সকাল ০৯:৫৪ ; সোমবার ;  ২২ অক্টোবর, ২০১৮  

কবির হুমায়ূনের কবিতা

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[কবির হুমায়ূন নব্বই দশকের অগ্রগণ্য কবি। জন্মেছেন লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার ফতেহপুর গ্রামে। পেশায় সাংবাদিক। তার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৮টি এবং গ্রদ্যগ্রন্থ ১টি। তার কবিতা বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউন-সাহিত্যে তার একটি নতুন কবিতা এবং একটি গ্রন্থিত কবিতা ও আলোচনা প্রকাশ করা হলো।] নতুন কবিতা ফসিল সমুদ্রের তলায় নুড়িপাথর। তার নিচে চাপা পড়ে ছিলাম। সহস্রাব্দের নিদ্রা শেষে জেগে দেখি চাকনাচুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আলো-অন্ধকার। চর হয়ে উঁকি দেওয়া হেরেমের ভগ্নাংশ কাঁন্নাজুড়ে ফের বিলীন; জলে মিশে থাকা সিলিকার শরীরে। এই যে শরীর, ওরে নিয়ে পারি না আর। স্পর্শের ট্যাবু ভেঙে দিলে তুমিও দূরত্ব মাপো। উত্তাপের শিরায় শিরায় খেলে যাওয়া বর্ণিলরশ্মি অবহেলা পেলে অভিমান করে। অভিমান নিয়ে দেখি- ঠোঁটে, ঠোঁট থেকে জিহ্বায়; গলনালী হয়ে ফুসফুস ও পাকস্থলিতে শিশির, তারপর কুঁচিকুঁচি আলোরকণা হয়ে জমাট বরফ বেঁধেছে সোনালী জল। পচনশীলে বরফ জমাট বাঁধলে সোনালি স্রোতে উত্তাপ থাকে না। এ কথা জেনে রক্ষিত ফুসফুস আর পাকস্থলি নিয়ে ফের যদি নুড়িপাথরের তলে ফসিল হয়ে যাই, হিজলের জলছাপে গেঁথে যাবে দিগন্তরেখার দীর্ঘশ্বাস। তুমি জমাট বরফের পাশে শিশির ও শিউলি হাস্নাহেনা ও লিলির স্পর্শ রেখে তারপর না হয় ট্যাবুর সনাতন পাটাতনে নিদ্রায় অবগাহন নিও। গ্রন্থিত কবিতা আজ আমার আনন্দের চল্লিশা

[caption id="attachment_36569" align="alignright" width="154"]এ বছর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ এ বছর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ[/caption]
ফেরাতে চাইলে ফিরতো কি না জানি না। ফেরাতে চাইনি। মৌলিক কোনো কিছু কখনো ফেরেনি, কখনো পেছন দেখে না। এত লম্বা পেছন পড়ে আছে... এত লম্বা, চল্লিশ বছর লম্বা, দশ বছর লম্বা তোর চলে যাওয়া, দশ বছর লম্বা আমার ফিরে আসা, এত লম্বা লম্বা দীর্ঘ কুয়াশার কুণ্ডলী, শীতে, গ্রীষ্মে আর বর্ষায় এত এত সবুজের মায়াকান্না, সবুজের ঝরে যাওয়া, অথচ মনে পড়ে না খসে পড়া শুকনো পাতা, মনে পড়ে না ঢিবির ওপর আধখান বেঞ্চি, কুয়োর পাড়ে অমানি রাতে চুম্বনের ডাহুক তৃষ্ণা। বহুকিছু সম্ভব ছিল না বলে এখন সম্ভব। এই ধর বর্ষার কথা। শীত আর গ্রীষ্মের প্রহর গুনে গুনে কতো কতো বছর গেল বর্ষার অপেক্ষায়! আজ এই এত বছর পর বর্ষা এলো রে! ভোরে, মানে যখন ঘুম ভাঙলো, হতে পারে দুপুর, হতে পারে অন্য কোনো সময়, তাতে কিছু যায় আসে না, প্রথম ঘুম ভাঙা মানেই ভোর, তো দেখি এই বর্ষার ভোরে চারদিক ভীষণ মন খারাপ করে আছে। আর আমি আনন্দে ধেই ধেই করছি। আজ বর্ষার মন খারাপ। আজ রোদের চেকনাই মাস্তানি দেখাতে ভুলে গেছে, আজ বর্ষা অপেক্ষা করছে যদি একটু কান্না করা যায়! আমি তো সতের বছর একা কান্না করেছি। আমি তো সতের বছর একা পাতাঝরা পথে হেঁটেছি, আমি তো রাত্রির টুটি চেপে ধরে পঁচিশ বছর একা খিস্তিখেউর করেছি। আজ আমি আনন্দে ধেই ধেই করে সিটি বাজালে ভ্রুকুঞ্চিত করবি না তুই। আজ আমার আনন্দের চল্লিশা। আজ আমি রাস্তার মোড়ে সিন্নি বিলাবো, ফকির-মিছকিন ধরে নতুন জামা পরাবো। আজ আমার আনন্দের শবযাত্রা। আমি তো ফেরাইনি কিছুই। অপেক্ষাও করিনি। জলের ভাঁজ কেটে কেটে, জলের গড়ন উল্টে-পাল্টে প্রবাল সাম্রাজ্যে স্থিরতা খুঁজেছি। তোকে কোথাও খুঁজিনি। ফেরাতেও চাইনি জোছনার পিঠে জেলি মাছের কাতর প্রার্থনা। আজ রিকশার হুড খুলে দিয়েছি। আজ বর্ষার মন খারাপ। আর আমি আনন্দে ধেই ধেই হুড খোলা রিকশায় সিটি বাজাচ্ছি তো বাজাচ্ছি... ‘আজ আমার আনন্দের চল্লিশা’ নিয়ে আলোচনা নিজেকে লেখা পত্রে মাহমুদ শাওন || নয়ের দশকের শেষদিকে, আর আমরা তখন কেবল কিছু লেখার চেষ্টায়, কিভাবে কিভাবে হাতে এলো ‘মঙ্গলসন্ধ্যা’। ‘এ ফোর’ সাইজের আটপাতার (না-কি বারো পাতা!) ঈর্ষণীয় গম্ভীর, স্বচ্ছ আর দারুণ ব্যক্তিত্বময় একটা কাগজ। সেখানেই প্রথম পড়েছি কবির হুমায়ূনের কবিতা। শিবের গীত হলে ক্ষমা চাইছি, সে কাগজের প্রধান কয়েকজন কবি মুজিব ইরম, শাহনাজ মুন্নী, সরকার আমিন ও কবির হুমায়ূন। আর যে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়েছে- তা হলো, চার জনের কবিতা একেবারেই চার রকম। আটের দশকের মাঝামাঝি তাদের শুরু, আর নয়ে পূর্ণ বিকাশের সে মুহূর্তটি ধরা আছে মঙ্গলসন্ধ্যা’র অল্প কয়েকটি সংখ্যায়। বুঝিবা পরের দশকের কাছেও! তো, পূর্বে পড়া কবির হুমায়ূনের অধিকাংশ কবিতায় শব্দ ব্যবহারে বৈচিত্র লক্ষ্য করেছি বরাবরই। বিশেষ করে অনেক কম ব্যবহৃত শব্দ, একেবারেই অপ্রচল শব্দ, প্রচুর বিদেশী শব্দ তার কবিতায় যত্রতত্র ছড়ানো থাকতো। কখনো কখনো মনে হতো, হয়তো সদ্য শেখা কোনো শব্দের মোহে পরে তিনি ভুলে যাচ্ছেন তার প্রয়োগ কতটা গ্রহণ করতে পারলো পাঠক! আমার কাছে অহেতুক জটিল মনে হতো তার কবিতা। আর এখন এই কবিতা পড়ে একেবারেই অন্য আরেক কবিকে পেলাম। নিজের কাছে ফেরার আকুতি, নিজেকে এত গভীর মমতা নিয়ে চেনার চেষ্টা, আর কিছু ক্লান্তি। যদিও ক্লান্তি মুছে আনন্দ উদযাপনের উপলক্ষ্য আছে খুব। তবুও। সচল কবি তার বৃত্ত ভেঙে অনায়াসেই বের হয়ে আসেন। আর ব্যর্থরা বৃত্তের মাঝে আত্মহত্যা করেন। একই সময়ে থেকে, একই সঙ্গ নিয়ে, পৃথক হওয়ার যে বৈশিষ্ট্য তার মাঝে ছিল- তা অটুট আছে এখনো। কিন্তু এই সময়ের একজন পাঠক হিসেবে, এই কবিতাকে তার যে ‘আমি’, সে ‘আমি’ কেনো জানি, আমার মাঝে সঞ্চারিত হচ্ছে না। হয়তো আরো কয়েক বছর পর যখন আমার বয়সও চল্লিশ হবে, সঞ্চারিত হলেও হতে পারে!

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।