রাত ১০:১৭ ; রবিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৮  

জীবন পাতার একটি খবর

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

আফসানা বেগম || লাশটা রাখা ছিল লম্বা করিডোরের শেষ মাথায়, উঁচু একটা স্ট্রেচারের উপরে। থুতনি পর্যন্ত হালকা নীল চাদরে ঢাকা, চুলগুলো কপালের সাথে লেপ্টে আছে, ঠোঁটদুটো ঠিক মিলে যায়নি, সামান্য ফাঁক থাকায় দাঁত দেখা যাচ্ছে। কব্জি থেকে একটা হাত স্ট্রেচারের সীমানার বাইরে, ছাইরঙা নেইলপলিশ, খুব কাছে দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে ছুঁয়ে দিতে পারে। একজন প্রায় ধাক্কাই দিয়ে গেল একটু আগে। নিচের চারটি চাকা একযোগে ইঞ্চিখানেক এদিকওদিক ঘোরাঘুরি করে থেমে গেল। হাসপাতালের করিডোরগুলোতে সবার যেন কীসের তাড়া, একজন এদিকে ছুটছে তো আরেকজন ওদিকে, সরু করিডোরে কোনোরকমে ধাক্কা বাঁচিয়ে পাশ কাটিয়ে নিচ্ছে, যেন কোনো বিষ্ফোরণের কারণে ইলেকট্রনগুলো এদিক সেদিক ছুটছে ক্রমাগত। ধাক্কায় স্ট্রেচারের চাকা নড়তেই চোখ গেল মেঝের দিকে, দেয়ালের কোণে এক জোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল আর বহু ট্যাপ খাওয়া অ্যালুমিনিয়ামের মগ, সাদা স্যান্ডেলে পাঁচ আঙুলের নীলচে ছাপ স্পষ্ট, একটির ফিতা ছেঁড়া। কেনো কারণ ছাড়া সেদিকে তাকিয়ে ছিল রবিন। দৃষ্টি শূন্য, মাথাও। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না ব্যাপারটা কী হয়েছে। বিভ্রান্ত একটা অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকলে যা হয়, চিন্তাশক্তি অকেজো। রবিন বারবার আঙুল চিরুনির মতো করে কপালের চুলগুলোকে পেছনে পাঠাচ্ছিল, দাঁত দিয়ে নখের পাশ থেকে ওঠা সুতার মতো চামড়া কাটার চেষ্টা করছিল। যে পর্যন্ত ভেবেছিল সেখানে বসে, সেখানে স্থগিত করে আবার নতুন করে ভাবা শুরু করল, একেবারে প্রথম থেকে, স্টেপ বাই স্টেপ। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল গত রাতে। রাত ন’টার দিকে শিলা আপু ফোন করল, অস্থির গলায় বলল, ‘রবিন, কাল একবার আসতে পারবি রে? খুব জরুরি কথা আছে।’ গলা শুনেই রবিন বুঝেছিল, ব্যাপারটা সাংঘাতিক কিছু। মানা না করে এক কথায়ই রাজি হয়ে গেল। তারপর আজ ক্লাস শুরুর আগে একবার, পরে আরেকবার ফোন করেও শিলা আপুকে ফোনে পাওয়া গেল না। রিং বেজেই যাচ্ছে, সে ফোন ধরছে না। তাই রবিন আর চেষ্টা না করে ক্লাস শেষে সরাসরি চলে গেল তার বাসায়। বাসায় গিয়ে দেখা গেল অন্য সব সাধারণ দিনের মতোই দারোয়ান গেটে দাঁড়িয়ে আছে, ভেতরে লনের ঘাসে একজন পানি দিচ্ছে, শীত পড়ে যাবার পরেও ম্লান হয়নি ঘাসগুলো, তরতাজা আগের মতোই। রবিন সোজা ভেতরে চলে গিয়েছিল। নিচতলায় কেউ ছিল না, রান্নাঘর পর্যন্ত খুঁজে এসেছিল সে। ‘শিলা আপু’ বলে চিৎকার দিয়ে ডেকেওছিল কয়েকবার। তারপর কিছুক্ষণ লিভিং রুমে বসে থেকে শিলার ফোনে ফোন দিয়েছে, আগের মতোই বেজে বেজে হয়রান হয়েছে ফোন। ‘সুখহীন নিশিদিন পরাধীন হয়ে ভ্রমিছ দীনপ্রাণ...,’ শিলা আপুর ডায়াল টিউন শুনে শুনে কঠিন সে গানও প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছে। তারপর ফেসবুক খুলে দেখেছে শিলা আপু অফলাইন। কোনোভাবেই বুঝতে পারছিল না সে বাসায় নাকি বাইরে। অনেকক্ষণ বসে থাকার পরে রবিন উপরতলায় গেছে ধীরে ধীরে। ওই বাড়ি তার জন্য যতই অবারিতদ্বার হোক, পাড়ার সম্পর্কের শিলা আপুর বরের বাড়ির বেডরুমে হুট করে কিছুতেই ঢুকে পড়া যায় না। কিন্তু চলে আসবে নাকি বসেই থাকবে সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সেটা ছিল শেষ চেষ্টা। উপরতলায়ও কোথাও কেউ ছিল না। নিস্তব্ধ ফ্যামিলি লিভিং এরিয়ায় রবিন নিজের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল কেবল। ওপরে না এলেও আগে যতবার এসেছে টিভি চলার আওয়াজ পেয়েছে নিচের লিভিং রুম থেকে। ওখানকার টিভি হয়তো সবসময়ই অন থাকে, কোনো নিউজ চ্যানেল বা ডিসকভারি চ্যানেলের একঘেয়ে বর্ণনা মতো মৃদু লয়ে কিছু চলতে থাকে বরাবর। শিলা আপুর এই অভ্যাসটা ছিল, বিয়ের আগে নিজেদের বাড়িতেও, যাই করুক না কেন টিভি চলতে থাকবে, বলতো,‘নিউজ চলতে থাকুক, দেখলে দেখবি না দেখলে না, কিন্তু আপডেট থাকবি, বুঝলি?’ রবিনের অবশ্য সেটা করা হয়নি। টিভি দেখা মানে তার কাছে টিভি দেখা, তখন অন্য কিছু করা যায় না। একটা ঘণ্টা দুয়েকের সিনেমার সাথে বড়জোর চিপস বা পপকর্ন চিবিয়ে যাওয়া যায়, এর বেশি কিছু নয়। ফোন এলেও সিনেমার ডায়ালগ মিস হয়ে যায়, রাগ হয় তখন রবিনের। তবে শিলা আপু শুধু টিভির নিউজ দেখেও শান্তি পেত না, অন্তত তিনটা পেপার প্রথম কলাম থেকে শেষ অব্দি পড়তে হতো তাকে। অন্যদিন নিচে বসে থাকলেও দু’এক জনকে এটা ওটা মোছার কাজ করতে দেখা যায়, রান্নাঘর থেকে কেউ এসে জানতে চায় আজ গরুর মাংস হবে নাকি মুরগী। যেহেতু তাদেরও কাউকে দেখা যায়নি তখন দিনটা অবশ্যই অস্বাভাবিক ছিল। রবিনের বোঝা উচিৎ ছিল, ওভাবে উপরে উঠে যাওয়া কি ঠিক হয়েছে? আবার না উঠলে কী হতো...আরও কতক্ষণ ওভাবে শিলা আপু...হঠাৎ বাচ্চাদের মতো কান্না পায় রবিনের, আবার ঠিক কান্নাও নয়, একটা অসহ্য যন্ত্রণা, একটা চাপ। সারাদিন খবরের সাথে থাকা শিলা আপু একবার উধাও হয়ে গিয়েছিল, রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে পড়াতে চলে গেল পাশ করার পরপরই। তারপর বিকেলগুলো পদ্মার তীরে বসে বসে নিজেকে আবিষ্কার করল, একদিন ফোনে বলল, ‘মানুষের একা হওয়া খুব দরকার, বুঝলি? কারণ চারদিকে কেউ নেই- এমন সময়ই কিন্তু একাকিত্ব নয়, বরং একাকিত্ব হচ্ছে এমন একটা সময় যখন মানুষ নিজের সাথে কথা বলার সুযোগ পায়, আর সব শব্দ থেমে গেলে তখন কেবল নিজের আত্মার কথা শুনতে পাওয়া যায়।’ ‘তুমি শুনতে পাও?’ ‘পাচ্ছি তো!’ ‘কী বলে তোমার আত্মা?’ ‘বলে, জীবন সুন্দর। সুন্দর এই বেঁচে থাকা।’ ‘তাহলে তুমি বেঁচে থাকার মানে পেয়ে গেছ!’ ‘পাই, আবার হারাই। প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে না পেতেই দেখি জীবনের গতি বদলে যায়, তৈরি হয় নতুন প্রশ্ন, আবার খুঁজি নতুন উত্তর। তবে তোকে নিশ্চিত হতে হবে কী করতে চাস। আর আমরা যা যা করতে চাই তার জন্য বাঁচতে হবে, কাজ করতে হবে, বুঝলি রে, পাগলা?’ আবার বুকের ওপরে চাপ লাগে রবিনের। শিলা আপু আদর করে পাগলা, পাজী, কত কী বলত। সে বাঁচতে চাইত, কাজ করতে চাইত, সে কিছুতেই এভাবে...! বন্ধ টিভির ঘোলা স্ক্রিনের টিভির সামনে আবার ফিরে যায় রবিনের ভাবনা। সেখানে গিয়েও সে ‘শিলা আপু’ বলে ডেকেছিল বারকয়েক। তবে অত জোরে নয়, বেডরুমের পাশে দাঁড়িয়ে গলাটা চাইলেও কেন যেন বাড়ছিল না। হয়তো জড়তার কারণেই মাঝখানের ভারী বৃত্তাকার কার্পেটের ধারে জুতো লেগে একটা হোচট খেয়েছিল। নিজেকে সামলে ভেজানো দরজার রুমটির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল, তারপর সামান্য ঠেলাতেই দরজার সোজাসুজি শিলা আপুকে মেঝের উপরে পড়ে থাকতে দেখেছে। তখন আর আড়ষ্ট লাগেনি, ওরকম দেখলে একটা মানুষ যা করে রবিনও তাই করেছে। ছুটে গিয়ে শিলা আপুর শরীরের উপরে ঝুঁকে দেখেছে, তার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে ডেকেছে, হাতটা বেশ ঠান্ডা ছিল কি... এখন কেন যেন মনে পড়ে না। এটুকু মনে আছে যে একবারও মনে হয়নি শরীরটা জীবন্ত নয়, চট করে হাতে তুলে ছুটে বাইরে বেরিয়েছেল সে, প্রথমেই মনে হয়েছে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। শিলা আপু বরাবর ছিপছিপে, স্বাস্থ্য সচেতন, আর তখন উত্তেজনায় হাতের উপরে তার শরীরটা মনে হচ্ছিল পলকা, এর চেয়ে অনেক বেশি ভার রবিন অনায়াসে বয়ে নিতে পারে। বাইরের দরজার পাশে ড্রাইভার তাকে ওভাবে দেখেই গাড়ির দরজা খুলে দিয়েছিল, গাড়ি পাঁচিল পেরিয়ে বেরোনোর পরে ধাতস্ত হয়ে জানতে চাইল, ‘হায় আল্লা, কী হইছে? কই যাব?’ রবিন কাছের একটা ক্লিনিকে যেতে বলল। ইমারজেন্সি ইউনিটে শিলা আপুকে দেখেই বলে দিলো, ‘মারা তো গেছে মনে হয় অনেকক্ষণ, বসেন, পুলিশ কেস হবে, লাশ ঢাকা মেডিকেলে যাবে।’ মানুষ কারও মৃত্যুর খবর এরকম স্বাভাবিকভাবে বলতে পারে? তা-ও আবার শিলা আপুর। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না রবিন, ‘বসেন এইখানে, আত্মীয়-স্বজনরে খবর দেন, ঘটনা কী দেখা যাক।’ ওই নার্স আর ডিউটি ডাক্তার রবিনকে ‘কেমন আছেন, বাড়ির সবাই ভালো?’ জানতে চাইলেও একই সুরে জানতে চাইবে, রবিন নিশ্চিত; অথচ কারও কোনো আগ্রহ নেই বোঝার কী হয়েছিল মেয়েটার। যে শিলা আপুুকে সে বয়ে এনেছে, সে যে কেবলই লাশ, এর বেশি আর কিছুই জানা হলো না রবিনের। ওখানে জীবিত মানুষদের চিকিৎসা হয়, লাশের ব্যাপারে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। কেবল দুজন নার্স নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিল, ‘আত্মহত্যাই তো মনে হয়, কী বলো?’ আরেকজন বলল, ‘না-ও হতে পারে, চিহ্ন না রেখেও তো মেরে ফেলা যায় কতভাবে। বাদ দাও, ওসব অটোপ্সি ডিপার্টমেন্টের ব্যাপার। তবে মারা গেছে মনে হয় মিনিমাম চার-পাঁচ ঘণ্টা আগে’ রবিনকে মেনে নিতে হয়েছিল, শিলা আপু জরুরি বিভাগে কারও জন্য জরুরি ব্যাপার না। কিন্তু শিলা আপু আত্মহত্যা করবে, এটা তো মানা যায় না! সে তো বাঁচতে চাইত প্রবলভাবে। ইমারজেন্সি ইউনিটের এক কোণের বেঞ্চে বসে রবিনের চোখে ছোটকাল থেকে দেখা শিলা আপুর হাজার ছবি ভাসছিল। তার কথা, তার হাত নাড়া, তার কণ্ঠস্বর, দু’একটা ছবিতে এসে থমকে দাঁড়াতে হচ্ছিল বটে, কিন্তু তাই বলে সারা জীবনের সমস্ত ঘটনায় এত তাড়াতাড়ি চক্কর দিয়ে আসা যায়, আশ্চর্য! রবিনের সেই কয়েকটা মিনিট যেন অনন্তকাল, সে কেবল স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে সামনে-পেছনে যাওয়া-আসা করছিল। থেকে থেকে কানে বাজে শিলা আপুর কণ্ঠস্বর, ‘জীবনকে এড়িয়ে কখনও শান্তি পাওয়া যায় না- কী, ভাবছিস আমার কথা?...না, ভার্জিনিয়া উলফের। তবে সমস্যা হলো, এই কথা বলার ক’দিন বাদেই মহিলা নিজের ওভার কোটের পকেটে পাথর ভরে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন; পরের তিন সপ্তাহ তার শরীরটাও খুঁজে পাওয়া গেল না। বুঝে দেখ ব্যাপারটা এখন, মানুষ এমন কত কথা বলে যা সে নিজেই বিশ্বাস করে না। তবে হ্যাঁ, হয়তো বিশ্বাস করতে চায়, তাই নিজেকেই শোনায়, অন্যেরা ভাবে অভিজ্ঞতার ফসল।’ রবিনের মনে হলো ডুকরে কেঁদে ওঠে, শিলা আপুও কি তবে...? নতুনডাক্তার এসে আগের মতোই স্বাভাবিক গলায় বলল, “খবর দিয়েছেন সবাইকে? পুলিশ রিপোর্ট লেখা হয়ে গেলে লাশ ঢাকা মেডিকেলে চলে যাচ্ছে, কেমন?” রবিন ফোন করেছিল শিলার মাকে। তারা দেশের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল, সেখান থেকে ফিরছে, ঘণ্টা তিনেক পরে চলে আসবে। ততক্ষণ রবিনের আর নড়ার উপায় নেই। শিলা আপুর বরকে ফোনে পাওয়া যায়নি, ফোন বন্ধ। বহুবার চেষ্টা করেও না পাওয়ার পরে ড্রাইভারকে তার কথা জিজ্ঞাসা করল সে। ড্রাইভার জানাল দুপুরে তাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে এসেছে। তখন থেকে রবিনের মাথায় ‘দুপুর’ শব্দটা ঘুরছিল। অনন্ত চার-পাঁচ ঘণ্টা আগে শিলা আপু মারা গেছে, তখন দুপুরই ছিল বটে। কিন্তু চট করে তাকে সন্দেহইবা করে কী করে, শিলা আপু তো তার সাথে ভালোই ছিল, বিয়ে হয়েছে বছরখানেক মাত্র। কখনও তার ব্যাপারে খারাপ কিছু বলেনি, কেবল সপ্তাহখানেক আগে বলেছিল, ‘জানিস, রবিন, মনের ভেতরে একটা না বলা কাহিনি পুষে রাখার মতো ক্ষোভ আর নেই।’ রবিন জানতে চায়নি কী সেই না বলা কাহিনি কিন্তু শিলা আপুর মতো সুখী মানুষের ভেতরে কোনো ক্ষোভ থাকতে পারে, সেটা ঠিক ভাবা যায় না। আবার পরে মনে হয়েছিল, থাকতেই পারে। সেবারে ছুটিতে ঢাকায় এলো আর জোর করে বিয়ে দিলেন তার মা, এ নিয়ে কোনো ক্ষোভ ছিল কি? ডাক্তারের কথায় ভাবনা থেকে ফিরে এসেছিল রবিন, ‘চলেন, রিপোর্ট লেখা হবে। পুলিশ চলে এসেছে।’ যেখানে কথা বলার মতোই অবস্থা ছিল না সেখানে হাজার প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা তখন রবিনের দায়িত্ব। একই প্রশ্ন কতবার যে কতভাবে করা হলো! ‘দরজা ভেজানো ছিল?’ ‘দরজা লক ছিল না?’ ‘আপনি ঠেলা দেবার পর দরজা খুলল?’ প্রশ্নের ফাঁকে একজন আরেকজনকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘আত্মহত্যা করলে মানুষ দরজা লক না করে করবে?’ তারপর আবার রবিনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘আচ্ছা বাড়ির কাজের লোকেরা ছিল না কেন, বলেন তো?’ রবিন বলেছিল সে জানে না। পুলিশ বলল, ‘জানেন না মানে?’ শিলার সাথে তার হাজব্যান্ডের সম্পর্ক কেমন ছিল, তার কোনো শত্রু ছিল কি না, সব প্রশ্নের একই নির্দোষ উত্তরে পুলিশের একই প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শিলা আপুর বাড়ির খুটিনাটি, তার মৃত্যুর সাথে জড়িত নানারকম মোটিভের সবকিছু না জানা রবিনের জন্য তখন বিরাট অপরাধ। গলায় ফাঁস বা বিষক্রিয়া কোনো কিছুর কোনো আলামত কেন দেখা যাচ্ছে না সেই হতাশার কথাটাও রবিনের দিকে কটাক্ষ দৃষ্টি দিয়ে বলা হলো। শেষে লাশসহ রবিন চলে এলো মেডিকেলে। তাকে রেখে দুই পুলিশ চা খেতে চলে গেল। হাঁটুর উপরে হাত রেখে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল রবিন। লাঠিতে একগোছা দড়ি লাগানো এক জিনিস দিয়ে কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ মুছেই যাচ্ছে, অথচ তারপরেও মনে হয় এই মেঝেতে কোনোদিন ঝাড়– পড়েনি। শিলা আপু না হয় সবরকম ইনফেকশনের উর্ধ্বে উঠে গেছে, কিন্তু জীবিত রোগীরা এই পরিবেশে কী করে বেঁচে আছে ভাবতে অবাক লাগে। ‘কই, আমার শিলা কই?’ আন্টির গলায় চিন্তায় ছেদ পড়ে রবিনের। ‘কী হয়েছে, কী করে হলো, রবিন?’ তারপর আর কথা নেই। অনেকক্ষণ কান্নাকাটির পরে শিলা আপুর বাবা যেন দোষ দেয়ার একটা উপলক্ষ পেলেন, স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘এই বিয়ে দিও না, বলেছিলাম না আমি? লোভ, তোমার লোভে আমার মেয়েকে জীবন দিতে হলো।’ শিলা আপুর মা নাকচোখ মুছে বললেন, ‘আমাকে দোষ দিচ্ছ কেন? আমি কী করলাম?’ ‘তোমাকে আমি বলিনি, পড়াশোনা নিয়ে থাকা মেয়ে আমার, তাকে তার মতো ছেলে দেখে বিয়ে দিতে হবে? কিন্তু তুমি এই ছেলের টাকাপয়সা দেখে পাগল হয়ে গেলে।’ ‘তো, তুমি রাজি হয়েছিলে কেন?’ ‘আমি কখনও রাজি হইনি। মানা শুনবে না দেখে চুপ ছিলাম।’ ‘কেন চুপ ছিলে তুমি?’ আন্টি আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। অপরাধী গলায় শিলা আপুর বাবা বললেন, ‘মাসখানেক আগে একজন বলল, জামাইয়ের ওই রিয়েল এস্টেট ব্যবসাটা কেবল লোকদেখানো, আসল হলো পর্ন ফিল্মের ব্যবসা। তখন বিশ্বাস করিনি। শিলা নিশ্চয়ই কিছু জেনে ফেলেছিল। ইস্ আমি যদি শিলাকে আগেই সতর্ক করতে পারতাম!’ ‘করোনি কেন?’ হাউমাউ কান্নাকাটির মঝেখানে মুখ থেকে হাত সরিয়ে বললেন আন্টি, ‘এখন দেখলে তো কী হলো?’ ‘যা হয়েছে, তা হয়েছে কেবল তোমার জন্য। পয়সা দেখে কোনো খোঁজখবর না নিয়ে এভাবে কেউ নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়? আমি জানতাম এর পরিণাম ভয়াবহ হবে। শিলার মতো মেয়ে ওভাবে সুখী হতে পারে না।’ ‘তুমি তো সবই জানতে, কিন্তু এখন...’ তাদের উত্তপ্ত কথাবার্তার মধ্যে দুই পুলিশ এসে উপস্থিত হলেন। ‘শিলার হাজব্যন্ডকেই তাহলে সন্দেহ করছেন আপনারা?’ একজন জানতে চাইলেন। ‘অবশ্যই। সে-ই খুন করেছে আমার মেয়েকে। নইলে সুস্থ স্বাভাবিক একটা মানুষ এভাবে মরে যেতে পারে?’ শিলা আপুর বাবা বললেন। ‘কোনো অসুস্থতা ছিল কি না সেটা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত তো জানা যাচ্ছে না। দেখা যাক। আর তার ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।’ পুলিশেরা আরও কিছু জেরা করে একটু থামল। তিনজন সাংবাদিক কোত্থেকে এসে হাজির হলো, প্রশ্নের সুযোগ খুঁজতে লাগল। আন্টি স্ট্রেচারের বাইরে বেরিয়ে থাকা হাতটা নিয়ে বিলাপ করতে লাগলেন, ‘আমার শিলা, শেষপর্যন্ত এই ময়লা জায়গায় পড়ে আছে, ভাবা যায়?’ প্রশ্নটা হয়তো রবিনের দিকে ছিল। রবিন উত্তর না দিয়ে তাকে ধরে এনে বেঞ্চে বসিয়ে দেয়। তিনি রবিনের হাত ধরেন, যেন একজন কাউকে তার একটা কিছু বলা দরকার, ‘কত স্ট্রাগল করল এই মেয়ে জীবনে। পিএইচডি করতে দেশের বাইরে যাবে, কত আশা ছিল, জানো রবিন, দেখেছ তো তোমরা, সারারাত জেগে পড়াশোনা, কত ভালো রেজাল্ট ...আমি কি জানতাম, ভাবলাম এমন যোগ্য মেয়ের জন্য ওরকম বড়লোক হাজব্যান্ড না হলে মানায়? এখন কী হলো বলো তো?’ রবিনের কাছে কোনো উত্তর নেই, সে কেবল তার হাত ধরে বসে থাকে। ‘দেখলে, আমার মেয়েটা জীবনে কিছুই পেল না। অনেক নামডাক হতে পারত, নিজের কাজের ব্যাপারে সৎ ছিল। পরাজয় মানত না। এমনকী সামান্য টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় এক মার্ক কম পাওয়ার দুঃখে সারারাত ঘুমাতে পারত না, আরও বেশি খাটবে, প্রতিজ্ঞা করত। আচ্ছা, কী হলো এত কিছু করে?’ সাংবাদিকদের কৌতুহলের শেষ নেই, তারা প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে। কিছু কান্না কিছু আফসোসের ফাঁকে দুজন এসে স্ট্রেচার ঠেলে নিয়ে যেতে লাগল। বাবা ছুটে গেলেন, ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?’ রবিন পেছন থেকে তার কাঁধে হাত রাখল, ‘পোস্টমর্টেমের জন্য নিচ্ছে, আঙ্কেল।’ তিনি যেন কী বলতে চাইলেন আবার কী মনে করে হাত সরিয়ে নিলেন স্ট্রেচার থেকে। শিলা আপুর মা পেছন থেকে ছুটে এলেন, ‘কী হবে, কী হবে এসব করে? আমার মেয়ে ফিরে আসবে?’ উঁচু ছাদওলা, প্লাস্টার খসে পড়া দেয়ালের পাশে হাজার মানুষের ছোটাছুটিতে গমগম করা করিডোরে রবিনের হঠাৎ কেমন শীতশীত লাগে। স্ট্রেচারটা সরে যায় চোখের সামনে থেকে। শিলা আপুর বাবা-মাকে বুঝিয়ে বাড়ির দিকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেও রাস্তায় বেরিয়ে আসে। ফুটপাথে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, খবরের পোকা শিলা আপু নিজেই কাল সকালের শিরোনাম হবে। পুলিশ বাড়িতে আস্তানা গাঁড়বে, জিজ্ঞাসাবাদ চলতে থাকবে, রিপোর্টাররাও সুযোগ ছাড়বে না। তার সংসারের নাড়িভুড়ি টেনে বের করা হবে, উন্মুক্ত করা হবে, তার একজন গোপন প্রেমিকও পয়দা হয়ে যেতে পারে। কিছুদিন এ নিয়ে চলতে থাকবে টিভিতে, নিউজ পেপারে। তারপর ক’দিন বাদে সবাই ভুলে যাবে। শিলা আপুর ব্যাপারে রবিনের আর কিছু মনে পড়ুক না পড়ুক, এটুকু মনে পড়বেই যে সে বাঁচতে চেয়েছিল। আফসানা বেগম : কথাসাহিত্যিক। পেয়েছেন জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার-২০১৪। অলঙ্করণ : সঞ্জয় দে রিপন।

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।