সকাল ১০:৫২ ; সোমবার ;  ২২ অক্টোবর, ২০১৮  

মাহমুদ দারবিশের কবিতা ‘গাজার জন্য নীরবতা’

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[গাজার কোনো বিশেষণ লাগে না। হয় সেখানে বোমা পড়ছে নতুবা বোমাগুলো বিশ্রাম নিচ্ছে ‘যুদ্ধবিরতি’র পর ফাটবে বলে। এর বাইরে গাজার কোনো বাস্তবতা নেই। মাহমুদ দারবিশ- ফিলিস্তিনি কবি- তিনি গাজার জন্য একটু নীরবতা চেয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট দারবিশ নীরব হলেও গাজা হয়নি। তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। -বি. স]   ডিনামাইটে সে কোমর পেচিয়ে নেয়... সে বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়ে... এ তো মৃত্যু নয়, আত্মহত্যাও নয়... জীবনের জন্য নিজেকে যোগ্য ঘোষণা করার লক্ষ্যে গাজার এ এক নিজস্ব পদ্ধতি মাত্র... চার বছর এরকম চলেছে এবং গাজার দেহের মাংস এভাবে গোলার টুকরো হয়ে বিস্ফোরিত হয়ে পড়েছে... কোনো রকম যাদুমন্ত্রে হয়নি এমন; এ কোনো অলৌকিক ঘটনাও নয়... চলমান অস্তিত্বের জন্য গাজার হাতিয়ার আর অস্ত্র এমনই... এটাই শত্রু নিধনের উপায়... চার বছর ধরে শত্রু স্বপ্ন নিয়ে উল্লাস করেছে... সময়ের সাথে প্রেমবিলাসে মত্ত থেকেছে... তবে গাজায় নয় শুধু... কেননা গাজা তার সব আপনজন থেকে দূরে... শত্রুবেষ্টিত... কারণ গাজা হলো একটা বোমা... যখনই বিস্ফোরিত হোক না কেন... বিস্ফোরণ হওয়া থেকে কখনও সে বিরত থাকে না... শত্রুর মুখ দেখে আগে তার মনে ভীতি জেগেছে... আর সময়ের কাছ থেকে পাওয়া সন্তুষ্টির বলে সে ওদের তাড়িয়ে দিয়েছে... গাজায় আরেকটা বিশেষ বিষয় হলো সময়... কেননা গাজায় সময় কোনো নিরপেক্ষ বিষয় নয়... সময় এখানকার মানুষের নিরাবেগ চিন্তার দিকে চালনা করে না... বরং বিস্ফোরণের স্বাধীনতার দিকে তাড়িত করে... আর সত্যের মোকাবেলা করতে... সময় তাদের সন্তানদের শৈশব থেকে বার্ধক্যে নিয়ে যায় না... বরং প্রথমেই ওদের শত্রুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে সময় ওদেরকে পৌরুষে পৌঁছে দেয়... গাজায় সময় মানে বিশ্রাম-আয়েশ নয়... বরং জ্বলন্ত দুপুরের ভেতর ঝড়ের মতো ছুটে যাওয়া... গাজায় মূল্যবোধ ভিন্ন রকমের... ভিন্ন রকমের... একদমই ভিন্ন রকমের... অধিকৃত মানুষের একমাত্র মূল্যবোধ মানে শত্রুর বিপক্ষে প্রতিরোধের পরিধি... সেখানে এই একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আছে... সম্মানজনক এবং কঠিন এই সত্যের প্রতিই আসক্ত গাজা... বই-পুস্তক থেকে নয়, নিবিড় ও দ্রুত শেষ করার মতো কোনো পাঠ্যসূচি থেকেও নয়... গাজা স্বভাবতই শিখে নেয়... সময় তাদের সন্তানদের শৈশব থেকে বার্ধক্যে নিয়ে যায় না... বরং প্রথমেই ওদের শত্রুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে সময় ওদেরকে পৌরুষে পৌঁছে দেয়... গাজায় সময় মানে বিশ্রাম-আয়েশ নয়... বরং জ্বলন্ত দুপুরের ভেতর ঝড়ের মতো ছুটে যাওয়া... গাজায় মূল্যবোধ ভিন্ন রকমের... ভিন্ন রকমের... একেবারেই ভিন্ন রকমের... বই-পুস্তক থেকে নয়, নিবিড় ও দ্রুত শেষ করার মতো কোনো পাঠ্যসূচি থেকেও নয়... প্রচারণার উচ্চস্বর এবং সমবেত সংগীত থেকে নয়... শুধু অভিজ্ঞতার বলে এবং কাজ আর পরিশ্রমের থেকে সে শিখেছে... বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য নয়, আত্মপ্রতিমা তৈরির জন্যও নয়... অস্ত্র, বিপ্লবী মনোভাব... এবং বাজেটের গর্বে নয়... সে নিজের তিক্ত মাংস উপস্থাপন করে... স্বেচ্ছায় নিজের রক্ত ছলকে দেয়... গাজা বাগ্মিতার চর্চা করে না... গাজার কণ্ঠ নেই... গাজার লোমকূপ কথা বলে... ...ঘাম ...রক্ত ...জ্বলে ওঠে... ...হত্যার কাছাকাছি শত্রু-ঘৃণা এখান থেকেই শুরু হয় ...তাদের ভীতি খুনের কাছাকাছি ...তারা তাকে সমুদ্রের ভেতর টেনে নামাতে চায় ...কিংবা মরুভূমিতে ...কিংবা রক্তের ভেতর তার প্রিয়জন আর আত্মীয়দের ...সলাজ ভালোবাসা এখান থেকেই শুরু হয় ...আর ঈর্ষা এবং মাঝে মাঝে ভয় পর্যন্ত পৌঁছে যায় ...কারণ গাজা বন্ধু আর শত্রু ...উভয়ের জন্যই ...এক আদিম পাঠ ...আর উজ্জ্বল প্রতীক ...গাজা সবচেয়ে সুন্দর নগরী নয় ...গাজার তীর অন্যসব আরব নগরীর তীরের চেয়ে বেশি নীল নয় ... আর গাজার কমলালেবু ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে সুন্দর নয় ...গাজা সবচেয়ে ধনী নগরী নয় ...গাজা সব নগরীর চেয়ে প্রগতিশীল নয়... তবে গাজা একটি জাতির ইতিহাসের সমান ...কারণ শত্রুর চোখে গাজাই সবচেয়ে কুৎসিত ...অন্যদের চেয়ে হতদরিদ্র, অধিকতর শোচনীয় আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ...কারণ গাজা হলো শত্রুর জন্য আদিম পাঠ ...কারণ শত্রুর ঘুম হারাম করার জন্য গাজাই হলো সবচেয়ে বলীয়ান ...কারণ সেখানে বিরাজ করে দুঃস্বপ্ন ...কারণ গোপন বোমাই হলো গাজার কমলালেবু ...এখানকার শিশুরা শৈশবহীন; বয়স্কদের কোনো বয়স নেই ...নারীদের নেই বাসনা ...কারণ গাজা এরকমই ...গাজা সবার চেয়ে সুন্দর ...সবার চেয়ে স্বচ্ছ ...সবার চেয়ে ধনী ...এবং সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসা পওয়ার যোগ্য যখন আমরা গাজার কবিতা খুঁজতে যাই তার প্রতি আমরা অবিচারই করি... ...কারণ গাজার কোনো কবিতা নেই গাজা সকল সৌন্দর্যের মাঝে নিজেকে সুন্দরতম বানায় ...যখন আমরা কবিতা দিয়ে শত্রুকে পরাজিত করার চেষ্টা করেছি ...শত্রুরা আমাদের মুক্ত কণ্ঠে গান গাওয়ার অবস্থায় ফেলে গেলে আমরা উল্লাস করেছি ...শত্রুদের আমরা বিজয়ী হতে দিয়েছি ...যাতে আমাদের ঠোঁটে লেগে থাকা কবিতা শুকিয়ে যায় আর শত্রুদের আমরা নগরী গড়তে দুর্গ গড়তে দিয়েছি আর দিয়েছি রাস্তা নির্মাণ করতে!!! ...গাজার প্রতি আমরা অবিচারই করেছি ...যখন আমরা তাকে কিংবদন্তী করে তুলেছি ...তবে তাকে ঘৃণা করি যখন দেখতে পাই ...গাজা খুব ছোট আর হতদরিদ্র ...যখন আমরা জিজ্ঞেস করি ... কোন কারণে তাকে কিংবদন্তী করা যায় ... সে কি প্রতিরোধ করে? ...যদি আমাদের মর্যাদা বলে কিছু থেকে থাকে ...আমাদের সব আয়না ভেঙে ফেলে চিৎকার করতে থাকব ...কিংবা আমরা যদি তাকে আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বারণ করে থাকি ...আমরা তাকে অভিশাপ দেব ...আমরা গাজার প্রতি অবিচার করে থাকি ...যদি তাকে মহিমান্বিত করতে করতে মহিনীশক্তিতে ভরে তুলি ...কারণ মহিনীশক্তি আমাদের নিয়ে যাবে ...প্রতীক্ষার কিনারায় ...গাজা আমাদের কাছে এগিয়ে আসে না ...গাজা আমাদের মুক্তি দেয় না ...গাজার কোনো ঘোড়া নেই ...নেই কোনো উড়োজাহাজ ... নেই কোনো যাদুর কাঠি ...রাজধানীতে কোনো অফিস আদালত নেই ...আমাদের বৈশিষ্ট্য থেকে ...আমাদের ভাষা থেকে ...এবং সকল প্রবৃত্তি থেকে একই সময়ে ...গাজা নিজেকেই মুক্ত করে নেয় ...আর যখন কোনো স্বপ্নের ভেতরে আমরা গাজার মুখোমুখি হই তখন? ...যদি সে আমাদের চিনতে পারে ...কারণ গাজার জন্ম হয়েছে আগুন থেকে ...আর আমাদের জন্ম হয়েছে অপেক্ষার জন্য ...আর আমাদের হারানো জন্মভিটার জন্য কাঁদার জন্য ...গাজার রয়েছে সত্যিকারের বিশেষ পারিপার্শ্বিকতা ...আর একান্ত নিজস্ব স্বভাব... তবে গাজার গোপনীয়তা কোনো বিভ্রান্তিকর কিছু নয় তার প্রতিরোধ সবার জানা... গাজায় আছে ঐক্য, গাজা জানে সে নিজে কী চায়... নিজের বস্ত্র থেকে শত্রুকে ঝেরে ফেলতে চায়... গাজার প্রতিরোধ গড়ে থাকে আমজনতা... ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্কের মতো নয়... রক্ত আর হাড়ের সঙ্গে ত্বকের সম্পর্কের মতো... গাজার প্রতিরোধ ব্যবস্থা টাকার বিমিয়ে করা কাজের মতো নয়... গাজার প্রতিরোধ কোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তি নয়... কারো অভিভাবকত্ব মানতে রাজী নয় সে... গাজার ভাগ্য কারো আঙুলের ছাপের অধীন নয়... কারো স্বাক্ষরের অধীনতাও মানে না... নিজের নামযশ কিংবা বাগ্মিতার দক্ষতা... সম্পর্কে জানার জন্য মোটেও পরোয়া করে না গাজা... নিজেকে বিজ্ঞাপনের বস্তু বানাতে... সে কখনও রাজী হয়নি... ক্যামেরার লেন্সের জন্য গাজা কখনও থামে না... হাসির প্রলেপ দিয়ে মুখ মোছে না... গাজা এবং আমরা... এসব দিয়ে শুরু করা পছন্দ করি না... দালালদের জন্য গাজা একটা লোকসানী ব্যবসায়... আর আরবদের জন্য এই গাজাকে নিয়ে শুরু করাটাই হলো... একটা অমূল্য সোনার খনি... ...গাজার বড় সৌন্দর্য হলো সে আমাদের কণ্ঠই শোনে না ...কোনো কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না ...কোনো কিছুই তার মুষ্টিকে শত্রুর মুখ থেকে ...অন্য দিকে ফেরাতে পারে না ...ফিলিস্তিনের সরকারের আকারে যখনই কোনো রকম ভিন্ন মত- ...আমরা চাঁদের পূর্ব কপোলে তৈরি করতে চাই ...কিংবা মঙ্গলের পশ্চিম চোয়ালে গড়তে চাই সরকার ...তখনই দেখতে পাই গাজা ব্যস্ত আছে প্রত্যাখ্যান নিয়ে ...ক্ষুধায় প্রত্যাখ্যান ...তৃষ্ণায় প্রত্যাখ্যান ...অভিবাসী আন্দোলনে (আসাতাতে) প্রত্যাখ্যান ...নির্যাতনে প্রত্যাখ্যান ...অবরোধে প্রত্যাখ্যান ...মৃত্যুতে প্রত্যাখ্যান ...আর প্রত্যাখ্যানে প্রত্যাখ্যান ...গাজায় শত্রু বিজয়ী হতে পারে এবং সমুদ্রের সুউচ্চ ঢেউও বিজয়ী হতে পারে ...কেননা এই দ্বীপে শত্রুরা সব গাছ উপড়ে ফেলেছে কিংবা কেটে ফেলেছে ...গাজার হাড়হাড্ডি তারা ভেঙে ফেলতে পারে শিশুদের বুকে ট্যাঙ্ক পাততে পারে ...আর নারীদের পেটের ওপরেও ...আরো পারে সমুদ্রে ...আর মরুর বুকে আর রক্তে... কিন্তু কিন্তু সে কখনও মিথ্যে বলে না কিংবা ...আক্রমণকারীদের হ্যাঁ বলে না ...সে বিস্ফোরিত হতেই থাকবে এ তো মৃত্যু নয়, আত্মহত্যাও নয়... জীবনের জন্য নিজেকে যোগ্য ঘোষণা করার লক্ষ্যে গাজার এ এক নিজস্ব পদ্ধতি মাত্র... আচ্ছন্নতা... সে বিস্ফোরিত হতেই থাকবে জীবনের জন্য নিজেকে যোগ্য ঘোষণা করার লক্ষ্যে গাজার এ এক নিজস্ব পদ্ধতি মাত্র...   অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর [caption id="attachment_45425" align="alignleft" width="243"]ইসাম পাশার ড্রিম ইন এ ওয়ার জোন ইসাম পাশার ড্রিম ইন এ ওয়ার জোন[/caption]        

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।