দুপুর ০১:১৫ ; শনিবার ;  ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯  

একশ বছরের পুরনো আইনে পার পাচ্ছে ধর্ষকরা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম ॥ প্রায় শতবর্ষের পুরনো প্রমাণ সংক্রান্ত আইনের (এভিডেন্স অ্যাক্ট) কারণে ধর্ষণের অভিযোগ থাকার পরও অনেক আসামি বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। শতকরা ৭৫ ভাগ আসামি এ ধারার সুবিধা নিচ্ছে। ১৮৭২ সালে প্রমাণ আইনের ১৫৫(৪) ধারায় বলা হয়েছে, 'যখন কোনও পুরুষকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় বা তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয় তখন ভুক্তভোগী নারীকে চরিত্রহীন হিসেবে দেখানো হতে পারে।' অধিকার কর্মীদের মতে, সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যদি প্রমাণ করা যায় ধর্ষণের শিকার নারীর অন্য পুরুষের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক রয়েছে, তাহলে ওই নারীকে চরিত্রহীন হিসেবে অভিহিত করা হয়। একইসঙ্গে অপরাধীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও অনেকটা লঘু হয়ে যায়। তারা বলেন, ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামিদের ৭৫ ভাগই প্রমাণ সংক্রান্ত আইনের ১৫৫ (৪) ধারা অনুযায়ী তথ্য-প্রমাণ হাজির করে আদালতে। আইনের ফাঁক গলে তারা খালাস পেয়ে যায়। মাস খানেক আগে ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের ১৩ বছরের সুমিকে (ছদ্মনাম) সাত দুর্বৃত্তের দল অপহরণের পর গণধর্ষণ করে। অপহরণের এক মাস পর সুমিকে তার বাড়ির পাশের পাট খেতে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সুমির পরিবার নারী ও শিশু নির্যাতন আইন-২০০০ এর আওতায় মামলা দায়ের করে। সুমিকে উদ্ধারের ১০ দিন পর চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, সুমির সঙ্গে জোর করে যৌন সম্পর্ক তৈরি করা হয়নি। সে এ ধরনের সম্পর্কে অভ্যস্ত ছিল। আর তার বয়স ১৭ বছর। এ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ওই মামলার সাত আসামির মধ্যে পাঁচজনের নাম মামলা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। বাকি দু'জনও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পায়। ১৮৭২ সালের ওই আইনের আওতায় বিবাদি পক্ষ ওই প্রতিবেদনকে প্রমাণ হিসেবে আদালতে হাজির করে। শুধু সুমির ক্ষেত্রেই নয় বেশিরভাগ ধর্ষণের মামলার রায় এমন হয়। জাতীয় মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪৩১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৮২টি গণধর্ষণের ঘটনা এবং ৪৫টি ঘটনায় ধর্ষণের পর মেয়েটিকে মেরে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশ নারী আইনজীবী সংস্থার (বিএনডাব্লিউএলএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে কমপক্ষে ৬০০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। আর ২০১২ সালে এ সংখ্যা ছিল আট শতাধিক। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, 'আমাদের দেশে আইনের প্রয়োগ সে অর্থে হয় না। এ কারণেই আইনের ফাঁক গলে অপরাধীরা বেরিয়ে যায়। প্রমাণ সংক্রান্ত আইনে 'নারীর সতীত্বের' কথা বলা হয়েছে, যা দিয়ে কখনই নারী নির্যাতনের মামলার বিচার হতে পারে না।' তার অভিযোগ বিদ্যমান আইনের কারণেই ৭৫ ভাগ ধর্ষণের মামলায় অাসামি সাজা পায় না। ধর্ষণ মামলার ফাঁকফোকড় খুঁজে বের করতে এ নিয়ে কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ফাতেমা সুভ্রা। তিনি বলেন, 'আইনের ১৫৫(৪) ধারা বিলোপ করা না হলে আমরা সব সময়ই একটি ভুল ধারণার মধ্যেই বাস করবো। তা হলে 'চরিত্রহীন নারী' কখনই ধর্ষণের শিকার হতে পারে না। আইনের এ ধারা কাজে লাগিয়ে কোনও ব্যক্তি চাইলেই একজন নারীকে চরিত্রহীন হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।' প্রসঙ্গত, ২০০৩ সালে ভারত সরকার সেদেশের ধর্ষণ আইনের প্রমাণ সংক্রান্ত ১৪৬(৩) ধারাটির সংশোধন করে। যাতে নারীর চরিত্র নিয়ে কোন প্রশ্নই করা যাবে না। /এসটি/টিএন/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।