রাত ১০:২০ ; রবিবার ;  ২০ অক্টোবর, ২০১৯  

মুক্তি কখনোই সৃজনশীলতাকে সীমাবদ্ধ করে না : নাডিন গর্ডিমার

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

[নাডিন গর্ডিমার। যিনি সিমাস হিনির কল্পনার গেরিলা, ম্যান্ডেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মহতী এই মানুষটি এসেছিলেন কলকাতায়, একদিনের জন্যে, ICCR-এর আমন্ত্রণে। নোবেল লেকচার সিরিজে বক্তৃতা দিতে। নাডিনের কথায় উঠে আসে লেখালেখি, বিশ্বসাহিত্য, রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক ভাবনা-চিন্তার কথা। বাংলাদেশ, ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়া ও তার স্বদেশ দক্ষিণ আফ্রিকা সম্পর্কেও তিনি তাঁর ভাবনা ও উৎকণ্ঠার কথা ব্যক্ত করেন। তখন তাঁর সঙ্গে কথা বলেন কবি রুবানা আহমেদ।] জোহানেসবার্গ থেকে ৫০ কিলোমিটার পূর্বে স্পিংস নামক একটি ছোট্ট শহরে জন্ম আমার, ১৯২৩ সালে। অনেকেই জানতে চান আত্মজীবনী লিখিনি কেন। সত্যি বলতে কী, কোনো আত্মজীবনী লেখার পরিকল্পনা নেই আমার। গ্রাহাম গ্রিনের মতো আমি বিশ্বাস করি, লেখক হচ্ছেন বহুজীবনের বহু সাধের বহু সত্তার কল্পনার সংমিশ্রণ। ট্রেনে বা ট্রামে, স্থলে কিংবা জলে লেখকের চোখে দেখা, কানে শোনা বহু বাক্সবন্দি স্মৃতির মালা গাঁথাই যেন লেখকের একমাত্র কাজ। এলোমেলোভাবে বলছি, ১৯৯৩ সালে The Lying Days-এ প্রায় নিজের কথা বলার চেষ্টা করেছি। ১৯৫৮ সালের Word of strangers আর ১৯৬৩ সালে Occasion for loving-এর সাদা-কালোর নিষিদ্ধ প্রেম ছাড়াও ১৯৬৬ সালে The Late Burger’s Daughter ও Bourgeois world-এর দাসানুদাসদের কথকতা, ১৯৮৯ সালের সোয়েতোর আন্দোলনের পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছি, ১৯৯৮ সালের The House Gun-এ কাঠগড়ার গল্প শিরোনামে, সর্বশেষ ২০০১ সালে The Pickup লেখার মধ্য দিয়ে যে জগতের উন্মোচন করেছি সর্বোপরি বলা চলে এটাই আমার আপন ভুবন। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেক্ষাপট দুটির মিল অমিল খুঁজে চলেছি একজীবন। ভারতের মহেঞ্জদারো-হরপ্পা সভ্যতা আর যদি দক্ষিণ আফ্রিকার একটু বাইরে অন্যদিকে মুখ ঘুরাই, তাহলে দেখতে পাবো নীলনদকেন্দ্রিক যে মিশরীয় সভ্যতার পূর্বাপর কাল যা দক্ষিণ আফ্রিকার জনমনেও প্রভাব ফেলেছে। আমি যখন আমার ত্রিশের কোঠায় রাজনীতি শুরু করি, তখন দুই শ্রেণীর লোক দেখতাম। এক দল হাড়ভাঙা খাটুনির শিকার শ্রমিক পক্ষ, আর অন্যটি ভারতীয় যাত্রী, যারা দক্ষিণ আফ্রিকায় পরে বণিক সম্প্রদায়ের জন্মদান করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় সৌভাগ্যবশত সেই সময় মহাত্মা গান্ধীর আগমন ঘটে। এই মহাত্মার আগমন যদিও ভারতীয়দের অধিকার সংরক্ষণের জন্য হয়ে থাকলেও পরে African National Congress-এর সনদে যা সবচেয়ে প্রাধান্য পায় তা হলো গান্ধীর Passive Resistance মহাত্মা গান্ধীর এমন রাজনৈতিক দর্শন আমাদের বিমোহিত করেছিল। আমরা এমন একজনের নেতৃত্বের কথাই কল্পনা করতাম, এমন একজন মহান নেতার আদর্শের পথকেই সঠিক পথ হিসেবে বিবেচনা বা আমলে নেয়ার জন্য নিয়ত সংগ্রাম করেছি। মহাত্মা গান্ধীর চিন্তা ঔপনিবেশিক শোষিত মানুষের আপনার চিন্তা, যে চিন্তার ফসল আধুনিক ভারত কিংবা অনেকক্ষেত্রেই বলা চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধউত্তর নতুন নতুন দেশের জন্ম। লেখক এবার অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক, বিশেষ করে যেহেতু আমি প্রকৃতই শিল্প-সাহিত্যের মানুষ, তাই উপমহাদেশের যে ক’জন লেখকের লেখা পড়েছি, তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাকে বিশেষভাবে প্রাণিত করেছেন। সাধক কী আর সাধনা কেমন করে করতে হয়, সেই সম্পর্কে প্রভাবিত করেছেন। এছাড়া সালমান রুশদীকে খুব শক্তিমান লেখক মনে হয়। আর. কে নারায়ণ, অরবিন্দ আদিগারও পড়েছি। আর বাংলাদেশ কিংবা অপরাপর সাউথ এশিয়ার দেশের লেখকদের ইংরেজি অনুবাদ অপ্রতুল, ফলে একদম অন্ধকারেই আছি এই সকল দেশের মহান লেখকদের লেখা সম্পর্কে। এখানে মূলত রাষ্ট্র ও প্রকাশকদের দায়ী করা চলে। সাহিত্যের অর্থনীতিও অনেকটা দায়ী। তবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভি.এস নাইপল রাজনৈতিকভাবেই অনেকটা বিভ্রান্ত, সেটা তার লেখায়ও প্রভাব ফেলেছে বলে আমি মনে করি। তবে Mistaken Identity-র লেখক নয়নতারা সেহগাল আমার ভীষণ পছন্দের, ওর লেখায় সময় এবং কালচেতনা স্পষ্ট, যা যুগোপযোগী তো বটেই, বলা চলে নয়নতারা সেহগাল তার লেখায় তুলে ধরতে পেরেছেন আমরা যে ভয়ঙ্কর সময়ের শিকার তার প্রতিচ্ছবি। এই সময় কাউকে রেহাই দেয় না, কাউকে স্বস্তি দেয় না। পথে-ঘাটে, এয়ারপোর্টে, বাস-টার্মিনালে, ট্রেন-স্টেশনে সব জায়গায় শুধুই সন্দেহ তাক করে ফিরছে আমাদের। রাজনৈতিক কোন্দল, কোলাহল, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ্য এ সবই যেন আমাদের নিত্যকার সঙ্গী হয়ে গেছে- যা সেহগালের লেখায় সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুটা দেখিনি বটে, তবে জারের পতন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নতুন নতুন স্বাধীন দেশের জন্ম দেখেছি। সেই দেখা ও উপলব্ধি থেকে বলতে পারি, আজীবন যে দুইজনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবো, তাঁদের একজন মহতী মহাত্মা গান্ধী, অন্যজন নেলসন ম্যান্ডেলা। Art rests with the oppressed বহুল ব্যবহৃত উদ্ধৃতি, আর উদ্ধৃতির ফলে অনেকেই প্রশ্ন করেন যুক্তি কি সৃজনশীলতাকে হনন করে? আমি চিৎকার দিয়ে বলতে চাই Nonsense Question কখনোই না। দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে আমাকে বহুজন জিজ্ঞেস করেছেন, এরপরে কী? এরপর কী নিয়ে লিখবেন? আমি উত্তরে বলেছি, একজন লেখকের হৃদয় শুধু Propaganda খোঁজে না; উত্তেজনা, যুদ্ধ, হানাহানির বাইরেও লেখকের চোখ সর্বাঙ্গীন অস্তিত্বকে অনুসরণ করে। কাজেই মুক্তি কখনই সৃজনশীলতাকে সীমাবদ্ধ করে না।

এবার অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক, বিশেষ করে যেহেতু আমি প্রকৃতই শিল্প-সাহিত্যের মানুষ, তাই উপমহাদেশের যে ক’জন লেখকের লেখা পড়েছি, তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাকে বিশেষভাবে প্রাণিত করেছেন। সাধক কী আর সাধনা কেমন করে করতে হয়, সেই সম্পর্কে প্রভাবিত করেছেন। এছাড়া সালমান রুশদীকে খুব শক্তিমান লেখক মনে হয়। আর. কে নারায়ণ, অরবিন্দ আদিগারও পড়েছি। আর বাংলাদেশ কিংবা অপরাপর সাউথ এশিয়ার দেশের লেখকদের ইংরেজি অনুবাদ অপ্রতুল, ফলে একদম অন্ধকারেই আছি এই সকল দেশের মহান লেখকদের লেখা সম্পর্কে। এখানে মূলত রাষ্ট্র ও প্রকাশকদের দায়ী করা চলে। সাহিত্যের অর্থনীতিও অনেকটা দায়ী

সত্যি কথা বলতে কী ১৫ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় Forum পত্রিকায় প্রকাশিত সেই গল্প থেকে সত্তরের দশকে বুকার পুরস্কারের পর কিংবা ১৯৯১ সালে নোবেল প্রাপ্তির পরেও আমার নিজের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় আমার লেখা পড়তে দেয়া হতো না। আমার দেশের ১১টি প্রচলিত ভাষার মধ্যে একটি ইংরেজি এবং এই ইংরেজি ভাষায় লেখা আমার গল্পগুলো নিষিদ্ধ হলেও এরচেয়ে আকারে আরও সংকীর্ণ বহু ঘটনা আমার দেশে ঘটে চলছিল নিয়ত। মনে পড়ে এইচআইভি পজিটিভ অর্থাৎ এইডস-এ আক্রান্ত দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক জর্জ এডওয়ার্ড ক্যামেরনের সাহসিকতার কথা। ১২ বছর এই দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং সাধারণ নিষ্পাপ মানুষদের এই ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য গঠন করেছেন Treatment Active Campaign- যার সঙ্গে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। আমরা ২০০৪ সালে Telling tales নামে বহু লেখকের গল্প নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলাম এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার খরচ যোগানোর জন্য। কলকাতায় আগমনের পূর্বে মুম্বাইয়ের এশিয়াটিক সোসাইটিতে ৮৫ বছরের বৃদ্ধার গল্প বলিনি। বলেছি ১০ বছর বয়সের মোজাম্বিকের একটি মেয়ের কথা। যে মেয়েটিকে Kruger Park-এর জন্তু-জানোয়ার পেরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা পৌঁছোতে হয়েছিল; যে Kruger Park-এর জন্তুরা ছিল মুক্ত আর মেয়েটি ছিল ক্ষুধার্ত। আশির দশকের অশান্ত মোজাম্বিক থেকে বহু শরণার্থী দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমায়। London BBC’র সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎকার নিতে গেলে আমার হঠাৎ London Observer-এ প্রকাশিত দক্ষিণ আফ্রিকা বিষয়ক An Ultimate Safari শিরোনামের বিজ্ঞাপনটি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। তখনই Kruger Park টিকে নিয়ে An Ultimate Safari গল্পটি লিখে ফেলি। আগামী দিনের স্বপ্নের গণতন্ত্র- সে তোমার দেশ বাংলাদেশ কিংবা আমার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় Jacob Zumar’র মতো ব্যক্তিত্ব যতদিন ‘আমাকে মেশিনগান দাও’ বলে নাগরিকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবে, ততদিন গণতন্ত্রের তরী অনিশ্চয়তার সঙ্গে দুলতেই থাকবে। আর ততদিনই ভয়াবহ অবস্থা পেরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় স্বপ্নতরী ভেড়ানোর যে কারো পক্ষেই দুষ্কর হবে। [caption id="attachment_30382" align="aligncenter" width="500"]সালমান রুশদী, নাডিন গর্ডিমার ও গুন্টার গ্রাস সালমান রুশদী, নাডিন গর্ডিমার ও গুন্টার গ্রাস[/caption] দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষকে সুনিশ্চিত নোঙরের অপেক্ষায় আর কত কত সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে? এর উত্তরে বলতে পারি, পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিন যেদিন দেয়াল ভেঙে দিয়েছিল, সেদিন চারদিকে শুধু শ্যামপেইনের ছড়াছড়ি। কিন্তু এর পরের দিন সকালে দু’পাশের নাগরিকরা নতুন যন্ত্রণা নিয়ে নতুন সকাল শুরু করেছিল। একেই বলা চলে The headache of the morning after. গণতন্ত্রের পথে এখনও শৈশব অবস্থা, বহুপথ পাড়ি দিতে হবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তোমাদের অবস্থাও তেমনি; অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের একই অবস্থা। আমি মূলত লেখক, তাই নতুন লেখকদের জন্য মূলমন্ত্র হচ্ছে- পড়, পড়, পড়। শুধু নিজের ভাষায়ই নয়, নিজের ভূখণ্ডে নয়, সম্ভাব্য গোটা পৃথিবীর সব লেখকদেরকে পড়। টেলিভিশন প্রজন্মের দায়ভার আমাদের। কাজেই আগামীতে পড়ুয়া তৈরি করার দায়িত্বও আমাদের ওপর বর্তাচ্ছে। আমার লেখা Loot কাহিনীর রেশ ধরে বললে কল্পকাহিনী নয়, সত্যি অনুভূতির কথা বলতে হয়। দক্ষিণ এশিয়া আর দক্ষিণ আফ্রিকার সমুদ্রতরঙ্গ যদি মিনিট খানিকের জন্য দুই ধারে নিঃশ্বাস চেপে দাঁড়ায়, তাহলে সমুদ্র গহ্বরে দেখতে পাব, দুই ভূখণ্ডের প্রত্যাখ্যাত সব উপকরণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভাণ্ড থেকে শুরু করে পুরনো টিভি, ফ্রিজ, মাটি হয়ে যাওয়া মুদ্রা, এক সময়ে ফেলে দেয়া সবগুলো জিনিসকে কুড়িয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে মানুষ। কিংবা শোধ হিসেবে আন্দোলন করছে শোষকদের বিরুদ্ধে, ফেরত চাচ্ছে তাদের পুরনো ঐতিহ্য। Loot গল্পে যখন মানুষগুলো ফেলা জিনিস কুড়াতে ব্যস্ত, দু’পাশ থেকে স্রোত এসে ডুবিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয় গোটা শহরকে। কী আশ্চর্য স্বপ্ন, তাই না! ভবিতব্যের স্বপ্নচারী মানুষ আমরা তাই, Beethoven was 1/16th black-২০০৭ লেখা গল্পের বিষয় টেনে বলতে চাই- Once there were black wanting to be white. Now there are white wanting to be black. It’s the same secret.

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।