সকাল ০৯:৪২ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

২০২০ সালে তথ্যপ্রযুক্তির ৪০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করবে এশিয়া: অাবদুল্লাহ এইচ কাফি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

২০টি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সংগঠন এশিয়ান ওশেনিয়ান কম্পিউটিং ইন্ডাস্ট্রি অর্গানাইজেশনের (অ্যাসোসিও) চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ এইচ কাফি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০১৩-২০১৪ মেয়াদে অ্যাসোসিও’র চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। এর অাগে সংগঠনটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। আবদুল্লাহ এইচ কাফি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সাবেক সভাপতিও।

তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে জড়িত হন ১৯৮০ সালে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিসিএস-এর প্রতিষ্ঠাতা কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। পরে বিভিন্ন মেয়াদে সভাপতিসহ কার্যকরী কমিটির সব পদেই তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৪ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশেষ অবদানের জন্য অ্যাসোসিও পুরস্কার পান তিনি।

আবদুল্লাহ এইচ কাফি বাংলাদেশে ক্যানন সিস্টেম প্রোডাক্ট ও ইমেজিং প্রোডাক্টের পরিবেশক জেএএন অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অাগামী অক্টোবরে ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিতব্য অ্যাসোসিও সামিট ও সমসাময়িক তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হিটলার এ. হালিম

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ট্রেন্ড কোন দিকে?

অাবদুল্লাহ এইচ কাফি: ট্রেন্ড জানার অাগে অামাদের জানতে হবে, অামরা অাগে কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় এ‌‌‌সেছি। অাজ থেকে ৩০-৩৫ বছর অাগে যখন অামরা অাইটিতে ক্যারিয়ার শুরু করি তখন অামাদের ফোকাস ছিল তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি। এত দিনে সেটা হয়েছে।

বাংলাদেশকে সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় বলা হচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশে তরুণরা অাছে। তরুণরাই পারবে দেশকে এগিয়ে নিতে। তবে একটু মডিফায়েড ওয়েতে। 'ম্যান'কে 'ম্যানপাওয়ার'-এ ট্রান্সফার করেই তা সম্ভব। এর জন্য টুল হিসেবে প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তি।

বাংলাদেশের মানুষ খুব ইনোভেটিভ। অামাদের তরুণরা অনেক বেশি অ্যাডভেঞ্চারাস। তারা নিজের জীবনের মান উন্নয়নে অনেক ঝুঁকি নিতে চায়।

তরুণদের অাশা অনেক উঁচুতে। তারা চাচ্ছে না একটা ছোট অফিসেকাজ করতে। তারা লাইফস্টাইল পরিবর্তন করতে চাচ্ছে। তারা বুঝে গেছে, এটা কেবল তথ্যপ্রযুক্তি দিয়েই সম্ভব। তাই ট্রেন্ডটা হলো ত্যথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর কাজের মাধ্যমে জীবনযাপন, নিজের মান উন্নয়ন এবং দেশের উন্নয়ন।

আমাদের সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য রফতানি এরই মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অাগামী বছর এটা ৬০০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। এর পরের বছরে হতে পারে ১.২ বিলিয়ন ডলার। অামরা বড় ধরনের একটা জাম্প দিতে পারি।

বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু তরুণরাই তো অাবার তথ্যপ্রযুক্তি অপব্যবহার করে বিপথগামী হচ্ছে? তারাই তো এতে অাটকা পড়ছে।

অাবদুল্লাহ এইচ কাফি: তরুণরা যা করে যা তাদের সহজাত। তারা এক্সপ্লোর করতে চায়। তারা প্রযুক্তির ব্যবহার করবে, অপব্যবহার করবে, ভুল ব্যবহারও করবে। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। যারা এর অপব্যবহার করে অন্যের জীবন বিষিয়ে তোলে, সমাজ ও রাষ্ট্রে অরাজকতা সৃষ্টি করে তাদের শাস্তি দেওয়া হলে অপব্যবহারের ঘটনা ঘটবে না।

আবার এও সত্য যে, এখন পর্যন্ত বিশ্বে বাংলাদেশের যে ব্র্যান্ডিং হয়েছে তা করেছে তরুণরাই। তারা যাতে অারও ভালো করতে পারে সে ব্যাপারে তাদের গাইডলাইন দিতে হবে। এ ধরনের সমস্যা (তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার) দূর করতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ অারোপ করা হলে তা 'মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা'র মতো হবে। প্রযুক্তির ওপর কোনও অবরোধ অারোপ করা হলে তা আমাদের পিছিয়ে দেবে।

বাংলা ট্রিবিউন: তরুণদের মধ্যে সচেতনতার অভাব অাছে বলে মনে হয়? দেশে এ বিষয়ে সচেতনতা কেমন?

অাবদুল্লাহ এইচ কাফি: তরুণরা অনেক সচেতন। তবে কিছু দুষ্টু অাছে যারা বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি করে। এদের সংখ্যা বেশি নয়। অনেক তরুণ বিভিন্ন ওয়েবসাইট হ্যাক করছে, ভাইরাসের প্রোগ্রাম লিখছে। তারা কী খুব খারাপ?উন্নত বিশ্বে তরুণরা এ কাজ করলে তাদের মোটা বেতনে চাকরি দেওয়া হয়। অামাদের দেশে তাদের নিগ্রহ করা হয়। এ কারণে এসব নিয়ে অামাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

সামগ্রিক অর্থে দেশে সচেতনতা সৃষ্টিতে কোনও সমস্যা নেই। সরকার কাজটা ঠিকভাবেই করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে। তবে অারও করতে হবে। একজন রিকশাঅলা ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে কী বুঝবে, গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে সুফল পাবে তা পরিষ্কার করতে হবে।

abdullah h kafi2 বাংলা ট্রিবিউন: ২০২১ সালে বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান?

অাবদুল্লাহ এইচ কাফি: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হবে ২০২১ সালে। সে কারণেই রূপকল্প-২০২১ সাল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে অামরা দেশকে মধ্যম অায়ের দেশ হিসেবে দেখতে চাই।

পাশাপাশি সারা পৃথিবীতে 'ভিশন: ২০২০' ঠিক করা হয়েছে। এ সময়ে প্রতিটি দেশকেই সেই দেশের নাগরিকরা অগ্রসর দেশ হিসেবে দেখতে চায়। যেমন থাইল্যান্ড ২০২০ সালে 'স্মার্ট থাইল্যান্ড' গড়ার ঘোষণা দিয়েছে। থাইল্যান্ডের প্রতিটি শিশুর হাতে ট্যাবলেট পিসি তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৮ লাখ শিশুর হাতে ট্যাব তুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ২০২০ সাল নাগাদ প্রায় ৮০০ ধরনের সরকারি সেবা ইলেকট্রনিক প্লাটফর্মে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে থাইল্যান্ড।

ভারতও অনেক দূর এগিয়েছে। দেশটি গত বছর সফটওয়্যার ও অাইটি সেবা রফতানি করে ২০০ মিলিয়ন ডলার অায় করেছে। তাদের অাইটিতে রয়েছে ৫০ লাখ দক্ষ কর্মী। এর মধ্যে ১০-১২ লাখ কর্মী সারা পৃথিবীর অাইটি শিল্প চষে বেড়াচ্ছে।

অামাদের দেশে প্রশিক্ষিত মানুষের অভাব রয়েছে। 'হিউম্যান' অাছে কিন্তু 'ম্যানপাওয়ার' নেই। অামাদের এ দিকে নজর দিতে হবে। অামরা কোনও শ্রমিককে বিদেশে পাঠালেও যেন ভালোভাবে প্রশিক্ষিত করে পাঠাই। তাহলে সে নিজের এবং দেশের উন্নতি করতে পারবে। স্কুল থেকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিতে পারলে অারও ভালো।

বাংলা ট্রিবিউন: ২০২০ সালের জন্য অাপনি কী স্বপ্ন দেখেন?

অাবদুল্লাহ এইচ কাফি: বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মাত্র ২৬ ভাগ এশিয়ার দখলে অথচ বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি বাস করে এ মহাদেশে। ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্তত ৪০ ভাগ এশিয়ার দখলে নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখি।

বাংলা ট্রিবিউন: অ্যাসোসিও সামিট-২০১৪ সম্পর্কে জানতে চাই। এবার কোন বিষয়টিকে ফোকাস করা হবে?

অাবদুল্লাহ এইচ কাফি: অাগামী অক্টোবের ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এবারের সম্মেলনে কৃষি এবং কৃষিভিত্তিক যন্ত্রপাতির ওপর ফোকাস করা হবে। এবার 'তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষির উন্নয়ন' বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা চলছে।

অনেক দেশ অাছে যারা শ‌ুধু কৃষি নিয়েই থাকতে চায় না, বা কৃষিকে গুরুত্ব দিতে চায় না। সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, হংকং অন্য কিছু ভাবছে। যদিও ভিয়েতনাম কৃষিভিত্তিক দেশ, তারা অাবার এর অায়োজকও। ফলে কৃষি এমনিতেই প্রাধান্য পাবে।

অামরা ভাবছি তথ্যপ্রযুক্তিতে যারা দক্ষ তারা যদি ফ্রি মুভ করতে পারে তাহলে সে বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠতে পারবে। সব জায়গায়ই সে তার দক্ষতা কাজে লাগতে পারবে। এসব নিয়েও সেখানে অালোচনা হবে।

বাংলাদেশ এ সামিট থেকে অনেক কিছু পেতে পারে। অামাদের কৃষি বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সেখানে যেতে পারেন। যারা কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসা করেন তারাও সেখানে যেতে পারেন। প্যাকিং, প্যাকেজিং, পণ্য সংরক্ষণ, কৃষিভিত্তিক ই-কমার্স ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে দেশে ফিরে তা কাজে লাগাতে পারেন।

বাংলা ট্রিবিউন: অাপনাকে অ্যাসোসিওর চেয়ারম্যান হিসেবে বিশ্ব কীভাবে দেখে?

অাবদুল্লাহ এইচ কাফি: বাংলাদেশ ও বিশ্বের অনেকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে। এই চেনাটা ব্যক্তি হিসেবে। এ রকম ব্যক্তির সংখ্যা দেশে এখন অনেক। এরা সবাই কিন্তু এক জায়গায় এসে একটি সমষ্টিতে পরিণত হচ্ছে না। এটাই সমস্যা। সবাই অালাদা অালাদাভাবে বড় হতে চায়। যিনি বা যারা বিখ্যাত, তাদের সঙ্গে অন্যরা দাঁড়ালে কিন্তু বিশ্ববাসী তখন সমষ্টি হিসেবে চিনবে।

এই যে অামি এখন অ্যাসোসিওর চেয়ারম্যান। অাগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের অার কেউ চেয়ারম্যান হতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু দেশে এই 'চেয়ার'টাকে ঠিকভাবে ফোকাস করা হলো না। জানি না এতে অামরা কিছু হারালাম কী-না। তবে খুব বেশি যে লাভবান হয়েছি এটা বলা যাবে না।

সম্প্রতি জাপানের তিনটি টিম বাংলাদেশে এসেছিল। নেপাল এবং ভুটান থেকেও একটি করে টিম (তথ্যপ্রযুক্তি সংগঠনের) এসেছিল। অামাকে জানানো হয়নি। কোনও পক্ষই (সরকার এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ী সংগঠন) অামাকে জানায়নি। হয়তো প্রয়োজন মনে করেনি। কিন্তু তারা অামার সঙ্গে ঠিকই যোগাযোগ করেছিল, অ্যাসোসিও চেয়ারম্যান হিসেবে। বিভিন্ন পক্ষের এই যে 'এড়িয়ে যাওয়া', এটা খারাপ।

ছবি: ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি

এফএ

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।