রাত ০৯:৫৯ ; শুক্রবার ;  ১৮ অক্টোবর, ২০১৯  

কুমার চক্রবর্তীর ফার্ন আর ফণীমনসায় ভরে যাওয়া জীবন

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

জাহিদ সোহাগ || ‘তবে এসো হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ’ এটি এমন একটি কাব্যগ্রন্থ যাতে কবির নানাবিধ অনুভূতির বিস্তার গ্রথিত হয়েছে বা হতে হয়েছে একটি কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে, যে কেন্দ্রের নাম শূন্যতা। কাঠামোর দিক থেকে এই কবিতা শুরু ও শেষহীন; শূন্যতা দিয়ে শুরু করে এসে পাঠক শূন্যতায় এতে দাঁড়াবেন; তাকে হয়ত বিভ্রান্ত হতে হবে; মাঝখানের সময়টুকু চৈতন্যের কনসেনট্রেনশন ক্যাম্প। কুমার চক্রবর্তীর এই কবিতা সম্পর্কে এ কথা আগেই বলে রাখি এ কারণে যে, তার কবিতায় পাঠক কিছুই পাবেন না, যদি তিনি প্রথাগত গবেষকদের মতো লোক-ঐতিহ্য, স্বাদেশিকতা, সংগ্রামী মানুষ বা কাজল-ভাঙা লোকায়ত নারী খুঁজতে যান। এর ভাষা বাংলা হয়েছে শুধু মাধ্যমের প্রয়োজনে। তাহলে কী আছে তার কবিতায়? কবি নিজেই ভূমিকায় লিখেছেন, ‘লিখতে গিয়ে আমার কাছে দীর্ঘ কবিতা খুলে দিয়েছে এক আচ্ছন্নতার আর্কেডিয়া, আমি তাতে জন্মহীন মৃত্যুহীন হয়ে বসবাস করি। আর এই কবিতা এক আচ্ছন্নতার আযুর্বেদ যা আমাকে বিদিত করে- জীবনের হারানোর কিছু নেই, পাওয়ারও কিছু নেই।’ জীবনানন্দ লাশকাটা ঘরে চিৎ হয়ে শুয়েছিলেন এই নৈরাশ্যের শেষে বা জীবনের সমাপ্তির প্রয়োজনে কিন্তু কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘যেন সময়ের রাজা আপন খেয়ালে বাতাসে ওড়ায় শূন্য বুদ্বুদ/জীবন তো সেই সকালে পান করে বসে আছে হলুদ পাতার হেমলক।’ অর্থহীনতার পকেটে আমাদের যে জীবন- ইন্দ্রিয়ের তারে বাধা যে সুর, তাকে বাজাতে বাজাতে আমরা কোথায় চলে যাই- তাকে ফেরাবে পাকা ধানের ঘ্রাণ? কামনার অসহ্য রঙিন? তবু মানুষের জীবন নয় শূন্যের দিকে ঈষৎ ঝুঁকে থাকা- এ কথা লিখে ফেললে হাতের কাছে ইরেজার সজাগ হয়ে ওঠে। তখন কবিকে আবিষ্কার করি- ‘তামাক খেতের মাঝ দিয়ে হাঁটছি এখন/দহনের কালে মৃদু হাওয়া গালমন্দ দেয়/নাম ধরে হাঁকডাক করে চিদানন্দ চিদানন্দ বলে/উত্তরে-দক্ষিণে একনাগাড়ে তামাকের বন, রূপময় গন্ধদশা,/মৃদুল বাতাসে তারা আন্দোলিত, পাতারাশি আটকে রেখেছে এই/ জন্মপূর্ব নেশার সুবাস।’ জন্মপূর্ব নেশার সুবাসে এসে কবি এক স্মৃতিহীন জগতের কথা বলেন; তাকে তার তামাকের ঘ্রাণের মতোই মনে হয়। সেই তরল লালান্ধকারে যে প্রাণ মাতৃবাহনে জগতের সঙ্গে সংযুক্ত হতে চায়, তাকে তিনি আবিষ্কার করেন, রেললাইনের অন্তহীন পথে। যেখানে আছে হারানোর ব্যথা। বাংলা কবিতায় দীর্ঘকবিতার চর্চা খুব বেশি নেই। এখানে কাহিনিকাব্যের যুগ সামন্তীয় প্রতিভার মতো জাগ্রত। পাত্র-পাত্রীর মধ্য দিয়ে কবি নিজেকে শূন্য করে তোলেন। কিন্তু টি. এস এলিয়ট তার ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’এর মাধ্যমে আধুনিক কবিদের সামনে খুলে দিয়েছেন অনুভূতির সন্ধ্যাসূর্যরশ্মিমাখা জলতরঙ্গ; তাই দীর্ঘ কবিতা প্রচুর উল্লম্ফন নিয়ে কবি নিজের চৈতন্যকে ছিঁড়েখুঁড়ে বলেন, ‘হে নোঙর-বাঁধা জাহাজ/পথরেখা ফেরি করে কে আর মুক্ত হতে চায়/কে আর নক্ষত্রের দেশে উড়ে যেতে চায় ডানাহীন,/বালিয়াড়ির শেষ ছবি তুলে তুমি আজ সমুদ্রেই ফিরে যাও...।’ এই কবিতায় মৃত্যু নানা প্রতীকে এসেছে; সামনে শুধু খোলা ওই একটি পথই কিন্তু তাকে গ্রহণ বা প্রত্যাখানের কোনো ইচ্ছা কবির নেই। তিনি দেখতে থাকেন, ‘...শিকড়চ্যুত গাছেরা কেমন হাওয়ায় ভাসে/আর নীরবত গুনে গুনে সংখ্যা বাড়ায় নৈঃশব্দ্যের।’ এ কারণে তিনি ট্রাজেডির নায়কও নন। ওডেসিয়াস সমুদ্রঝঞ্ঝা থেকে জেগে উঠতে চেয়েছেন; তার স্বপ্নের ভেতর জাগ্রত ছিলো একটুকরো প্রেমময় ইথাকা। কিন্তু কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাকে ভেবো না ডুবুডুবু/আমার তো রয়েছে নির্লিপ্তির আয়ুর্বেদ/এখানে এই মৃদুল হাওয়ায় গর্ভ থেকে উঠে আসা বুদ্বুদগুলো/মহিমান্বিত করে তোলে আকাশ/আর কোরালেরা শেষ পর্যন্ত সময়কেই গিলে খায়।’ এখন আমরা ব্যবচ্ছেদ করতে চাই এই সময়কে, যে সময় সীমাহীন ধর্ষণেও হাসে কুমিরের হাসি। পুঁজিবাদ, উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা আর ক্রমক্ষয়িষ্ণু ব্যক্তিবোধ তাকে তুলে ধরেছে শূন্যে; তাই তার সামনে আর কোনো স্বপ্ন নেই। এই কবির কোনো ভূগোল নেই, নেই শ্লোগানে ক্ষত নিদানের আকাঙ্ক্ষাও। আছে শুধু বিপর্যস্ত অনুভূতি। ফার্ন আর ফণীমনসায় ভরে যাওয়া জীবন। নিশ্চয়ই আপনিও এখানে এসে বিভ্রান্ত হবেন। তবে এসো হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ। কুমার চক্রবর্তী। প্রকাশক: শুদ্ধস্বর। প্রকাশকাল: ২০১৪। প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা। মূল্য: ৯০ টাকা।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।