দুপুর ০১:০৫ ; রবিবার ;  ২৬ মে, ২০১৯  

সরেজমিনে থ্রিডি প্রিন্টার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

নাজমুল কবীর রনিকলাহোমা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে॥

প্রযুক্তি বিশ্বে এ সময়ের অন্যতম আলোচিত একটি শব্দ থ্রিডি প্রিন্টিং বা ত্রি-মাত্রিক মুদ্রণ। আর সবার মতো আমার কাছেও থ্রিডি প্রিন্টিং ছিল রোমাঞ্চকর এক আবিষ্কার!

ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলা যায়! গত বছর ভিনদেশে পড়তে এসে থ্রিডি প্রিন্টিং কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি (যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়), সেখানে বছর দুয়েক আগে ওয়ান ইউনিভার্সিটি ডিজিটাল ইনিশিয়েটিভ নামে একটি কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হলো, বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে এমন কিছু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করা যাতে করে শিক্ষা কার্যক্রম আরও আকর্ষণীয় হয়, শিক্ষা উপকরণ সহজলভ্য হয় এবং শিক্ষার্থীদের খরচ কমে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ান ইউ সেন্টারে গত বছর থ্রিডি প্রিন্টার আনা হয়।

যেভাবে এলো থ্রিডি প্রিন্টিং: থ্রিডি প্রিন্টিং গত কয়েক বছরে প্রযুক্তি অঙ্গনে বেশ তোলপাড় তুললেও প্রথম থ্রিডি প্রিন্টার তৈরি হয় কিন্তু আশির দশকে। চাক হাল নামে একজন আমেরিকান প্রকৌশল পদার্থবিদ ১৯৮৩ সালে প্রথম থ্রিডি প্রিন্টিং -এর ধারণা দেন। যদিও, সেসময় এই প্রযুক্তির নাম ছিল “স্টেরিওলিথোগ্রাফি”।

থ্রিডি প্রিন্টার মূলত ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট। যে কোন নকশা থেকে এটি হুবহু কার্যকর প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে।

10

যেবাবে কাজ করে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি: থ্রিডি প্রিন্টিং -এর প্রথম ধাপ হলো নকশা তৈরি। যে কেউ চাইলে নিজে নকশা করে থ্রিডি রেন্ডারিং সফটওয়্যার দিয়ে সেগুলো থ্রিডি প্রিন্টিং -এর জন্য উপযোগী করে তুলতে পারেন। তবে নকশা তৈরি করতে না জানলেও সমস্যা নেই! ইন্টারনেটে খুঁজলে বেশ কিছু বিনামূল্যের সফটওয়্যার (গুগল স্কেচ-অা, থ্রিডি ক্রাফটার, ব্লেন্ডার, ফ্রিক্যাড) পেয়ে যাবেন যেগুলো দিয়ে খুব সহজেই ত্রি-মাত্রিক নকশা তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া কোন জিনিসের হুবহু নকল বা কপি তৈরি করতে হলে হাতে বহনযোগ্য স্ক্যানার দিয়ে জিনিসটি সব দিক থেকে স্ক্যান করে নিতে হবে। তারপর স্ক্যান করা তথ্য সফটওয়্যার দিয়ে প্রিন্টারের উপযোগী রেন্ডারিং করে নিতে হবে।

নকশা তৈরি হলে থ্রিডি প্রিন্টার সফটওয়্যার এ প্রিন্ট কমান্ড চাপলেই শুরু হয়ে যাবে প্রিন্টিং -এর কাজ। মজার ব্যাপার হলো, থ্রিডি প্রিন্টারে কালি হিসেবে ব্যবহার করা হয় নানারকমের “ফিলামেন্ট”। এগুলো তৈরি হয় মূলত বিভিন্ন রকমের প্লাস্টিক দিয়ে। থ্রিডি প্রিন্টিং বেশ সময় সাপেক্ষও বটে! নকশা, প্রিন্টারের আকার, কালির ধরণ এগুলোর উপর নির্ভর করে একটি থ্রিডি প্রিন্ট হতে সময় লাগতে পারে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত!

থ্রিডি প্রিন্টিং হতে পারে উদ্বেগের কারণ: খাবার থেকে শুরু করে কৃত্রিম অঙ্গ কিংবা, হাতুড়ি থেকে বিমানের পাখা, থ্রিডি প্রিন্টি -এর কল্যাণে সবই এখন আক্ষরিক অর্থে হুবহু “প্রিন্ট” করা সম্ভব।12

গবেষকরা ধারণা করছেন, আগামী দশকে থ্রিডি প্রিন্টিং -এর বিশ্বব্যাপী বাজারের মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু বেশ কিছু কারণে এরই মধ্যে তাক লাগানো এই প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। সম্প্রতি গবেষকরা থ্রিডি প্রিন্টারে কার্যকর বন্দুক তৈরি করেছেন। সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতিকারীরা থ্রিডি প্রিন্টারে বন্দুক থেকে শুরু করে আরও আধুনিক মারণাস্ত্র বানিয়ে ফেলতে পারবে।

যেহেতু থ্রিডি প্রিন্টারের মূল উপদান প্লাস্টিক, তাই অপরাধ করে খুব দ্রুতই আলামত নষ্ট করে ফেলা সম্ভব। এছাড়া নকশা যোগাড় করতে পারলে খুব সহজেই পেটেন্টেড সামগ্রী তৈরি করা যাবে। তাই ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টির পরও আসতে পারে বিরাট আঘাত। ধারণা করা হচ্ছে, থ্রিডি প্রিন্টিং ব্যবহার করে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি সাধন করা হতে পারে! এরই মাঝে বেশ কিছু দেশ থ্রিডি প্রিন্টারে তৈরি অস্ত্রের পর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অনেক দেশে দাবি উঠেছে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শক্ত আইন করার। এসব কারণে থ্রিডি প্রিন্টার নিয়ে সামনে যে অনেক বিতর্ক দেখতে হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

থ্রিডি প্রিন্টিং এর ভবিষ্যত: বিরূপ ধারণা থাকা সত্ত্বেও থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আজকাল যে কেউ ইচ্ছে করলে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য থ্রিডি প্রিন্টার কিনতে পারেন, যার সর্বনিম্ন বাজার মূল্য ৫০০ মার্কিন ডলার। বর্তমানে বাজারে বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের থ্রিডি প্রিন্টার পাওয়া যায়। এর মধ্যে “মেকারবট” এর তৈরি প্রিন্টারগুলো শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।13

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েকটি থ্রিডি প্রিন্টার চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা চাইলে বিনামূল্যে এগুলোর সেবা নিতে পারেন। বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এখন থেকেই থ্রিডি প্রিন্টিং এর পর দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি করতে পারে তাহলে সামনের দিনগুলোতে বেশ বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা আমরা ঘরে তুলতে পারব

--মেইল: nazmul.rony@ou.edu

এইচএএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।