রাত ১২:৩৯ ; রবিবার ;  ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

নাডিন গর্ডিমারের গল্প ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর || আমার স্ত্রী লেরিস এবং আমি কেউ-ই প্রকৃত কৃষিজীবী নই। জোহান্সবার্গ থেকে দশ মাইল দূরে বড় রাস্তার পাশে একটি খামার কিনেছিলাম- উদ্দেশ্য ছিল শুধু আমাদের মধ্যে একটু পরিবর্তন আনা। স্বভাবতই আমাদের দাম্পত্য জীবন নিয়ে অনেকের মধ্যে গল্পগুজব চলতে পারে। আর দাম্পত্য জীবন শুরুর প্রসঙ্গ আসলেই অন্য কিছু না হোক সবাই এক ধরনের গভীর সন্তুষ্টির নীরবতা আশা করে। আমাদের বেলায় তেমন কিছু ঘটেনি। তবে খামারটির কারণে অপ্রত্যাশিত কিছু পেয়েছি যা যুক্তির বাইরে। লেরিস যখন পছন্দমতো পেয়ে পুনরায় তার অভিনয় জগতে ফিরে যাবার চেষ্টা করছে তখন আমার মনে হয়েছে, সে দু’এক মাস মাত্র চেখভীয় দুঃখবোধে নীরব থেকে খামার থেকে দূরে সরেই থাকবে। কিন্তু দেখা গেল আসলে তা নয়- এক সময় যে গাম্ভীর্য নিয়ে সে কোনো নাট্যকারের মন উৎসাহে ভরে দিত সেই রকম গাম্ভীর্যের সাথেই খামার পরিচালনায় লেগে গেল। অনেক আগেই আমি এই খামার পরিচালনার কাজটি ছেড়ে দিতাম। শুধু তার কারণেই ধরে আছি। অভিনয়ের সময় তাকে লাল মেকআপ অথবা হীরার আংটি পড়তে হয়নি এবং তার ছোটখাটো হাত দুটো ছিল কোমল মসৃণ ও সযত্নে সুরক্ষিত। কিন্তু সেই কোমল হাত দুটো এখন কুকুরের থাবার নিচের মাংসের মতো বেশ শক্তপোক্ত হয়ে গেছে। আমি অবশ্য শুধুমাত্র সন্ধ্যা ও সপ্তাহান্তে ওখানে যাই। আমি একটা ক্রমবর্ধমান ট্রাভেল এজেন্সির অংশীদার। বলা বাহুল্য, যেমন লেরিসকে বলে থাকি যে, খামারটা চালিয়ে নেবার জন্যে আমার এই কাজটা। যদিও আমি জানি যে, খামারের ব্যয় বহন করাটা আমাদের পক্ষে খুব কঠিন এবং খামারের মুরগীগুলোর গন্ধ আমাকে অসুস্থ করে ফেলে বলে মুরগীর খামারটাকে এড়িয়ে চলি তবু এটার একটা সুন্দর দিক যে আছে তা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম- বিশেষ করে কোনো রোববার ঘুম থেকে উঠে যখন সবুজ ঘাসে ভরা মাঠে গিয়ে দাঁড়াই তখন কোনো তালগাছ অথবা মাছের পুকুর দেখি না বরং দেখি বাঁধের উপরে সাদা হাঁস, গবাদি পশুর ছিমছাম ঘাস এবং বেঁটেখাটো গাট্টাগোট্টা কুতকুতে চোখের ষাঁড়টাকে চোখেমুখে কামভাব পরিপূর্ণ তবে বিরক্ত-ক্লান্ত, সঙ্গিনীদের একজন তার মুখ চেটে আদর করে দিচ্ছে। এলো চুলে পাশে এসে দাঁড়ায় লেরিস, হাতে একটি সরু লাঠি, তা থেকে তখনো গো-চোনাদী চুইয়ে পড়ছে। দু’এক মুহূর্তের জন্য তার দু’চোখ স্বপ্নে বিভোর হয়- অভিনয়ের সময়ে তার চাহনি যে রকম হত ঠিক তেমনি। নিঃস্পলক চোখে তাকিয়ে বলে, ‘আগামীকাল ওরা মিলিত হবে! দেখো, সঙ্গিনী ওকে কেমন আদর করছে! আহা, আমার ক্ষুদে নেপোলীয়ান!’ হয়তো এ কারণেই রোববার বিকেলে লোকজন বেড়াতে এলে কোনো তরল পদার্থ গ্লাসে ঢালতে ঢালতে নিজের অজান্তে বলে ফেলি, ‘শহর থেকে গাড়ি করে যখন প্রতিদিন আমি বাড়ি ফিরি তখন শহরতলির সারিসারি বাড়িগুলো দেখে অবাকই হই যে, কী করে আমরা এতোদিন নরক যন্ত্রণা সহ্য করে আসছি। চারপাশে সৌন্দর্য দেখার মতো ধৈর্য কি তোমাদের নেই?’ উদাহরণস্বরূপ, তখন আমার মনে এরকম ছবি ভেসে ওঠে যে, একটা সুন্দরী মেয়ে তার অল্প বয়সী স্বামীকে নিয়ে আমাদের নদীর ধারে বেড়াতে এসেছে। মেয়েটার মোজা বারবার ভূট্টার গাছে আটকে যাচ্ছে; চকচকে সবুজ মাছি গোবরের ওপর ভনভন করছে এবং লাফ দিয়ে গোবরের স্তুপগুলো পার হতে হতে স্বামীকে বলছে, ‘...যত সব শহুরে দুশ্চিন্তা! দৃশ্যটা শহর থেকে বেশ কাছেই। আমার কাছে বেশ চমৎকার মনে হচ্ছে কেননা তুমি তো উভয় সুযোগই বেশ কাছে থেকেই পাচ্ছো!’ এক মুহূর্তের জন্য হলেও বিজয়কে আমি সাদরে গ্রহণ করি যেন আমি নিজেই ব্যবস্থাটা করেছি- যে অসম্ভবকে আমি সারাজীবন ধরে সম্ভবে পরিণত করার চেষ্টা করছি। কিছুটা এরকম যে, উভয় সুযোগই আলাদা কোনো এককভাবে বা একক পথে আসছে না রবং অন্য আরেক উপায়ে পাওয়া যাচ্ছে যার জন্যে কেউই পূর্বাহ্নে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কিন্তু আমাদের মানসিক বিবেদী মুহূর্তগুলোতে যখন লেরিসের সহজ সরল আগ্রহকে আমার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়, যেমন এক সময়ে তার কপট আগ্রহকে মনে হতো এবং তার সরল আগ্রহের বিপরীতে সঙ্গী হিসেবে আমার অনাগ্রহকে সে ঈর্ষা মনে করে, তবু আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমরা কমপক্ষে ওইসব নাগরিক দুঃশ্চিন্তা- যেগুলো আমাদের নাগরিক অতিথিরা উল্লেখ করে থাকে সেগুলোকে সততার সাথেই এড়িয়ে চলতে সক্ষম হয়েছি। জোহান্সবার্গের লোকজন যখন দুঃশ্চিন্তার কথা বলে তখন তারা ভীড়ের রাস্তায় ব্যস্ত লোকের কথা অথবা অর্থের জন্যে সংগ্রামের কথা অথবা নাগরিক জীবনের প্রতিযোগিতার কথা বলে না; তারা বরং সাদা লোকদের বালিশের নিচে পিস্তল রাখার কথা এবং চোর ঠেকাতে জানালার পাশে প্রতিবন্ধকতার কথা বলে। তাদের কথার মধ্যে আরো থাকে সাদা লোকদের দেখে কালোরা রাস্তার পাশে সরে দাঁড়ায় না- এ প্রসঙ্গটিও। সামান্য দশ মাইল দূরে ওখানকার চেয়ে জীবন অনেক সহজ ও স্বচ্ছন্দ। গ্রামজীবনে এখনও বৃহৎ পরিবর্তনের পূর্বের সময়ের কিছু স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গেছে; কালোদের সাথে আমাদের সম্পর্ক সামন্ততান্ত্রিক বরং বলা চলে সবদিক বিবেচনায়- ঝামেলাহীন এবং স্বচ্ছন্দ। আমাদের বন্দুক অথবা চোর ঠেকানো প্রতিবন্ধকতার দরকার হয় না। খামারের লোকদের স্ত্রী এবং বাচ্চারা সবাই ফার্মের মধ্যেই বসবাস করে। ওরা নিজের হাতে টকমদ তৈরি করে- কোনও রকম পুলিশি তল্লাশির ভয় করার কিছু নেই। আমরা নিজেরাও সবসময় গর্ববোধ করি যে, ওরা আমাদের কাছে আছে বলেই ওদের ভয় করার কিছু নেই। লেরিস ওদের বাচ্চাদেরকে দেখাশোনা করে এমনকি, ছেলেবুড়ো যে কেউ-ই অসুস্থ হলে চিকিৎসাও করে থাকে।

সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল এমন এক দৃষ্টিতে যা থেকে তার দৃঢ় বিশ্বাস ঠিকরে বের হচ্ছে- সাদা মানুষদের সব কিছুই আছে; যা ইচ্ছে তা বাস্তবে পরিণত করতে পারে এবং যদি কোনো কিছু না করে তাহলে বুঝতে হবে তাদের ইচ্ছে নেই!’

এর জন্যেই গত শীতে একরাতে আলবার্ট নামের ওদের একজন আমরা শুয়ে পড়ার বেশ অনেক পরে যথন এসে দরোজায় কড়া নাড়ল তখন আমরা তেমন চমকিত হইনি। সে রাতে আমি শোবার ঘরে ছিলাম না। কারণ লেরিসের প্রতি আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলাম আর গোসলের পর ওর গায়ে মাখা ট্যালকম পাউডারের মিষ্টি গন্ধটা আমার কাছে অসহ্য ঠেকে বলে আমি আর তেমন নমনীয় হইনি। আমি শুয়েছিলাম পাশের একটা ড্রেসিং রুম-কাম কাপড়ের রুমে। লেরিস এসে আমাকে ডেকে তুলল, ‘আলবার্ট বলছে ওদের একটা ছেলে নাকি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমার মনে হয় তুমি গিয়ে একটু দেখে আসলে ভালো হয়। এতো রাতে ওরা আর অযথা আমাদের ডেকে তুলতে আসেনি।’ ‘এখন রাত ক’টা বাজে?’ ‘যতো রাতই হোক তাতে কী?’ লেরিসের অকাট্য যুক্তি। আমি উঠলাম কিছুটা বিরক্ত হয়েই। লেরিস আমার দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকবার আমি খেয়াল করে দেখেছি তার বিছানাটা ছেড়ে যখনই দূরে থেকেছি তখনই কোনো না কোনোভাবে নিজের কাছে বোকা বনে গেছি। পরের দিন সকালে নাস্তার টেবিলে সে কথা বলেছে আমার দিকে না তাকিয়ে- কিছুটা অপমানিত, আহত। ঘুম জড়ানো চোখে বাইরে এলাম। ‘কোন ছেলেটা?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। ততক্ষণে আমরা আমার টর্চের কম্পমান আলোকে অনুসরণ করে চলতে শুরু করেছি। ‘ও খুবই অসুস্থ, একেবারে কাহিল।’ সে বলল। ‘কিন্তু ওটা কে? ফ্রাঞ্জ?’ আমার মনে পড়ল সপ্তাহখানেক আগে ফ্রাঞ্জের খুব কাশি হয়েছিল। আলবার্ট কোনো জবাব দিল না, লম্বা মরা ঘাসের ভেতর দিয়ে পথ দেখিয়ে চলল। ওর মুখের ওপর টর্চের আলো পড়তেই দেখলাম খুব ঘাবড়ে গেছে। আমি বললাম, ‘আসলে ব্যাপারটা কী?’ আলোর সামনে মুখ নিচু করে বলল, ‘আমার কেউ না, প্রেট্রাস আমাকে পাঠিয়েছে!’ বিরক্ত হয়ে ওদের কুঁড়েঘরগুলোর দিকে এগিয়ে গেলাম। পেট্রাসের ঘরে ইট আর লোহার তৈরি উঁচু বিছানায় ছেলেটা শুয়ে আছে- মৃত। কপালে বিন্দু বিন্দু ঠান্ডা ঘাম জমে আছে; শরীরটা তখনও গরম। অন্যান্য ছেলেরা চারপাশে ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে, চুপচাপ, নিঃস্পৃহ- অন্যান্য সময় যেভাবে ওরা ভীড় করে কেউ রান্নাঘরে কোনও আকর্ষণীয় খাবার খুললে। অন্ধকারে ওদের কার যেন স্ত্রী দু’হাত কাপড়ের নিচে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধের পর থেকে অনেকদিন কোনও মৃতদেহ। এটা সম্পূর্ণ একটা আলাদা মৃত্যু মনে হচ্ছে। অন্যান্যদের মতো আমরাও নিজেকে বহিরাগত বলে মনে হচ্ছে যেন আমার কোনও ভূমিকা নেই। ‘কী হয়েছিল?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। মহিলা বুক চাপড়ে এবং মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝাতে চাইল- শ্বাসকষ্ট। অনুমান করলাম- ছেলেটির অবশ্যই নিউমোনিয়া হয়েছিল এবং পেট্রাসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ছেলেটি কে? এখানে কী করতো?’ মেঝের মোমবাতির আলোয় দেখলাম প্রেট্রাস কাঁদছে। আমার পিছুপিছু সে দরোজার বাইরে এলো। বাইরে এসে অন্ধকারে আমি তার কাছ থেকে কিছু শোনার জন্যে অপেক্ষা করলাম, কিন্তু ও নির্বিকার। আমি বললাম, ‘প্রেট্রাস, ছেলেটা কে? আমাকে বলো না! ও কি তোমার কোনও বন্ধু?’ ‘স্যার, ও আমার ভাই। রোডেশিয়া থেকে কাজের খোঁজে এসেছিল।’ ঘটনাটা লেরিস এবং আমাকে সামান্য বিব্রত করলো। ছেলেটা রোডেশিয়া থেকে পায়ে হেঁটে জোহান্সবার্গে কাজের সন্ধানে এসেছিল। আসার পথে রাস্তায় রাত কাটানোর জন্য ঠান্ডা লাগে। মারা যাবার তিনদিন আগে থেকে ওর ঘরেই অসুস্থ অবস্থায় শুয়েছিল। আমাদের কাজের লোকদের কেউই ওর জন্য আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে সাহস করেনি, কারণ আমরাও ওর উপস্থিতি সম্পর্কে ওদের কাছে কিছু জানতে চাইনি। অনুমতি ছাড়া রোডেশিয়ার আদিবাসীদের জন্য ইউনিয়নে প্রবেশ নিষিদ্ধ; ছেলেটা ছিল অবৈধ অভিবাসী আমাদের কাজের লোকেরা পূর্বে বেশ কয়েকবার এরকম ঘটনা সফলতার সাথেই সামাল দিতে পেরেছে। ওদের বেশ কিছু আত্মীয়-স্বজন প্রায় সাত/আটশ’ মাইল হেঁটে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা থেকে কেতাদূরস্ত স্বর্গ, পুলিশী তল্লাশী, কালোদের শহরতলির পাশে সোনার নগরী যাকে আফ্রিকান নামে জোহান্সবার্গ বলা হয় সেখানে পৌঁছে গেছে। এই ছেলেটার ব্যাপারেও তেমন খুব একটা জটিল কিছু ছিল না; সে শুধু আমাদের খামার এলাকায় কয়েক দিন তার একটা কাজ জুটে যাবার আগ পর্যন্ত লুকিয়ে থাকলেই হতো। যে কেউই তার একটা কাজের পারিবর্তে তার অভিবাস সংক্রান্ত আইনি ঝামেলা কাটিয়ে দিতে পারতো যতি না আগেই নগরীকর্তৃক তাকে দোষে ফেলা হতো। কিন্তু সে তো আর জীবতাবস্থায় কখনই ফিরে আসবে না। পরদিন সকালে লেরিস বলল, ‘তুমি হয়তো মনে করে থাকবে ওরা আমাদেরকে ব্যাপারটা বলতে চেয়েছিল। ছেলেটা যখন একবার অসুস্থ হয়েই পড়েছে তখন তুমি তো আপাতত; ভাবতে পারতে...! গভীরভাবে আবেগাক্রান্ত হলে তার একটা অভ্যাস আছে- খুব সংক্ষিপ্ত কোনো সফরে যাবার পূর্বে যেমন অনেকে অতি পরিচিত জিনিসপত্রের দিকে তাকায়- সেও রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের আসবাবপত্রের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন সেগুলো আগে কখনো দেখেনি। তার এরকম চেহারা আমি রান্নাঘরে প্রেট্রাসের সামনেও দেখেছি- পুরো অবয়ব জুড়ে আহত হবার চেহারা। যে কোনো ব্যাপারেই তার আতঙ্কিত ও সনির্বন্ধ চাহনি দেখেও আমাদের জীবনের সব কিছুতেই নিজেকে জড়ানোর মতো সময় ও ইচ্ছে কোনোটাই আমার নেই। সে এমন একজন মহিলা যে নিজেকে অতি সাধারণ অথবা অদ্ভুত অবস্থায় দেখতে পেলেও তার তেমন কিছু যায় আসে না। জরুরী অনিশ্চয়তার কারণে তার মুখভাবের অস্বাভাবিক রূপটি কেমন অদ্ভুত দেখায় তা দেখলেও আমার মনে হয় খুব একটা পরিশোধনের চেষ্টা করবে না। আমি বললাম, ‘এখন এসব আজেবাজে কাজ করার একমাত্র ব্যক্তি হলাম আমি!’ আমার দিকে লেরিস পলকহীন সেই দৃষ্টিতেই তাকিয়ে রইল যেন আমাকে মেপে দেখছে। আমি জানি- এবং সেও জানলে বুঝতে পারতো- শুধুই সময় নষ্ট করছে। ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে’- ধীরস্থিরভাবে বললাম। ‘ওকে তো কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে দাফন করে এলেই হয় না। আর মোট কথা, আমরা আসলেই জানি না ছেলেটা কী কারণে মারা গেল।’ লেরিস চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল যেন আশাহত-দৃষ্টি শুধু আমার দিকে আর নেই। আমার মনে হয় এরকম বিরক্তির একশেষ আর কখনো হইনি। ‘কোনো ছোঁয়াচে রোগও তো হতে পারতো; খোদা মালুম।’ এর কোনো উত্তর নেই। নিজে নিজে কথাবার্তা চালিয়ে যাবার মতো মুগ্ধতা আমার কখনোই নেই। ওদের একজনকে ডাকার জন্যে বাইরে এলাম। সকালবেলার মতো শহরে যাবার জন্যে গাড়ি বের করতে হবে। যেমন ভেবেছিলাম তেমনই হল, ব্যাপারটা মোটামুটি আমার একটা কাজে দাঁড়িয়ে গেল। পুলিশে খবর দেয়া, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং একগাদা ক্লান্তিকর প্রশ্নের জবাব দেয়া- কী করে আমি ছেলেটার উপস্থিতি সম্পর্কে অনবহিত থাকলাম; যদি আমি আমার কাজের লোকদের আবাস দেখাশোনা নাই করি তবে কী করে আমি জানি যে সেখানে এরকম ঘটনা অহরহ ঘটছে না। এবং যখন আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম আমার লোকজন যতক্ষণ তাদের কাজকর্ম করে ততক্ষণ অবশ্যই আমি তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে নাক গলাতে পারি না; এটা আমার অধিকারও নয়- তখন স্থুল বুদ্ধির পুলিশ সার্জেন্ট আমার দিকে এমন এক চাহনিতে তাকাল যা মস্তিষ্কের চিন্তা প্রসূত কোনো ফসল নয় বরং তাতে মিশে আছে সকল সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক মানসিক শক্তির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা উচ্চমার্গীয় তত্ত্ব কথার অতি পাগলীর নিশ্চিন্ততা। আমার বোকামিতে লোকটা তাচ্ছিল্য আর আনন্দ মিশ্রিত একটা দাঁতাল হাসি দিল। আমি প্রেট্রাসকে বুঝিয়ে বললাম, কী করণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে পোস্টমর্টেম করতে চায় এবং পোস্টমর্টেম ব্যপারটা আসলে কী। কয়েকদিন পর যখন তাদের কাছে ফলাফল জানার জন্য টেলিফোন করলাম তখন আমাকে বলা হলো, আমরা যা অনুমান করেছিলাম সেটাই ছেলেটার মৃত্যুর কারণ- নিউমোনিয়া এবং মরদেহ ভালোভাবেই দাফন করা হয়েছে।

আমি নিজেও তাকে অর্থটা দেবার ব্যাপারে আগ্রহী নই। ছেলেটা বেঁচে থাকলে তার ডাক্তার দেখানো এবং ওষুধপত্রের জন্যে শুধু কুড়ি পাউন্ড নয় প্রয়োজনীয় যে কোনো পরিমাণের অর্থ খরচ করতে আমার দ্বিধা ছিল না। আমি আর প্রেট্রাসকে কুড়ি পাউন্ড অযথা খরচ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে কোনো সংগত কারণ দেখি না যেহেতু ছেলেটা মারা গেছে। তার পুরো পরিবারের এক বছরের কাপড়চোপর কিনতেও কুড়ি পাউন্ড খরচ হয় না।

প্রেট্রাস খামারে মুরগীর খাবার দিচ্ছিল। ওর কাছে গিয়ে বললাম, সব কিছু ঠিকঠাক মতো হয়েছে; কোনো ঝামেলা হয়নি এবং তার ভাই বুকের ব্যথাতেই মারা গেছে। প্যারাফিনের টিনটা নামিয়ে রেখে প্রেট্রাস আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ওকে আনতে যেতে হবে?’ ‘আনতে মানে?’ ‘আপনি কি দয়া করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন কখন ওকে আনতে যেতে হবে?’ বাড়িতে ফিরে গিয়ে লেরিসকে ডাকতে লাগলাম। সে অতিরিক্ত শোবার ঘর থেকে নিচে নেমে এলে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখন আমাকে কী করতে হবে? প্রেট্রাসকে খবর দেবার পর ও আমাকে সাদামাটাভাবে জিজ্ঞেস করলো ওরা কখন মৃতদেহটা আনতে যাবে। ওরা ভেবেছে নিজেরাই দাফন করতে যাচ্ছে।’ ‘তোমার তো সব কিছু ওকে খুলে বলা উচিৎ ছিল। এখনই গিয়ে সব পরিষ্কার করে বলে এসো। যখন ওকে আবার খুঁজে পেলাম ও আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। আমি বললাম, ‘শোন প্রেট্রাস, তোমার ভাইকে আনতে যাবার দরকার নেই। ওরা ওকে দাফন করে ফেলেছে, বুঝেছ?’ ‘কোথায়?’ তার প্রশ্নের ধরনে মনে হলো কথাটা তার মোটেও বিশ্বাস হয়নি। ‘তুমি তো জান, তোমার ভাই এখানে অপরিচিত ছিল। ওরা জানে সে এখানকার কেউ নয় এবং আত্মীয়-পরিজন বলতে এখানে কেউ নেই। সে কারণে ওরা নিজেরাই দাফন করেছে।’ ‘স্যার, দয়া করে ওদেরকে জিজ্ঞেস করবেন...!’ আসলে জিজ্ঞেস করা বলতে সে কবরস্থানের ব্যাপারটা বোঝায়নি। আমি তার কাছে যতো দুর্বোধ্য বিষয় বললাম, তা সে আমলই দিল না। সে তার ভাইকে ফেরত চাচ্ছে। ‘কিন্তু প্রেট্রাস, আমি এখন কী করে ওকে ফেরত আনতে পারি? তোমার ভাইকে দাফন করা হয়ে গেছে। এখন তো আর এ ব্যাপারে তাদেরকে কিছু বলা যায় না।’ ‘আহ্ স্যার,’ -সে ভূষি মাখানো নিশ্চল হাতে উঠে দাঁড়ালো, চোখের এক কোণ তিরতির করে কাঁপছে। ‘কী করে তোমাকে বোঝাই প্রেট্রাস, তারা এখন আর এই কাজ করবে না। দুঃখিত, কিন্তু কিছুই করতে পারছি না!’ সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল এমন এক দৃষ্টিতে যা থেকে তার দৃঢ় বিশ্বাস ঠিকরে বের হচ্ছে- সাদা মানুষদের সব কিছুই আছে; যা ইচ্ছে তা বাস্তবে পরিণত করতে পারে এবং যদি কোনো কিছু না করে তাহলে বুঝতে হবে তাদের ইচ্ছে নেই!’ রাতে খেতে বসে লেরিস শুরু করলো, ‘তুমি তো কমপক্ষে ফোন করতে পারতে।’ ‘কী মুশকিল! আমাকে তুমি কী মনে কর? আমি কি মৃতকে জীবিতাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারব?’ আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি আর কথা লম্বা করতে চাইলাম না। লেরিস বলে চলল, ‘ফোন করে দাও, তাহলে তুমি অন্তত প্রেট্রাসকে বলতে পারবে তুমি চেষ্টা করেছো এবং ওরা তোমাকে জানিয়ে দিয়েছে এটা অসম্ভব।’ কফি শেষ করে লেরিস রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। একটু পরে ফিরে এসে আবার বলল, ‘ছেলেটার বৃদ্ধ বাবা রোডেশিয়া থেকে দাফনে উপস্থিত হবার জন্যে রওনা হয়েছে। তার অনুমতি মিলেছে এবং এখন পথে আছে।’ দুর্ভাগ্যবশত দেখা গেল মৃতদেহ ফিরে পাওয়া একেবারে অসম্ভব কিছু নয়। কর্তৃপক্ষ জানাল ব্যাপারটা আসলে কেউ সচারচর করে না। লাশ কবর থেকে তুলে আনার অনুমতি উপেক্ষা করার মতো নয়, যেহেতু স্বাস্থ্যবিধির সকল কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়েছে। হিসাব করে দেখলাম মোটের উপর খরচ পড়বে কুড়ি পাউন্ড- শেষমেষ তাহলে রক্ষা হল। অবশ্যই মাসিক পাঁচ পাউন্ড বেতনের প্রেট্রাসের কাছে কুড়ি পাউন্ড নেই ঠিক তেমনিভাবে তার এই অর্থ খরচ মৃত ভাইয়ের জন্য কোনো মঙ্গলই আনবে না। আমি নিজেও তাকে অর্থটা দেবার ব্যাপারে আগ্রহী নই। ছেলেটা বেঁচে থাকলে তার ডাক্তার দেখানো এবং ওষুধপত্রের জন্যে শুধু কুড়ি পাউন্ড নয় প্রয়োজনীয় যে কোনো পরিমাণের অর্থ খরচ করতে আমার দ্বিধা ছিল না। আমি আর প্রেট্রাসকে কুড়ি পাউন্ড অযথা খরচ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে কোনো সংগত কারণ দেখি না যেহেতু ছেলেটা মারা গেছে। তার পুরো পরিবারের এক বছরের কাপড়চোপর কিনতেও কুড়ি পাউন্ড খরচ হয় না। রাতে রান্নাঘরে প্রেট্রাসকে খরচের পরিমাণটা জানালে সে আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো, ‘কুড়ি পাউন্ড!’ ‘হ্যাঁ, ঠিক কুড়ি পাউন্ড!’ তার দিকে তাকিয়ে মুহূর্তে আমার যেন মনে হল সে হিসাব করে দেখছে। কিন্তু যখন সে কথা বলল তখন বুঝলাম আসলে হিসাবটা হয়ছে আমার চিন্তায় কারণ সে বলল, ‘আমাদেরকে কুড়ি পাউন্ড দিতে হবে!’ তার কণ্ঠস্বর যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে যেমন কেউ কেউ বলে থাকে যখন কোনো কিছু নাগালের এতো বেশি বাইরে থাকে যে তা নিয়ে ভাববার কোনো কারণ থাকে না। ‘ঠিক আছে প্রেট্রাস,’ বলে আমি শোবার ঘরের দিকে চলে গেলাম। পরদিন সকালে আমি শহরে যাবার আগ্রেই প্রেট্রাস এসে আমার হাতে একটা পোটলা ধরিয়ে দিয়ে আকুতিভরা কণ্ঠে বলল, ‘স্যার...!’ পোটলার ভেতর এক তাড়া নোট। তার দেয়া আনাড়ি ভঙ্গি বলে দেয় তারা- হতভাগার দল- শুধু নিতেই অভ্যস্ত কিন্তু দিতে জানে না। কীভাবে একজন সাদা মানুষের হাতে অর্থ তুলে দিতে হয়। মোট কুড়ি পাউন্ড- কতগুলো পুরো নোট, কিছু আধুলি। নোটগুলোর কিছু আবার ভাঁজ করা যেন ন্যাকড়ায় পরিণত না হওয়া পর্যন্ত চলতেই থাকবে, বাকিগুলো চকচকে নতুন নোট। আমি অনুমান করলাম অবশ্য এই অর্থ প্রেট্রাসের একার নয়’ কিছু আছে ফ্রাঞ্জের, কিছু দিয়েছে আলবার্ট, কিছু বাবুচিং ডোরা, কিছু মালি জ্যাকব- বাকিটা কে দিয়েছে খোদা জানেন, অবশ্যই আশপাশের খামারের অনেকেই দিয়েছে। পাউন্ডগুলো নেবার সময় আমি বিস্মিত হবার চেয়ে বিরক্তই বেশি হলাম- এতো গরীব মানুষের পক্ষে এতোবড় একটা আর্থিক বাজে ব্যয়। এরাও অন্যান্য গরীবদের মতোই মৃত্যুকে মহিমান্বিত করার জন্য জীবনকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করে। আমার এবং লেরিসের কাছে তাদের ব্যাপারটা অসমর্থনযোগ্য যেহেতু আমরা জীবনের জন্যে যে কোনো পরিমাণ অর্থ অকাতরে ব্যয় করতে রাজি। আর মৃত্যু প্রসঙ্গে আমাদের ধারণা- সে সময়ে আমাদের চূড়ান্ত দেউলিয়াত্বেরও কিছু যায় আসে না। খামারের লোকজন শনিবার বিকেলে কাজ করে না বিধায় লাশ দাফনের জন্যে দিনটা সুবিধাজনক। প্রেট্রাস এবং তার বাবা শহর থেকে কফিন আনার জন্য আমাদের গাধায় টানা গাড়িটা নিয়ে গেল। ফিরে এসে প্রেট্রাস লেরিসকে বলল, ওখানে সব কিছুই ঠিকঠাক মতো ছিল; লাশ তুলে কফিনে সিল করা ছিল, না হলে দু’সপ্তাহ আগের লাশ নিয়ে তাদেরকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো। এতোটা সময় লেগেছে কারণ কর্তৃপক্ষ লাশ স্থানান্তরের জন্যে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। সামান্য দূরের কবরস্থানে রওয়ানা হবার আগ পর্যন্ত লাশ প্রেট্রাসের ঘরে পড়ে রইল। কবরস্থানটা আমাদের খামারের পূর্ব দিকের সীমানার পাশে; জায়গাটা বহুদিনের স্মৃতি বিজড়িত- আমাদের খামার শুধুমাত্র কেতাদুরস্ত গ্রামীণ সামন্তে পরিণত হবার আগ পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে একটা খামারই ছিল। তখন থেকেই এই কবরস্থানটা আছে। খামারের বেড়ার পাশে আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম শবযাত্রা এগিয়ে আসছে। লেরিস আবারও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করল; শনিবার বিকেলে সে বাড়িটা আবর্জনাময় করে রেখেছে। বাড়ি ফিরে তাকে ময়লাযুক্ত ট্রাউজার পরতে দেখে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। রাতের পর থেকে আর মাথায় চিরুনি দেয়নি। শোবার ঘরের মেঝে ঘসে ঘসে পরিষ্কার করতে গিয়ে ওদেরকে আসতে দেখে মনে পড়ল। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে ক্রুশ, বৃষ্টিভেজা তামাটে আচারের কৌটা আর মরা ফুলের ওপর জ্বলজ্বলে সূর্যালো ঢেলে পড়ছে। আমি কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম- গলফ বলে আঘাত করবো না কি ওদের যাত্রা চুপচুপ পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবো। গাড়ির চাকা যতোবার ঘোরে ততবার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হয়। থেমে থেমে মন্থর গতিতে গাড়িটা এগুচ্ছে। অবশ্য ওই রকম গতিই গাধা দু’টোর সাথে অদ্ভুতভাবে হলেও মানিয়ে গেছে। তাদের পেটে পেটে ঘষা লাগছে মাথা দণ্ডের নিচে, কান পেছনের দিকে ফেরানো- যেন পিছে পিছে আসা নর-নারীর সাথে তাদের মনোভাব মিশে গেছে। ভারবাহী ধৈর্যশীল গাধা- এ জন্যই তাদেরকে বাইবেলে স্থান দেয়া হয়েছে। আমি ব্যাট নামিয়ে রাখলাম। গাড়ি থেকে কফিন নামানো হয়েছে- চকচকে হলুদ বার্নিশ করা, অনেকটা সস্তা আসবাবপত্রের মতো। গাধা দুটো মাছি তাড়ানোর জন্য কানে ঝাপটা দিচ্ছে। ফ্রাঞ্জ, আলবার্ট, প্রেট্রাস এবং তার বৃদ্ধ বাবা কফিন কাঁধে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে পদযাত্রা শুরু করলো। 1একটা বিব্রতকর মুহূর্তে আমি বোকার মতো চুপচাপ বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। চকচকে কফিন কাঁধে নত মুখে চারজন এবং পেছনে আরো যারা আসছে- শোকাবহ চেহারায় সবাই ধীরে ধীরে আমাকে পার হয়ে চলে গেল। দলের মধ্যে কয়েকজন আমাদের খামারের কর্মী বাকিরা প্রতিবেশীদের খামারে কাজ করে। খামারে অথবা বাড়ির আশপাশে আমার সাথে তাদের টুকটাক কথাবর্তা হয়েছে মাঝে মাঝে- সবাই আমার চেনা। বৃদ্ধ লোকটার সশব্দ শ্বাস আমার কানে আসছে। ব্যাট তোলার জন্য আমি নিচু হয়েছি- তখন ভাবগম্ভীর শোকযাত্রায় একটা বেসুরো আওয়াজ শুনতে পেলাম। বাতাসে হঠাৎ এক হালকা গরম কিংবা শান্ত নদীর মধ্যে হঠাৎ একটা ঠান্ডা স্রোত পা ছুঁয়ে যাবার মতো অনুভূতি হচ্ছে। বৃদ্ধ লোকটা বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। অন্যরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থেমে গেছে- একে অপরের গায়ে পড়ছে; কেউ বলছে এগিয়ে যেতে অন্যরা চুপ করে থেমে থাকতে চাপা কণ্ঠে গুরুত্ব বোঝাচ্ছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লোকজন বিব্রত অবস্থায় পড়ে গেছে, তারা না পারছে বুঝতে, না পরছে লোকটার দৈববাণীর মতো কণ্ঠকে অবজ্ঞা করতে যে পাশটা লোকটার কাঁধে সেটা অনেকটা নিচু হয়ে গেছে, ভারী বস্তুটার চাপ এড়াতে চাচ্ছে না। প্রেট্রাস লোকটাকে মৃদু ভর্ৎসনা করছে। গাধা দুটো দেখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল যে ছেলেটাকে সে ওইদকে দৌড়ে গেল। যদিও কারণ জানি না তবু বুঝলাম যে কারণে সিনেমা হলে কেউ মূর্ছা গেলে তার পারপাশে লোকজন ভীড় করে সেই একই রকম কারণে সেও ওইদিকে যাচ্ছে। বেড়ার কাঁটাতার গলে আমি ওকে অনুসরণ করলাম। প্রেট্রাস তার বিপন্ন, ভীত দৃষ্টি তুলে আমার দিকে তাকাল আর বাবা তার লাশের ভার পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছে বলে অন্য তিনজন আর ধরে রাখতে না পেরে কফিন পথের ওপর নামিয়ে ফেলেছে। হালকা ধুলোর একটি আস্তরণ রোদ লেগে শূন্যে চিকচিক করছে। বৃদ্ধলোকটা কী বলছে তা বুঝতে পারছি না- এতে নাক গলানোও দ্বিধাবোধ করছি। বিক্ষুব্ধ লোকটা আবার নীরবতার দিকে দৃষ্টি ফেরাল। এবং আমার কাছে এসে ওপরের দিকে দু’হাত ঝাঁকিয়ে বৃদ্ধ যা বললো তার কোনো অর্থ না বুঝলেও তার ভাবভঙ্গিতে বুঝলাম কোনো দুঃখজনক অস্বাভাবিক কিছু বলছে। ‘কী ব্যাপার প্রেট্রাস,’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। ওপরের দিকে হাত তুলে মাথা ঝাঁকিয়ে পরে আমার দিকে হঠাৎ তাকিয়ে প্রেট্রাস উত্তর দিল, ‘বাবা বলছে তার ছেলে এত ভারী হতে পারে না!’ সবাই নীরব। লোকটার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। মুখ হা করা এই বয়সী লোকদের যে রকম হয়। ‘আমার ছেলে বয়সে অল্প এবং হালকা-পাতলা ছিল’, সে এবার ইংরেজিতে বললো। আবার নীরবতা নেমে এল। তারপর গুঞ্জন শুরু হলো। বৃদ্ধ সবার প্রতি চিৎকার শুরু করেছে- তার বেশিরভাগ দাঁত পড়ে গেছে বাকি যে কয়টা আছে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। ধূসর বর্ণের বাঁকানো গোঁফ যা আজকাল আর চোখে পড়ে না। বরং প্রাচীনকালের রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে প্রচলন ছিল। তার প্রতিটি কথাকে অকাট্য অর্থবহ করার জন্য জোর দিয়ে বলছে। সমবেত সবাই তার কথায় আহত। তারা ভাবছে লোকটা পাগল হয়ে গেছে; তবু তার কথা শুনতে হচ্ছে। লোকটা নিজ হাতে কফিন খোলার চেষ্টা করতেই ভীড়ের মধ্য থেকে তিনি তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলেন। তখন সে মাটিতে বসে পড়ল- একেতো বৃদ্ধ, তার ওপর দুর্বল- যেন কথা বলতেও অসমর্থ। কফিনের দিকে হাত তুলে অন্যদেরকে বুঝিয়ে দিল মৃতের ওপর তার অধিকার এবং দায়িত্ব তাদেরকে দিয়ে দিচ্ছে।

এতদিন পর এই পর্যায়ে এসে প্রেট্রাস লজ্জাবনত মুখে আমাকে অনুরোধ করলো টাকা ফেরত পাওয়া যায় কিনা দেখতে। পরে লেরিসকে বললাম, ‘ওর কথার ভঙ্গি দেখে মনে হবে যেন ওর মৃত ভাইটিকেও ফাঁকি দিচ্ছে!’ কিন্তু এ কথা বলার পর লেরিস এতো বেশি আবেগাক্রান্ত হয়ে গেল যে, আমার সামান্য উপহাসের অর্থটাই ধরতে পারলো না।

সবাই লাশের চারপাশে ভীড় করে এগিয়ে গেল- আসলে ব্যাপারটা কী, আমি নিজেও দেখার চেষ্টা করলাম। সবাই তখন শোকাবহ ঘটনার কথা ভুলে গিয়ে বিস্ময়াভিভূত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, চোখেমুখে উত্তেজনা, ঘনঘন শ্বাস উঠা-নামা করছে। যে ছেলেটা গাধা দুটো দেখাশোনা করছিল রাগে তার কান্না পাবার মতো অবস্থা- কারণ কফিনের পাশে বড়দের ভীড়ের জন্য তার দৃষ্টি আর এগুতে পারছে না। কফিনের মধ্যে যে আছে তাকে উপস্থিত কেউই দেখেনি। নাদুস-নুদুস চেহারা, কিছুটা হালকা ত্বক, আর কপালে হালকাভাবে কয়েকটা সেলাই দেয়া সম্ভবত ঝগড়া-বিবাদের এক পর্যায়ে কেউ আঘাত করেছিল যার ধীর প্রক্রিয়ায় তার মৃত্যু ঘটেছে। আরো সপ্তাহ দুয়েক কর্তৃপক্ষের সাথে ঝোলাঝুলি করলাম। মনে হল অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তারা অনুতপ্ত, তবে দেখলাম বেনামী লাশের ব্যাপারে তাদের দ্বিধা দূর করার সম্ভাবনা কম। তারা জানালো, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে!’ মনে হলো যে কোনো মুহূর্তে তারা আমাকে শবাগারে ডেকে বলবে, ‘দেখুন অনেকগুলো কালো মানুষের লাশ আছে। এদের মধ্যে কেউ না কেউ আপনার খামারের মজুরের মৃত ভাই।’ প্রতি সন্ধ্যায় প্রেট্রাস রান্নাঘরে আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকতে লাগল। আমি ওকে বলি, ‘প্রেট্রাস, ওরা তোমার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ লেরিসকে একরাতে বললাম, ‘আমার অফিসের অর্ধেক সময় নষ্ট হচ্ছে প্রেট্রাসের ব্যাপারে শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত গাড়ি নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে!’ এ ব্যাপারে পরবর্তিতে যখনই কথা বলি প্রেট্রাস এবং লেরিস একই রকম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তখন দু’জনের চেহারার অবস্থানের কোনো পার্থক্য দেখি না, যদিও এটা অসম্ভব। আমার স্ত্রীর উঁচু ফর্সা ললাট, ইংরেজ মহিলাদের মতো হালকা-পাতলা শরীর, আর প্রেট্রাসের দড়ি দিয়ে বাঁধা খাকী ট্রাউজারের হাঁটুর নিচে একজোড়া শক্ত নগ্ন পা আর শরীরে অস্বস্তিকর ঘামের গন্ধ। লেরিস হঠাৎ বলে ফেললো, ‘ব্যাপারটা নিয়ে তুমি এখন এতা বেপরোয়া হলে কোনো?’ তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘এটা একটা নীতির প্রশ্ন: তারা প্রতারণা করে সরে পড়বে কেন? আসলে এদেরকে এতো সহজে ছেড়ে দেয়া উচিৎ না। কিন্তু ঝামেলা পোহাবে কে?’ লেরিস শুধু উচ্চারণ করলো, ‘...ওহ!’ কথাবার্তা তার আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে প্রেট্রাস বাইরে যাবার জন্য দরজা খুলতেই লেরিসও বেড়িয়ে গেল। প্রতি সন্ধ্যায় আমি প্রেট্রাসকে নিশ্চয়তা দিয়ে যেতে লাগলাম। তথাপি যদিও একই কথা একই সুরে প্রতিদিনই বলতে থাকলাম, দেখলাম আমার কথার কার্যকারিতা ক্রমেই কমে আসছে, শেষে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল না, প্রেট্রাসের ভাইকে আর আমরা ফেরত পাব না। কারণ, তার হদিস কেউ জানে না- কোথাও কোনো কবরস্থানে গৃহায়ণ পরিকল্পনার মতো, কোথাও হয়তো তার সংখ্যায় মিলে না অথবা কোনো মেডিক্যাল স্কুলে পেশী আর স্নায়ুর চাপে পড়ে আছে, খোদা জানেন! এই পৃথিবীতে আর তার কোনো পরিচিতি নেই। এতদিন পর এই পর্যায়ে এসে প্রেট্রাস লজ্জাবনত মুখে আমাকে অনুরোধ করলো টাকা ফেরত পাওয়া যায় কিনা দেখতে। পরে লেরিসকে বললাম, ‘ওর কথার ভঙ্গি দেখে মনে হবে যেন ওর মৃত ভাইটিকেও ফাঁকি দিচ্ছে!’ কিন্তু এ কথা বলার পর লেরিস এতো বেশি আবেগাক্রান্ত হয়ে গেল যে, আমার সামান্য উপহাসের অর্থটাই ধরতে পারলো না। আমি চেষ্টা করলাম। লেরিসও চুপ থাকলো না, আমরা দু’জনেই টেলিফোনে এবং লিখিতভাবে যুক্তি দেখালাম যাতে টাকাটা ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শেষমেষ দেখা গেল হতভাগা গরীব মানুষগুলোর এতো কষ্টের অর্জন পুরোপুরি বাজে ব্যয় হয়েছে। লেরিস বৃদ্ধ লোকটাকে তার বাবার কয়েকটা পুরনো জামাকাপড় দিয়ে দিল। লোকটা যে রকম কাঙাল অবস্থায় এসেছিল তার চেয়ে ভালো অবস্থায় রোডেশিয়া ফিরে গেল- বেশ তো একপ্রস্ত গরম কাপড়- বাইরে যখন এমন প্রচণ্ড শীত! অলঙ্করণ : সঞ্জয় দে রিপন

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।