দুপুর ০৩:২৫ ; রবিবার ;  ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮  

বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন: সবাই মিলে!

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আশরাফুল আলম জয়॥

উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত লেখালেখির এক আশ্চর্য জগতের মধ্যে ডুবে ছিলাম। কাঁধে চটের ব্যাগ ঝুলিয়ে পত্রিকা অফিসে যাই, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে গুরু-গম্ভীর আড্ডা দেই, চারুকলায় গিয়ে গলা ছেড়ে গান গাই বন্ধুদের নিয়ে। সাহিত্য-সাংবাদিকতা করে সৃষ্টিশীল জীবন পার করে দেবো এই রকম একটা লক্ষ্য নিজের অজান্তেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্ত সেই সুখ বেশীদিন সইলো না। বাবা বিজ্ঞানের লোক বলে মোটামুটি ধরে বেঁধে ভর্তি করে দিলেন বেসরকারি বিশ্ববদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানে।

প্রোগ্রামিং তো দূরে থাক, সারা জীবনে কম্পিউটারও অন করে দেখিনি। সুতরাং আমি পড়লাম অথৈ সাগরে। কম্পিউটার ল্যাবে গিয়ে পাশের সহপাঠিটিকে অনুরোধ করি টার্বো প্যাসকেলের নীল স্ক্রিনটা এনে দিতে। টিচার এসে ক্লাস ওয়ার্ক দেন। সবাই খটাখট প্রোগ্রাম লেখা শুরু করে। আমি ঘামতে থাকি, ঢোঁক গিলতে থাকি, তাতে কোনও বিশেষ সুবিধা হয় না। প্রোগ্রামিং -এর সঙ্গে ঘামানো বা ঢোঁক গেলার কোনও সম্পর্ক নেই। শুকনো মুখে প্রায় খালি স্ক্রিন রেখে ক্লাস শেষ করি।

প্রথম কয়েকটা ক্লাস এভাবেই গেল। আমার একটা সমস্যা হলো যেকোনও জিনিস চট করে ধরতে পারি না। একটু সময় লাগে (এখনও কেউ নতুন কিছু বুঝিয়ে বললে প্রথম কতোক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে থাকি)। তবে খানিকটা লেগে থাকলে যে কোনও বিষয় ধরা দিতে থাকে আমার কাছে। প্রোগ্রামিং -এর ক্ষেত্রেও তাই হলো। আস্তে আস্তে এখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে থাকলাম। মনুষ্য সাহিত্যের চাইতেও কম্পিউটারের জন্য গল্প-গাঁথা তৈরি কম ইন্টারেস্টিং মনে হলো না।

আমার প্রোগ্রামিং -এর প্রতি এই গভীর ভালোবাসা তৈরির পেছনে যে ক'জনের অবদান আছে তাদের একজন মশিউর ভাই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র ভাই। এসিএম প্রোগ্রামিং টিমের দলপতি ছিলেন, দেশে বিদেশের বড় বড় প্রতিযোগিতায় ভালো অবস্থান দখল করেছেন। তখন সবেমাত্র পাশ করে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছেন। তার প্রথম ছাত্রদের মধ্যে আমিও একজন। প্রোগ্রামিং -এ আগ্রহ দেখে নানা উৎসাহ দিতেন। একদিন মশিউর ভাই বড় ধরণের একটা চমক দিলেন। সিঙ্গাপুর থেকে একটা প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ফেরার পথে আমার জন্যে একটা সুন্দর নোটবুক আর দামি কলম নিয়ে এলেন। নোটবুকে লিখে দিলেন - "To My First & Best Student"

উপহার পেয়ে আমি ঘাবড়ে গেলাম। সাধারণত ছাত্ররা বেশি গ্রেডের আশায় টিচারকে উপহার দেয়, এখানে তো দেখি ঘটনা ঘটল উল্টো! কী অার করা, বেশি করে প্রোগ্রামিং করতে থাকি, কোনভাবেই সাধারণ রেজাল্ট করা যাবেনা।

সে সেমিস্টারে মশিউর ভাই'র সি প্রোগ্রামিং-এর কোর্সে ১০০ তে ১২৮ পেয়েছিলাম (সি প্রোগ্রামিং-এ ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাপক ফেল রোধে ভালো-খারাপ সবাইকে ১০ করে তিনবার গ্রেস দেয়া হয়েছিল!)

প্রোগ্রামিং ভালো লাগার করণে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করতে আর বেগ পেতে হয়নি।

Joy

এরপরে দেশে প্রায় ন'বছর কাটিয়ে দিলাম। এই নাতিদীর্ঘ সময়টিতে অনেকের মধ্যেই এই নেশাটি সঞ্চারিত করেছি। তবে একটা সময়ে এক ঘেঁয়েমিও পেয়ে বসতে থাকলো। কারণ এখানকার প্রোজেক্টের চ্যালেঞ্জ সীমিত। ঠিক করলাম বাইরে যাবো।

আমার দেশান্তরী হওয়ার কথা শুনে পেশা জগতের অনেক বন্ধু-শুভাকাঙ্খী দুঃখিত গলায় বলেছিলেন, না গেলেই কি নয়? তাদের হয় তো ধারণা হয়েছিল, আমি চলে গেলে দেশের সফটওয়্যার শিল্পের বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে! তবে আমার ধারণা, দেশের সফটওয়্যার শিল্পের চাইতেও ব্যক্তিগতভাবে তারা আমাকে পছন্দ করেন বলে এমনটা বলছেন।

তবু মনের ভেতর একটা খচখচানি ছিল, গেলাম মশিউর ভাই'র কাছে। মশিউর ভাই হালকা ধমকের গলায় বললেন, বিদেশে বড় আকারের কাজ করলে তোমার যে অভিজ্ঞতা হবে, সেটা দিয়ে দেশকে অনেক কিছু দিতে পারবে। সেটা তুমি ফিরে এসে কিংবা বিদেশে বসেই করতে পারবে। আর কোন দ্বিধা থাকলো না। পা দিলাম প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর একটিতে।

এতোক্ষণ ভূমিকা করলাম। এবার আসল কথায় আসি। আমার অনেকগুলো স্বপ্নের একটি হলো দেশে আন্তর্জাতিক মানের একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। আমাদের দেশে অনেক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান থাকলেও "ট্রু" সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান একটিও নেই, যেটি মাইক্রোসফট, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।

আমি জানি দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এরকম একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা খুবই কঠিন কাজ। কিন্তু অসম্ভব নয়। এজন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কাজও শুরু করেছি। এর মধ্যে একটি হলো, বিভিন্ন নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করা, যেন দেশে বিশ্বমানের ডেভেলপারদের একটা নিয়মিত যোগান তৈরি হয়। পত্রিকায় কিছু লেখালেখিও শুরু করেছি। সামনে কিছু ভার্চুয়াল ইভেন্ট করার ইচ্ছা আছে।

এরকম একটি প্রতিষ্ঠান তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিতে অনেককেই দরকার হবে আমার পাশে। এক্ষেত্রে কারও মতামত বা পরামর্শ থাকলে ইনবক্সে বা কমেন্টে জানাতে পারেন। দেশে এধরনের প্রতিষ্ঠান কেউ করতে চাইলেও যোগাযোগ করতে পারেন আমার সঙ্গে। সামনেই দেশে আসছি। চাইলে কথা হতে পারে সামনা সামনি!

যারা সবে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়ছেন কিংবা মাত্র পেশা জীবনে ঢুকেছেন, যোগাযোগ রাখতে পারেন তারাও। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী কিছু দিক-নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করবো। তবে শর্ত একটাই সফটওয়্যার প্রকৌশলে লংটার্ম কমিটমেন্ট থাকতে হবে।

শুরুটাতো আগে করি। দেখা যাক, কতোদূর যাওয়া যায়সবার জন্য শুভ কামনা।

শুভ চিন্তার জয় হোক!

গাম্বায়া ইনক, সিঙ্গাপুর থেকে

লেখক: আশরাফুল আলম জয়, সিঙ্গাপুর প্রবাসী সফটওয়্যার স্থপতি। উচ্চ সক্ষমতার ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটার সফটওয়্যার ডিজাইন ও তৈরি বিষয়ে একজন সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ। তিনি গাম্বায়া (Gumbuya) নামের পরবর্তী প্রজন্মের ইন্টারনেটভিত্তিক সফটওয়্যার প্লাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বর্তমানে সেখানে অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করছেন। মাইক্রোসফট বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি কমিউনিটিতে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আশরাফুল আলমকে ৬ বার মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্রফেশনাল (এএসপি.নেট) পুরস্কার দিয়েছে।

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগঃ ফেসবুক

এইচএএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।