সকাল ০৮:১৮ ; রবিবার ;  ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯  

মামলা দায়েরের অনিচ্ছায় বাড়ছে শিশু হয়রানির পুনরাবৃত্তি

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

উদিসা ইসলাম॥ নির্যাতিতদের পরিবার ও স্বজনদের মামলা দায়েরের অনিচ্ছার কারণে শিশুদের ওপর বিভিন্ন হয়রানির পুনরাবৃত্তি বেড়েই চলেছে। জাতীয় শিশু বিষয়ক টাস্ক ফোর্সের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৫১ শতাংশ পথশিশুই বিভিন্নভাবে নিগ্রহ, নির্যাতনসহ নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছে। গত বছর রাজশাহীর বিদিরপুরে প্রতিবেশীর দ্বারা ধর্ষিত হয় শিশু সীমা (ছদ্মনাম)। তার পরিবার যখন মামলা দায়েরের চেষ্টা করে তখন ওই প্রতিবেশীর অাত্মীয় স্বজনরা বিষয়টি প্রথমে মিটমাট করার চেষ্টা করে। এমনকি পরে বিভিন্ন হুমকিও দেয়। পরে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার মধ্যস্থতায় সীমার পরিবার মামলা দায়ের না করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলশ্রুতিতে তিন মাস পর ওই একই প্রতিবেশীর ছেলেটি সীমার ওপর নির্যাতন চালানোর চেষ্টা করে। বিষয়টি নিয়ে সীমা বলে, 'যদি অামার পরিবার তখন অাপোষ না করতো তাহলে দ্বিতীয়বার অামার ওপর হামলা হতো না।' একইরকম আরেকজন-কৈশোরে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়া রাশিদা (ছদ্মনাম) জানান তার কথা। তার মা সম্প্রতি জানতে পেরেছেন যে, রাশিদার ১৯ বছর বয়সী এক ভাই মাঝে মাঝেই তার মেয়েকে যৌন নির্যাতন করতো। এই অবস্থা এড়াতে তিনি রাশিদাকে তার দাদাবাড়িতে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু সেখানেও রাশিদার এক চাচা তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা শুরু করে। উপরের উভয় ঘটনাতেই দুটি পরিবারই নিজেদের সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয়ে পুরো বিষয়টিকে চেপে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। একই সময় নিশ্চিত প্রমাণ থাকার পরও যৌন হয়রানির অভিযোগ দাখিল না হওয়ায় পার পেয়ে গেছে অপরাধীরা। এমন অনেক ঘটনাই 'পারিবারিক বিষয়' বিবেচনা করে জানার অগোচরে থেকে যায়। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শারীরিক ও মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জে থাকা অর্ধেকের বেশি শিশু যৌন হয়রানির শিকার। এবং সেটি তারা হচ্ছে ঘনিষ্ঠ অাত্মীয় স্বজনদের দ্বারাই। যৌথভাবে এই গবেষণাটি করেছে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন (বিপিএফ) এবং সেভ দ্য চিলড্রেন সুইডেন-ডেনমার্ক। জাতীয় শিশু বিষয়ক টাস্ক ফোর্সের তথ্য মতে, দেশের ৫১ শতাংশ পথশিশুই বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার। এরমধ্যে ২০ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার। এছাড়া ৪৬ শতাংশ মেয়ে শিশু যৌন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার। শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত বিদ্যমান আইন শিশু অধিকার রক্ষার চেয়ে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারেই বেশি জোর দিয়েছে। শিশু অধিকার গভর্ন্যান্স অ্যাসেমব্লির দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, বিধান থাকার পরও সাধারণত শিশু নির্যাতনের মামলায় ক্যামেরা ট্রায়ালের ব্যবস্থা রাখা হয় না। যার ফলে নির্যাতনের শিকার অনেকেই প্রকাশ্যে অাদালতে হাজির হতে চান না। ফলে দ্বিতীয়বার যখন তাদের ওপর হামলা হয় তখন হামলা অারও হিংস্র হয়। মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, 'অামাদের দেশে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মামলাকারীরা দ্রুত প্রতিকার পায় না। কখনও কখনও নির্যাতনকারীর চাপের ফলে নির্যাতিতার পরিবার মামলা দায়ের থেকে বিরত থাকে। প্রায় সময় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নির্যাতনকারীকে রক্ষাও করে থাকেন। অার এটি ওই নির্যাতিতের ওপর দ্বিতীয়বার হামলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।' অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন বলেন, 'বিদ্যমান অাইন বাস্তবায়নে অামাদের কিছু কারিগরী সমস্যা রয়েছে। সম্প্রতি অামরা ইভ টিজিংসহ নানা বিষয়ে নির্যাতিতদের রক্ষায় অাব্রেলা টার্ম ব্যবহার করছি। কিন্তু অধিকাংশ অাইন শৃঙ্খলা বাহিনীই যাদের কাছে প্রাথমিকভাবে অভিযোগটা অাসে তারা এ সম্পর্কে ভালো জানে না। তাই তারা নির্যাতিতকে সুরক্ষা দিতে অাগ্রহী হয় না।' তিনি অারও বলেন, 'নিরাপত্তা ও সামাজিক সৌন্দর্য সম্পর্কে অামাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। অামার সন্তান বারবার অাইন ভাঙছে এবং অামি সেটা যথাসম্ভব লুকানোর চেষ্টা করছি। তাই পরিস্থিতির এখনও পরিবর্তন হয়নি। তাই বিভিন্ন নির্যাতন রোধে অাইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।' এসএম/টিএন

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।