রাত ১০:২৪ ; শুক্রবার ;  ২২ মার্চ, ২০১৯  

অপরাধী শনাক্তে দেশে ডিএনএ ডাটাবেজ তৈরি হচ্ছে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম॥

মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ক্লু লেস মামলার ক্লু উদ্ধারে সর্বোচ্চ প্রমাণ হিসেবে সহায়তা নেওয়া হচ্ছে ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড) পরীক্ষার। অার এই পরীক্ষার মাধ্যমেই গড়ে তোলা হচ্ছে অপরাধী এবং মামলা সংশ্লিষ্টদের ডিএনএ ডাটাবেজ।

দেশের নিম্ন অাদালতে জটিল প্রকৃতির ফৌজদারী ও দেওয়ানী মামলা নিষ্পত্তিতে এ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে উচ্চ অাদালতের নির্দেশেও ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিঅাইডি) প্রতিষ্ঠিত 'ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি' অাদালতের মাধ্যমে অাসা ডিএনএ পরীক্ষাগুলো করছে। অাদালতের নির্দেশ ছাড়া সরাসরি ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় না এই ল্যাবে।

  • ৭০টির বেশি মামলা প্রমাণে ডিএনএ পরীক্ষা হচ্ছে সিঅাইডির ল্যাবে

  • পরীক্ষার পরে এগুলোরই ডাটাবেজ তৈরি করা হবে

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এখনও অাগের মতো মামলা প্রমাণে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে। এর পাশাপাশি সিঅাইডিতে প্রতিষ্ঠিত ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতেও মামলা প্রমাণে ডিএনএ পরীক্ষা হচ্ছে।

সিঅাইডি কর্তৃপক্ষ তাদের কাজের সুবিধার্থে এখানে ডিএনএ পরীক্ষার প্রোফাইলগুলো দিয়েই তৈরি করছে ডাটাবেজ। ভবিষ্যতে অপরাধী শনাক্ত এবং অপরাধ প্রমাণে এই ডাটাবেজের সহায়তা নেওয়া হবে বলে সিঅাইডি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

গত ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত এ ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে এরই মধ্যে ৭০টির বেশি মামলা প্রমাণে (নিষ্পত্তির জন্য) ডিএনএ নমুনা জমা প‌‌‌ড়েছে বলে ল্যাব সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে খুন, ধর্ষণের (ডিএনএ নমুনা) মামলা বেশি। এ ছাড়াও মৃতদেহের অংশ এবং অশনাক্ত মৃতদেহের পরিচয় উদঘাটনের জন্যও ডিএনএ পরীক্ষার হচ্ছে এই ল্যাবে। এর মধ্যে অনেকগুলোর ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি শেষ হয়েছে এবং অাদালতে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হচ্ছে।

ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রোফাইলিং বিনামূল্যে করা হলেও ব্যক্তি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলার (দেওয়ানী বা সিভিল স্যুট) পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণ বা অন্যান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সরকার নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়।

ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশ প্রকল্পের পরিচালক সিঅাইডির বিশেষ পুলিশ সুপার শেখ মো. রেজাউল হায়দার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "ক্লু লেসকে ক্লু করা এবং যে ঘটনা ঘটেছে সেটা প্রমাণ করতে সায়েন্টিফিক ইন্সট্রুমেন্টের ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ল্যাবে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে তা অাদালতের কাছে দাখিল করা হচ্ছে।" তিনি মনে করেন, এর ফলে কোর্টে ফাউল প্লের সংখ্যা কমবে এবং মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে সময় কম লাগবে। তিনি জানান, অপরাধ প্রমাণে ডিএনএ পরীক্ষার ফলে সুনির্দিষ্ট অপরাধীকে চিহ্নিত করা সহজ হয়। এর ফলে নির্দোষ ব্যক্তি ভোগান্তির হাত থেকে রক্ষা পান।

সিঅাইডিতে এই ল্যাব প্রতিষ্ঠার ফলে ধর্ষকের পরিচয় নির্ণয়, সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণ এবং অপরাধী শনাক্তকরণে দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বিড়ম্বনা ও বিচার প্রার্থীদের হয়রানির অবসান ঘটবে বলে মনে করে কর্তৃপক্ষ।

এই ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষা করে সন্তানের পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব নির্ণয় করা হচ্ছে। পিতা-মাতা এবং সন্তানের জৈবিক নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে সন্তানের প্রকৃত পিতা-মাতা নির্ধারণ করা যায় এর ফলে সন্তানের পিতৃত্ব নির্ণয়ের মাধ্যমে কুমারী মাতাকে স্ত্রীর মর্যাদাদানসহ অবৈধ সন্তানের পিতা-মাতা এবং বৈধ-অবৈধ সন্তানের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়। অার এতে করে নারী ও শিশুর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী নির্ণয়ে সব ধরনের জটিলতার অবসান ঘটবে।

গাইবান্ধার ১২ বছরের এক গর্ভবতী শিশুর পিতৃ পরিচয় নির্ধারণে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য সিঅাইডির ল্যাবে জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই ১২ বছরের শিশু তার গর্ভের সন্তানের জন্য এক ৮০ বছরের বৃদ্ধের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ অানলে জটিলতা তৈরি হয়। ওই জটিলতা দূর করতে অাশ্রয় নেওয়া হয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার। অন্যদিকে, বরিশালের বাকেরগঞ্জে এক চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ মামলার প্রমাণ হিসেবে সিঅাইডির ল্যাবে পাঠানো হয়েছে ডিএনএ নমুনা। এমন অনেক জটিল সমস্যার ডিএনএ পরীক্ষা হচ্ছে সিঅাইডির ডিএনএ ল্যাবে।

ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা সিঅাইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অালিমুজ্জামান বলেন, ক্রাইম সিন (অপরাধস্থল) ম্যানেজমেন্ট ঠিকমত (ডিএনএন নমুনা সংগ্রহ) হলে ডিএনএ পরীক্ষা করে অপরাধী শনাক্ত করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না।

তিনি জানান, প্রথমে অপরাধস্থল থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে এনে বারকোড করে পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হয়। পরীক্ষক পরীক্ষা করে প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদন ডিকোড করে মামলার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, ডিএনএ নমুনা বারকোড করায় পরীক্ষক বা অন্য কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, এটা কোন মামলার প্রমাণ হিসেবে ডিএনএ পরীক্ষা বা কোন পক্ষের পরীক্ষা। ফলে শতভাগ স্বচ্ছতার নিরিখে ডিএনএ পরীক্ষা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

জানা গেছে, রেফারেন্স নমুনা (রক্ত) থেকে ডিএনএ পরীক্ষা করতে ১৫ দিন এবং অপরাধস্থল থেকে প্রাপ্ত নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করতে ১ থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, উপপরিদর্শক, পরিদর্শক এবং এএসপিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে এক হাজারের বেশি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অারও এক হাজার কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। দেশের ৬০০ থানা এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অাওতায় অাসবে বলে জানা গেছে।

প্রশিক্ষণ শেষ হলে দেশের প্রতি‌‌‌টি থানায় একাধিক কর্মকর্তা থাকবেন যারা সঠিক উপায়ে অপরাধস্থল থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে পারবেন। কারণ হিসেবে জানা গেছে, সঠিক উপায়ে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ না হলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত নাও হতে পারে।

জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ সেন্টার‘

জাতীয় ডিএনএ ডাটাবেজ সেন্টার‘ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্ত সহজ করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, পাস হওয়া বাজেটে ডিএনএ ডাটাবেজ সেন্টারের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সংসদের মহিলা ও শিশু বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এই প্রকল্প র সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখছে। ডিএনএ ডাটাবেজ সংক্রান্ত আইনটি গত নভেম্বরে মন্ত্রপরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের 'ন্যাশনাল ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি'র সহযোগিতায় এবং নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই ডিএনএ ডাটাবেজ তৈরি করা হবে বলে জানা যায়।

সূত্র মতে, আদালত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করলে কারাগার কর্তৃপক্ষ তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ডাটাবেজ সেন্টারে জমা দেবে। এছাড়া অজ্ঞাত কোনও মৃতদেহ উদ্ধার হলেও সে ডিএনএ ডাটাবেজ সেন্টারে জমা রাখা হবে বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, ন্যাশনাল ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে ২০০৬ থেকে ২০১৪ সালের মে মাস পর্যন্ত ২ হাজার ৬১৫টি ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৩০৭টি ধর্ষণ, ৯০৬টি বংশ পরিচয়, ২২৫টি খুন, ৫০টি ব্যক্তি পরিচয় নিশ্চিতকরণ, ইমিগ্রেশনের ৩৬টি, ৫৩টি টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট এবং ১টি ডাকাতি সংক্রান্ত মামলার।

বিচারকার্যে ডিএনএ প্রযুক্তির ব্যবহার

বিচারকার্যে ডিএনএ'র ব্যবহার পৃথিবীতে খুব বেশি দিনের নয়। ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখা গেছে, ক্যারি মিডলিস ১৯৮০ সালে ডিএনএ প্রোফাইল টেকনোলজির আবিষ্কার করেন। ডিএনএ প্রোফাইল সর্বপ্রথম ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যে বিচারকার্যে ব্যবহার হয়। এরপর ১৯৮৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিঅাই অপরাধ তদন্তে ডিএনএ প্রোফাইল প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে। বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে ডিএনএ প্রোফাইল প্রযুক্তি অপরাধ তদন্তে ব্যবহার হচ্ছে।

/এইচএএইচ/এএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।