে কিভাবে আলাদা করে তৈরি করেছেন বা করতে পেরেছেন কি না- আমরা আপনার কোন বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করবো যেটা বাংলা ছোটগল্পে ইতোপূর্বে লক্ষ্য করা যায়নি। উত্তর : এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য মনে করছি না। কারণ আমি একেবারেই নবীন ছোটগল্পের ভূবনে, লেখায় যদি একাগ্র থাকতে পারি তবে নির্দিষ্ট একটা সময় পরে পাঠকরা হয়তো বলতে পারবেন। প্রশ্ন : আপনার গল্পের ভাষা সহজ, কখনও সরলও- ভাষা নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনা কি? উত্তর : ভাষার ব্যাপারে আমার জ্ঞান সীমিত। আমি শুধু এটুকুই বুঝি যে গল্পের ভাষা হওয়া উচিৎ যোগাযোগের জন্য সহজ, যা বলতে চাই তা যেন প্রকাশিত হয় অল্প কথায় এবং অনায়াসে। প্রশ্ন : আশি-নব্বই দশকে দেখা গেছে গল্পের উপস্থাপনায় একটি নতুনত্ব এসেছে- রবীন্দ্রনাথের ‘ছোটপ্রাণ ছোটব্যথা’ দিয়ে তাকে ব্যাখা করা যায় না- অনেকে কাঠামোগত দিকে মনোযোগ দিয়েছেন- ব্যাপারটাকে আপনি কিভাবে দেখেন? উত্তর : আমি কেবল চর্চা শুরু করেছি, কাঠামোগত দিক নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চাই না। প্রশ্ন : আমাদের দেশে হুমায়ূন আহমেদীয় যে ঘরানা তার বাইরে বাংলাদেশের পাঠকের কাছে প্রমিনেন্ট লেখকরাও অচেনা থেকে যাচ্ছেন- এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কি? উত্তর : উত্তরণের পথটি আমার সত্যিই জানা নেই, তবে পাঠকের কাছে একজন প্রমিনেন্ট লেখক যদি অজানা বা অচেনা থেকে যান, মানে তিনি পাঠকের কাছে কোনো কারণে পৌঁছুতে ব্যর্থ হচ্ছেন, এই বিষয়টি সত্যি দুঃখজনক। প্রশ্ন : বাংলাদেশের পাঠক বা একটু অগ্রসর হয়ে বলা হলে, যারা লেখালেখি করেন তারা অন্যের লেখায় হিউমার পছন্দ করেন কিন্তু নিজেদের লেখা একেবারেই রিয়ালিস্টিক কিন্তু মার্কেস বা আমোস টুটুওয়ালার মতো লেখকরা তো কল্পনার সীমাকেও কখনো কখনো ভেঙে দিয়েছেন। এব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই। উত্তর : এটা যার যার নিজস্ব ধারা বা রুচি কিংবা লেখনীর ব্যাপার বলে আমি মনে করি। প্রশ্ন : আমাদের তো ঠাকুরমার ঝুলি আছে বা আরব্য রজনী পাঠেরও অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু আমাদের গল্প বয়ানে গল্পের ‘বহুস্তর’ অনুপস্থিত বলে মনে হয়- আমরা কি গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চাই? উত্তর : এক একটা সময় হয়তো একেক ধরনের প্রেক্ষাপটে লেখকরা লিখে থাকেন। কখনও বিশ্বাসযোগ্য কাহিনীর মধ্যে দিয়ে অবাস্তব সত্যকে আবার কখনও অবিশ্বাস্য পটভূমি বা চরিত্রের মধ্য দিয়ে বাস্তব সমস্যাকে তুলে ধরা হয়। সুতরাং সেই ঠাকুরমার ঝুলি কিংবা আরব্য রজনীর কাহিনী থেকে যে আমরা পুরোপুরি সরে এসেছি, এটা আমি মনে করি না। আর আমার মতে যে কোনো কাহিনীকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে ধরাটাই গল্পকারের দায়িত্ব। প্রশ্ন : আপনার বর্তমান লেখালেখি নিয়ে বলুন- কি লিখছেন কি ভাবছেন? উত্তর : উপন্যাস লিখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি বরাবর। অনুবাদ করছি পুরোদমে। আগামী বইমেলায় অন্তত দুটো অনুবাদের বই আসবে বলে আশা করছি। আর তার ফাঁকে ফাঁকে আমার প্রিয় ক্ষেত্র, ছোটগল্প লেখার কাজটা চালিয়ে যেতে চাই। লেখা নিয়ে ভাবনা একটাই, লেখাটা চালিয়ে যাওয়াটা জরুরি, থামলে চলবে না। প্রশ্ন : বাংলাদেশ ও বিশ্বসাহিত্যে কার কার ছোটগল্প আপনার ভালো লাগে- বিশেষ দু’একজন থাকলে তাদের লেখার কোন দিকটা আকর্ষণ করে? উত্তর : অনেকের ছোটগল্প ভালো লাগে। তবে সেভাবে উল্লেখ করতে গেলে বলব সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী আর মঈনুল আহসান সাবেরের কথা, যাদের গল্পগুলো আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ি। আর অবশ্যই বলব প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কথা, যাদের ভাষা সহজ অথচ চমক লাগানো উপস্থাপনা। যতবার পড়ি ততবারই মুগ্ধ হই। চেখভের ছোটগল্পে মানুষের প্রাণের উপস্থিতি আমাকে দারুণ আকর্ষণ করে। এখন যাদের গল্প পড়ছি তাদের মধ্যে জাকির তালুকদার, ইমতিয়ার শামীম এবং শাহনাজ মুন্নীর গল্প খুব ভালো লাগে।    

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।