রাত ০৮:২০ ; বুধবার ;  ২৫ এপ্রিল, ২০১৮  

তিন বাংলার শূন্যের কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[‘তিন বাংলা’ শুনে চমকে যাবার কিছু নেই। শুধুমাত্র ভৌগলিক অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য এই নির্দিষ্টকরণ। ‘ওপার বাংলা’ বলতে বাংলাদেশের বাইরে বোঝালেও বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গকেই ধরা হয়- এর সঙ্গে ফুটনোটের মতো যুক্ত ত্রিপুরা। এখানে আমরা ত্রিপুরা রাজ্যকে আলাদা করেছি এর স্বাতন্ত্র্য বুঝতে। -বি.স.]   বাংলাদেশের কবিতা   পাহাড় পোড়া শবদে ইমতিয়াজ মাহমুদ কারা যেন আজ আগুন জ্বেলেছে। গরীব অসহায় একটা বাসে। বাসটা পুড়ছে। ভেতরে একটা ড্রাইভার। সেও নাকি মানুষ। মানুষটা পুড়ছে। তার আবার বউ বাচ্চাও আছে। আর দেশে অনেক চ্যানেল। ফলে বাস পোড়ার দৃশ্য আমরা সরাসরি দেখছি। একটা লুঙ্গি পরা লোক। মনে হয় কন্ড্রাকটর। মনে হয় মানুষ। খুব কাঁদছে। ড্রাইভারটা মারা যাচ্ছে। তার মৃত্যু দৃশ্য আমরা সরাসরি দেখতে পাচ্ছি। একটা সয়াবিন তেলের সৌজন্যে। তার বউ-বাচ্চা আছে। আর তার বাসায়ও একটা টেলিভিশন আছে। সয়াবিন তেলের সৌজন্যে। বউ অজ্ঞান হয়ে গেছে। কন্ড্রাকটর কাঁদছে। আর বাচ্চাটা। আর আমরা। আর। না আর কেউ নয় এই চোখের পানিতে নেতাদের কী আর মনের ময়লা দূর হয়!   মেঘমল্লার জাহিদ সোহাগ এখন এটুকু ভরসা। যদি বৃষ্টি হয় আমি মেঘমল্লার শুনে চেয়ে থাকবো। হয়ত বিকেল হয়ে এলো, চেয়ে থাকবো, একটু আলো আসে, যেখানে থাকে একটু আকাশ; আর ধীরে ধীরে শুধু মাঠ মাঠ আর মাঠ বৃষ্টিফোঁটাসমেতে নেচে ওঠে- হায় সেখানে আমি ভুলে গেছি বাড়িফেরা আমার শার্টে বেধে নিয়েছি কচুরিফুলের বিছানা, তুমি নারিকেলফুলঝড়া উঠোনে শুধু দুটো চোখ, ভেজা, মণিদুটো মেঘের ঘনঘটা- আমি কি হারিয়ে গেছি, রাখাল বালক, ডুবে যেতে থাকা গাভীর গ্রীবা খুঁজে? তারচে শোনো বুকে হীমের শব্দ। বৃষ্টির দাঁতাল যেখানে ভেঙে গেছে কাঁটানটে ঝোপ আর বুক ছোঁয়ার সপ্রতিভ সাহস; যেন আামকে বন্দি করো তোমার দেহের বাইরে- আর দ্যাখো এখন শুধু সংবাদ শুনি, তোমার মরুঝড় আর স্বাস্থ্যনিবাস ভরা গোধূলি- তুমি কি জানতে আমাকেও টুকরোটাকরো করে যাবে আমার কৌতুহল, ঝুলন্ত টবে ফুল ফোটাতে! আমার তো কিছু করার নেই একটা উপলক্ষ্য, কারো কথা ভেবে দেখি, আর এখনো হঠাৎ দুপুরে সবাই নির্জনতায়, আমি যেন চিৎকার শুনি, হায় তার কচি হাত কচি হাত, পুষ্পের আঘ্রাণ ভেবে, আঘ্রাণ ভেবে, আগুন ছুঁতে যায়। তাকে তো আমি আর ফিরে পাইনি। হ্যাঁ এইসব কথা, এই বিকেল হয়ে এলো বলে, যদি বৃষ্টি হয় শুধু শুধু নিজের রক্তসঞ্চালনের বিরুদ্ধে না গিয়ে, মেঘমল্লার, মেঘমল্লার যদি কোথাও বাজে আমার আঙুল আরো একটি দিনের জন্য বেঁচে থাকে।   ম্যানিলার গোল পোস্টে মাথায় উৎকৃষ্ট ফুটবল জুয়েল মোস্তাফিজ ফাঁসির কাঠে দাঁড়িয়ে নিজের মৃত্যুকে সন্দেহ হয়েছিল, আর দেখছিলাম ভুঁয়া পোকারা যতবার হাসছে ততবার তিতা হয়ে উঠছে মৃত্যুর নিমপাতা। আমি পায়ে পায়ে খুঁজছিলাম কাঠের বুক আর অমনি চোখের ভেতর সাত দরজার কপাট লেগে গেল। প্রথম কপাটের দৃশ্য ছিল ভীষণ এলোমেলো- কমে যাচ্ছে যমজ পুকুরে পানি আর ওই পুকুরের মাছগুলো খেয়ে ফেলছে নিজেদের সাঁতার; পানির সঙ্গে বদল হচ্ছে মাছের কাঁটা। সপ্তম কপাটের দৃশ্যের সাথে কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না, নিঃশ্বাস কোন ধরনের তামাক? আমার ভীষণ নিঃশ্বাসের নেশা পেয়েছিল, আর শেষবারের মতো ইচ্ছে হয়েছিল নিজের মাথাটা খুলে একবার ফুটবল খেলি। দেখলাম ফাঁসির কাঠ চওড়া হতে হতে বড় একটা মাঠ হয়ে গেল; আমি নিজের মাথার পিছে পিছে মূহূর্তেই সহস্রকাল দৌঁড়ালাম, আর মনে হলো ম্যানিলার গোল পোস্টে মাথায় উৎকৃষ্ট ফুটবল...   শাহবাগের তালগাছ ফেরদৌস মাহমুদ আমাদের শহরের জাদুঘরটার সামনে মস্ত এক তালগাছ আছে। ওটা দেখলে সেই আগন্তুকের মুখ মনে পড়ে, যার কাছে প্রথম শুনেছিলাম কেওক্রাডংয়ে ওঠার গল্প। ওই তালগাছ দেখলেই ইচ্ছে হয় পৃথিবীর উঁচু কোনো পাহাড়ের উচ্চতা মাপার। ওই তালগাছ তলায় দাঁড়িয়ে আশ্চর্য সব সন্ধ্যার পাগলের কাছে শুনি দূর মানচিত্রের গল্প। নিজেকে মনে হয় পাহাড়ের মাটি, সমুদ্রের বালি, পাখির উড়াল কিংবা পিঁপড়ের নিরবতাভর্তি ম্যাজিক বাক্সের বাহক। ভাবি ওটা লাগিয়েছিল কে? সেটা কি ব্রিটিশ আমলে নাকি পাকিস্তানি? ওই তালগাছের ওপর আরেকটা তালগাছ, তারপর আরেকটা ... তারপর আরেকটা তুলে দিলেই কি মেঘের সাথে লেগে যাবে মাথা? শাহবাগের মেঘ কি কবিতা লেখে? সিনেমা বানায়, গিটার বাজায়? আহা! শাহবাগের তালগাছের চূড়ায় রোজই দেখি আটকা পড়ছে দূরযাত্রার মেঘ, ছেঁড়া ঘুড়ি, ভাঙা এরোপ্লেন কিংবা মজলিসি দীর্ঘশ্বাস !   কমিকস, ক্যামেরা, ট্র্যাভেলগ ইত্যাদি বিজয় আহমেদ চুল্লীতে সোনার রেডিও! তুমি বোকা আজো একটা থ্রি ব্যান্ড-রেডিওর বিকল এন্টেনাই সাড়তে পারলে না হাসছো। রাক্ষস জাগছে। মূর্খ খুব; হাতঘড়ি নেই হাসছো। শপিংমলে ভৌতিক ডাকাত। সিসি ক্যামেরায় লুটের সোনা ও আরবের ঘোড়া গান গায় আর অতর্কিতে, গমক্ষেতে ঘন বৃষ্টিতে, রূপসী দুইবোন নেচে উঠছে, এমন অলৌকিকতা আজ   পশ্চিমবঙ্গের কবিতা   পুরনো বন্ধু অর্পিতা কুণ্ডু সাইকেল রেসে তুই ছিলি নুড়িগুলো ফের হাতে এল ঝরাপাতা যত উঁচু নিচু হাওয়া দিলে সব এলোমেলো অপরাজিতার হাত জোড়া লঘু ছিল আঙুলের ফাঁকে পথখানি দোয়াতে কলমে মাখামাখি। কার নাম ডাকে? রসদে আগুন ছিল, জানি সেতার তখনও গতে বাঁধা তোর হাতে মেজরাব রেখে পাড়ি মেঘে, ছাপিয়েছি আঁধার হেঁটে গেছি বাঁক বরাবর থামিনি রৌদ্রভয়ে, ধুলো শুকিয়ে, লুকিয়ে গেল কবে ভুল বুঝে, দ্যাখ, ফুলগুলো!   যে জন রহস্য জানে তমাল বন্দ্যোপাধ্যায় আমার প্রত্যেক স্বপ্নে তুমি এসে রেখেছ নির্দেশ। বিষণ্ন, হতাশ রাতে থেমে যাচ্ছে আমার নিভৃত। বিলাস করি না, তবু, দেবতার ছবি আঁকা ঘরে যেমন স্বপ্নের দূর, কেন তুমি ভেঙে দিচ্ছ, বলো? কেন তুমি নির্দ্বিধায় বলে যাচ্ছ শিকারের কথা? বাবা, বাবা, চুপ করো। আমি খুব একা হয়ে গেছি... ধনুক আমার হাতে আজ আর মানাচ্ছে না, জানো? প্রার্থনার যে আকাশে আমার বয়স চুরি করে নিয়ে গেছে মেঠো জল, তার নুয়ে পড়া সীমানায় একাকার হতে হতে কোনোদিন তোমাকে দেখাব, দেবতার চোখ জুড়ে, শিকার করার রীতি ভরে, আসলে এ নীরবতা তোমার স্বপ্নেই লেখা আছে...   এসো দেবব্রত কর বিশ্বাস খুব ভোরে উঠে পড়া অ্যালার্ম ক্লকের মতো তোমাকে ডাকছি... আর তুমি কিছু না বুঝেই হুট করে হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিচ্ছো আমাকে   কষ্ট সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায় গলার কাছে কষ্ট হচ্ছে! বুকের মধ্যে ভার যা কিছু আজ দেখছি আমি জগৎ সংসার... কোনখানে যে রাখব সেসব দেখব যে কোন চোখে- ইচ্ছে করে গান্ধারী হই অন্ধ বলুক লোকে! যেসব কাঁধে হাত রেখেছি যেসব পায়ে মাথা আজ যে দেখি সমস্ত ফুল ইচ্ছে জটিল গাথা! আমার যে সব গুলিয়ে যাচ্ছে শুকিয়ে যাচ্ছে ফুল ও... অস্থিরতায় ছটফটাচ্ছি; (আহা) আড়ালে গিয়ে খুলো... দেখতে পাবে আর কিছু নেই আমার ভিতর লজ্জা। হাড়ের ভিতর শুকিয়ে গেছে মৃত্তিকা রঙ মজ্জা।   এমন ভাষায় হিমালয় জানা জানালাবিহীন ঘরে বসে থাকা মানুষের এই সব লেখা। অনেক গল্পের দূর। সন্ধে হচ্ছে তার থেকেও দূরে। বাড়িরা পাখিতে ফিরছে। পালকে পালকে সব শাদা। আজ এটুকুই। ভালোবাসা।   ত্রিপুরার কবিতা   ঋণ অনিরুদ্ধ সাহা আজ মায়ের জন্মদিন, একাধারে আমার মা বহু কবির আশ্রয়স্থল, দুর্দিনের একা ধাইমা আশ্রমে যাই, রক্তদান শেষে মার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। কেউ একজন নরম জল, কলা, সামান্য মিষ্টি নিয়ে আশেপাশে ঘুরে, কৃতজ্ঞতা জানায়। আমার রক্তে বহুজন্মের আত্মবিষ, মৃত্যুর স্পৃহা। লাবণ্যের প্রতি চিরকালীন অবজ্ঞার জিজ্ঞাসারা বিলম্বিত মৃত্যুর ভেতর উষ্মা প্রকাশ করে, আহা! লোহিত অপেক্ষা ক্রমশ অন্য রঙে ধাবিত হয়ে ভাবায়। আজ মায়ের জন্মদিন, পৃথিবীর সবাই জানে তার মতো একজন, হুবহু একজন দেখতে তারই মতো কোথাও না কোথাও ঠিকই আছেন। রক্তের টান না থাকলেও সে তোমায় ভালোবেসে যাবে।   কথা খোকন সাহা ঐ দেখো শালিক উড়ছে, তুমি নিচে রথচক্র ধরে আছো। যেহেতু ধরেছো টান দাও, ছিঁড়ে ফেলো ছত্রছায়া, মায়াবী ছুতো। কত ছায়াঘন গূঢ় কথা, মনে পড়ে। হাজার এমন মুহূর্ত, যেখানে নদী বইতে পারে। যখন এতো কথাই হলো, তাহলে মনে ওঠা আলো নিভে কেনো বার বার?   আত্মকথন গোপেশ চক্রবর্তী স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন যে মাটিতে পোতা তার ধুলোবালি গায়ে মেখে প্রতিমুহূর্তেই জানান দিচ্ছি- বেঁচে আছি তোমরা আরও অর্থবহ করে তুলছো এই বেঁচে থাকা দুঃখ পাওয়া শিখতে হয় এই বোধের জন্ম থেকেই সব হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা আরও অর্থবহ হয়ে উঠেছে ভেজা মাটি দেখে মাতাল হয়ে যাওয়ার আগে চিৎকার করে বলি- জলীয় সংবাদ দাও আরও ভেজা মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে শিখে নেব ভূমিকা ও উপসংহারহীন সময়ের কথা একই মাটিতে স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন আছে বলে একবার মুখ দেখি আরেকবার মুখোশ ধুলোবালি গায়ে জমতে জমতে মাতাল হয়ে যাওয়ার আগেই মাতাল হয়ে উঠি। তীব্র ভালোবাসা, তীব্র ঘৃণা চুটকি মেরে উড়িয়ে দেই। যেখানেই মাটি স্পর্শ করি, দাঁড়াই কর্মকুশলতার মায়াজাল আর বেড়ে ওঠার পথ ও মতের বিরোধী হয়ে উঠি সন্তর্পণে হেঁটে যাই...   আগুন প্রীতি আচার্য পায়ের পাতায় আগুন গুঁজে বলেছিলে নাচ ময়ূর নাচ। পেখম তুলে নাচ যার পাখা নেই সে কতটা পেখম তুলে নাচবে তুমি তা ঠিক জানতে। জানতে বলেই তোমার ওই চাবকানো হাতের সামনে কোনদিন তুলে দিইনি পায়ের মুদ্রা। 0 মই ও লিপি মৃদুল দেবরায় গোপন ছিলো না কোনো কিছুই। আলোর বর্ণ আর খেলা এবং গোধূলির হাল্কা গল্পগুলোও। বিয়োগান্তে ফুটে ওঠা দৃশ্যগুলোকেই মৃগনাভীর সুগন্ধ ভেবেছি। শ্রম ফেরৎ শ্রমিকের ঘুমের মতো জড়িয়ে ধরেছি। এক কচি কলাপাতার রঙ বয়ে বেড়াচ্ছে হৃৎপিণ্ডের গলিপথ ধরে। ফ্যান্টমের নেকড়ের মতো অনেকটা আনুগত্য তার। টের পাই। রোমকূপ বেজে ওঠে মুহূর্মুহ। বেজে ওঠে পাখিদের উড়ে যাওয়ার মতো এক শো শো আওয়াজ। আসলে কোনো মুহূর্তই প্রতিশ্রুতিবান নয়। একথা জানতে পেরেছি হলুদ দুপুরে গ্রীষ্ম যখন প্রখর। যখন দূর হতে আইসক্রীমওয়ালার ডাকে স্পষ্ট হচ্ছে ঘাম পতনের শব্দ। আগোছালো মাথার ভেতর হঠাৎ কথাগুলো উপচে পড়তে চায়। ঝাঁকুনির পর বিয়ারের কর্ক খুলে যেমন হয়, অনেকটা তেমন। বিষাদ নিরোধক বড়ি আর কতো চালানো যায়! আয়না জানালো সেদিন। মস্তিষ্কে কোনো গোলোযোগ নেই। আসলে প্যাঁচানো মইয়ে লিপিবদ্ধ সব কথকথা বয়ে বেড়াচ্ছি কয়েকশ’ যুগ ধরে।  

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।